ধর্মীয় সম্প্রদায়

  • Print

ধর্মীয় সম্প্রদায়

১২০৬ খ্রিস্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজীর পূর্বে এদেশের রাজা ও প্রজা প্রায় সকলেই ছিল বৌদ্ধ ও হিন্দু। কেবল মুসলমানদের রাজত্ব শুরু হবার পর থেকে মুসলমান প্রবাহের শুরু হয়। এ ধর্ম কখন বিশেষভাবে প্রসার লাভ করে তার একটা পরোক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায় বঙ্গদেশে নির্মিত মসজিদের সংখ্যা এবং অবস্থান থেকে। ত্রয়োদশ শতকে মসজিদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৬টি। পরে শতাব্দীতে এই সংখ্যা আনুপাতিক সেটেই বৃদ্ধি পায়। এ শতাব্দীতে এরুপ মসজিদ নির্মিত হয় সাতটি। পনের শতকে এ সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং মসজিদ তৈরি হয় ৬৬টি। আর যোল শতকে ৭৫টি। তারপর সতের শতকে ঢাকা, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, নোয়াখালি, কুমিল্লা ইত্যাদি অঞ্চলের মসজিদের সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পায়। ক্রেমারের গবেষণা থেকে জানা যায় ১২০৪ সালে বঙ্গদেশে মোট জনসংখ্যা ছিল ১২.৫৮ মিলিয়ন (১ কোটি ২৫ লক্ষ প্রায়) তা ১৮৭২-এ দাঁড়ায় ৩৬.৭ মিলিয়ন (৩ কোটি ৭০ লক্ষ প্রায়)।

১৯০১ এ দাঁড়ায় প্রায় ৪কোটি (উভয় বাংলা)। পানিনি প্রদত্ত গ্রাফে দেখা যায় ১৫০০ খ্রিস্টাব্দের পূর্ববঙ্গে মুসলমান ছিল খুবই কম। তবে ১৮৭২-এর দেখা যায় হিন্দু মুসলমান প্রায় সমান এবং গ্রাফটিতে ১৯০১-এ মুসলমানদের সংখ্যা হিন্দুদের ছাড়িয়ে যায়। প্রায় একশত বছর পূর্বে ফরিদপুর জেলায় হিন্দু, মুসলমান, ব্রাহ্ম, খ্রিস্টান এই চার জাতির বাস ছিল। হিন্দুর সংখ্যা ৭,৩৩৫৫ জন। তম্মোধ্যে পুরুষ ৩৬০০১২ স্ত্রী ৩,৭৩,৫৪৩। ব্রাহ্ম ৮৩ জন। পুরুষ ৪০, মহিলা ৪৩। মুসলমান মোট সংখ্যা ১১,৯৯,৩৫১ জন। তম্মোধ্যে পুরুষ ৬,০৭,৬৮৮ ও স্ত্রী ৫,৯১৬৬৩ জন। খ্রিস্টান ৩,৬৫৭ জন (ফরিদপুরের ইতিহাসে আনন্দনাথ রায় পৃষ্ঠা-২২)।

১৯৬১ সালে আদমশুমারী অনুযায়ী ফরিদপুর জেলার মোট জনসংখ্যা ৩১,৭৮,৯৪৫। এরমধ্যে ২৩,৪৭,১৭৩ জন মুসলমান। ২,২৮,৫০৬ জন কাষ্ট হিন্দু। ৬,৯৬,৫৫৮ জন শিডিউল কাষ্ট (নমশুদ্র), ৯,১৫৮ জন খ্রিস্টান এবং অন্যান্য ৫৫০ জন। এ সময় গোয়ালন্দ মহকুমার হিন্দু ও মুসলমান জনসংখ্যার পরিমাণ ছিল নিম্নরুপ------

মহাকুমার

থান/নাম সমস্ত ধর্মের লোকসংখ্যা, মুসলমান, কাষ্টহিন্দু,শিডিউলকাষ্ট হিন্দু,মোট হিন্দু,ক্রীশ্চিয়ান, অন্যান্য

গোয়ালন্দ মহাকুমা     ৪৩৪৪০৭,   ৩১৫৮৮৬, ৫১০৯৩,   ৬৭৩৪৯,     ১১৮৪৪২,    ৩০       ৭৯

পাংশা  থানা          ১৫৮৩৩১,   ১২৪২৯৫,   ১৮০১৪,     ১৬০২২,     ৩৪০৩৮,     ০০       ৩০

বালিয়াকান্দি থান    ১১৮০৩৬,   ৬৫৭১৫,   ১৭৪৩২,     ৩৪৮৮৯,      ৫২৪৪৯,     ০০       ০০

রাজবাড়ি থানা       ১১৩৪৪৯,    ৮৯৩৭৬,  ১৪৪৪৮,      ৯৫৩৬,      ২৩৯৮৪,     ৩০       ৪৯

গোয়ালন্দ ঘাট        ৪৪৬০১,     ৩৬৫০০,   ১১১৯,        ৬৯০২       ৮০২৯,       ০০       ০০

উল্লেখিত বিবরণ, গ্রাফ ও তথ্যসূচী থেকে জেলায় মুসলমান সংখ্যা বৃ্দ্ধির স্পষ্ট নিদর্শন মেলে।


বঙ্গে ইসলাম প্রবাহের কয়েকটি কারণ উল্লেখযোগ্য যথা-----তরবারি, সামাজিক সাম্য, পীরদরবেশ ও আউলিয়াদের ধর্ম প্রচার, বৌদ্ধ ও হিন্দুদের সামাজিক অবস্থা এবং বঙ্গের সহজ জীবন ব্যবস্থা। ভারতবর্ষে যদি কেবল তরবারির দ্বারা ইসলামের প্রসার ঘটত তাহলে দিল্লী, আগ্রাতেই মুসলমান বেশি থাকত। কিন্তু তুলনামূলক দেখা যায় ইসলাম ধর্মের প্রসার ঘটেছে দ্রুত এবং তা আবার ১৫ শতকের পর অর্থাৎ মোগল শাসনকাল থেকে।

মোগলরা আবার ধর্মপ্রচারে উদাসীন ছিলেন বলেই ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয়। নবম শতাব্দী থেকে আরব বণিকরা চট্রগ্রাম অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। অবশ্য তারা র্ধম প্রচার করতে আসেননি। বখতিয়ার খলজির মতো তারাও এসেছিলেন ইহলৌকিক লাভের আশায়। এদেশে বণিক ও যোদ্ধা ছাড়া আরো এসেছিলেন ধর্ম প্রচারকরা। তারা দেশ শাসন বা ব্যবসা করতে আসেননি।

তারা এসেছিলেন ধর্মপ্রচারে দ্বারা পুণ্য অর্জন করতে। মহম্মদ এনামুল হকের মতে এ রকম একজন প্রচারক বাবা আদম এসেছিলেন দ্বাদশ শতকের গোড়ায়। জানা যায় তিনি, নাকি বল্লভ সেনের সাথে যুদ্ধ করে ১১১৯ সালে মারা যান। তারপরে আসেন শাহ মুহম্মদ সুলতান। সে কালের প্রখ্যাত সুফি সৈয়দ জালালউদ্দিন মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার কিছু আগে বঙ্গে এসেছিলেন। তারা সে সময় আগমন করলেও ইসলাম প্রচারে বিশেষ সুবিধা করতে পারেননি। কারণ তখন রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকাতার অভাব ছিল। তবে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠায় ইসলাম প্রচার প্রসারে ব্যাপক সাহায্য করেছিল। সুলতানদের লক্ষ্য না হলেও তারা আদৌ ধর্মনিরপেক্ষ ছিলেন না। তারা বরং বিদ্বেষের কর্তৃত্বকে প্রতিষ্ঠিত এবং জোরদার করার জন্য অকাতরে ধর্মের নাম এবং প্রতীক ব্যবহার করেছেন। সেই সঙ্গে ব্যাবহার করেছেন তরবারি। নিজেদের নামে খুৎবা প্রচলন রীতি তখন প্রকাশ্যে রীতি হিসেবে গৃহীত হয়েছিল। মুসলমানদের সংখ্যা কম হলেও তারা বহু মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন ও নির্মাণ করতে সাহায্য করেছিলেন। বস্তুত মসজিদ ধর্ম প্রচারের প্রতিকে পরিণত হয়েছিল। নতুন কর্তৃত্বের সমকালীন ঐতিহাসিক মিনহাজ এর বিবরণ থেকে জানা যায়, জাহাঙ্গীর খিলজী গোবিন্দ পালের রাজধানী অজন্তপুরী আক্রমন করে এবং রাজধানী দখলের পর বৌদ্ধবিহার লুটপাট এবং বৌদ্ধ ভিক্ষুদের  হত্যা করে। অনেক বৌদ্ধ সে সময় মুসলমানদের অত্যাচার থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দক্ষিণ পূর্ববাংলায় এবং নেপালে আশ্রয় নেয়। হিন্দু মন্দিরও ভেঙ্গে ফেলেন। এছাড়া তাদের মূর্তিপূজা বিরোধী মনোভাব ছিল। সুলতানি আমলেও প্রথম দিকে বৌদ্ধ বিহার ও মন্দির ধবংসের ঘটনা কমবেশি ঘটে থাকলেও জোর জুলুম করে হিন্দু প্রধান বাংলায় রাজ্যশাসন স্থায়ী হবে না তা তারা বুঝেছিলেন। এছাড়া গোটা দেশ জুড়ে ছিল ছোট বড় হিন্দু রাজা ও জমিদার। তাদের বশে না-রাখতে পারলে ভূমি রাজস্ব পাওয়া যাবে না। এ কারণে সুলতানি শাসনের পরবর্তীকালে শাসকগণ ধর্ম প্রচারে উৎসাহিত ছিলেন না। বাংলায় ইসলাম ধর্মের বিকাশে যত মতবাদই থাক না কেন এদেশে মুসলিম শাসনের প্রাক্কালে আরব, তুরস্ক, ইরাক থেকে যে সংস্কৃতির প্রবাহের ঢেউ এসে ধাক্কা দেয় তা ধীরে ধীরে বাংলার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়ে। একথা কোনো ইতিহাসবিদ অস্বীকার করতে পারবেন না। একথা ঠিক যে, কোনো অঞ্চলে সভ্যতার উন্মেষ ঘটলে তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ‍উভয় প্রভাব সর্বত্র ছড়েয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে প্রত্যক্ষভাবে মুসলমান বিজয়ীরা মুসলিম সংস্কৃতির বিকাশ বঙ্গে ঘটেয়েছিল। তবে প্রথম দিকে তা ফরিদপুর অঞ্চলে বা পূর্ববঙ্গে ঘটেনি। পূর্ববঙ্গ তখনও মুসলিম শাসনের আওতায় আসে নাই। ১২৭৫ খ্রি. সুলতান মুগীস উদ্দিন তুগরিল দিল্লীর বশ্যতা অস্বীকার করে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং নিজ নামে খুৎবা পাঠ এবং মুদ্রা চালু করেন। তিনি পদ্মা নদীর দুই তীরবর্তী অঞ্চলে বিশেষ করে বর্তমান রাজবাড়ি ফরিদপুর এবং ঢাকা জেলার পশ্চিম-দক্ষিণাংশের উপর কর্তৃত্ব স্থাপন করেন।

সুলতান রুকুনউদ্দিন বরবক শাহের পুত্র শামসুদ্দিন ইউসুফ শাহ (১৪৭৪-১৪৮১) সাত বছর বাংলা শাসন করেন। ইউসুফ শাহের মৃত্যুর পর তার পুত্র সিকান্দার শাহকে (১৪৮১) সরিয়ে রুকুনউদ্দিন বরবক শাহের ছোট ভাই ফতেহ শাহ (১৪৮১-১৪৮৯) ক্ষমতা দখল করেন।


ফতেহ শাহর সময়ে গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, ফুলেশ্বরী, ইদিলপুর, রাজবাড়ি মোগল শাসকরা বসতি স্থাপন করে। ১৪৮৭ থেকে ১৪৯৩ হাবশী ক্রীতদাসগণ বাংলা শাসন করেন। এ সময় ছিল অশান্তির যুগ। ১৪৯৩ খ্রিস্টাব্দের সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ লক্ষ্ণৌতে তথা বাংলার সিংহাসনে আসিন হন। তার সময়েই ফতেহবাদ অঞ্চল সরাসরি মুসলমানদের অধিকারে আসে। ফতেহবাদ অঞ্চলকে নুশরতশাহী, মাহমুদশাহী, ইউসুফশাহী ও মাহমুদাবাদ নামকরণ করেন। এরমধ্যে রাজবাড়ি নশরত শাহী ও ফতেহাবাদে অন্তভুক্ত হয়। (পরগনা হিসেবে রাজবাড়ি নুশরতশাহী দেখা যায়।) সুলতানি শাসনকালে প্রায় ২০০ বছর ফতেহাবাদ উল্লেখযোগ্য শাসন কেন্দ্রে পরিণত হয়। ফতেহবাদ টাকশালি থেকে মুদ্রা উত্তোলন হত। দীর্ঘকাল ও অঞ্চল মুসলিম শাসনাধীন থাকায় ইসলামের প্রসার ঘটাই স্বাভাবিক। এরমধ্যে হুসেন শাহের বংশের রাজত্বকাল ১৪৯৩-১৫৩৮। সুদীর্ঘ প্রায় ৫০ বছর রাজত্বকালে হুসেন শাহ ও তার পুত্র নশরত শাহ ইসলাম ধর্ম প্রচারে অনেক মসজিদ নির্মাণ করেন। নশরত শাহের নির্মিত গৌড়ের সোনা মসজিদ, কদম-রসুল মসজিদ, বার দুয়ারী মসজিদ স্মৃতিস্বরুপ ইসলাম প্রসারের দৃষ্টান্ত বহন করে। ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী থানায় অবস্থিত সাতৈর মসজিদ তাঁর কীর্তি (ফরিদপুরের ইতিহাস, আনম আবদুস সোবহান, পৃষ্ঠা-৩৬)। নশরত শাহ ও তাঁর পিতা হুসেন শাহ প্রজাহিত কাজ ও ইসলাম প্রচারে আরো মসজিদ সরাইখানা নির্মাণ করেন। রাজবাড়ি অঞ্চলটি ফতেহাবাদ, নশরতশাহী এবং মাহমুদাবাদের অংশবিশেষ। রাজবাড়িতে কালুখালির অদূরে ‘রুপসা গায়েবী মসজিদ’, সূর্যনগরের নিকটবর্তী ‘বাগমারা গায়েবী মসজিদ’, আলাদীপুর ইউনিয়নের ‘শিঙ্গা গায়েবী মসজিদ’ নামে ৫০০-৭০০ বছরের পুরানো এসকল মসজিদের ধবংসাবশেষ এখনো দেখা যায়। এ বিষয়ে পরে আলোচনা করা যাবে। মসজিদগুলি হুশেণী বংশের রাজত্বকালে নির্মিত।

তুর্কি শাসনের শুরু থেকে বাংলায় মোগল শাসনের পূর্বকালে প্রায় ৪০০ বছর ধরে ধীরে ধীরে বঙ্গে ইসলাম প্রসার লাভ করেছে। এ প্রসারের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে (১) মুসলমানদের শাসন প্রভাব ও পৃষ্ঠপোষকতা (২) ধর্মে মূর্তির বদলে অমূর্তের আদর্শে জোরপূর্বক হিন্দু দেবদেবী ধবংস (৩) পীর আউলিয়াদের ধর্ম প্রচারে স্বেচ্ছায় ধর্মান্তরিত হওয়া ইত্যাদি। রামাই পণ্ডিতের শূন্য -পূরাণে ইসলাম ধর্মের প্রসারের চিত্র এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

যথেক দেবতাগণ/ সভে হৈয়্যা একমন/ আনন্দেতে পরিলা ইজার/ ব্রাহ্মহৈল্যা মহামদ/ বিষ্ণু হইলা পেকাস্বর/ অদম্ফ হইল্যা শুলপানি। গণেশ গাজী/ কাত্তিক হইল্যা কাজী। ফকীর হইল্যা যথামুনি তেজিয়্যা আপন ভেক/ নারদ হইল্যা শেক, পুরন্দর হইল্যা মওলানা। আপনি চণ্ডিকা দেবী/ তিহ হইল্যা হায়া বিবি/ পদ্মাবতী হইল্যা বিবিনুর। যথেক দেবতাগণ/ সভে হয়্যা একমন/ প্রবেশ করিলা জাজপুর। দেউল দোহারা ভাঙ্গে/ ক্যাড়া ফ্যিড়া খায় বঙ্গে/ পাখর পাখর বলে বোল।

এখানে জাজপুরের মন্দিরে প্রবেশ করে দেবতাদের মূর্তি ভাঙ্গার যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে তা সুলেমান কারবানীর সেনাপতি কালাপাহাড়ের মন্দির তছনছ করার ঘটনা। সে ঘটনা ঘটে ২৫৬৮তে। তবে এ কাব্য রচিত হয় কালাপাহাড় কিংবদন্তিতে পরিণত হওয়ার পর। হয়ত সপ্তদশ শতকের কোনো এক সময়ে। ফলে সত্যের সঙ্গে অতিরঞ্জন মিশে গেছে। বঙ্গদেশে ইসলাম ব্যাপকভাবে প্রচারিত ঠিকই কিন্তু দেবতারা সবাই এক হয়ে রাতারাতি মুসলমান হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ছিলেন তা ঠিক নয়। বরং ধারণা করা সঙ্গত হবে যে ইসলাম ধর্ম তড়িৎগতিতে নয়, পূর্ববঙ্গসহ বাংলার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল ধীরে ধীরে । তবে উক্ত চিত্র থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে মোগল শাসনের পূর্ব পর্যন্ত বিভিন্ন শ্রেণির হিন্দু ইসলামের দীক্ষাগ্রহণ করেন। কেবল হিন্দু নয় এ অঞ্চলে ব্যাপকহারে বৌদ্ধদের বসবাস ছিল। বৌদ্ধরাই বেশি হারে ইসলাম গ্রহণ করে।

অনেক খ্যাতনামা সাহিত্যিকদের লেখায় ‘ন্যাড়া’ ‘যবন’ ইত্যাদি শব্দ পাওয়া যায়। বালিয়াকান্দি ও পাংশা এলাকায় ‘নম’; ও ‘নাড়ে’ বিপরীতমূখী দুটি কূট শব্দ সাধারণ্যে ব্যবাহর হয়। শব্দ দুটি অপমানজনক শব্দ বলে উভয় সম্প্রদায় মনে করে। এ নিয়ে অতীতে কাইজা ফ্যাসাদ ঘটত। মূলত ন্যাড়া থেকে না’ড়ে শব্দটি উদ্ভুত।


