প্রাচীন ঐতিহ্য - পৃষ্ঠা নং-২

চাঁদ সওদাগর ছিলেন শিবভক্ত শৈব্য। শিবের শক্তি অসীম। শিব একক শক্তির অধিকারী। সর্পদেবী মনসাকে (পদ্মাদেবী) সে পূজা দিতে নারাজ।

হে হাতে পুজেছি আমি দেব শূলপাণি

হে হাতে পূজিব আমি বেঙ খাকী কাণী

এতে মনসা দেবী বাগান্বিত হয় এবং পুজো না দেওয়ায় প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে। ধনকুবের সওদাগর ছয়পুত্রসহ বিদেশ থেকে বাণিজ্য করে বাড়ি ফিরছিলেন। সপ্তডিঙ্গা কালীদহের সাগরে এলে মনসা দেবী কালীদহে কৃত্রিম ঝড় তোলে। এতে চাঁদের সপ্তডিঙ্গা ডুবে যায় এবং ছেলেদের সলিল সমাধি ঘটে। এরপর সওদাগরের আর এক পুত্র জন্মে। নাম লকিন্দর। লখিন্দরের বিবাহ হয় বেহুলার সাথে। কিন্তু দেবীর রোষানলে দেবীর ইশারায় বাসরঘরে লখিন্দরকে কালকুট সাপে দংশন করে। এতে লখিন্দরের মৃত্যু হয়। পতিব্রতা বেহুলা লখিন্দরকে ভেলায় নিয়ে দেবপুরীতে যায় এবং দেবকুলের অনুরোধে চাঁদ সওদাগর পদ্মাদেবীকে পূজা দিতে সম্পত হলে লখিন্দর জীবন ফিরে পায়। কাহিনীতে চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙ্গা কালীদহের সাগরে নিমজ্জিত হয়, হড়াই নদীতে নয়। কাহিনী অনুসারে হড়াই নদীতে চাঁদ সওদাগরের ডিঙ্গাডুবি নিতান্তই লোককাহিনী যাতে ইতিহাসের কোনো ভিত্তি নেই। আবার কালীদহের সাগরে মনসাদেবীর অভিশাপে সপ্তডিঙ্গার নিমজ্জন এবং ছয় পুত্রের মৃত্যু মনসা মঙ্গল কাব্যের কাহিনী। যে কাহিনী দেব-দেবীর শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠায় রচিত। কোনোটাই চাঁদ সওদাগরের ঐতিহাসিক চরিত্রের রুপায়ন নয়।

ইতিহাস চর্চায় দেখা যায় ম্যধযুগে পুণ্ড্রনগর বা বর্তমান মহাস্থানগড় প্রাচীন বরেন্দভূমির রাজধানী হিসেবে সমৃদ্ধ নগরীতে পরিণত হয়। চাঁদ সওদাগর, ধনপতি ইত্যাদি সওদাগর বণিকের নামও ইতিহাসে পাওয়া যায়। চম্পক নগর বা বর্তমানে চাঁপাই নগরের চাঁদ সওদাগর ছিলেন ধনকুবের বণিক যিনি সাগর পাড়ি দিয়ে বাণিজ্যেতে যেতেন। করতোয়া বেয়ে হড়াই, গড়াইয়ের পথ ধরে তিনি দক্ষিণের পথে যাতায়াত করতেন। চাঁদ সওদাগর বাণিজ্যপ্রেমী, ধনাঢ্য, বহুল আলোচিত ঐতিহাসিক বণিক। বিপ্রদাস পিপলাই বা বিজয় গুপ্ত এর দুশো বছর পর যখন মনসা মঙ্গল কাব্য রচনা করেন তখন ঐতিহাসিক চাঁদ সওদাগরকে নায়ক চরিত্রে দেখি আর মনসা দেবীর পূজার কাহিনীকে দেখতে হয় লোককথা হিসেবে। ‘বেহুলার বাসরঘর’--সর্প অধ্যুষিত বাংলার ধনাঢ্য বণিক চাঁদ সওদাগরের সন্তান লখিন্দর ও স্ত্রী বেহুলার বাসরঘর। কালীদহের সাগর এখনো সামান্য আয়তনের জলাধার হিসেবে বিদ্যামান। ফলে ইতিহাস আর সাহিত্যের রুপকল্পনায় চাঁদ সওদাগর সার্বিক অর্থেই ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে। ফলে খরস্রোতা হড়াই নদীতে চাঁদের বাণিজ্যের নৌকা ডুবে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক।

শ্রী ত্রৈলোক্যনাথ রাজবাড়ি জেলার অনেক ঘটনার প্রায় দেড়শত বছরের সাক্ষী। তিনি তাঁর লেখা আমার স্মৃতিকথা গ্রন্থের ১১৭ পৃষ্ঠায় চাঁদ সওদাগরের ঢিবি বিষয়ে লিখেছেন।

চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙ্গি

গোয়ালন্দ মহকুমার অন্তর্গত ইস্ট বেঙ্গল রেলপথে বেলগাছি স্টেশনের পশ্চিম দিক দিয়ে হড়াই নামে একটি নদী প্রবাহিত। উহা পদ্মানদীর শাখা নদী। পুরাকালে এটি নদী ছিল। বর্তমানে উহা শাখা নদীতে পরিণত হইয়াছে। তখনকার দিনে হড়াই নদীর দারুণ বেগবান ছিল। ঐ নদীতে চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙ্গা নিমজ্জিত হয়। এরুপ প্রবাদ লোখমুখে শ্রুত হয়। একটি ঢিবি এখনো বর্তমান আছে। কেহ জিজ্ঞাসা করিলে বর্তমান বসবাসকারী লোকেরা বলে ঐ স্থানে চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙ্গি নিমজ্জিত হইয়াছিল।

Additional information