ধর্মীয় সম্প্রদায় - পৃষ্ঠা নং-৪

বর্তমানে অন্য ধর্মের কেহ ইসলাম ধর্মগ্রহণ করলে তাকে নওমুসলিম বলা হয়। অনুরুপ ত্রয়োদশ, চতুর্দশ শতকে বৌদ্ধরা ইসলাম গ্রহণ করলে তাকে ন্যাড়া মুসলমান বলা হত। পরবতীতে স্পর্শকাতর ন্যাড়া বা না’ড়ে বলে মুসলমানদের উপহাস করা হত। ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে বাংলায় ইসলাম ধর্মের দ্রুত বিস্তার ঘটতে থাকে। এর ফলে দলে দলে দেশীয় লোকেরা অর্থাৎ বাঙালিরা ইসলাম ধর্মগ্রহণ করে। বর্ণহিন্দুদের নির্যাতন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ও নিম্নবর্ণের হিন্দুরা ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়ে বাংলার মুসলমান সমাজকে বিরাট আকার প্রদান করে। বাংলাদেশের মুণ্ডিত মস্তক বৌদ্ধদের প্রায় পুরো অংশটিই মুসলমান হয়ে যাওয়ার কারণে উচ্চ বর্ণের হিন্দুরা মুসলমানদের নেড়ে বলে অভিহিত করেন। বঙ্কিমচন্দ্র এই নেড়ে শব্দ তার আনন্দমঠ উপন্যাসে মুসমানদের জন্য ব্যাবহার করেছেন।

রাজবাড়িতে ১৩৩৭ সালে বালিয়াকান্দি উপজেলার জঙ্গল ইউনিয়নের নমঃশুদ্র হিন্দু ও নাড়ুয়া ইউনিয়নের মুসলমানদের মধ্যে গরু  কোরবানী নিয়ে ব্যাপকাকারে  এক কাইজা বাঁধে। এ নিয়ে সে সময় এক গ্রাম্য সায়ের রচিত হয় সায়রের কিঞ্চিত নিম্নরুপ---------

সন ১৩৩৭ সাল ৮ই জ্যৈষ্ঠ শুক্রবার

নমঃ সাথে বাধলোরে গোলমাল

দেশে এলোরে জঞ্জাল।

আজকে না’ড়ে পড়ছো ফেরে, ও শরকীর আগায় নেব জান

না’ড়ে খাব ভাতে দিয়ে কাঁদিবে তোর যতেক মুসলমান।

এরুপ না’ড়ে শব্দের গণব্যবহারে ধারণা করা যায় এ অঞ্চলের মণ্ডিত মস্তক বৌদ্ধরা বিপুলাকারে মুসলমান ধর্মে দীক্ষিত হয়। ১৮ শতকে বঙ্গে মুসলমানের সংখ্যা হিন্দুর সংখ্যা ছাড়িয়ে যায়। অবশ্য মোগলরা ইসলাম প্রচারে উদাসীন ছিলেন। তা সত্ত্বেও ইসলাম প্রসারের কারণ কী? এ বিষয়ে কয়েকটি কারণ নির্দেশ করা যাবে। প্রথমত মোগল শাসনকালে বাংলায় মুসলিম আধিপাত্য বৃদ্ধি পায়। মোগল শাসকদের মধ্যে অনেকে স্থায়ী বসতি স্থাপন করে। এছাড়া সেনাপতি, দেওয়ান, ফৌজদার, আমলা, কর্মচারী অনেকে স্থায়ী বসতবাড়ি গড়ে তোলে। তাদের শাসনকালে অনেকে ব্যাবসা, বাণিজ্য, জমিদারী কর্তৃকত্ব গ্রহণ করে। ১৫৭৪ সালে সম্রাট আকবর মোরাদ খাকে বাংলা অধিকারে পূর্ববঙ্গ পাঠান। আকবরনামায় দেখা যায় তিনি ফতেহাবাদ (ফরিদপুর) বা সরকার বাকলা বা বাকের গঞ্জকে আকবরের রাজ্যভুক্ত করেন। সুবাদারগণ ফরিদপুর শহরের তের মাইল উত্তর পশ্চিমে বর্তমান রাজবাড়ি সদর থানার অন্তর্গত খানখানাপুর গ্রামে বসবাস করতেন। মাত্র ছয়বছর রাজত্বের পর তিনি পরলোকগমন করেন। (আসকার ইবনে শাইখ, বাংলার শাসনকর্তা, পৃষ্ঠা-৩৩)। এরুপ অনেকেই বঙ্গে থেকে যান।

দ্বিতীয় যে বিশেষ কারণ তা হল পীর, আউলিয়া, দরবেশ ধর্মপ্রচারদের আগমন, স্থায়ী বসতি এবং ধর্ম প্রচার। সুলতানি আমল থেকে পীর দরবেশ আগমন করেন। তাদের সংখ্যা ছিল কম। চৌদ্দ শতকের সবচেয়ে উল্লেখ্য পীর ও ধর্ম প্রচারক হলেন হযরত শাহ জালাল (১৩৪৫)। খুলনায় পীর খানজাহান আলী (১৪৫৯)। যোদ্ধার বেশে এসে পীর খানজাহান আলী পীর পরিচিতিতে পরিচিত হন। তিনি যশোর, খুলনা জয় করে খলিফাতাবাদ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং ইসলাম প্রচার করেন। এরপর  দিনাজপুরে ইসলাম প্রচার করেন সাহ বদরুদ্দিন পাবনায়, মখদুম শাহ দৌলা , ঢাকায় শাহ আলী বাগদাদী, ফরিদপুরে  ফরিদ উদ্দিন (শেখ ফরিদ) নোয়াখালিতে আহমদ নবী এবং চট্রগ্রামে বদর শাহ। এরপর দলে-দলে আগমন করেন সূফী দরবেশ, পীর ও ফকীর। তাঁরা আবার ছিলেন বিভিন্ন তরীকাভুক্ত যেমন চিশতিয়া, কালান্দরিয়া, মাদারিয়া, কাদেরিয়া, নখশাবন্দিয়অ, আহমদিয়া ইত্যাদি।

Additional information