বর্তমানে অন্য ধর্মের কেহ ইসলাম ধর্মগ্রহণ করলে তাকে নওমুসলিম বলা হয়। অনুরুপ ত্রয়োদশ, চতুর্দশ শতকে বৌদ্ধরা ইসলাম গ্রহণ করলে তাকে ন্যাড়া মুসলমান বলা হত। পরবতীতে স্পর্শকাতর ন্যাড়া বা না’ড়ে বলে মুসলমানদের উপহাস করা হত। ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে বাংলায় ইসলাম ধর্মের দ্রুত বিস্তার ঘটতে থাকে। এর ফলে দলে দলে দেশীয় লোকেরা অর্থাৎ বাঙালিরা ইসলাম ধর্মগ্রহণ করে। বর্ণহিন্দুদের নির্যাতন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ও নিম্নবর্ণের হিন্দুরা ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়ে বাংলার মুসলমান সমাজকে বিরাট আকার প্রদান করে। বাংলাদেশের মুণ্ডিত মস্তক বৌদ্ধদের প্রায় পুরো অংশটিই মুসলমান হয়ে যাওয়ার কারণে উচ্চ বর্ণের হিন্দুরা মুসলমানদের নেড়ে বলে অভিহিত করেন। বঙ্কিমচন্দ্র এই নেড়ে শব্দ তার আনন্দমঠ উপন্যাসে মুসমানদের জন্য ব্যাবহার করেছেন।

রাজবাড়িতে ১৩৩৭ সালে বালিয়াকান্দি উপজেলার জঙ্গল ইউনিয়নের নমঃশুদ্র হিন্দু ও নাড়ুয়া ইউনিয়নের মুসলমানদের মধ্যে গরু  কোরবানী নিয়ে ব্যাপকাকারে  এক কাইজা বাঁধে। এ নিয়ে সে সময় এক গ্রাম্য সায়ের রচিত হয় সায়রের কিঞ্চিত নিম্নরুপ---------

সন ১৩৩৭ সাল ৮ই জ্যৈষ্ঠ শুক্রবার

নমঃ সাথে বাধলোরে গোলমাল

দেশে এলোরে জঞ্জাল।

আজকে না’ড়ে পড়ছো ফেরে, ও শরকীর আগায় নেব জান

না’ড়ে খাব ভাতে দিয়ে কাঁদিবে তোর যতেক মুসলমান।

এরুপ না’ড়ে শব্দের গণব্যবহারে ধারণা করা যায় এ অঞ্চলের মণ্ডিত মস্তক বৌদ্ধরা বিপুলাকারে মুসলমান ধর্মে দীক্ষিত হয়। ১৮ শতকে বঙ্গে মুসলমানের সংখ্যা হিন্দুর সংখ্যা ছাড়িয়ে যায়। অবশ্য মোগলরা ইসলাম প্রচারে উদাসীন ছিলেন। তা সত্ত্বেও ইসলাম প্রসারের কারণ কী? এ বিষয়ে কয়েকটি কারণ নির্দেশ করা যাবে। প্রথমত মোগল শাসনকালে বাংলায় মুসলিম আধিপাত্য বৃদ্ধি পায়। মোগল শাসকদের মধ্যে অনেকে স্থায়ী বসতি স্থাপন করে। এছাড়া সেনাপতি, দেওয়ান, ফৌজদার, আমলা, কর্মচারী অনেকে স্থায়ী বসতবাড়ি গড়ে তোলে। তাদের শাসনকালে অনেকে ব্যাবসা, বাণিজ্য, জমিদারী কর্তৃকত্ব গ্রহণ করে। ১৫৭৪ সালে সম্রাট আকবর মোরাদ খাকে বাংলা অধিকারে পূর্ববঙ্গ পাঠান। আকবরনামায় দেখা যায় তিনি ফতেহাবাদ (ফরিদপুর) বা সরকার বাকলা বা বাকের গঞ্জকে আকবরের রাজ্যভুক্ত করেন। সুবাদারগণ ফরিদপুর শহরের তের মাইল উত্তর পশ্চিমে বর্তমান রাজবাড়ি সদর থানার অন্তর্গত খানখানাপুর গ্রামে বসবাস করতেন। মাত্র ছয়বছর রাজত্বের পর তিনি পরলোকগমন করেন। (আসকার ইবনে শাইখ, বাংলার শাসনকর্তা, পৃষ্ঠা-৩৩)। এরুপ অনেকেই বঙ্গে থেকে যান।

দ্বিতীয় যে বিশেষ কারণ তা হল পীর, আউলিয়া, দরবেশ ধর্মপ্রচারদের আগমন, স্থায়ী বসতি এবং ধর্ম প্রচার। সুলতানি আমল থেকে পীর দরবেশ আগমন করেন। তাদের সংখ্যা ছিল কম। চৌদ্দ শতকের সবচেয়ে উল্লেখ্য পীর ও ধর্ম প্রচারক হলেন হযরত শাহ জালাল (১৩৪৫)। খুলনায় পীর খানজাহান আলী (১৪৫৯)। যোদ্ধার বেশে এসে পীর খানজাহান আলী পীর পরিচিতিতে পরিচিত হন। তিনি যশোর, খুলনা জয় করে খলিফাতাবাদ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং ইসলাম প্রচার করেন। এরপর  দিনাজপুরে ইসলাম প্রচার করেন সাহ বদরুদ্দিন পাবনায়, মখদুম শাহ দৌলা , ঢাকায় শাহ আলী বাগদাদী, ফরিদপুরে  ফরিদ উদ্দিন (শেখ ফরিদ) নোয়াখালিতে আহমদ নবী এবং চট্রগ্রামে বদর শাহ। এরপর দলে-দলে আগমন করেন সূফী দরবেশ, পীর ও ফকীর। তাঁরা আবার ছিলেন বিভিন্ন তরীকাভুক্ত যেমন চিশতিয়া, কালান্দরিয়া, মাদারিয়া, কাদেরিয়া, নখশাবন্দিয়অ, আহমদিয়া ইত্যাদি।


ধর্মচেতনা, ধর্মপালন আমাদের জীবন ব্যবস্থায় নিত্যসঙ্গী। হাজার হাজার বছর ধরে বংশ পরস্পরায় মানব জাতি ধর্মাচরণে অভ্যস্থ। পৃথিবীতে যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ধর্ম সংস্কৃতির ছায়ায় মানুষ বসবাস করছে সে সব ধর্মের বিকাশ ঘটেছে খ্রিস্টের জন্মের প্রায় ৫০০ শত বছর পূর্বে ও পরে। এ সময়ের মধ্যে হিন্দু ধর্ম রামায়ণ, মহাভারত, ‍উপনিষদ, পুরাণ, উপপুরাণভিত্তিক স্বকীয় সত্ত্বা লাভ করে। গৌতম বুদ্ধ, যিশুখ্রিস্ট এবং হযরত মুহম্মদ (সঃ) এর আবির্ভাব এ সময়ের মধ্যে। যুগে যুগে সর্ব ধর্মই নানা ভাগে বিভক্ত হয়েছে, নানা কুসংস্কারে আটকে গেছে। বঙ্গে ইসলামের যে স্বচ্ছ ধারাটি প্রায় ৫০০ বছর ধরে চলে আসছিল উপনেবেশিক ইংরেজ শাসনকালে বিশেষ করে উনবিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকে বিংশ শতাব্দীর সংস্কার আন্দোলন পর্যন্ত তার হাল বেহাল হয়ে পড়ে। ১৯২৬ সালের ‘রওশন হেদায়েত’ পত্রিকায় এ সম্বন্ধে যা লেখা হয়েছিল তা থেকে তৎকালীন ধমীয় অবস্থার মুসলমানদের আভাস পাওয়া যায়------

বহু নাদান মোছলমান কালী পূজা, দুর্গাপূজা, লক্ষী পূজা, সরস্বতী পূজা, বাসন্তি পূজা, চড়ক পূজা, রথ পূজা পাথর পূজা, দরগা পূজা, কদর পূজা, মানিকপীর পূজা, মাদারবাঁশ পূজা, ইত্যাদিতে যোগদান করে শেরেকের মন্ত্রতন্ত্র ব্যবহার করে, কালী, দুর্গা, কামগুরু কামাক্ষা ইত্যাদি নামের দোহাই দেয়, ইত্যাদি শরিয়ত গর্হিত কার্য করতঃ অমূল্য ইমানকে হারাইয়া কাফেরে পরিণত হইয়া জাহান্নামের পথ পরিস্কার করিতেছে। (হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি, গোলাম মুরশিদ)

উনিশ শতকে বঙ্গের মুসলমান কেবল গোত্র এবং নামেই নয় কাজকর্মেও তারা অধমে পরিণত হয়। যে মুসলমান জাতি শত শত বছর ধরে রাজা বাদশার জাতি বলে গৌরবান্বিত, মাত্র শত দেড়শত বছরের মধ্যে তাদের সামাজিক অবস্থান একেবারে পিছন কাতারে পৌঁছে গেছে। প্রায় শতভাগ মুসলমান নিম্ন বুদ্ধিজীবী, কুলি, নৌকাবাহক, পালকিবাহক, গাড়িয়াল, তেলি, কুলু, বেদে, মুটে, মজুরও জমিদারের আজ্ঞবাহকে পরিণত হল। মুসলমানদের এ দুরাবস্থার বিষয়ে ঐতিহাসিকগণ সাধারণভাবে ইংরেজি না শেখা ইংরেজদের থেকে দূরে থাকার নীতিকেই দায়ী করেন। তবে গবেষকগণ এর সাথে আরো অনেক কারণ নির্দেশ করে থাকেন। মূলত সুলতান, পাঠান ও মোগল শাসনকালে ‍সুদীর্ঘ প্রায় ৪০০ শত বছরে বঙ্গের সুলতানদের মধ্যে জাতিস্বত্ত্বার বিকাশ ঘটেনি যা হিন্দুদের মধ্যে ৭ম/৮ম শতকে ঘটেছিল। ভাগ্য-বিড়ম্বনায় ভারত তথা বঙ্গের হিন্দু মুসলিম বৃটিশ শাসনাধীনে থাকলেও শিক্ষা, সাহিত্য, রাজকাজ থেকে মুসলমানেরা দূরে ছিল। এদিকে মোগল শাসনকালে মুসলিম শাসকরা দিল্লী সালতানাতের ঐশ্চর্য বৃদ্ধিতেই ব্যস্ত থাকতেন, প্রজাপালনে নয়। এদিকে বৃটিশ শাসনকালের প্রারম্ভে বাবু ও ভদ্রলোক শ্রেণির নামকরণে একটি শ্রেণির উদ্ভব ঘটে যারা দ্রুত উচ্চ শ্রেণিতে পরিণত হয়। প্রথমত এই বাবু ভদ্রলোক শ্রেণির উন্মেষ কলিকাতা কেন্দ্রীক থাকলেও ধীরে ধীরে তা সারা বঙ্গের বাবু কালচারে পরিণত হয়। তৎকালীন অঞ্চল বিশেষ রাজবাড়ির মুসলমানদের অবস্থা ত্রৈলোক্যনাথের লেখা ‘রাজবাড়িতে একটি মুসলমান সভা থেকে ধারণা পাওয়া যায়-------

‘১৯১২ বা ১৯১৩ সালে রাজবাড়িতে এক মসলমান সভায় সমবেত শ্রোতাদের সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। কিছু হিন্দুও যোগ দিয়েছে। সংখ্যা বিশ পঁচিশ। চট্রগ্রাম থেকে এসেছেন একজন মওলানা, সাথে কয়েকজন মৌলবি। মওলানা সাহেব ওয়াজ করছেন----দেখ ভাইসব, ইংরেজ নহে হিন্দুরাই আমাদের উপর রাজত্ব করছে। ছোট বড় সরকারি কাজে হিন্দুদেরই প্রাধান্য। আমরা কয়জন পাই? আমরা নাকি অশিক্ষিত, মূর্খ।


এখন হইতে তোমরা সজাগ হও। হিন্দুর বাড়ি চাকরি করতে যাবে না। ঘরামির কাজে যাবে না। হিন্দুর ভাত খাবে না ইত্যাদি। ঐ সভায় রাজবাড়ির দুই নামকরা মোক্তার গোবিন্দ চন্দ্র রায় ও চন্দ্রনাথ লাহিড়ী উপস্থিত ছিলেন। গোবিন্দ রায় ছিলেন হাস্যরসিক ও স্পষ্টভাষী। তিনি মওলানা সাহেবকে সম্বোধন করে বললেন শ্রদ্ধেয় মওলানা সাহেব, আপনি আমাদের যে যে উপদেশ দিলেন শুনিলাম। কিন্তু আপনার বোধ হয় ভুল হইয়া গিয়াছে আর একটি উপদেশ দিতে। আপনার বলা উচিত ছিল ‘হিন্দু বাড়ি চুরি করতেও যাইবে না’ তাহা হইলে আমরা অনেকটা নিশ্চিন্ত হইতে পারিতাম। দেখুন আমি মোক্তারী করি এই মহকুমায় যত মোকদ্দমা হয় দেখিতে পাই আসামী শ্রেণিতে মুসলমানই সংখ্যায় বেশি। অবশ্য হিন্দুর মধ্যেও বাগদী, ডোম, মুর্দাফরাস কিছু কিছু আছে। আমাদের এই অঞ্চলের মুসলমানেরা বড় গরীব তারা হিন্দুদের বাড়ি কাজ কর্ম  করিয়া দুধ বেচিয়া কোনো রকমে সংসার চালায়। মুসলমানদের অনেকেরই অনটনের সংসার। টাকার দরকার হইলে হিন্দু মহাজনের শরনাপন্ন হয়। তারপর ধান পাট জন্মাইলে বিক্রয় করিয়া দেনা শোধ করে।’ (আমার স্মৃতিকথা, ত্রৈলোক্যনাথ ভট্রাচার্য, পৃ-১০১)

এ থেকে রাজবাড়িতে তৎকালীন মুসলমানদের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শিক্ষা, সচেতনতা ও স্বাজত্ববোধ কোনো জাতি বা গোষ্ঠীর মুক্তির অনিবার্য শর্ত। ইংরেজ শাসনকালে মুসলমানদের পশ্চাৎপদতার অন্যতম কারণ শিক্ষার অভাব। ইংরেজ শাসনের শুরু থেকেই মুসলমানের ইংরেজি ও পাশ্চাত্য শিক্ষাকে পাপ মনে করে তা বর্জন করে। মুসলমানদের পুনর্জগরণ এবং চেতনা বিকাশের লক্ষ্যে আঠারো শতকের শুরু থেকে সৈয়দ আহম্মেদ, তিতুমীর নেতৃত্ব  দেন। উনিশ শতকে এনায়েত আলী, কেরামত আলী, তরীকায়ে মোহাম্মাদিয়া (মোহাম্মদের পথ) আন্দোলনের নামে শুদ্ধ পথে ধর্ম প্রচারের বন্যা বইয়ে দেন। ২৪ পরগনা, যশোর, ফরিদপুর, রাজশাহী, নোয়াখালি, ঢাকা এলাকায় তা ব্যাপক প্র্রসার লাভ করে। ফরিদপুরের কাজী শরিয়তুল্লাহ (১৭৮১-১৮৪০) ফরায়েজী আন্দোলনের নামে কোর-আন শিক্ষা বা ফরজ পালনে জোর তৎপরতা চালান। এসময় অনেক ফরায়েজী পণ্ডিত রাজবাড়ির মানুষের মধ্যে জাগরণ সৃষ্টি করেন। হাজী শরিয়তুল্লাহর ছেলে পীর দুদু মিয়া কোরআন সুন্নাহভিত্তিক শুদ্ধি আন্দোলন এবং নীলবিদ্রোহে নেতৃত্ব দান কালে সোনাপুরের হাসেম আলীসহ শত শত মুসলমান তার অনুগামী হয়ে ওঠেন। ফরিদপুরের নওয়াব আব্দুল লতিফ ১৮৬৩ সালে মুসলমানদের সুসংগঠিত করার ‍উদ্দেশ্যে ‘মোহামেডান লিটারেরী সোসাইটি’ স্থাপন করেন। কলিকাতাভিত্তিক এ সংগঠনে যোগদান করেন পদমদির (রাজবাড়ি) নবাব মীর মোহাম্মদ আলী। মীর মোহাম্মদ আলী কুষ্টিয়া ও পদমদিতে দুটি ইংলিশ স্কুল স্থাপন করেন। এরমধ্যে পদমদিতে ১৮৫০ এর মাঝামাঝি প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি রাজবাড়ি জেলায় স্থাপিত প্রথম মাইনর ইংলিশ স্কুল।

ঊনিশ শতকের শেষে প্রথম মুসলিম সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেনের বিষাদ সিন্ধু প্রকাশ পায়। গ্রন্থখানার মর্মবাণী মুসলমানদের হৃদয় মথিত করে। রাজবাড়ি শিক্ষিত পরিবারে গ্রন্থটির পাঠ গঠন চলতে থাকে। ইমাম হোসেন এর বিয়োগান্তক অংশটি দল বেঁধে আসা শ্রোতার চোখে অশ্রু ঝরায়। নিরক্ষর গ্রাম্য চাষীরা ইসলামের গৌরব অনুভব করে। এসব তাদের স্বাজাত্য বোধে উদ্ধুদ্ধ করে। এছাড়া তিনি লেখেন মুসলমানদের বাঙ্গালা শিক্ষা-প্রথম ভাগ, এসলামের জয়, জমিদার দর্পণ, কুলসুম জীবনী ইত্যাদি। এসব গ্রন্থ পাঠে অত্র অঞ্চলের মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষার অনুরাগ বৃদ্ধি করে। বিশেষ করে মোসলমানদের বাঙ্গালা শিক্ষা গ্রন্থখানি বাংলা ভাষা শিক্ষা এবং ইসলামী মূল্যবোধের প্রসার ঘটায়। মীর মশাররফ হোসেনের সমসাময়ীক কালে পাংশায় রওশন আলী চৌধুরী ‘কোহিনুর’ পত্রিকা প্রকাশ করেন ( ১৮৯৮)। তৎকালীন সময়ের অতি আলোচিত এই পত্রিকায় মুসলিম জাগরণের পুরোধা পুরুষ  কবি কায়কোবাদ, কবি মোজাম্মেল হক, শেখ ফজলুল করিম, মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, এয়াকুব আলী চৌধুরী প্রমুখ। অত্র অঞ্চলের মুসলমান জাগরণ, সংগ্রাম ও সচেতনাত বৃদ্ধিতে পত্রিকাটি বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে।


ঊনিশ শতকের শেষে রাজবাড়িতে প্রথম গ্রাজুয়েট আলীমুজ্জামান চৌধুরী। তিনি ছিলেন অত্র এলাকার সমাজসেবক ও প্রজাহিতৈষী জমিদার। ফরিদপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান।

তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় মুসলমান সমাজ অগ্রগামী হয়। বিশ শতকের শুরু থেকে বৃটিশ শাসনের অবসানকাল পর্যন্ত প্রায় অর্ধশত বছরে রাজবাড়ির মুসলমান সমাজ শিক্ষা-দীক্ষাসহ সামাজিক ও আর্থিক ভিত সুদৃঢ় করে তোলে। এ সময়ের কিছু পূর্ব থেকে অত্র এলাকার প্রথম ইংরেজি উচ্চ বিদ্যালয় রাজা সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশন এবং এর ৪ বছর পর ১৮৯২ সালে গোয়ালন্দ মডেল হাই স্কুল (বর্তমান সরকারি উচ্চ বালক বিদ্যালয়) স্থাপিত হওয়ায় গরিব মুসলমান সম্প্রদায় শিক্ষিত হয়ে উঠতে থাকে। স্থানীয় জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতা এবং স্থানীয় হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়ের উৎসাহে খানখানাপুর সুরুজমোহনী হাই স্কুল, বালিয়াকান্দি হাই স্কুল, পাংশা জর্জ হাইস্কুল, নলিয়া জামালপুর হাইস্কুল, গোয়ালন্দ নাজির উদ্দিন হাই স্কুল, বেলগাছি আলীমুজ্জাম হাই স্কুল, হাবাসপুর হাই স্কুলসহ অনেক উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। মুসলমান ছাত্রদের মধ্যে মৌলবী তমিজ উদ্দিন খান, এয়াকুব আলী চৌধুরী, কাজী মোতাহার হোসনে, কাজী আব্দুল ওদুদ, খোন্দকার নাজির উদ্দিন আহমেদ (খাতক পত্রিকার সম্পাদক) ডা. কেএস আলম, ব্যারিস্টার শেলী, প্রিন্সিপ্যাল কেতাব উদ্দিন আহম্মেদ, আহমদ আলী মৃধা, ফখর উদ্দিন আহমেদ, কাজী আবুল কাশেম, কাজী আব্দুল মাজেদ, ডা. এ কে এম আসজাদ, ইউসুফ হোসেন চৌধুরী, এবিএম নুরুল ইসলাম, অধ্যাপক আব্দুল গফুর, এ্যাডভেকেট আব্দুল জলিল, এ্যাডভোকেট আবুল কাশেশ মৃধা, খলিল উদ্দিন জজ সাহেব, তোফাজ্জেল হোসেন জজ সাহেব প্রমুখ উচ্চ শিক্ষিত মুসলমান ছাত্র অঞ্চলভিত্তিক ও জাতীয় উন্নয়নে স্ব-স্ব ভূমিকা রাখেন।

১৯৪৭ সালে বৃটিশ শাসনের অবসানে পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে। ভারতের সংখ্যা গরিষ্ঠ মুসলমান এলাকা নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়। এ সময় পূর্ব-পাকিস্তানের অন্যান্য এলাকার মতো জমিদার শ্রেণিসহ অনেক হিন্দু পরিবার স্থায়ীভাবে রাজবাড়ি ত্যাগ করে। অন্যদিকে ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ মোহাজের ও অবাঙালি বিহারী মুসলমানের অভিবাসন ঘটে। তার স্থায়ীভাবে রাজবাড়ি শহর ও পল্লী এলাকায় স্থায়ী বসতি গড়ে তোলে। ১৯৬০ এর দশকের শুরুতে নোয়াখালি ও কুমিল্লা থেকে অনেক মুসলমান পরিবার রাজবাড়ির বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ করে বাণীবহ, বহরপুর, রামদিয়া, সোনাপুর বসতি স্থাপন করে। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর ভারত থেকে অনেক মোহাজের মুসলমান রাজবাড়ি বিসিক এলাকায় বসতি গড়ে তোলে। কালপ্রবাহে স্বাধীন দেশের রাজবাড়ির মুসলমান অসাম্প্রাদায়িক চেতনায় শিক্ষিত ও মর্যাদাশীল সম্প্রদায় হিসেবে বিবেচিত।

 রুপসা গায়েবী মসজিদ

পদ্মার দক্ষিণে অবস্থিত কালুখালি একটি রেলওয়ে জংশন। রেলওয়ে স্টেশন থেকে স্বল্প দূরত্বে অবস্থিত রুপসা গ্রাম। কাঁচা রাস্তা ধরে এগুতেই রুপসা খাল। আর খালের পাড়েই মসজিদ। মসজিদের খানিকটা মাটির নিচে বসে গেছে। দেখতে অনেকটা অন্ধকার কুঠিরের মতো। মসজিদের প্রাচীন একটি দেয়াল অবশিষ্ট আছে। পাশেই প্রাচীন প্রশস্ত একটি বটবৃক্ষ ছায়াদান করছে। সামনে বিস্তীর্ণ প্রাঙ্গন। এখানে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। মসজিদের মোয়াজ্জেম মোঃ ওয়াজেদ আলী শেখ খোন্দকার। মসজিদটি মোগল শাসনের পূর্বে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে ধারণা করা যায়। 


বাগমারা গায়েবী মসজিদ

রাজবাড়ি শহরের প্রায় ৮ কিমি পশ্চিমে সূর্যনগর রেলস্টেশন। স্টেশনের দক্ষিণে বাগমারা গ্রাম। চন্দনী ও পদ্মা তীরবতী ঘন বনাঞ্চলে একসময় বন্য হিংস্র প্রাণী বাঘ, শুকুরের উপদ্রব ছিল। এই বাগমারায় কোনো এক সময় হয়ত কোনো বাঘ মারা হয়েছিল। সে কারণে স্থানের নাম হয় বাঘমারা। কালে তা পরিবর্তন হয়ে বাগমারা হয়েছে।

বাগমারা বাসস্টান্ডের পাশে অবস্থিত এ মসজিদটিকেও এলাকার মানুষ গায়েবী মসজিদ বলে থাকে। লোকমুখে প্র্রচলিত আছে কোনো এক রাতে জিনেরা মসজিদ তৈরি কলে। তবে সকাল হওয়ায় ঢেঁটি পাড়ের শব্দ শুনে তারা আর মসজিদের ছাদ দিতে পারে না। আসলে প্রাচীন মসজিদটি ছাদ কখন ভেঙ্গে পড়েছিল তা তারা জানে না। পাশে মাজার। সকলে মাজারটি সৈয়দ শাহ রাজেক আলীর (রাঃ) মাজার বলে জানে। অনেক ধর্ম প্রচারকের মতো তিনিও এসেছিলেন কয়েক শতাব্দী পূর্বে  ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে। প্রায় চল্লিশ বছর পূর্বে এলাকার বাসিন্দা আজহার আলী মোল্লা মসজিদটি পাকা করেন। প্রায় ১৫ বছর যাবত মোঃ মোসলেম উদ্দিন মণ্ডল মসজিদটির মুয়াজ্জিন হিসেবে নিয়োজিত আছেন। 

শিঙ্গা গায়েবী মসজিদ

রাজবাড়ি শহরের দক্ষিণ পূর্বে আলীপুর ইউনিয়ন। আলীপুর ইউনিয়নের শিঙ্গা নামক গ্রামে অনুরুপ আর একটি গায়েবী মসজিদের সন্ধান পাওয়া যায়। এলাকাবাসীর বিশ্বাস এ গ্রামে কখনো রাতারাতি পুকুর কাটা হয়। পুকুরের মাটি দিয়ে ইট কেটে অলৌকিকভাবে শুকিয়ে ঐ পুকুরে ভিজিয়ে রাতের মধ্যেই মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল। মসজিদটি এখন টিনসেড পাকা মসজিদ। পুরাতন ইট নিদর্শন হিসেবে স্তুপীকৃত অবস্থায় রয়েছে। মসজিদটি ইটের আকার অন্য সকল গায়েবী মসজিদের ইটের মত। এ মসজিদের মুয়াজ্জিন আব্দুল মোন্নাফ মোল্লা।

 হযরত সাহ পাহলোয়ান পূর্ব-পশ্চিম মাজার

হযরত শাহ পাহলোয়ানের পূর্ব-পশ্চিম মাজার সেকাড়ায় পীর আউলিয়া ও দরবেশগণের যে সমস্ত প্রাচীন মাজার রয়েছে তার পরিচিতিতে ধর্ম প্রসার সম্বন্ধে জ্ঞাত হওয়া যায়। বালিয়াকান্দি উপজেলার পদমদীর নিকটবর্তী চন্দনা নদীর তীরে সেকাড়ায় হযরত সাহ পাহলোয়ানের মাজার সম্বন্ধে অনেক কথা ও কাহিনী প্রচলিত আছে। সেকাড়া গ্রামে তার পূর্ব-পশ্চিম মাজার যত্নসহকারে রক্ষিত। কথিত আছে মৃত্যুকালে ইসলাম বিধান মতে উত্তর দক্ষিণ কবর না দিয়ে মুরীদানদের পূর্ব পশ্চিম কবর দেওয়ার আদেশ দিয়ে যান। কিন্তু মৃত্যুর পর প্রচলিত রীতি অনুসারে কবর  দেয়া হলে রাতারাতি কবরটি ঘুরে পূর্ব পশ্চিম হয়ে যায়। মাজারের পাশে মসজিদ রয়েছে। পূর্ব পশ্চিম মাজারের বিষয়ে যে কথাই প্রচলিত থাক না কেন তাঁর আগমন ও ধর্ম প্রসার বিষয়ে অনেক কিছু জানা যায়। মীর মোশাররফ হোসেনের বর্ণনা মতে ১৪৮০ থেকে ১৫১০ সালের মধ্যে সাহ পাহলোয়ান বাগদাদ শরীফ পরিত্যাগ করে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে ফরিদপুর অঞ্চলে এসে চন্দনা নদীর তীরে সেকাড়ায় বাসস্থান নির্মাণ করে আল্লাহর উপাসনা করছিলেন। তাপস তপস্যার জন্য নির্জনতার প্রয়োজনে তৎকালীন জঙ্গলাকীর্ণ সেকাড়ার গ্রামটি বেছে নিয়েছিলেন।


সাহ পাহলোয়ান- ১৪৮০-১৫১০ এরমধ্যে

সাহ সাদুল্লা (জামাতা)

মীর কুতুবুল্লাহ (সাদুল্লাহর পৌত্র)

মীর ওমর দারাজ (মীর কুতুবুল্লাহর পুত্র)

মীর ইব্রাহিম (ওমর দারাজের পুত্র)

মীর মোয়াজ্জেম (মীর ইব্রাহিম এর পুত্র)

মীর মশাররফ হোসেন (সূত্র: মীর মশাররফ হোসেন রচনাসম্ভার পুস্তক-৫৯)

পদমদি, সেকড়া, খালকুলা, রাজধারপুর, তেঘারী এ অঞ্চলের প্রাচীন প্রসিদ্ধ গ্রাম। হযরত সাহ পাহলোয়ান সুদূর বাগদাদ থেকে পায়ে হেঁটে এ অঞ্চলে আসেন। ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে সুলতানি শাসনামলের শেষ থেকে মোগল শাসনের প্রারম্ভ পর্যন্ত বাগদাদ, আফগানিস্থান, সিরিয়া, বসরা থেকে দলে দলে আগমন ঘটেছিল পীর আওলিয়াদের। নিবেদিত ধর্মপ্রাণ ও আধ্যাত্মগণের অধিকারী এসব পীর দরবেশ ইসলাম ধর্মের আধ্যাত্বিকতার দ্রুত বিকাশ ঘটান। আজও এ অঞ্চলের মানুষ শ্রদ্ধাভরে সাহ পাহলোয়ানের নাম স্মরণ করে।

হযরত শাহ জুঁই

সমসাময়িক পঞ্চদশ থেকে ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি অত্র অঞ্চলে যে সমস্ত পীর আওলীয়াগণ বাগদাদ, আফগানিস্তান থেকে ইসলাম প্রচারে আগমন করেন তাদের মধ্যে শা জুঁই অন্যতম। তৎকালীন পশ্চাৎপদ পাংশা এলাকায় তিনি আস্তানা স্থাপন করে ধর্ম প্রচারে ব্রতী হন। আচরণ এবং ইসলামের উদার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেক বর্ণ হিন্দু, বৌদ্ধ, নিম্ন বর্ণের নানা সম্প্রদায়ের মানুষ ইসলাম ধর্মে দীক্ষা লাভ করে। মৃত্যুর পর তাকে পাংশা পুরাতন বাজারের নিকটস্থ সমাহিত করা হয়। এর পাশে একটি পুরাতন মসজিদের চিহ্ন রয়েছে। পাকা ভবন নির্মিত তার মাজারটি জেলার ঐতিহ্য। তার তার নামানুসারে পাংশায় শাহজুঁই মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

কোমরপাড়ায় হযরত শাহ জঙ্গী (রঃ) মাজার

রাজবাড়ি শহর থেকে ৬/৭ কিমি দক্ষিণে আলাদিপুর বাজারের নিকটস্থ পীর শাহজঙ্গী মাজার। এ মাজারটি জেলার প্রাচীন ঐতিহ্য। পীরজঙ্গী নামের সাথে জড়িয়ে আছে অত্র অঞ্চলের ইসলাম ধর্ম বিকাশের ধারা। চতুর্দশ  পঞ্চদশ শতকে যে সমস্ত পীর আওলিয়াগণ ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে এ অঞ্চলে আগমন করেন তাদের মধ্যে শাহ জঙ্গী (রহঃ) অন্যতম। জানা যায় ইসলামে স্থায়ীত্ব দানে তাকে নানা বাধা বিপত্তি অতিক্রম করতে হয়। যে কারণে তিনি জঙ্গী নামে পরিচিত হন। বর্তমানে ৭২ শতাংশ জমিতে মাজারটি অস্থিত । এ ছাড়া লাখোরাজ অনেক ভূ-সম্পত্তির মধ্যে কুটির হাটের দক্ষিণে ২২ শতক জমি আছে। সেখানে কিছু ভূমিহীন বসবাস করে (গুলশান আউলিয়া আহসানুল হাবিব, পৃ-১৮)। এখানে বাৎসরিক ওরস অনুষ্ঠিত হয়।


কাজীকান্দা খোদাওন্দ খাঁর মসজিদ

রাজবাড়ি এককালে বলুয়ারচর (কুমার পাড়া) আজকের কাজীকান্দা। কাজীকান্দায় প্রায় তিনশত বৎসর পূর্বে কুমারদের বসবাস ছিল। ৩০/৪০ বৎসর পূর্বেও খননকালে কুমার পরিত্যক্ত হাড়ি কলসের মাথা ও খাপড়া পাওয়া যেত। সম্রাট আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে অত্র এলাকায় আগমন ঘটে খোদাওন্দ খাঁ নামে এক ধর্ম প্রচাররকের। তিনি এখানে অতিসাধারণ বেশে বসবাস শুরু করেন এবং ইসলাম ধর্ম প্রচারে রত হন। ধীরে ধীরে তিনি এলাকায় স্বীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে তিনি রাজকার্যে বিচার কাজ করার সনদপ্রাপ্ত হন। যা থেকে তিনি কাজী উপাধি প্রাপ্ত হন। খোদাওন্দ খাঁ হলেন খোদাওন্দ কাজী, আর হাড়ি কলসির কান্দা এ দুইয়ে মিলিয়ে এলাকার নাম হয় কাজীকান্দা। খোদাওন্দ খাঁর ছেলে কুসুম কাজী এবং তদীয় পুত্র রইচ কাজী একজন শক্তিমান পুরুষ ছিলেন। রইচ কাজীর এক পুত্র কাজী আব্দুল করিম তৎকালীন ভাইসরয়ের একান্ত সচিব ছিলেন।

কাজীকান্দার পাশেই সজ্জনকান্দা। সজ্জনকান্দার মোল্লাবাড়ি, মণ্ডলবাড়ি, রাজবাড়ির বুনিয়াদী বংশ। কাজীকান্দা, সজ্জনকান্দা মুসলিম প্রধান এলাকা হয়ে ওঠে এবং আজও সে বৈশিষ্ট্য রয়েছে। অন্যদিকে লক্ষীকোল, বিনোদপুর, ভবানীপুর, গঙ্গাপ্রসাদপুর প্রাচীন হিন্দু বসত এলাকা। রাজবাড়ির বেড়াডাঙ্গা মৌজা হিসেবে চককৃষ্টপুর। এলাকাটি পূর্বে বন জঙ্গলে আচ্ছন্ন থাকলেও বর্তমানে এ অঞ্চলটি বর্ধিষ্ণু লোকের বাসস্থল।

দ্বদশী খোদাই দরগা

রাজবাড়ি শহর থেকে রেল লাইন ধরে পূর্বদিকে এক কিলোমিটার দূরে দ্বাদশী খোদাই দরগা। কথিত আছে রাজবাড়ি রেললাইন ১৮৯০ সালে গোয়ালন্দ ঘাট পর্যন্ত স্থাপনের সময় জঙ্গলের মধ্যে দরগাটির সন্ধান মেলে। সেই হতে দরগাটি এ অঞ্চলের ধর্মগ্রাণ মানুষ খোদাই দরগা নামে কামাল সাহ আউলিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে আসছে। ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে ষোড়শ শতক এতদ্বাঞ্চলে তিনি আগমন করেন।

ফুরফুরা খানকা শরীফ

রাজবাড়ি জেলায় ইসলাম বিস্তৃতির ক্ষেত্রে ফুরফুরা শরীফের প্রভাব অন্যান্য যে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান থেকে কম নয় বরং ক্ষেত্র বিশেষ অধিক। ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে প্রশ্চিমবাংলার হুগলী জেলার বালিয়া বাসন্তিই ফুরফুরা শরীফ। ফুরফুরা শব্দটি ফরফরা শব্দজাত, যার অর্থ পরিপূর্ণ বা অখণ্ড আনন্দ। বাগদাদ ছেড়ে ৭০০ হিজরীতে (১৩০০খ্রি.) আসেন এক সুফি যিনি ফুরফুরার পীর বংশের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর নাম মখদুম মওলানা মনসুর বাগদাদী। তিনি এ পীর বংশের হযরত আবু বক্কর সিদ্দিকীর পূর্বপুরুষ। ১৯৬১ সালে Hoogli District hand book ফুরফুরাকে Pilgrimage for Muslim  বলে উল্লেখ করেছেন। আওরঙ্গজেবের সময় খ্যাতনামা সাধক ছিলেন আলহাজ্ব মওলানা শাহ সুফী মোস্তফা মাদানী। মুনসরি বাগদাদীর পীর বংশেই জন্ম হয় ফুরপুরার আউলিয়া শ্রেষ্ঠ আবুবকর সিদ্দিকীর (১৮৪৩-১৯৬৯)। তার পুত্র আব্দুল হাই সিদ্দিকী, মোঃ নাজমুল হাই সিদ্দিকীর রাজবাড়ি অঞ্চলে বহু ভক্তপ্রাণ মুরীদান রয়েছে। ফুরফুরা শরীফের হুজুরপাকবৃন্দ রাজবাড়ি অঞ্চলে ইসলাম ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতায় মাঝে মাঝে ধর্মসভা করে থাকেন।


