ধর্মীয় সম্প্রদায় - পৃষ্ঠা নং-৬

এখন হইতে তোমরা সজাগ হও। হিন্দুর বাড়ি চাকরি করতে যাবে না। ঘরামির কাজে যাবে না। হিন্দুর ভাত খাবে না ইত্যাদি। ঐ সভায় রাজবাড়ির দুই নামকরা মোক্তার গোবিন্দ চন্দ্র রায় ও চন্দ্রনাথ লাহিড়ী উপস্থিত ছিলেন। গোবিন্দ রায় ছিলেন হাস্যরসিক ও স্পষ্টভাষী। তিনি মওলানা সাহেবকে সম্বোধন করে বললেন শ্রদ্ধেয় মওলানা সাহেব, আপনি আমাদের যে যে উপদেশ দিলেন শুনিলাম। কিন্তু আপনার বোধ হয় ভুল হইয়া গিয়াছে আর একটি উপদেশ দিতে। আপনার বলা উচিত ছিল ‘হিন্দু বাড়ি চুরি করতেও যাইবে না’ তাহা হইলে আমরা অনেকটা নিশ্চিন্ত হইতে পারিতাম। দেখুন আমি মোক্তারী করি এই মহকুমায় যত মোকদ্দমা হয় দেখিতে পাই আসামী শ্রেণিতে মুসলমানই সংখ্যায় বেশি। অবশ্য হিন্দুর মধ্যেও বাগদী, ডোম, মুর্দাফরাস কিছু কিছু আছে। আমাদের এই অঞ্চলের মুসলমানেরা বড় গরীব তারা হিন্দুদের বাড়ি কাজ কর্ম  করিয়া দুধ বেচিয়া কোনো রকমে সংসার চালায়। মুসলমানদের অনেকেরই অনটনের সংসার। টাকার দরকার হইলে হিন্দু মহাজনের শরনাপন্ন হয়। তারপর ধান পাট জন্মাইলে বিক্রয় করিয়া দেনা শোধ করে।’ (আমার স্মৃতিকথা, ত্রৈলোক্যনাথ ভট্রাচার্য, পৃ-১০১)

এ থেকে রাজবাড়িতে তৎকালীন মুসলমানদের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শিক্ষা, সচেতনতা ও স্বাজত্ববোধ কোনো জাতি বা গোষ্ঠীর মুক্তির অনিবার্য শর্ত। ইংরেজ শাসনকালে মুসলমানদের পশ্চাৎপদতার অন্যতম কারণ শিক্ষার অভাব। ইংরেজ শাসনের শুরু থেকেই মুসলমানের ইংরেজি ও পাশ্চাত্য শিক্ষাকে পাপ মনে করে তা বর্জন করে। মুসলমানদের পুনর্জগরণ এবং চেতনা বিকাশের লক্ষ্যে আঠারো শতকের শুরু থেকে সৈয়দ আহম্মেদ, তিতুমীর নেতৃত্ব  দেন। উনিশ শতকে এনায়েত আলী, কেরামত আলী, তরীকায়ে মোহাম্মাদিয়া (মোহাম্মদের পথ) আন্দোলনের নামে শুদ্ধ পথে ধর্ম প্রচারের বন্যা বইয়ে দেন। ২৪ পরগনা, যশোর, ফরিদপুর, রাজশাহী, নোয়াখালি, ঢাকা এলাকায় তা ব্যাপক প্র্রসার লাভ করে। ফরিদপুরের কাজী শরিয়তুল্লাহ (১৭৮১-১৮৪০) ফরায়েজী আন্দোলনের নামে কোর-আন শিক্ষা বা ফরজ পালনে জোর তৎপরতা চালান। এসময় অনেক ফরায়েজী পণ্ডিত রাজবাড়ির মানুষের মধ্যে জাগরণ সৃষ্টি করেন। হাজী শরিয়তুল্লাহর ছেলে পীর দুদু মিয়া কোরআন সুন্নাহভিত্তিক শুদ্ধি আন্দোলন এবং নীলবিদ্রোহে নেতৃত্ব দান কালে সোনাপুরের হাসেম আলীসহ শত শত মুসলমান তার অনুগামী হয়ে ওঠেন। ফরিদপুরের নওয়াব আব্দুল লতিফ ১৮৬৩ সালে মুসলমানদের সুসংগঠিত করার ‍উদ্দেশ্যে ‘মোহামেডান লিটারেরী সোসাইটি’ স্থাপন করেন। কলিকাতাভিত্তিক এ সংগঠনে যোগদান করেন পদমদির (রাজবাড়ি) নবাব মীর মোহাম্মদ আলী। মীর মোহাম্মদ আলী কুষ্টিয়া ও পদমদিতে দুটি ইংলিশ স্কুল স্থাপন করেন। এরমধ্যে পদমদিতে ১৮৫০ এর মাঝামাঝি প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি রাজবাড়ি জেলায় স্থাপিত প্রথম মাইনর ইংলিশ স্কুল।

ঊনিশ শতকের শেষে প্রথম মুসলিম সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেনের বিষাদ সিন্ধু প্রকাশ পায়। গ্রন্থখানার মর্মবাণী মুসলমানদের হৃদয় মথিত করে। রাজবাড়ি শিক্ষিত পরিবারে গ্রন্থটির পাঠ গঠন চলতে থাকে। ইমাম হোসেন এর বিয়োগান্তক অংশটি দল বেঁধে আসা শ্রোতার চোখে অশ্রু ঝরায়। নিরক্ষর গ্রাম্য চাষীরা ইসলামের গৌরব অনুভব করে। এসব তাদের স্বাজাত্য বোধে উদ্ধুদ্ধ করে। এছাড়া তিনি লেখেন মুসলমানদের বাঙ্গালা শিক্ষা-প্রথম ভাগ, এসলামের জয়, জমিদার দর্পণ, কুলসুম জীবনী ইত্যাদি। এসব গ্রন্থ পাঠে অত্র অঞ্চলের মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষার অনুরাগ বৃদ্ধি করে। বিশেষ করে মোসলমানদের বাঙ্গালা শিক্ষা গ্রন্থখানি বাংলা ভাষা শিক্ষা এবং ইসলামী মূল্যবোধের প্রসার ঘটায়। মীর মশাররফ হোসেনের সমসাময়ীক কালে পাংশায় রওশন আলী চৌধুরী ‘কোহিনুর’ পত্রিকা প্রকাশ করেন ( ১৮৯৮)। তৎকালীন সময়ের অতি আলোচিত এই পত্রিকায় মুসলিম জাগরণের পুরোধা পুরুষ  কবি কায়কোবাদ, কবি মোজাম্মেল হক, শেখ ফজলুল করিম, মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, এয়াকুব আলী চৌধুরী প্রমুখ। অত্র অঞ্চলের মুসলমান জাগরণ, সংগ্রাম ও সচেতনাত বৃদ্ধিতে পত্রিকাটি বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে।

Additional information