ধর্মীয় সম্প্রদায় - পৃষ্ঠা নং-৫

ধর্মচেতনা, ধর্মপালন আমাদের জীবন ব্যবস্থায় নিত্যসঙ্গী। হাজার হাজার বছর ধরে বংশ পরস্পরায় মানব জাতি ধর্মাচরণে অভ্যস্থ। পৃথিবীতে যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ধর্ম সংস্কৃতির ছায়ায় মানুষ বসবাস করছে সে সব ধর্মের বিকাশ ঘটেছে খ্রিস্টের জন্মের প্রায় ৫০০ শত বছর পূর্বে ও পরে। এ সময়ের মধ্যে হিন্দু ধর্ম রামায়ণ, মহাভারত, ‍উপনিষদ, পুরাণ, উপপুরাণভিত্তিক স্বকীয় সত্ত্বা লাভ করে। গৌতম বুদ্ধ, যিশুখ্রিস্ট এবং হযরত মুহম্মদ (সঃ) এর আবির্ভাব এ সময়ের মধ্যে। যুগে যুগে সর্ব ধর্মই নানা ভাগে বিভক্ত হয়েছে, নানা কুসংস্কারে আটকে গেছে। বঙ্গে ইসলামের যে স্বচ্ছ ধারাটি প্রায় ৫০০ বছর ধরে চলে আসছিল উপনেবেশিক ইংরেজ শাসনকালে বিশেষ করে উনবিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকে বিংশ শতাব্দীর সংস্কার আন্দোলন পর্যন্ত তার হাল বেহাল হয়ে পড়ে। ১৯২৬ সালের ‘রওশন হেদায়েত’ পত্রিকায় এ সম্বন্ধে যা লেখা হয়েছিল তা থেকে তৎকালীন ধমীয় অবস্থার মুসলমানদের আভাস পাওয়া যায়------

বহু নাদান মোছলমান কালী পূজা, দুর্গাপূজা, লক্ষী পূজা, সরস্বতী পূজা, বাসন্তি পূজা, চড়ক পূজা, রথ পূজা পাথর পূজা, দরগা পূজা, কদর পূজা, মানিকপীর পূজা, মাদারবাঁশ পূজা, ইত্যাদিতে যোগদান করে শেরেকের মন্ত্রতন্ত্র ব্যবহার করে, কালী, দুর্গা, কামগুরু কামাক্ষা ইত্যাদি নামের দোহাই দেয়, ইত্যাদি শরিয়ত গর্হিত কার্য করতঃ অমূল্য ইমানকে হারাইয়া কাফেরে পরিণত হইয়া জাহান্নামের পথ পরিস্কার করিতেছে। (হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি, গোলাম মুরশিদ)

উনিশ শতকে বঙ্গের মুসলমান কেবল গোত্র এবং নামেই নয় কাজকর্মেও তারা অধমে পরিণত হয়। যে মুসলমান জাতি শত শত বছর ধরে রাজা বাদশার জাতি বলে গৌরবান্বিত, মাত্র শত দেড়শত বছরের মধ্যে তাদের সামাজিক অবস্থান একেবারে পিছন কাতারে পৌঁছে গেছে। প্রায় শতভাগ মুসলমান নিম্ন বুদ্ধিজীবী, কুলি, নৌকাবাহক, পালকিবাহক, গাড়িয়াল, তেলি, কুলু, বেদে, মুটে, মজুরও জমিদারের আজ্ঞবাহকে পরিণত হল। মুসলমানদের এ দুরাবস্থার বিষয়ে ঐতিহাসিকগণ সাধারণভাবে ইংরেজি না শেখা ইংরেজদের থেকে দূরে থাকার নীতিকেই দায়ী করেন। তবে গবেষকগণ এর সাথে আরো অনেক কারণ নির্দেশ করে থাকেন। মূলত সুলতান, পাঠান ও মোগল শাসনকালে ‍সুদীর্ঘ প্রায় ৪০০ শত বছরে বঙ্গের সুলতানদের মধ্যে জাতিস্বত্ত্বার বিকাশ ঘটেনি যা হিন্দুদের মধ্যে ৭ম/৮ম শতকে ঘটেছিল। ভাগ্য-বিড়ম্বনায় ভারত তথা বঙ্গের হিন্দু মুসলিম বৃটিশ শাসনাধীনে থাকলেও শিক্ষা, সাহিত্য, রাজকাজ থেকে মুসলমানেরা দূরে ছিল। এদিকে মোগল শাসনকালে মুসলিম শাসকরা দিল্লী সালতানাতের ঐশ্চর্য বৃদ্ধিতেই ব্যস্ত থাকতেন, প্রজাপালনে নয়। এদিকে বৃটিশ শাসনকালের প্রারম্ভে বাবু ও ভদ্রলোক শ্রেণির নামকরণে একটি শ্রেণির উদ্ভব ঘটে যারা দ্রুত উচ্চ শ্রেণিতে পরিণত হয়। প্রথমত এই বাবু ভদ্রলোক শ্রেণির উন্মেষ কলিকাতা কেন্দ্রীক থাকলেও ধীরে ধীরে তা সারা বঙ্গের বাবু কালচারে পরিণত হয়। তৎকালীন অঞ্চল বিশেষ রাজবাড়ির মুসলমানদের অবস্থা ত্রৈলোক্যনাথের লেখা ‘রাজবাড়িতে একটি মুসলমান সভা থেকে ধারণা পাওয়া যায়-------

‘১৯১২ বা ১৯১৩ সালে রাজবাড়িতে এক মসলমান সভায় সমবেত শ্রোতাদের সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। কিছু হিন্দুও যোগ দিয়েছে। সংখ্যা বিশ পঁচিশ। চট্রগ্রাম থেকে এসেছেন একজন মওলানা, সাথে কয়েকজন মৌলবি। মওলানা সাহেব ওয়াজ করছেন----দেখ ভাইসব, ইংরেজ নহে হিন্দুরাই আমাদের উপর রাজত্ব করছে। ছোট বড় সরকারি কাজে হিন্দুদেরই প্রাধান্য। আমরা কয়জন পাই? আমরা নাকি অশিক্ষিত, মূর্খ।

Additional information