হযরত জামাইপাগল মুরশীদ (রহ) ও হযরত নূর বাকের শাহ

হযরত জামাই পাগলের মাজার শরীফআলাদিপুর মোড় ঘুরতেই রাজবাড়ি শহরের প্রবেশ পথে বাবা মুরশীদ জামাই পাগলের মাজার শরীফের স্মৃতি বহনকারী তিন গম্বুজ বিশিষ্ট তোরণ। লোকমুখে যতটা জানা যায় তিনি বিগত শতাব্দীর শুরুতে আলাদিপুরে আসেন এবং দরবেশ হিসেবে সাদামাটা জীবন শুরু করেন। যতদুর জানা যায় তিনি ছিলেন সংসারত্যাগী এক আধ্যাত্মিক পুরুষ আহসানুল হাবিব তার গুলশানে আউলিযা গ্রন্থের ৩৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন, ‍মুর্শিদ যশোর পুলিশ বিভাগে চাকরি করতেন। তাঁ জন্মস্থান পরিবার পরিজন, বংশ সম্বন্ধে জানা যায় না। কথিত আছে জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর কোনো এক দরবেশের সাক্ষাৎ লাভ করেন। তিনি তাঁকে সংসার বিবাগী হওয়ার পরামর্শ দিলে সকল কিছু ত্যাগ করে পাংশায় আসেন। সেখানে তিনি জামাই পাগল নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন। এরপর তিনি রাজবাড়ির আলাদীপুরে আস্তানা গড়ে তোলেন। তিনি প্রায়ঃশই শরীরে কাদামাটি মেখে থাকতেন। অনেক সময় তাকে উলঙ্গ বা লেংটি পর অবস্থায় দেখা যেত। মানুষের সাথে কমই কথা বলতেন। অত্র অঞ্চলে তাঁর সম্বন্ধে নানা অলৌকিক কাহিনী শোনা যায়। রাস্তার ধারে প্রায় এক বিঘা জমির উপর মাজারটি অবস্থিত। মাজার ভবনের মধ্যে জামাই পাগল মুরশীদের কবর। তার পাশে খাদেম নূর বাকের শাহ এর কবর এখানে আর এক খাদেম গৌরী বালার কবর রয়েছে। প্রতিবছর ১৫ ফাগ্লুন এখানে ওরস অনুষ্ঠিত হয়।

ইতিহাসের পটভূমিকায়

রাজবাড়ি বড় মসজিদ খানকা শরীফ

পরম করুনাময়ের নামে শুরু করিতেছি -------আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়। আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) আল্লাহর প্রেরিত রাসুল ও প্রতিনিধি। আল্লাহুপাক পবিত্র  কোরআনে বলেছেন------ কুললা আসআলুকুম আলাইহে আজরান ইল্লাল মুয়াদ্দাতা ফিল কুরবা--(৪২ নাং সুরা-আশশুরার ২৩ নং আয়াত)

হে আমার রাসুল বলে দিন ঘনিষ্ঠ আত্মীয়বর্গের (আহলে বায়েত) প্রতি অচল অটল ভক্তি মহব্বত ছাড়া আমি তোমাদের নিকট কোনো প্রতিদান চাই না। এই আয়াত নাজিলের পর মহানবী (সঃ) কে সাহাবীরা  জিজ্ঞা করলেন এই আত্মীয়বর্গ কারা? যাদের প্রতি মহব্বত করা ফরজ। নবী পাক(সঃ) বললেন তারা হলেন হযরত আলী (কঃ), হযরত ফাতেমা(আঃ), হযরত হাসান (আঃ) হযরত হোসনে(আঃ) এরাই আমার আত্মীয়বর্গ ও আহলে বায়েতপাক। ইহারা অতি পাক ও পবিত্র। আল্লার সান্নিধ্য লাভ, বেহেস্তে প্রবেশ ও দ্বীন দুনিয়ার সুখ শান্তি লাভ করতে হলে তাদের প্রতি মহব্বত ও ভক্তি শ্রদ্ধা করতে হবে। হযরত নবী করিম (সঃ) ও তাঁর আহলে বায়েত পাক(আঃ) দের ও অলি আউলিয়াদের প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধা ও মহব্বত জানাতে হবে। অন্যথায় আল্লাহুর সান্নিধ্য, নৈকট্য লাভ ও হযরত নবী করিম (সঃ) এর শাফায়াত প্রাপ্তি হবে না। হযরত আহম্মদ ইবনে হাম্বল (রাঃ) বর্ণনা করেছেন -----যারা আহলে বায়াত পাকের বিরুদ্ধে শক্রতা করবে তারা মোনাফেক। সৃষ্টির আদি ও আল্লার জাতি নূরে সৃষ্টি হযরত নবী পাক (সঃ), ইমামুল মোরছালিন রহমতুল্লিল আল আমি। হয়রত নবী পাক (সঃ) এর নূরে সারা বিশ্ব সৃষ্টি। হযরত মুহাম্মদ (সঃ), হযরত আলী (কঃ), হযরত ফাতেমা (আঃ), হযরত হাসান (আাঃ), হযরত হোসেন (আঃ) ইহারা পাক পাঞ্জাতন। তাঁরা নূরের সৃষ্টি মহামানব। আল-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে হযরত নবী পাক (সঃ) বলেছেন আমি জ্ঞানের মহানগর আর হযরত আলী (কঃ) ঐ নগরের দরজা।


সমস্ত ইমাম (রাঃ), ঈমানদার, মুত্তাকিনদের নেতা হযরত আলী (কঃ)। সমস্ত শহীদানদের নেতা হযরত হাসান (আঃ) ও হযরত হোসেন (আঃ)। বেহেস্তের যুবকদের নেতা হযরত হাসান (আঃ) ও হযরত হোসেন (আঃ)। নারীদের বেহেস্তের নেত্রী হযরত ফাতেমা (আঃ)। সমস্ত অলি, আওলিয়া, গাউস, কুতুবদের সরদার ও পীর, হযরত সৈয়দ শেখ মাওলানা ওলিকূল শিরোমনি পীরানে পীর দস্তগীর, মাহবুবে সোবহানী, কুতবে রব্বানী, গাউসে ছামদানি, বড় পীর শেখ আবু মোহাম্মদ মহিউদ্দিন হযরত আবদুল কাদের জিলানী-বাগদাদী (আঃ)। হযরত নবী করিম (সঃ) বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব ও নূরে মুজাচ্ছাম ও সর্বশেষ বিশ্বনবী। তাঁর বেছাল হক ও ওফাতের পরে বিশ্বে আর কোনো নবীর আগমন ঘটবে না বিধায় হযরত নবী করিম (সঃ) তাঁর ওফাত পাকের সময় তাঁর নিকট গচ্ছিত আল্লাহু প্রদত্ত আমানতি বস্তু তাঁর  চাচাতো ভাই, ওছি, জামাতা হযরত আলীকে (কঃ) প্রদান করেন। ইহাই বেলায়েত। আল্লাহ প্রদত্ত ক্ষমতা ও শক্তি। হযরত নবী পাক (সঃ) এর নিকট হতে হযরত আলী (কঃ) বেলায়েতপ্রাপ্ত হয়েন। হযরত আলী (কঃ) বেলায়েতের সম্রাট, ধারক ও বাহক। হযরত আলী (কঃ) হযরত নবী পাক (সঃ) এর নিকট হতে প্রাপ্ত বেলায়েত তাঁর শাহাদত পাকের পূর্বে তাঁর দুই শাহজাদা পাক হযরত ইমাম হাসান (আঃ) ও হযরত ইমাম হোসেন (আঃ) পাকদের প্রদান করেন। এদিকে পাক পাঞ্জাতনের সদস্য হযরত আলী (কঃ) ও হযরত বিবি মা ফাতেমার পুত্রদ্বয় হযরত ইমাম হাসান (আঃ) ও হযরত ইমাম হোসেন (আঃ), হযরত নবী করিম (সঃ) ও হযরত আলী (কঃ) এর পবিত্র বংশধর ও আহলে বায়াত পাকের সদস্য। ইসলাম ধর্মের স্থায়িত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং আল্লাহুর নাম ও নবী রাসূল (সঃ) এর বাণী, কোরআন, হাদিস, সুন্নাহ, দীন ইসলাম ও সত্যকে স্থায়ী প্রতিষ্ঠিত রাখতে হযরত ইমাম আলী (কঃ), হযরত ইমাম হাসান (আঃ) ও হযরত ইমাম হোসেন (আঃ) দের প্রচেষ্টা, আত্মদান ইতিহাস খ্যাত। কারবালায় আল্লা রাসূলের নাম ও ইসলামকে রক্ষার জন্য, হককে প্রতিষ্ঠার জন্য বনি উমাইয়া বংশের অত্যাচারী, ব্যাভিচারী, ইসলাম ধবংসকারী শাসক মরদুদ এজিদ এর বিরাট সৈন্যবাহিনীর বিরুদ্ধে  হযরত ইমাম হোসেন (আঃ) পাক তাঁর আত্মীয়বর্গ, ভক্তবৃন্দসহ মাত্র ৭২ জন সঙ্গী সাথী নিয়ে হকের জন্য বাতিলের বিরুদ্ধে ন্যায় যুদ্ধে (জেহাদ) করে নির্মমভাবে শহীদ হন কারবালা প্রান্তরে।

কারবালার মর্মস্পর্শী ঘটনায় আজো ধর্মপ্রাণ মুসলমান ও ভক্তপ্রাণ আশেকান রাসুল (সঃ) ও মোমিন মুসলমানদের চোখে অশ্রুপাত ঘটায়-----ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায় হর কারবালা কি বাদ।’ পরবর্তীতে হযরত বড় ইমাম হাসান (আঃ) পাক বেছালএ হকের (ওফাত) আগে তাঁর নিকট গচ্ছিত বেলায়েত প্রদান করেন মদিনা পাকে তাঁর জীবিত শাহজাদা হযরত ইমাম হাসান মসন্না (আঃ) কে এবং হযরত ইমাম হোসেন (আঃ) পাক কারবালার যুদ্ধে তাঁর অসুস্থ রুগ্ন একমাত্র জীবিত পুত্র হযরত ইমাম জয়নাল আবেদীন (আঃ) কে বেলায়েত প্রদান করে শহীদ হন কারবালার মরু প্রান্তরে।

এভাবে হযরত আলী (কঃ) এর ঐরসে হযরত বিবি মা ফাতেমার গর্ভের ও বংশের পবিত্র বংশধরেরা আওলাদেরা বেলায়েতপ্রাপ্ত হয়ে আসছেন ও কিয়ামততক পেতে থাকবেন। পর্যায়ক্রমে হযরত ইমাম হাসান (আঃ) এর পুত্র হযরত ইমাম হাসান মসন্না (আঃ) পাক তাঁর বংশে হযরত বড় পীর আবদুল কাদের জিলানী (আঃ) এর পিতা হযরত আবু সালেহ মুসাজঙ্গী দোস্ত (আঃ) জন্মগ্রহণ করেন। অপর দিকে হযরত ইমাম হোসেন (আঃ) এর বংশে জন্ম নেন হযরত আবদুল্লাহ সওমী (আঃ) এবং তার সুযোগ্য কন্যা হযরত উম্মূল খায়ের ফাতেমা সানী (আঃ)।

হযরত বড় পীর আবদুল কাদের জিলানী (আঃ) পিতার দিক হতে হযরত ইমাম হাসান (আঃ) এবং মাতার দিক থেকে হযরত ইমাম হোসেন (আঃ) এর পবিত্র বংশধর। ফলে তিনি পিতা ও মাতার উভয় দিক থেকে আল হাসানী ওয়াল হোসেনী সৈয়দ বংশ। হিজরী ৪৭০ মতান্তরে ৪৭১ হিজরী সালের ১ রমজান তারিখ আরবের পারস্যের ইরানের জিলান নগরে সুযোগ্য পিতার ঔরষে জ্ঞান তাপসী মাতার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন হযরত বড় পীর দস্তগীর আবদুল কাদের জিলানী (আঃ)। জিলান নগরে জন্মগ্রহণ করেন বলে তিনি হযরত আবদুল কাদের জিলানী বলে খ্যাতি লাভ করেন। তিনি মাতৃ গর্ভজাত ওলিয়ে কামেল।


তিনি ওলিকূল শিরোমনি, পীরানে পীর, মিরানে মীর, গউসুল আজম দস্তগীর, মাহবুবে সোবহানী, গউসে সামদানী কুতুবে রব্বানী হযরত সৈয়দ শেখ মওলানা সৈয়েদেনা শাহ আবু মোহাম্মদ সামদানী, কুতুবে রব্বানী হযরত সৈয়দ শেখ মওলানা সৈয়েদেনা শাহ আবু মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বড় পীর আবদুল কাদের জিলানী আল হাসানী ওয়াল হোসেনী আলা নবীয়েনা ওয়া আলাইহিস সালাতো রাব্বানী (আঃ) হযরত নবী করিম (সঃ) এর ১৩ তম পবিত্র বংশধর ও হযরত আলী (কঃ) এর পবিত্র ১২ তম বংশধর। তিনি সমস্ত ওলিদের সম্রাট ও সমস্ত তরীকার পীরদের পীর, বড় পীর। খোলাফায়ে রাশেদীনের ৩য় খলিফা হযরত ওসমান (রাঃ) শহীদের পরে সমস্ত আরবে, মক্কা ও মদিনায় গোলযোগ, গোলমাল ও বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যে হযরত মওলা এ কায়নাত মওলা মুশকিল কোষা আমিরুল মোমেনিন শেরে খোদা হযরত আলী (কঃ) খোলাফায়ে রাশেদীনের চতুর্থ খলিফা হিসাবে খিলাফতের দায়িত্বগ্রহণ করেন। হযরত আলী (কঃ) রাষ্ট্রীয় কার্যের সুবিধার্থে কুফায় রাজধানী স্থানান্তরে পর থেকে বাগদাদের গুরুত্ব বেড়ে যায়। হযরত বড় পীর আবদুল কাদের জিলানী (আঃ) উচ্চ শিক্ষার জন্য বাগদাদে গমন করেন। হযরত বড় পীর আবদুল কাদের জিলানী (আঃ) এর ‍উচ্চ শিক্ষায় ও সুশিক্ষায়, কোরআন, হাদিস, ফেকাহ, এলমে তাসাউফ এর পূর্ণ জ্ঞান লাভ ও আধ্যাত্মিকতায় উচ্চাসনে সমাসীন হওয়ায় বাগদাদ নগর ধর্ম, জ্ঞান, বিজ্ঞান, শিক্ষা দীক্ষা, সুফিবাদ ও আধ্যাত্মিক বিকাশের প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠে। শত শত বছর ধরে ইসলামের ধর্ম বাণী ও শান্তির বার্তা দিকে দিকে ছড়েয়ে দেওয়া হয়। আর সকল কাজের প্রধান দায়িত্ব পালন করেন, হযরত গউসপাক (আঃ) এর আওলাদাপাকগণ ও ধর্ম প্রচারক ওলি, আওলিয়া, পীর মাশায়েখগণ। তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতায়, ভালোবাসা, আচার আচরণ, মহব্বত, আধ্যাত্মজ্ঞানের গভীরতায় ও অলৌকিক কার্যে মুগ্ধ হয়ে সর্বস্তরের মানুষ ধর্মীয় শিক্ষা দীক্ষা ও ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেন।

খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলে ভারত উপমহাদেশে মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধু জয়ের পরে এদেশে ভারত বর্ষে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। ত্রয়োদশ শতক থেকে শত শত ওলি, আউলিয়া, কামেল পীর, মাশায়েকদের আগমনে ও ইসলাম ধর্ম প্রচারে ভারত ভূমিতে ইসলাম ধর্ম বিশেষভাবে প্রচার, প্রসার ও বিস্তার লাভ করে। হযরত গউস পাকের (আঃ) নির্দেশে হযরত খাজা মাইনদ্দীন চিস্তি আজমিরী (রঃ) ভারতে এবং হযরত শাহজালাল (রঃ) সিলেটে ধর্ম প্রচারে কিংবদন্তির ইতিহাস।

হযরত শাহ পরান সিলেটে, হযরত গউসপাক (আঃ) এর আওলাদপাক, হযরত রুপস শাহ মুখদম বাগদাদী (রহ), হররত তুরকান শাহ বাগদাদী (রঃ), হযরত শাহ নূর বাগদাদী (রঃ) রাজশাহীতে অনেক যুদ্ধ বিগ্রহ করে ইসলাম প্রচার করেন। হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রঃ) হযরত বখতিয়ার কাকী (রঃ), হযরত শেখ ফরিদ (রঃ), হযরত শরফুদ্দিন চিশতি (রঃ) (ঢাকা) প্রমুখ ভারতে ইসলাম প্রচারে অবদান রেখেছেন। খুলনা বাগেরহাটে হযরত খান জাহান আলী (রঃ), হযরত মিছকিন শাহ, বায়োজীদ বোস্তামী আমানত শাহ চট্রগ্রামসহ অসংখ্য অলি আউলিয়া পীর মাশায়েকগণ ভারতবর্ষে, পূর্ব ও পশ্চিম-বাংলায় ইসলাম প্রচার করেছেন। পুরান ঢাকার ফরাসগঞ্জে ঐতিহাসিক প্রাচীনকালের ‘বিবিকা রওজা’ ও তথায় মহরম পাক অনুষ্ঠান উদযাপন হয়ে আসছে এবং ঢাকার প্রাচীন ঐতিহাসিক হোসেনী দালানে মহরমপাক উৎযাপন হয়ে আসছে যা ইসলাম জাগরণ ও মুসলিম ঐতিহ্যের নিদশন। হযরত পীরানে পীর দস্তগীর বড় পীর আব্দুল কাদের জিলানী আল হাসানী ওয়াল হোসেনী আল বাগদাদী (আঃ) ইসলামের পুনঃজীবন দানকারী। তিনি ইসলামের দুর্দিনে আরব দেশসহ সারা বিশ্বে ইসলাম প্রচার করেন এবং কাদেরিয়া তরীকা প্রবর্তনপূর্বক প্রচার ও প্রসার করেন এবং সারা বিশ্বে তা প্রতিষ্ঠিত করেন। এই তাপসপ্রবর মহাপুরুষ মাতৃগর্ভজাত ওলিয়ে কামেল ছিলেন। তিনি বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ সুলতানে আওলিয়া ও বড় পীর (আঃ)। তিনি বহু অলৌকিক কার্য করেছেন ও বহু কারামত পাক দেখিয়েছেন। মুরদাকে জিন্দা করতেন। তিনি বহু কিতাবের রচয়িতা। তাঁর কিতাব গ্রন্থে আল্লাহ, রাসুল, কালেমা তৈয়াবার উৎস, গুরুত্ব, মর্যাদা, শরীয়ত, মারেফত, তরীকাত, হকিকত, এলমে তাসাউফের গভীর রহস্য, সার্বজনীনতা ও অবিনস্বরতার পরিপূর্ণ ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি নিজেকে আল্লার সহিত বিলীন করে দিয়েছিলেন।


‘মান আরাফা নাফসাহু ফাকাদ আরাফা রাব্বুহু’ (যে নিজেকে চিনেছে সে তার রবকে চিনেছে)। হযরত বড় পীর আব্দুল কাদের জিলানী (আঃ) সমস্ত তরীকার পীরদের পীর কেবলা। তাঁর আমল হতে তরীকার উৎপত্তি। পবিত্র কোরআন ও হাদিসের অনুশীলন ব্যাখ্যা তার আধ্যাত্মিকতার দর্শন। নিজেকে চিনতে হলে ওলিয়ানা, মোর্শেদেনা, কামেল পীর এর মাধ্যমে সিলসিলা ও তরীকা ধরতে হবে এবং মোকাম মঞ্জিলে পৌছাতে হবে। হযরত গউসপাক (আঃ) বলেছেন ‘হে আমার ভক্তবৃন্দ (মুরিদ) ভয় করোনা। আল্লাহ আমার রব। আমার কোনো মুরিদের ও মোতেকাদের বিনা তওবায় মৃত্যু হবেনা।’ হযরত আবদুল কাদের জিলানী (আঃ) এর ৪ জন বিবি (রঃ) পাক ছিলেন এবং ২৭ জন পুত্র সন্তান ছিলেন ও ২২ জন কন্যা সন্তান ছিলেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন হযরত গউসপাক (আঃ) এর জীবদ্দশাতেই ইন্তেকাল করেন। সন্তানদের মধ্যে অনেকে বাগদাদ শহরে বসবাস করতেন এবং অনেকে বিভিন্ন স্থানে হিজরত করে বসবাস করতেন। তাঁরা সকলেই ওলি ও পীরে কামেল ছিলেন। হযরত আবদুল কাদের জিলানী (আঃ) এঁর সন্তানদের মধ্যে তার বড় বিবি পাকের গর্ভজাত সন্তান এবং সন্তানদের মধ্যে দ্বিতীয় শাহাজাদা পাক হযরত সৈয়দ শেখ আবদুল রাজ্জাক আলী আল কাদেরী আল হাসানী আল ওয়াল হোসেনী আল বাগদাদী (আঃ) পাকের পবিত্র বংশধর ও সিলসিলা হতে মেদেনীপুরের হযরত পীর কেবলাদের বংশ ও কাদেরিয়া তরীকা ও সিলসিলা প্রতিষ্ঠিত। তিনি বেলায়েত প্রাপ্ত হন পিতার নিকট থেকে। তাঁরা আহলে বায়াত পাকের সদস্যবৃন্দ এবং তরীকা কাদেরীয়া আল রাজ্জাকিয়া সিলসিলার পীর ও মোর্শেদ।

হযরত শেখ আব্দুল রাজ্জাক আলী আল কাদেরি (আঃ) পাকের বংশধর সিরিয়ার হামা শরীফের বসতি স্থাপন করেন ও বসবাস করতেন। তাঁদের মধ্যে হযরত আব্দুল্লাহ আল জিলি আল বাগদাদী আল হাসানী আল হোসেনী (আঃ) হযরত বড় পীর আবদুল কাদের জিলানী (আঃ) পাকের দৈব নির্দেশে সিরিয়ার হামাএ শরীফ হতে ভারতবর্ষে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। ঐ যাত্রায় তাঁর সঙ্গী হলেন চারপুত্র যথা-----হযরত জাকের আলী আল কাদেরী (আঃ), হযরত রওশন আলী আল কাদেরী (আঃ), হযরত গোলাম হোসেন আল কাদেরী (আঃ), হযরত রজব আলী আল কাদেরী (আঃ) ও হযরত রওশন আলী আল কাদেরী (আঃ) এর পুত্র হযরত তোফায়েল আলী আল কাদেরী (আঃ) এবং কিছু আত্মীয়বর্গ। আয়োজনে প্রথমে তাঁরা বাগদাদ এসে পৌছান এবং সেখান থেকে জাহাজে  উড়িষ্যা চাঁন্দবালী বন্দরে এসে উপস্থিত হন। এরপর (১১৮৮ হিজরী-১৭৬৭ খ্রি.) এখান থেকে তাঁরা মেদিনীপুর জেলার (ভারতের পশ্চিমবঙ্গে) পটাশপুরে উপস্থিত হন এবং গউস পাক (আঃ) এর অনেক তবারক পাক ও কাদেরীয়া তরীকার সনদ পাকসহ বর্ধমান জেলার মঙ্গলকোর্টে আসেন। সেই সময় বর্ধমান জেলার মঙ্গলকোর্ট ছিল ব্যবসা বাণিজ্যের কেন্দ্র এবং মুসলিম সংস্কৃতির পীঠস্থান। বীরভূম ও বর্ধমান জেলার সীমানায় অজয় ও কুমার নদীর মিলনস্থলে মঙ্গলকোর্টে তিনি বসবাস করতে মনস্থ করলেন। কয়েক মাস সকলে এখানে অবস্থানের পর হযরত জাকের আলী আল কাদেরী (আঃ) কে মঙ্গলকোটে এবং হযরত রওশন আলী আল কাদেরী (আঃ) কে ভারতের বিহার রাজ্যের পূর্ণিয়ার শহীদগঞ্জে (বর্তমান রওশনগঞ্জ) রেখে ও বেলায়েত প্রদান করে অন্যান্য আত্মীয় পরিজনসহ স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। হযরত রওশন আলী আল কাদেরী আল বাগদাদী (আঃ) অনেক যুদ্ধ বিগ্রহ করে ধর্ম প্রচার করেন ও কাদেরীয় তরীকা প্রতিষ্ঠিত করেন। হযরত তোফায়েল আলী আল কাদেরী (আঃ) তাঁর চাচা হযরত জাকের আলী আল কাদেরি (আঃ) এর নিকট থাকেন। হযরত জাকের আলী আল কাদেরী (আঃ) ৮১ বৎসর বয়সে জান্নাতবাসী (বেছালেহক) হন (হিজরী ১১৯২ জেলহজ্ব তারিখে)। তাঁকে গউসে সানীপাক ও আল সনদী বলা হত। হযরত জাকের আলী আল কাদেরী (আঃ) এর মাজার পাক মঙ্গলকোর্টে। তিনি অনেক কারামত দেখান এবং দলে দলে মানুষ তাঁর নিকট ইসলাম ধর্মগ্রহণ করেন ও কাদেরীয়া তরীকায় দাখিল হন। হযরত জাকের আলী আল কাদেরী (আঃ) এর কন্যার বিবাহ হয় হযরত তোফায়েল আলী আল কাদেরী (আঃ) এর সঙ্গে। সেই সূত্রে হযরত তোফায়েল আলী আল কাদেরী (আঃ) হযরত জাকের আলী আল কাদেরী (আঃ) এর ভাইয়ের পুত্র ও জামাতা। হযরত তোফায়েল আলী আল কাদেরী (আঃ) বেলায়েতপ্রাপ্ত হয়েন  তাঁর চাচা হযরত জাকের আলী আল কাদেরী (আঃ) এর নিকট হতে।


হযরত তোফায়েল আলী আল কাদেরী (আঃ) এর প্রথম বিবি ওফাত পাকের পরে শেষে হযরত তোফায়েল আলী আল কাদেরি (আঃ) মেদিনীপুরের জ্ঞান তাপস হযরত চন্দন শহীদের কন্যা নেয়ামতুন্নেছাকে বিবাহ করেন। তাঁর গর্ভজাত পুত্র হযরত মেহের আলী আল কাদেরী (আঃ)। বিবাহের পর হযরত তোফায়েল আলী আল কাদেরী (আঃ) মেদিনীপুরে বসবাস করতেন। তাঁর মাজার পাক মঙ্গলকোর্টে। তোফায়েল আলী আল কাদেরী (আঃ) এর তিন পুত্রের জন্ম হয়। তার শাহজাদা পাক হযরত মেহের আলী আল কাদেরী (আঃ) যিনি আলা হুজুর নামে খ্যাত ছিলেন। হযরত তোফায়েল আলী আল কাদেরী (আঃ) পর্দা নেওয়ার পর তাঁর সুযোগ্য শাহজাদা ও উত্তরাধিকারী হযরত মেহের আলী আল কাদেরী (আঃ) সাজ্জাদানসীন হন ও বেলায়েত প্রাপ্ত হন। সৈয়দেনা হযরত সৈয়দ শাহ মেহের আলী আল কাদেরী আল হাসানী ওয়াল হোসেনী আল বাগদাদী আল মেদিনীপুরী (আঃ) মূলত মেদিনীপুর পূণ্য পাক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা। যাঁর মহব্বতে এসে ভক্তপ্রাণ হাজার হাজার মুরিদান তাঁর প্রতি অনুরক্ত হয়ে ওঠেন। ১৮৬৮ (১২৮৫ হিঃ মহরম ১৭) তিনি পর্দা নেওয়ার পূর্বে (ওফাত) তিনি তাঁর সুযোগ্য উত্তরাধিকারী ও পুত্র হযরত আলী আব্দুল কাদের সামছুল কাদের মারুফ সৈয়েদেনা হযরত সৈয়দ শাহ মুরশীদ আলী আল কাদেরী আল হাসানী ওয়াল হোসেনী আল বাগদাদী আল মেদিনীপুরী (আঃ) এর নিকট তাঁর উত্তরাধিকার ও বেলায়েত ও বেলায়েত সমর্পণ করেন।

সৈয়দেনা ও মুরশিদেনা হযরত সৈয়দ শাহ মুরশিদ আলী আল কাদেরী আল হাসানী আল হোসেনী আল বাগদাদী ওয়াল মেদিনীপুরী (আঃ) জন্মগ্রহণ করেন পশ্চিম বাংলার মেদিনীপুরে (হিজরী ১২৬৮ সালে ২৭ রমজান, খ্রি.১৮৫২ জুলাই ১৬)। সার্জ্জাদানসীন হয়েন (হিজরী ১২৮৫, ১৭ মহরম)। তিনি কাদেরীয়া তরীকার উজ্জ্বল নক্ষত্র, বেলায়েত ও আধ্যাত্মিক ক্ষমতার ধারক ও বাহক। তাঁকে মওলাপাক বলা হত। তিনি দ্বীন ইসলাম ও কাদেরীয়া তরীকাকে হযরত গউস পাক (আঃ) এর ন্যায় সারাবিশ্ব তথা ভারত বর্ষের বিভিন্ন স্থানে ও পূর্ববাংলায় পশ্চিম-বাংলায় ছড়িয়ে দেন। তিনি আহলে বায়েত পাকের পবিত্র বংশধর ও সদস্য, হযরত গউস পাক (আঃ) আধ্যাত্মিকতায় উচ্চমানের ওলিয়ে কামেল ছিলেন। তাঁর সময়কাল থেকে আধ্যাত্মিকতার ও সুফিবাদের প্রভাব ভারত বর্ষের তথা পূর্ববাংলা ও পশ্চিমবাংলা, আসাম উড়িষ্যাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। মেদিনীপুর হয়ে ওঠে মুসলিম উম্মার পবিত্র মিলন কেন্দ্র। ঐতিহ্যবাহী মেদেনীপুরে মুসলিম ভ্রাতৃবন্ধনের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় গউস পাক (আঃ) এর প্রবর্তিত কাদেরীয়া তরীকা। মেদিনীপুর কেন্দ্রীক কাদেরীয়া তরীকাভুক্ত সকলে কাদেরীয়া তরীকার ধর্মপ্রাণ অনুগত ভক্ত মুরীদান বলে তাদের সাধারণ পরিচিতি রয়েছে। হযরত মুরশীদ আলী আল কাদেরী (আঃ) সর্বপ্রথম কলিকাতায় তালতলায় ২২ নং খানকায়ে কাদেরীয়া প্রতিষ্ঠা করেন। কাদেরীয়া তরীকার আদর্শ ও আধ্যাত্মবাদ দিকে দিকে ছড়িয়ে যায়। তিনি মেদিনীপুরে ইস্ত্রিগঞ্জে গভীর জঙ্গলে চিল্লাগাহে গভীর ইবাদত এবং কঠিন মাকুসী ইবাদত করেন। তিনি কাদেরীয়া তরীকার কিতাব দেওয়ানপাক রচনা করেন। তৎকালীন বৃটিশ ভারতের শাসন আমলে পূর্ববাংলার সাবেক ফরিদপুর জেলার গোয়ালন্দ মহকুমার রাজবাড়ি থানার অন্তর্গত সর্জ্জনকান্দা মৌজায় রাজবাড়ি শহরের কোর্ট পাড়ার পূর্বে প্রশস্ত দ্বিমুখী রোড সন্নিকট মনোরম স্থানে অবস্থিত রাজবাড়ি বড় মসজিদ খানকা শরীফ শহরের ভাবগাম্ভীর্যের প্রতীক ও ইসলাম ধর্ম এবং কাদেরীয়া তরীকার ভিত্তি ও প্রধান কেন্দ্র । রাজবাড়ি বড় মসজিদ খানকা শরীফকে কেন্দ্র করে রাজবাড়ি শহরে তথা পার্শ্ববর্তী এলাকায় ও এদেশে হযরত আলী (আঃ), হযরত বড় পীর (আঃ) পাকের পবিত্র বংশের কাদেরীয়া তরীকা ও মেদিনীপুর হযরত হুজুর পাক পীর কেবলাদের হাজার হাজার ভক্ত প্রাণ মুরিদান ইসলামের ও কাদেরীয়া তরীকার খেদমতের কাজ করে চলেছেন। গড়ে উঠেছে অতি পরিচিত কাদেরীয়া তরীকা ও আঞ্জুমান-ই-কাদেরীয়া ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। প্রাচীন এ মসজিদটির নির্মাণকাল ঠিক কবে কখন তা জানা যায় না। তবে এতটুকু জানা যায় যে, মসজিদটি ছনের ছাউনি বিশিষ্ট ঘর ছিল। সর্বমহলে টাউন মসজিদ হিসাবে এর পরিচিতি ছিল হযরত সৈয়দ শাহ মুরশীদ আলী আল কাদেরী (আঃ) (হযরত মওলাপাক) উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এই মসজিদে সর্বপ্রথম কদম মোবারক ও তসরীফ রাখেন। তৎকালীন সময়ে ফরিদপুরে তসরীফ রাখিবার পূর্বে তাঁর ভক্ত মুরিদান ভারতের এলাহাবাদের অ্যাডভোকেট এনামুল কবিরকে ফরিদপুর জেলার গোয়ালন্দ মহকুমার রাজবাড়িতে সাব রেজিস্ট্রার পদে কাজে যোগদানের নির্দেশ দেন।


এনামুল কবির এই পদে যোগদান করেন। বড় মসজিদটি যে স্থানে অবস্থিত এ জায়গার তৎকালীন মালিক ছিলেন মরহুম খান সাহেব মৌলবী মোখলেছুর রহমান ও মরহুম ছলিম চৌধুরী। ঐ জমিতে মালিকদের নির্মিত চৌচালা একখানা টিনের ঘরে ভাড়ায় সাব রেজিস্টারী কাজ সম্পন্ন হত। সাব রেজিস্টার অফিস সংলগ্ন একটি একতলা দালানে মিউনিসিপ্যালিটি অফিস ছিল। এনামুল কবির রাজবাড়িতে চাকরিকালীন সময় সাব রেজিস্টার অফিস সংলগ্ন ঘরে ভাড়ায় বাস করতেন। এ সময় হযরত সৈয়দ শাহ মুরশীদ আলী আল কাদেরী (আঃ) ফরিদপুরে খান বাহাদুর মৌলবী আব্দুল গনি সাহেবের বাড়িতে সফরসঙ্গী ও খাদেমসহ তসরীফ রাখেন।

হযরত মওলা পাক (আঃ) ফরিদপুর নদীপথে নৌকায় ভ্রমণকালে গেদার অনতিদূরে ঢোল সমুদ্র এলাকায় এলে তিনি প্রকাশ করেন যে, এখানে রাসুল (সঃ) পাকের তবারুক আছে এবং তা থেকে সুঘ্রাণ আসছে। গেরদা সৈয়দ বাড়ি (মিয়া বাড়িতে) হযরত শাহ আলী বাগদাদী (রঃ) বাগদাদ থেকে এখানে আসেন। তিনি নবী করিম (সঃ) পবিত্র দাড়ি মোবারক, হযরত আলী (কঃ) পবিত্র মুচ মোবারক, হযরত হাসান (আঃ) ও হযরত হোসেন (আঃ) এর পবিত্র জুলফী মোবারক, হযরত বড় পীর (আঃ) পাক এর গায়ের পবিত্র জোব্বা মোবারক, মাদার পীরের গুরদি, শাহ আলী বাগদাদী (রঃ) এর খাবার থালা, লাঠি ইত্যদি তবারুক সঙ্গে আনেন। হযরত শাহ আলী বাগদাদী (রঃ) গেরদায় কিছুদিন থাকার পর ঢাকার মিরপুরে চলে যান তথায় ওফাতপ্রাপ্ত হন। হযরত মুরশীদ আলী আল কাদেরী (আঃ) এর নিকট গেরদার মিয়া বাড়ির মীর মদন শাহ এবং তাঁর স্ত্রী মওলাপাকের নিকট বায়াত (মুরিদ) হয়েন। হযরত মুরশীদ আলী আল কাদেরী (আঃ) ফরিদপুর থেকে কলিকাতায় ফিরে যাবার পথে ভক্ত মুরীদ খাদেম ও সঙ্গী সাথীদের এবং এনামুল কবিরের বিনীত আরজীর প্রেক্ষিতে ও বিনীত অনুরোধে ছনের ছাউনীবিশিষ্ট মসজিদ ঘরে কদমপাক রাখেন ও তসরীফ রাখেন। হযরত মুরশীদ আলী আল কাদেরী (আঃ) ছনের মসজিদ ঘরে যে স্থানে কদম মোবারক ও তসরীফ রেখেছিলেন এবং অবস্থান করেছিলেন ঐ স্থানে ঐ সময় হতে হযরত মওলা পাকের পবিত্র হুজরা শরীফ ও সিজদাগাহ নির্মাণ করা হয়। যা এখন মওলা পাকের পবিত্র হুজরা শরীফ হিসাবে খ্যাত। পরবর্তীতে এই ছনের মসজিদ ঘর পুনঃসংস্কার করে মওলা পাকের হুজরা শরীফ সংলগ্ন করে টিনের মসজিদ ঘর নির্মাণ করা হয়। তৎপর হযরত এরশাদ আলী আল কাদেরী আল বাগদাদী (আঃ) এর সময় টিনের ঘর ভাঙ্গিয়া একতলা দালান (মসজিদ) নির্মাণ করা হয়। হযরত মওলা পাকের হুজরা শরীফে বর্তমান সার্জ্জাদানসীন পীর কেবলা হযরত সৈয়দ শাহ রশীদ আলী আল কাদেরী (আঃ) এর সদয় সম্মতিক্রমে হযরত ছোট হুজুর পাক (আঃ) এবং তদ্বীয় বড় শাহজাদা (আঃ) এর তত্ত্বাবধানে শহীদ সম্রাট হযরত ইমাম হোসেন (আঃ) পাকের তাবুত পাক ও হযরত বড় পীর আবদুল কাদের জিলানী (আঃ) এর পবিত্র মাজার পাকের পবিত্র গিলাব পাক হুজরা শরীফে রক্ষিত রয়েছে।

মুসলিম ও অমুসলিম জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নিবিশেষে অগণিত ভক্তবৃন্দ ভক্তি সহকারে জিয়ারত করে মোনবাঞ্ছা পূরণ করেন। হযরত মওলা পাকের পুরাতন হুজরা শরীফ সংলগ্ন বর্তমান সার্জ্জাদানসীন হযরত বড় হুজুর পাক পীর কেবলা (আঃ), হযরত ছোট হুজুর পাক (আঃ) ও হযরত বড় শাহজাদা পাক (আঃ) এর নতুন হুজরা শরীফ ও খানকা শরীফ রয়েছে। হযরত মওলা পাক (আঃ) তসরীফ রাখিবার সময়ে একখানা ছনের ছাউনী বিশিষ্ট আল্লাহুর মসজিদ ঘর ছিল। ঐ মসজিদ ঘর নির্মাণের সঠিক সাল-তারিখ জানা যায় না। আনুমানিক একশত বছরের উর্ধেব হবে। হযরত মওলা পাক (আঃ) হুজরা শরীফ ও মসজিদের জন্য ২৫ শতাংশ জমি মরহুম মৌলবী মোখলেছুর রহমান (খান সাহেব) ওয়াকফ করে দিয়েছিলেন। পরে অন্যান্য জমির মালিকদের নিকট হতে নগদ মুল্যে রেজিস্টারী কবলামূলে  আঞ্জুমান কমিটি খরিদ করেন। এছাড়া জমিতে থাকা একতলা দালান ও চৌচালা টিনের ঘর খরিদ করে প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী মসজিদটি প্রতিষ্ঠিত করা হয় যাহা রাজবাড়ি ‘টাউন মসজিদ’ নামে সর্বমহলে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে মসজিদটি বড় মসজিদ খানকা শরীফ নামে খ্যাত। জামানার ওলিয়ে কামেল হযরত মুরশীদ আলী আল কাদেরী (আঃ) ছিলেন হযরত গউস পাক আব্দুল কাদের জিলানী (আঃ) এর প্রতিচ্ছবি।


তিনি আধ্যাত্মিক গুণসম্পন্ন ও অলৌকি ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। জীবনের প্রায় সমস্ত সময় ইবাদত বন্দেগী ও আধ্যাত্মিক সাধনায় মগ্ন থাকতেন। তিনি ইসলামকে ও কাদেরীয়া তরীকাকে বিশ্বের দিকে দিকে ছড়িয়ে দিয়ে ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে গমন করেন। তিনি অনেক অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। তিনি ভারতবর্ষের কাদেরীয়া তরীকা ‍সুপ্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে কলিকাতায় ২২নং খানকা শরীফ প্রতিষ্ঠা করেন।

হযরত সৈয়দ শাহ মুরশীদ আলী আল কাদেরী (আঃ) বেছালে হক ফরমান (পর্দা) ২৭ শাওয়াল ১৩৭৮। বাংলা ৪ঠা ফাল্গুন ১৩০৭ (ইংরেজি ১৭ ফেব্রয়ারি ১৯০১) রাত ২টা ১১ মিনিটে কলিকাতা খানকা শরীফে বেছালেহকপ্রাপ্ত হয়েন। মেদিনীপুরে তাঁর পিতা ও মাতার মাজার পাকের পাশ্বে উচ্চ গম্বুজের মধ্যে তাঁর মাজার শরীফ রয়েছে।

হযরত মওলা পাকের বেছালে হকের পরে সার্জ্জাদানসীন হন তাঁর সুযোগ্য উত্তরসুরী ও সুযোগ্য শাহজাদা হযরত সৈয়দ শাহ এরশাদ আলী আল কাদেরী আল হাসানী ওয়াল হোসেনী আল বাগদাদী আল মেদিনীপুরী (আঃ)। তিনি ১৭ ফেব্রুয়ারী ১৯০১ সালে বেলায়েতপ্রাপ্ত হন ও সার্জ্জাদানসীন হন। তিনি ওলিয়ে কামেল এবং আধ্যাত্মিক বুজুর্গ ওলি ছিলেন। তিনি তরীকার কেতাব পাক, বায়েছ পাক মহরম পাকের কাছিদা পাক লিখেছেন। তিনি সার্জ্জাদাসীন হওয়ার পর রাজবাড়িতে বড় মসজিদ খানকা শরীফে কদম মোবারক রাখেন। তাঁর আগমনের সঠিক সাল -তারিখ জানা যায় না। তিনি রাজবাড়ির বিভিন্ন অঞ্চল বিশেষ করে দুঞ্চি, দ্বদশী, ভবদিয়া, বরাট, মতিয়াগাছিতে তসরীফ রেখেছিলেন। তিনি সর্বপ্রথম মেদিনীপুর মাজার পাকে মওলা পাকের ৪ ফাল্গুন পবিত্র ওরশ শরীফ শুরু করেন। রাজবাড়িসহ বাংলাদেশে তাঁর হাজার হাজার ভক্ত তাঁর নিকট বায়াতগ্রহণ করেন। তাঁর সময় থেকে অত্র অঞ্চলে দ্বীনি ইসলাম ও কাদেরীয়া তরীকার ব্যাপক প্রসার ঘটতে থাকে। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে রাজবাড়িসহ অত্র অঞ্চল ও বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলের ভক্ত মুরীদানদের নিয়ে ওরশ শরীফে যোগদানের জন্য একটি ওরশ স্পেশাল ট্রেনের ব্যাবস্থা করা হয়। ওরশ উপলক্ষে ১০৯ বছর যাবৎ দেশের কেবলমাত্র রাজবাড়ি থেকে ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভক্ত মুরীদানদের নিয়ে বড় হুজুরপাক কেবলা পরিচালিত একটি স্পেশাল ট্রেন ২ ফাল্গুন রাত ১০টা নাগাদ রাজবাড়ি রেল স্টেশন থেকে ছেড়ে যায়। ট্রেনটি সরাসরি বর্ডার অতিক্রম করে ৪ ফাল্গুন মেদিনীপুর পৌছে। ওরশ শেষে ৫ ফাল্গুন রাত ১০টা মেদিনীপুর স্টেশন থেকে ছেড়ে রাজবাড়ি স্টেশনে পৌছে ১৯ ফেব্রয়ারি। শত বছরের অধিককাল ধরে যাতায়াতকারী ট্রেনটি রাজবাড়ির ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। ট্রেনটির নির্গমন ও আগমন উপলক্ষে রাজবাড়ি মুসলিম উম্মার মিলন মেলায় পরিণত হয়। ইসলামিক ভাবগাম্ভীর্যে সজ্জিত ট্রেনটিকে পবিত্রতার প্রতীক বলে মনে করে। এ সময় শহর মুখরিত হয়ে ওঠে। নারী, পুরুষ ও শিশুসহ প্রায় এক হাজারের অধিক যাত্রী স্পেশাল ট্রেনে যাতায়াতের সুবন্দোবস্ত থাকে। আঞ্জুমান-ই-কাদেরীয়া কমিটির তত্ত্বাবধানে ও অফিস ব্যবস্থাপনায় পাসপোর্ট ভিষা সংগৃহীত হয়। হযরত এরশাদ আলী আল কাদেরী (আঃ) এর সময় থেকে দ্বীন-ই-ইসলাম ও কাদেরীয়া তরীকার ব্যাপক প্রচার ও প্রসার ঘটতে থাকে। তিনি কাদেরীয়া তরীকার কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য রাজবাড়িতে আব্দুল আলীকে খলিফা মনোনীত করেন। তৎকালীন কাদেরীয়া কার্যাদি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য একটি কার্যকরী কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সভাপতি ছিলেন মরহুম আব্দুল আলী খলিফা, সেক্রেটারী ছিলেন মরহুম মজিবর রহমান, কমিটিতে আরও ছিলেন মরহুম ছলিম চৌধুরী, মরহুম ফখরউদ্দিন আহম্মেদ, মরহুম হাবিবুর রহমান, মরহুম বাবর আলী, মরহুম কালু খলিফা প্রমুখ, আনোয়ার হোসেন। হযরত সৈয়েদেনা সৈয়দ শাহ এরশাদ আলী আল কাদেরী (আঃ) ১৯৫৩ সালের ২৩ ফেব্রয়ারি ২১ জমাদিয়াল আওয়াল বাংলা ২৩ মাঘ রাত্র ১১-১১ মিনিটে কলিকাতা ২২ নং খানকা শরীফে বেছালে হক (পর্দা) প্রাপ্ত হয়েন। তাঁর মাজার শরীফ মেদিনীপুর ঘেরাপাকের মধ্যে।


তার বেছাল এ হকের (ওফাত) পরে তাঁর সুযোগ্য উত্তরাধিকারী ২য় শাহজাদা পাক সৈয়দেনা মওলানা মুরশিদেনা হযরত সৈয়দ শাহ মুসতারশীদ আলী আল কাদেরী আল হাসানী ওয়াল হোসেনী আল বাগদাদী ওয়াল মেদিনীপুরী (আঃ) বেলায়েতপ্রাপ্ত হয়েন ও সার্জ্জাদানসীন হয়েন (১৯৫৩ সালের ২৩ ফ্রেব্রুয়ারি) তিনি বেলায়েতের ধারক বাহক ছিলেন। তিনি হকের জন্য ইসলাম ও আঞ্জুমান-ই-কাদেরীয়া তরীকাকে উচ্চাসনে প্রতিষ্ঠার জন্য আজীবন জেহাদ করেছেন। তিনি ইংরেজি ১৯৫৬ সালের ১২ মার্চ তারিখে তাঁর বড় শাহজাদা পাক হযরত সৈয়দেনা রশিদ আলী আল কাদেরী আল বাগদাদী (আঃ) (বর্তমান সার্জ্জাদানসীন বড় হুজুরপাক) ও মেজো শাহজাদা পাক হযরত রাজদান আলী আল কাদেরী আল বাগদাদী (আঃ) (বেছালেহক প্রাপ্ত), খাদেম ও অনেক সফরসঙ্গীসহ গেদে দর্শনা হয়ে রেলপথে রাজবাড়ি খানকা শরীফ বড় মসজিদের তসরীফ ও কদমপাক রাখেন। তাঁর আগমনে রাজবাড়িসহ এতদ্বঞ্চলের নারী পুরুষসহ হাজার হাজার মানুষের মুরিদের ঢল নামে ও অগণিত মানুষ মুরিদ হয়েন (বায়েত) গ্রহণ করেন। তিনি যে কাঠের বড় পালকী পাকে বসে এসেছিলেন ঐ পালকী খানা এখনো রাজবাড়ি খানকা শরীফে শ্রদ্ধাভরে সুরক্ষিত রয়েছে। তিনি আধ্যাত্মিক জগতের একজন মহাপুরুষ ছিলেন ও উচ্চস্তরের ওলিয়ে কামেল পীর ছিলেন। তিনি অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন।

তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে কলিকাতায় ৪নং হাজী মোহাম্মাদ মহসীন স্কয়্যার লেনের বাড়িতে পরিবার পরিজনসহ বসবাস করতেন। তিনি রাজবাড়ি ও তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে কাদেরীয়া তরীকার কার্যাদি সুষ্ঠুভাবে সুসম্পন্ন করিবার জন্য সর্বপ্রথম আঞ্জুমান-ই-কাদেরীয়া তরীকা প্রতিষ্ঠিত করেন ও গঠন করেন। তিনি আঞ্জুমান-ই-কাদেরীয়া কমিটি গঠন করেন ও বাই-ল তৈরি করেন। এই কমিটির রাজবাড়ির সভাপতি হন মরহুম আবদুল আলী খলিফা। সেক্রেটারী মরহুম কাজী হেদায়েত হোসেন, ক্যাশিয়ার মরহুম সামসুদ্দিন বিশ্বাস, কমিটিতে আরো থাকেন খোন্দকার আনিসুল হক, আনোয়ার হোসেন, মরহুম হাজী আঃ লতিফ, মরহুম ইসমাইল মিয়া, মরহুম নূরুন্নবী মোল্লা, রোস্তম আলী (তেল ব্যবসায়ী), শওকত আলী মোল্লা, মরহুম রোস্তম আলী, মরহুম আইনদ্দিন শিকদার, মরহুম আঃ জব্বার মোল্লা, মরহুম শাহাদত হোসেন ও মরহুম জালাল উদ্দিন, মরহুম আব্দুল জব্বার পোদ্দার এবং পরবর্তীতে যুক্ত হন মরহুম রহমত আলী বেপারী, মরহুম হেদায়েত আলী (খাদেম), মরহুম এনায়েত, মরহুম তসলিম উদ্দিন, মরহুম আইনদ্দিন মণ্ডল, মরহুম তোরাব আলী ও কাজী এরাদত আলী, মরহুম সৈয়দ আলী, জনাব আঃ ছাত্তার প্রমুখ। পরবর্তীতে হযরত বড় হুজুর পাক (আঃ) সময়ে নতুন কমিটি গঠিত হয়। ঐ কমিটির সভাপতি মরহুম হাজী আব্দুল লতিফ, সহ সভাপতি মরহুম সামসুদ্দিন বিশ্বাস ও মরহুম নূরন্নবী মোল্লা, সেক্রেটারী কাজী ইরাদত আলী, ক্যাশিয়ার খন্দকার আনিসুল হক, কমিটিতে আরো ছিলেন মরহুম আইনদ্দিন শিকদার, মরহুম আব্দুল জব্বার মোল্লা, গোফরান, আব্দুল মান্নান চৌধুরী, আব্দুল মতিন মণ্ডল ও মাহাবুবুল আলম।

হযরত সৈয়দ শাহ মুসতা রশীদ আলী আল কাদেরী আল বাগদাদী (আঃ) এর আগমনের পর হতে রাজবাড়ি টাউন মসজিদের নামকরণ হয় রাজবাড়ি বড় মসজিদ খানকা শরীফ। তিনি আঞ্জুমান-ই-কাদেরীয়া তরীকাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে প্রবর্তন করে, প্রচার ও প্রসার করে এবং সর্বদা অক্লান্ত পরিম্রমের পর ভক্তদের শোক সাগরে ভাষিয়ে হিজরী ১৩৯৭ সালের ২২ জিলকদ বাংলা ১৩৮৫ সালের ৭ কার্তিক, ১৯৭৮ সালের ২৫ অক্টোবর বাংলাদেশ সময় রাত্র ১০-১৫ মিনিটে কলিকাতায় ৪নং বাড়িতে পর্দানেন (বেছালে হক) তাঁকে পর্দা হুজুর পাক ও মালিক পাক বলা হত। তাঁর মাজার পাক মেদিনীপুর ঘেরা পাকের মধ্যে পিতা মাতার পার্শে্ । তিনি অনেক কারামত পাক দেখিয়েছেন। তাঁর বেছালে হকের (পর্দা) ওফাত পাকের পরে বেলায়েতপ্রাপ্ত হন তাঁর উত্তরাধিকারী বড় শাহজাদা পাক আধ্যাত্মিক ক্ষমতার মহাশক্তিধর মহান ওলিয়ে কামেল মুজাদ্দিদ এ জমা সৈয়েদেনা মওলানা মুরশিদেনা হযরত সৈয়দ শাহ রশিদ আলী আল কাদেরী আল হাসানী ওয়াল হোসেনী আল বাগদাদী আল মেদিনীপুরী(আঃ)। তিনি সার্জ্জাদানসীন হয়েন হিজরী ১৩৯৭ সালের ২২ জেলকদ বাংলা ১৩৮৫ সালের ৭ কার্তিক, খ্রিস্টাব্দ ১৯৭৮ সালের ২৫ অক্টোবর তারিখে। তিনি বড় হুজুর পাক কেবলা ও কাবা নামে খ্যাত।


তিনি জামানার অলি ও মুজ্জাদ্দেদ এ হাদী। তিনি তাঁর পূর্বপুরুষদের ন্যায় ইসলামের ও আঞ্জুমান-ই-কাদেরীয়া তরীকার ধারক, বাহক, পরিচালক, ইমাম, হাদী ও পবিত্র কেবলা ও কাবা এবং পবিত্র বেলায়েতের মালিক। তিনি তার মহান পূর্ব পুরুষদের ন্যায় উত্তরাধিকার সূত্রে বেলায়েতপ্রাপ্ত মহান ওলিয়ে কামেল পীর কেবলা ও কাবা ও মহাআধ্যাত্মিক ক্ষমতাধর সিদ্ধ মহাপুরুষ। হযরত নবীপাক (সঃ) এর হতে ৩৪ তম পবিত্র বংশধর ও হযরত আলী (কঃ) হতে ৩৩তম পবিত্র বংশধর এবং হযরত গাউস পাক (আঃ) হতে ২১ তম পবিত্র বংশধর। তিনি ছাহেবে বেলায়েত। তিনি অলৌকিক ক্ষমতার মালিক। তিনি আঞ্জুমান-ই-কাদেরীয়া তরীকার উজ্জ্বল নক্ষত্র। শরিয়ত, তরিকত হকিকত, মারেফাত ও বেলায়েতের ধারক, বাহক এবং মালিক। তিনি দ্বীন ইসলামও আঞ্জুমান-ই-কাদেরীয়া তরীকার প্রচার, প্রসার ও প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেকে সর্বদা নিয়োজিত করে বিলীন করেছেন আল্লাতে। তিনি হযরত নবীপাক (সঃ), হযরত আলী (কঃ), হযরত হাসান (আঃ), হযরত হোসেন (আঃ) ও হযরত গাউস পাক (আঃ) পবিত্র বংশধর ও আহালে বায়েত পাকের সদস্য। মুসলিম, অমুসলিম, জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে তার দরবার পাকে অগণিত মানুষ ও ভক্তবৃন্দ হাজির হয়ে মনোবাসনা পূর্ণ করেন। তিনি সার্জ্জাদানসীন হয়ে তাঁর পূর্ব পুরুষদের ন্যায় বাংলাদেশে ঢাকাতে তসরীফ রেখে সর্বপ্রথম রাজবাড়ি বড় মসজিদ খানকা শরীফে কদমপাক রাখেন ও তসরীফ রাখেন খ্রিস্টাব্দ ১৯৮২ সালের ২৩ ডিসেম্বর।

সঙ্গে এসেছিলেন তার ছোট ভাই হযরত সৈয়দ শাহ রোওয়াইশীদ আলী আল কাদেরী আল হাসানী ওয়াল হোসেনী আল বাগদাদী আল মেদিনীপুরী (আঃ) (ছোট হুজুরপাক)। তিনি ওলিয়ে কামেল মহাপুরুষ। তারপর হযরত বড় হজুর পাক (আঃ) খ্রিস্টাব্দ ০৭/০২/৮৪ তারিখে, খ্রিস্টাব্দ ২৬/১২/৮৮ তারিখে ও খ্রিস্টাব্দে ২৯/০৪/০৬ তারিখে রাজবাড়ি বড় মসজিদ খানকা শরীফে কদমপাক রাখেন ও তসরীফ রাখেন। শেষবারে সঙ্গে ছিলেন তার ছোট ভাইয়ের (ছোট হুজুরের ) বড়  শাহজাদাপাক হযরত সৈয়দ শাহ ইয়া’সুফ আলী আল কাদেরী আল হাসানী ওয়াল হোসেনী আল বাগদাদী আল মেদিনীপুরী (আঃ)। তিনিও অলিয়ে কামেল সিদ্ধ মহাপুরুষ।

হযরত বড় হুজুরপাক (আঃ) রাজবাড়ি বড় মসজিদ খানকা শরীফে ৫ বার তসরীফ রেখেছেন। সার্জ্জাদানসীন হযরত বড় হুজুর পাকের (আঃ) নিকট নারী, পুরুষ, মুসলিম, অমুসলিম, জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে রাজবাড়িসহ দূরদূরান্ত হতে লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢল নামে ও সকলে বায়েত গ্রহণ করেন ও মুরিদ হয়েন। বাংলাদেশে হযরত বড় হুজুরপাকের কয়েক লক্ষ ভক্ত মুরিদ রয়েছে। রাজবাড়ি বড় মসজিদ খানকা শরীফে হযরত বড় হুজুর পাক কেবলা ও কাবার আগমনে বাংলাদেশ ও এতদ্বাঞ্চলে দ্বীন ইসলাম ও আঞ্জুমান-ই-কাদেরীয়া তরীকার ব্যাপক প্রচার, প্রসার লাভ করিয়াছে। হযরত ছোট হুজুর পাক (আঃ) ও হযরত বড় শাহজাদা পাক (আঃ) রাজবাড়িতে কয়েকবার তসরীফ রেখেছেন। হযরত বড় হুজুর পাক (আঃ) বাংলাদেশের ঢাকা, রাজবাড়ি, ধুঞ্চি, খানখানাপুর, দৌলতদিয়া, পাবনা জেলার সাগরকান্দি ও সাটিয়া কোলায় তসরীফ রেখেছেন এবং ঐ সকল এলাকায়ও হাজার হাজার নারী পুরুষ বায়াত ও মুরিদ হয়েন। হযরত বড় হুজুর পাক কেবলা ও কাবার সদয় সম্মতিক্রমে হযরত ছোট হুজুরপাক (আঃ) ও হযরত বড় শাহজাদা পাক (আঃ) তত্ত্বাবধানে রাজবাড়ি বড় মসজিদ খানকাশরীফ পুনঃসংস্কার করা হইয়াছে ও নতুন খানকা শরীফ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রাজবাড়ি জেলার মধ্যে এই বড় মসজিদখানা আয়তনে সবচাইতে  বড় ও শোভনীয়। এই বড় মসজিদের বর্তমান ইমাম আলহ্বাজ্ব, হাফেজ মোহম্মদ শাহজাহান। মোয়াজ্জিন, ফেদার আলী। এই মসজিদের সাবেক ইমাম ছিলেন মরহুম আলহ্বাজ্ব, মাওলানা, আশরাফ আলী কাদেরী ও মরহুম হাফেজ রহমত উল্লাহ। রাজবাড়ি বড় মসজিদ খানকা শরীফে বিগত দিন যাবৎ প্রতি বছর মহরম মাসের ১ মহরম হতে ১০ই মহরম পাকের পড়াপাক মিলাদ মাহফিল, মর্সিয়া পাক অনুষ্ঠিত হয়। ১০ মহরম পবিত্র আশুরা পাক বেলা ১০টায় বড় মসজিদ হতে শহীদ সম্রাট হযরত ইমাম হোসেন (আঃ) ও তার আত্মীয়বর্গ ও সঙ্গী সাথী শহীদদের মরদুদ এজিদ বাহিনী কর্তৃক কারবালায় নির্মমভাবে শহীদ হওয়ায় তাঁদের স্মরণে ৩০/৩৫ হাজার লোকের সমাবেশে এক ঐতিহাসিক শোক মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।


এই মিছিল পাকে সোহাদায়ে কারবালা ইমাম হোসেন (আঃ) পাকের তাবুত পাক ভক্তিসহকারে বহন করা হয় এবং এই মিছিল পাকে কালো, সবুজ, লাল বর্ণের নিশান পাক শোভমান থাকে। হযরত গউস পাক (আঃ) এর নামের ব্যানার মিছিল পাকের সম্মুখে থাকে।

বড় মসজিদে পবিত্র ফাতেহা দোয়াজ দহম শরীফ, ফাতেহা ইয়াজদহম শরীফ, শবে মেরাজ শরীফ, প্রত্যেক চন্দ্র মাসে ১১ই শরীফ ও বিভিন্ন ওরশ শরীফ অনুষ্ঠিত হয়। হযরত নবী করিম (সঃ), হযরত আলী (কঃ), হযরত ইমাম হাসান (আঃ), হযরত ইমাম হোসেন (আঃ) ও হযরত গউস পাক (আঃ) এর পবিত্র বংশধর ও আওলাদ পাক ও আহলে বায়েত পাকের সদস্যবৃন্দের পবিত্র কদম পাকের ধূলিতে ও শুভ আগমনে রাজবাড়ি বড় মসজিদ খানকা শরীফ পূতপবিত্র ও ধন্য হয়েছে। ইতিহাসের পটভূমিকায় রাজবাড়ি বড় মসজিদ খানকাশরীফ-----রাজবাড়িসহ তৎকালীন পূর্ববাংলায় ও বর্তমান বাংলাদেশে দ্বীন ইসলাম ও কাদেরীয়া তরীকার প্রচার ও প্রসারে বিরাট ভূমিকা রেখেছেন ও অপরিসীম গুরুত্ব রয়েছে। কাদেরীয়া তরীকাপন্থী ভক্তদের ও আঞ্জুমান-ই-কাদেরীয়া তরীকার ভক্তদের রাজবাড়ি বড় মসজিদ খানকা শরীফ মূল ক্ষেত্র ও প্রধান কেন্দ্র। বর্তমান সার্জ্জাদানসীন হযরত সৈয়দ শাহ রশিদ আলী আল কাদেরী আল হাসানী ওয়াল হোসেনী আল বাগদাদী আল মেদিনীপুরী (আঃ) (বড় হুজুরপাক কেবলা) এর পরিচালনায় ও নির্দেশে কোরআন হাদিসের আলোকে পরিপূর্ণ ইসলামের বিধান মোতাবেক সমস্ত কার্যাদি সুসম্পন্ন হচ্ছে।

হযরত বড় হুজুর পাকের পরিচালনায় মওলা পাকের ৪ঠা ফাল্গুনের ওরশ শরীফে বড় হুজুর কেবলা পরিচালিত ওরশ যাত্রী স্পেশাল ট্রেন প্রতি বৎসর রাজবাড়ি রেলস্টেশন হতে মেদিনীপুরের ওরশ শরীফে যাতায়াত করে আসছে। মেদিনীপুর পাকের পবিত্র মওলা পাকের ৪ ফাল্গুনের ওরশ শরীফ বড় হুজুর পাকের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত হয় ও সেখানে লক্ষ লক্ষ নারী পুরুষ, মুসলিম-অমুসলিম, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে অগণিত লোকের সমাগম হয় ও মেলা পাক অনুষ্ঠিত হয়। হযরত বড় হুজুর পাকের পরিচালনায় রাজবাড়ি খানকাশরীফ বড় মসজিদ হতে ফাতেহা দোয়াজ দাহাম শরীফ ১২ই রবিউল আউয়াল অনুষ্ঠানে ভারতের বিহার রাজ্যের পূর্ণিয়া শরীফে (রওশন গঞ্জ) ১২ খানা ওরশ যাত্রী বাস যাতায়াত করে। হযরত বড় হুজুর (আঃ) পাকের পরিচালনায় ছোট হুজুর (আঃ) পাক, বড় শাহজাদা (আঃ) পাক এর তত্ত্বাবধানে রাজবাড়ি জেলার  গোয়ালন্দ থানার দৌলতদিয়া ‘মাদ্রাসাতু সাবিইল হাসান’ নামে একটি বিরাট মাদ্রাসা পরিচালিত হচ্ছে।

এবং বাংলাদেশ ও পশ্চিম-বাংলায় ও পূর্ণিয়ায় অনেক মসজিদ, মাদ্রসা ও খানকা শরীফ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ও হচ্ছে। বর্তমানে সার্জ্জাদানসীন হযরত বড় হুজুর পাক (আঃ) কেবলার পরিচালনায় ও হযরত ছোট হুজুর পাক (আঃ) ও হযরত বড় শাহজাদা পাক (আঃ) এর তত্ত্বাবধানে ভারতের পশ্চিম-বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা, আসামসহ বাংলাদেশের আঞ্জুমান-ই-কাদেরীয়ার ধর্মীয় যাবতীয় কার্যাদি কোরআন ও হাদিসের আলোকে পরিচালিত হচ্ছে। সাবেক পূর্ববঙ্গ বর্তমান বাংলাদেশের আঞ্জুমান-ই-কাদেরীয়া তরীকার (কাদেরীয়া তরীকা) প্রধান কেন্দ্র ও ভিত্তি রাজবাড়ির বড় মসজিদ খানকা শরীফ। হযরত বড় হুজুর পাক (আঃ) এর পরিচালনায় ও নির্দেশে এবং ছোট হুজুর পাক (আঃ) ও বড় শাহজাদা পাক (আঃ) এর তত্ত্বাবধানে ঢাকা কেন্দ্রীয় আঞ্জুমান-ই-কাদেরীয়া কমিটির তদারকীতে বাংলাদেশের সকল আঞ্জুমান-ই-কাদেরীয়ার কার্যাদি পরিচালিত হয়।

বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় আঞ্জুমান-ই-কাদেরীয়ার কমিটি, ঢাকা কল্যাণপুর মসজিদে কাদেরীয়া অবস্থিত। বাংলাদেশের আঞ্জুমান-ই-কাদেরীয়া কমিটি বিভিন্ন জেলায় যথা---রাজবাড়ি, ঢাকা, ধুঞ্চি, খানখানাপুর, দৌলতদিয়া, ফরিদপুর, পাবনা, সাগরকান্দি, মাছুমদিয়া, খাসআমিনপুর, খানপুর, মধ্য পাড়া, সাটিয়াকোলা, ইসলামপুর, চট্রগ্রাম ও খুলনাসহ আঞ্জুমান-ই-কাদেরীয়া কমিটি রয়েছে ও তরীকার বিভিন্ন ধর্মীয় কার্যাদি সুসম্পন্ন হচ্ছে। বড় হুজুর পাক (আঃ) এর হুকুম মোতাবেক মতিয়াগাছি, চরবরাট, দেবগ্রাম, কাকশিমূল (ঢালারচর), খোলাবাড়িয়া, সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন স্থানে শাখা কমিটির মাধ্যমে ১১ই শরীফ ও টেংরা পাড়ায় ৯ই শরীফসহ অন্যান্য ধর্মীয় কার্যাদি অনুষ্ঠিত হয়।


মতিয়াগাছিতে প্রতি বৎসর ৯ মহরম দিবাগত রাত্রে মহরম পাকের মিছিল পাক, মর্ছিয়া পাক ও মাতম পাক বহু লোকের সমাবেশে অনুষ্ঠিত হয়। রাজবাড়ি খানকা শরীফ বড় মসজিদে ও আঞ্জুমান-ই-কাদেরীয়ার প্রতিটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও মেদিনীপুর ওরশ স্পেশাল ট্রেনের যাবতীয় কার্যাদি সম্পন্ন করা হয়। আঞ্জুমান-ই-কাদেরীয়ার সমস্ত ধর্মীয় কার্যাদি সুসম্পন্ন করার জন্য নিম্নরুপ একটি কার্যকারী কমিটি রয়েছে।

সভাপতি                 :         কাজী ইরাদত আলী

সহ-সভাপতি             :         মোঃ আনোয়ার হোসেন

সম্পাদক                 :         মোঃ শওকত আলী মোল্লা

সহ-সম্পাদক             :         অ্যাডভোকেট আব্দুল মান্নান

 সহ-সম্পাদক             :         মোঃ মাহবুবুল আলম

কোষাধ্যক্ষ               :         মোঃ জাকির হোসেন

সহ কোষাধ্যক্ষ           :        ডা. লুৎফর রহমান

সদস্য                    :         মোঃ শুকুর আলী

সদস্য                    :         মোঃ মোশারফ হোসেন

সদস্য                    :         মোঃ আব্দুল আজিজ খোকন

সদস্য                    :         কুদরত-এ-মওলা পান্না

হযরত বড় হুজুর পাক এর অশেষ রহম করমে বান্দার এ লিখন সর্বপ্রকার ভুল-ত্রুটি মার্জনীয়।

অনুলিখন

অ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান, সহ-সম্পাদক আঞ্জুনাম-ই-কাদেরীয়া, রাজবাড়ি। অ্যাডভোকেট, রাজবাড়ি জজ কোর্ট, সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটার (পিপি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক, রাজবাড়ি জেলা বার এসোসিয়েশন। বর্তমান ঠিকানা : সর্জ্জনকান্দা ২ নং বেড়াডাঙ্গ সড়ক, রাজবাড়ি পৌরসভা। স্থায়ী ঠিকানা : সাং মতিয়াগাছি, পোঃ পাঁচুরিয়া, থানা ও জেলা-রাজবাড়ি।

সাহ সাদুল্লা

সাহ সাদুল্লা মীর মশাররফ হোসেনের পূর্বপুরুষ। মীরের বর্ণনায়----‘জগত বিখ্যাত বোগদাদ নগর হতে তাপস প্রবর সাহ সাদুল্লাহ ভ্রমণ করতে করতে ভারতবর্ষ ভারতভর্ষ ভ্রমণ করতে করতে বঙ্গদেশ, বঙ্গদেশ ভ্রমণ করতে করতে অধুনায়াতন ফরিদপুরের অন্তর্গত সেকাড়া গ্রামে উপস্থিত।’ তার সময়কাল ১৫০০ শতকের মাঝামাঝি। তিনি লিখেছেন সৈয়দ সাদুল্লাহ এক আসেন নাই। তার সাথে বিস্তর লোক ছিল। তার বর্ণনায় শুধু শিষ্য সেবকই নয়, রজক, নরসুন্দর পর্যন্ত ছিল। সাদুল্লার পূর্ববঙ্গে আসার দু’টি কারণ ছিল -----এক সাদুল্লাহর ইচ্ছা ধর্ম প্রচার, দুই তার পিতার সন্ধান করা। সাদুল্লাহর পিতা ছিলেন সাহ পাহলোয়ানের গুরু।


সেকাড়ায় সাহ পাহলোয়ানের অবস্থানের কথা জানতে পেরে তার পিতার খোঁজ করা যাবে এবং ইসলামের প্রচারও হবে। এ উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি সেকাড়ায় আগমণ করেন। সাহ সাদুল্লাহ আর ফিরে যান নাই। সাহ পাহলোয়ানের মেয়ের সাথে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং সেকাড়াতেই থেকে যান। সাদুল্লাহরই বংশ মীর মশাররফ হোসেন এবং এ কাহিনী তার রচিত, আমি কে? নিবন্ধে উল্লেখ আছে। সাহ পাহলোয়ান, সাহ সাদুল্লাহ ও তাদের শিষ্যবর্গের প্রভাবে এ অঞ্চলে ইসলামের প্রসার ঘটে।

মনুমিয়া ও ছনুমিয়া

মনু মিয়া ছনু মিয়ার মাজার রাজবাড়ি জেলার দক্ষিণবাড়ি গ্রামে মনুমিয়া ও ছনুমিয়া তাপস প্রবরের কবর। এই তাপস প্রবরেরা দুই ভাই  সাহ পাহলোয়ানের শিষ্য ছিলেন এবং ইসলাম ধর্ম প্রচারে ব্রতি এই দুই সাধকের অনক মাজেযার কাহিনী এ অঞ্চলে প্রচলিত আছে। মনুমিয়া ছনুমিয়া পদ্মায় ডুবন্ত এক নৌকা বদনার মধ্যে হাত দিয়ে উদ্ধার করেন এমন কাহিনী এ অঞ্চলে প্রচলিত।

পাঁচুশাহ ফকীর

রাজবাড়ি সদর উপজেলার পাঁচুরিয়া একটি ঐতিহ্যবাহী রেল জংশন। ১৮৯৮ সালে গোয়ালন্দ পর্যন্ত রেল বিস্তৃতকালে পাঁচুরিয়া স্টেশন প্রতিষ্ঠা পায়। পাঁচুশাহা তার কয়েক বিঘা জমি রেল কর্তপক্ষকে ছেড়ে দেন এবং তার নাম অনুসারে স্টেশনের নাম হয় পাঁচুরিয়া। পাঁচুশাহ খুব সম্ভব উনিশ শতকের শেষ থেকে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝিকাল পর্যন্ত এখানে বসবাস করতেন এবং অত্র এলাকায় তার ফকিরী প্রভাব বিস্তার লাভ করে। পাঁচুশাহ লালন অনুসারী বলে ধারণা করা যায়। লালনের আর এক শিষ্য ছিলেন পাঞ্জু শাহ। তিনি শৈলকূপায় জন্মগ্রহণ করেন। তার শিষ্য মাতাম শাহের পাঁচটি আস্তানা পাংশা উপজেলায় ছিল। এদেরই অনুসারী পাঁচু শাহ হবে। তিনি আধ্যত্মিক বাউলসাধক ছিলেন। তার অনেক শিষ্য এখনো এ অঞ্চলে রয়েছে। তার মাজার পাঁচুরিয়ায় বিদ্যামান এবং এখানে অনেক ভক্তবৃন্দের সমাবেশ ঘটে। একবার পাঁচুরিয়া স্টেশনের নাম পরিবর্তন করে আরবনগর করা হয়। পাঁচুরিয়াতে আগমন ঘটে একজন আরবীয় ধর্ম প্রচারকের। তিনি এলাকায় ধর্ম প্রসারে বিশেষ ভূমিকা রাখেন তার নাম অনুসারে আরবনগর রাখা হলে এর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। পরে পাঁচুরিয়া স্টেশনের নাম অপরিবর্তিত থাকে।

আখরজানি ছুটি মণ্ডলের মসজিদ

কালখালির অনতিদূরে আখরজানি গ্রামে তৎকালীন সময়ের আর একটি প্রাচীন মসজিদ রয়েছে লোকে এ মসজিদটিকে ছুটি মণ্ডলের মসজিদ বলে। লোকজনের মধ্যে এমন ধারণা রয়েছে যে, ছুটি মণ্ডল নামক কোনো ব্যক্তি স্বপ্নে একবস্তা টাকার সন্ধান পায় এবং স্বপ্নে আদেশপ্রাপ্ত হয়ে উক্ত মসজিদ নির্মাণ করেন। এর কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। মসজিদের আকার আয়তন প্রাচীন। নির্মাণকৌশল দেখে মনে হয় তা মোগল বা নবাবী আমলে নির্মিত। তবে মসজিদের গঠন দেখে মনে হয় তা কোনো দুর্গ ছিল। এমন জনশ্রুতিও এলাকায় রয়েছে যে দুর্গকে মসজিদে রুপান্তর করা হয়। এটি হয়তো সীতারামের দুর্গ ছিল।


ঠাকুর অনুকুলচন্দ্র ও রাজবাড়িতে ভক্তবৃন্দ

কালপ্রবাহে সকল ধর্মেই বিভিন্ন সংঘ ও সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে পরে। বৌদ্ধদের হিনযান মহাযান, খ্রিস্টধর্মে ক্যাথলিক-প্রটেস্ট্যান্ট, ইসলাম ধর্মের শিয়া-সুন্নি’র উদাহরণ। অনুরুপ সনাতন হিন্দু ধর্মে যোগ, সাংখ্য ব্রাহ্ম, শাক্ত, ন্যায়, বৈষ্ণব ইত্যাদি সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ঠাকুর অনকুল চন্দ্র মহাপ্রভু অনুরুপ হিন্দুধর্মের সৎসঙ্গ নাম ধর্ম সম্প্রদায়ের প্রবর্তক। তাঁর মতো ও পথ প্রচার প্রসার লাভ করেছে। ঠাকুর অনুকুলচন্দ্র ১৮৮৮ সালে সেপ্টেম্বর ১৪ তারিখে পাবনা জেলার হেমায়েতপুরে জন্মগ্রহণ করেন। বাল্যকাল থেকেই তিনি ভক্তিপ্রবণ ও সেবা ধর্মপরায়ণ ছিলেন। কলকাতা ন্যাশনাল মেডিক্যল স্কুল থেকে ডাক্তারী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর নিজগ্রাম হোময়েতপুরে গিয়ে মানবতার সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। কিছুদিন পর মায়ের কাছ থেকে দীক্ষাগ্রহণ করে সাধনচর্চায় ব্রতী হন। ধীরে ধীরে তিনি একটি কীর্তন দল গঠন করেন এবং তার মধ্য দিয়ে সত্যভাষণ ও সৎকর্মের আদর্শ প্রচার শুরু করেন। তাঁর প্রচারিত সৎসঙ্গ সম্প্রদায়ে মূলভাব হল কেউ কারো কাছে প্রত্যাশী হবে না। স্বাবলম্বন ও দীক্ষা গ্রহণের মধ্য দিয়ে সাধনায় সিদ্ধিলাভ করতে হবে। অনুকুল ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত সৎসঙ্গ আশ্রমের এই হল আদর্শ। তাঁর ভক্তবৃন্দের সহযোগিতায় তপোবন বিদ্যালয়, মাতৃবিদ্যালয়, দাতব্য চিকিৎসালয়, ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ, মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। ১৯৪৬ সালে তিনি বিহারের দেওঘরে গমন করেন। সেখানেও তিনি আশ্রম, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। ‘শতাব্দী’ নামে আশ্রমের একটি মুখপত্র প্রকাশিত হয় তাঁদের নিজেস্ব ছাপাখানা থেকে। তিনি প্রায় ৪৬টি পুস্তক রচনা করেন। এগুলোতে ধর্মশিক্ষা, সমাজ প্রভৃতি আদর্শ ও উপদেশসমূহ বর্ণীত হয়েছে। ১৯৬৯ সালে জানুয়ারি ২৬ তারিখ তিনি দেওঘরে পরলোকগমন করেন। ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মতো ও আদর্শকে অনুসরণ করে রাজবাড়িতে দীর্ঘদিন যাবৎ একটি সংঘ গড়ে উঠেছে। সংঘটির উদ্দেশ্য তা৭র মতো ও পথকে ভক্তবৃন্দের মধ্যে প্রচার করা। প্রতি বছর তাঁর উদ্দেশ্যে পাটবাজার মন্দিরে সংকীর্তন অনুষ্ঠিত হয়।

ঠাকুর লোকনাথ এবং রাজবাড়িতে তাঁর ভক্তবৃন্দ

হিন্দুধর্মে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অবতাররুপে ধরাধামে আবির্ভুত হন। এ বিশ্বাসে ভক্ত কঠোর সাধনায় কৃষ্ণপ্রেমে বিভোর হয়ে পুণ্যাত্মায় লীন হওয়ার আদর্শগ্রহণ করেন। শ্রীকৃষ্ণের বাণীই হিন্দু ধর্মগ্রন্থ পবিত্র গীতা। কৃষ্ণপ্রেমের বিভোরতায় অনন্যদৃষ্টান্তে পরিণত হলে ভক্ত সাধারণ্যে হয়ে ওঠেন অসাধারণ। গুরু, পণ্ডিত, আচার্য, মহাপ্রভু নামে পরিচিত হন। দীক্ষা নেন অন্য ভক্তবৃন্দ। ধর্ম এভাবেই কালানুক্রমিক ধারায় কালের স্মৃতি বহন করে। ভক্ত পরিশুদ্ধ আত্মার সংস্পর্শে পবিত্র হয়। জাগতিক কর্মপ্রবাহের মধ্যেও মানবতার উচ্চাসনই হয় তাঁর অদ্বৈত আচার্য, শ্রী চৈতন্য, ঠাকুর লোকনাথ, রামকৃষ্ণ পরমহংস এমনি প্রাতস্মরণীয় নাম। শ্রী অদ্বৈতার্চায়ের শিষ্য পরমানন্দ ওরফে পদ্মনাভের সন্তান লোকনাথ। পদ্মনাভ অনুমান ১৪৪০ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান মাগুরা জেলার অন্তর্গত তালঘড়ি গ্রামে বসবাস শুরু করেন। তিনি মাঝেমধ্যে শান্তিপুর ও নবদ্বীপে এসে ভক্তিচর্চা করতেন। তিনি শ্রী চৈত্রন্যের জন্মেরও পূর্বে অদ্বৈতার্চারে প্রচারিত ভক্তিভাব লহরী নিজ দেশে এনে বিতরণ করতেন। পদ্মনাভের স্ত্রী সীতাদেবী পরম ভক্তিমতি ছিলেন ।


যৈছে পদ্মনাভ তৈচে তার পত্নী সীতা

বৈষ্ণবী পরম যেহো অতি পবিত্রতা

 নরোত্তম বিলাস -১ম

এই আদর্শ দম্পতির ৪ পুত্রের মধ্যে লোকনাথ তৃতীয় সন্তান। তিনিই চৈতন্যযুগে সর্বপ্রথম বৃন্দাবন গিয়ে তীর্থ স্থানের কাজ আরম্ভ করেন এবং কালে লোকনাথ গোস্বামী নামে গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের অন্যতম গুরু হন। ১৪৮৩ সালে মাগুরার তালবাড়ি গ্রামে তাঁর জন্ম হয়। বিষয় আশায়ের প্রতি নিরাসক্ত লোকনাথ বৈরাগ্যব্রতে আসক্ত হয়ে পড়েন। বিবাহ, ঘর সংসার অনিত্য ভেবে একদিন নবদ্বীপে পৌঁছে গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর (শ্রীচৈতন্য) শিষ্যত্ব গ্রহণ কেরন। তিনি আর কখনো তালঘড়ি ফিরে আসেননি। মহাব্রতধর্মী এই মরমী একবারেই নিরাসক্ত ছিলেন। কখনো নিজেকে প্রকাশ করিতে চাইতেন না। তিনি রাধাবিনোদ শ্রীবগ্রহ লাভ করে অলৌকিক নিষ্ঠার সাথে তাঁর সেবা আরম্ভ করেন। দীনহীন নিকিঞ্চন ভক্তের রুপ জগৎবাসীকে দেখান। শ্রী গৌরাঙ্গের আদেশমত বৃন্দাবনে বনে, প্রান্তরে পাহাড়ে ঘুড়ে ঘুরে তিনি শতাধিক তীর্থের আাবিস্কার এবং মাহাত্ম্য প্রকাশ করেন। অবশেষে তিনি নির্জন কুঞ্জুকুটীরে দিবারাত্র যে কঠোর সাধনা করতেন তাতে সমস্ত বৃন্দাবনে রোমাঞ্চ সঞ্চার হয়েছিল। তিনি আত্মগোপন করে লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকতেন, নিজের সম্বন্ধে কাহাকেও জানতে দিতেন না। কাউকে শিষ্য করতেন না। কেবল রাজশাহীর লক্ষপতি জমিদারপুত্র নরোত্তম দত্ত বিপুল সম্পত্তি পরিত্যাগ করে গৃহত্যগী হয়ে পাগলের মতো লোকনাথের চরণে লুটিয়ে পড়েন এবং নরোত্তম গুরু লাভ করেন। পরবর্তীতে লোকনাথের আদর্শ বাংলার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। রাজবাড়িতে তার অনেক ভক্তবৃন্দ রয়েছে।

রাজবাড়ির ব্যাপ্টিস্ট চার্চ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়

হযরত ঈসার জন্ম ও মৃত্যুতে যে রহস্যই থাক না কেন হযরত ঈসা এবং তাঁর প্রচারিত ধর্ম ইতিহাসের অনেকাংশ জুড়ে আছে। তাঁর আদর্শ ও ধর্মমত কেবল খ্রিস্টান জগতেই নয় সকল মানুষের জন্য তা অমূল্য সম্পদ। তৎকালীন ইহুদি সম্প্রদায় হযরত মুসার প্রকৃত শিক্ষা থেকে সরে এসে ধর্মের নানা কুংস্কারে জড়িয়ে পড়ে। মানবতার বিপরীতে অন্যায়, অসত্য, নিপীড়ন, পাপ মাথাচাড়া দেয়। এসময় মানবসেবা, সত্যপথ, মহান ঈশ্বরের প্রদর্শিত পথে শিক্ষা দিতে হযরত ঈসার জন্ম। ঈসার প্রচারিত ধর্মে মানব মুক্তির এমন আদর্শ ছিল বলেই অতিদ্রুত তা মানুষকে আকৃষ্ট করে। তাঁর অবর্তমানে জুডিও খ্রিস্টানিটি ও পোলীয় খ্রিস্টানিটি দুইভাবে বিভক্ত হয়ে পোলীয় খ্রিস্টানিটি বহুজাতি ও রোমান সম্প্রদায়ের মধ্যে দ্রুত বিস্তার লাভ করে। তৎকালীন পশ্চিম ইউরোপ জুড়ে এ ধর্মের ব্যাপকতা লক্ষ্য করা যায়। উল্লেখ্য হযরত ঈসা তৎকালীন হিব্রু ও রোমক জাতির নিকট যিশাস বা যিশুখ্রিস্ট বলে পরিচিত। মূল ধর্মগ্রন্থ তাওরাত (ইহুদিরা অনুসরণ করে) এবং ইঞ্জিল খ্রিস্টানরা অনুসরণ করে। তাওরাত ও ইঞ্জিলের মিলিত রুপ বাইবেল। তবে খ্রিস্টানরা যিশু প্রচারিত সুসমাচার সমষ্টির বাইবেলকে পবিত্র জ্ঞানে ধর্মগ্রন্থ মনে করে। লাতিন সম্প্রদায়ের প্রধান কেন্দ্র রোমে খ্রিস্টধর্মের ধর্মগুরু হলেন বিশপ। তারা পৌলপন্থী খ্রিস্টান। যিশুর শিষ্য পিটার (প্রেরিত) খ্রিস্টানমতে ছিলেন প্রথম বিশপ। পরবর্তীকালে বিশবের পরিবর্তে পোপ উপাধির সৃষ্টি হয়। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গীর্জার প্রধান পোপ বা পাদ্রী। ষোড়শ শতকে খ্রিস্টান সম্প্রদায় গীর্জাভিত্তিক ক্যাথলিক ও প্রটেস্ট্যান্ট দুইভাবে বিভক্ত হয়।

খ্রিস্টান ধর্মের বিকাশকাল থেকে পাশ্চত্য দেশেই এর ব্যাপক প্রচার প্রসার ঘটে। কেবল ষোড়শ সপ্তদশ শতকে ইউরোপীয় বণিকদের দ্বারা এশিয়ার পূর্বাঞ্চলে চার্চভিত্তিক ষোড়শ সপ্তদশ শতকে ইউরোপীয় বণিকদের দ্বারা এশিয়ার পূর্বাঞ্চলে চার্চভিত্তিক ক্যাথলিক খ্রিস্টান ধর্মের বিস্তৃতি লক্ষ করা যায়।


ইংরেজ শাসনকালে ভারতবর্ষে দরিদ্র, অসহায় বর্ণহিন্দু ও মুসলমান খ্রিস্টানধর্মে ধর্মান্তরিত হয়। খ্রিস্টান ধর্ম প্রচার প্রসারের লক্ষ্যে বিপুল পরিমানে ধমীয় প্রতিষ্ঠান গীর্জা প্রতিষ্ঠিত হয়। এ উদ্দেশ্যে রেভাঃ সাইলাস মিড এলএলবি; এসএ ১৯১১ সালে সাইলাস মিড মেমোরিয়াল চার্চ প্রতিষ্ঠা করেন। এর অবস্থান রাজবাড়ি কলেজসংলগ্ন পূর্বদিকে, পাকা সড়কের পাশে। এটি ছিল মূলত অস্টোলিয়ান মিশনারী চার্চ। সে সময় সাইলাস মিডের সঙ্গে ফাদার অব অস্টোলিয়ান মিশন ইন ইন্ডিয়া’ খ্যাত মিশনারী মিস এডিট এল কিং আগমন করেন। ১৯১১ থেকে ১৯৫৭ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে মিস ব্রাউন, মি. ও মিসেস এ্যাটেনি, মিস থ্যাকভোলেন, মিস হকবেল, মিস হরুড, মিস হেল প্রমুখ আগমন করেন। তারা ফরিদপুর, ওড়াকান্দি, গোপালপুর ইত্যাদি মিশনকে রাজবাড়ির চার্চের আওতায় দেখভাল করতেন। পাবনা আতাইকোলা, নিবাসী শ্যামসন এইচ চৌধুরী এত্র অঞ্চলের চার্চসহ ঈশরদি, চাঁদপুর, ময়মনসিংহ, কুমিল্লার মিশনসমূহকে সমন্বয় করতেন।

১৯১১ সালের চার্চ প্রতিষ্ঠার পর মিস ব্রাউন মিশনারীদের ও তার বাসের জন্য বর্তমান রাজবাড়ি সরকারি কলেজের দ্বিতল লাল ভবন (অধ্যাক্ষ ও তাঁর অফিস) প্রথম তলা নির্মাণ করেন এবং মিস ব্রাউনের রাজবংশীয় ধনিক বাবা ও মা অস্ট্রেলিয়া থেকে মেয়েকে দেখতে এসে ভবনকে দ্বিতল করেন। অবস্থিত কলেজের বিজ্ঞান ভবনের আমতলায় তখন শিশুদের জন্য একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ বিদ্যালয়ে বাঙালি সুনীতি রায় ও বসন্ত বাবু শিক্ষকতা করতেন। ১৯৫৭ সালে অস্ট্রেলিয়ান মিশনারী বাংলা ত্যাগ করে। এসময় চার্চের সকল সম্পত্তিও পরিচালনাভার ইস্ট বেঙ্গল ব্যাপ্টিস্ট সম্মিলনীর ওপর ন্যস্ত হয়। চার্চের অনুমান ২ একর ভূমি চার্চের সদস্যদের মধ্যে বন্টনের প্রস্তাব উত্থাপন হয়। এই  সময়ের মধ্যে রাজবাড়ি কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ সময় চার্চের দ্বিতল ভবনসহ ৪৭ শতক জমি সম্মিলনীর সম্পাদক শ্যামসন এইচ চৌধুরী (আতাইকোলা) নামমাত্র মূল্যে কলেজ গভর্নিং বডির নামে রেজিস্ট্রি করে দেন। বিগত সময়ে চার্চের দায়িত্ব পালন করেন সত্যরঞ্জন দে (ছায়া রানী কররের বাবা-১৯২৪), হরিচরণ (১৯২৮), আমিয়কান্ত সরকার (১৯৩০), দেবেন বাবু (১৯৩৮), বেভাঃডা. মোহনচন্দ্র হালদার (১৯৪৫-ওড়াকান্দা ও রাজবাড়ি)। মোহনচন্দ্র হালদার ময়মনসিংহ থেকে এসে রাজবাড়িতে স্থায়ী বসতি গড়ে তোলেন। তিনি ছিলেন পূর্ববাংলা ব্যাপিষ্ট সম্মিলনীয় সাধারণ সম্পাদক। তাঁর নাতি জেমস হালদার চার্চের বর্তমান দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানে রাজবাড়িতে ১৪টি পরিবার চার্চের সাথে যুক্ত আছে। অসিত, ডেভিড, বাহুত, রবিন মল্লিক, মি. কোটা মল্লিক, মি. রবার্ট, মি. লুকাস, আজিম মল্লিক চার্চের কর্মসম্পাদন কমিটিতে আছেন।