প্রাচীন ঐতিহ্য - পৃষ্ঠা নং-৩

পাংশায় বৌদ্ধ সংঘারাম সপ্তম শাসনস্মৃতি

খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৫০০ অব্দ থেকে ৮ম শতকের পালদের শাসনকাল পর্যন্ত ভারতবর্ষ, চীন, মায়ানমার, সিংহল, তিব্বত, আফগানিস্তানসহ এশিয়ার পূর্বাঞ্চলে বৌদ্ধধর্মের ব্যাপক প্রসার ঘটে। সুদীর্ঘকাল ধর্ম শিক্ষা বিস্তার ও জ্ঞান অনুশীলনে বৌদ্ধদের অন্যতম মহাযান সম্প্রদায়ের দ্বারা সম্রাট অশোক (২৭৩ খ্রি.) ও কনিঙ্কের শাসনকালে বহু স্থানে স্তুপ, বিহার, চৈত্য, স্তম্ভ ও সংঘ গড়ে ওঠে। এ বিষয়ে উল্লেখ করা যায় যে, হর্ষবর্ধনের রাজত্বকালে ইউয়ান চোয়াং এদেশে আসেন। তিনি ৬২৯ হইতে ৬৪৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারতবর্ষে বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করেন। তার বিবরণীতে ভারতবর্ষ সম্বন্ধে অনেক তথ্য জানা যায়। ইউয়ান চোয়াং সমতট সম্বন্ধে লিখেছেন, এই স্থানে ভূমি উর্বরা, লোকসকল ক্ষুদ্রাকৃতি, কৃষ্ণকায় এবং তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন। তিনি এদেশে বহু পণ্ডিতের সমাবেশের উল্লেখ করেছেন । তিনি লিখেছেন এদেশে ৩০টিরও বেশি বৌদ্ধ সংঘরাম রয়েছে। এই ৩০টি বৌদ্ধ সংঘারাম কোথায় ছিল? এ বিষয়ে সতীশ চন্দ্র মিত্রের যশোহর-খুলনার ইতিহাসের ১৩৩ পৃষ্ঠা থেকে উদ্ধৃত হল-----চৈনিক পরিব্রাজকের উল্লেখিত ৩০টি সংঘারাম কোথায় ছিল তা নির্ণয় করা কঠিন। এ বিষয় নিয়ে কেহ এ পর্যন্ত মস্তক বিড়ম্বিত করিতে উদ্যোগী হন নাই। পুরাতত্ত্ববিদ পরেশনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় পূর্ববঙ্গের অধিকাংশ সমতটের অন্তর্ভুক্ত করিয়া লইয়া অনুমান করিয়াছেন যে, রায়পুড়া, মহেশপুর, মাঠবাড়ি, রামপাল, সুবর্ণগ্রাম, জম্বুসর, মেদিনীসার, জয়পুর, পাংশা রাজাসন, যোগীডিহি, সুমাইহা, শ্রীনগর কুমার হট্র, শৈলকুপা, তেলিগ্রাম, প্রভৃতি স্থানে বৌদ্ধ সংঘারাম ছিল।’ প্রাচীনকালে অঞ্চলটি পাল শাসনভুক্ত হয়। পালদের শাসনকালে বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার ঘটে। উল্লিখিত উদ্ধৃতিতে পাংশার নাম থাকায় পাংশায় বৌদ্ধ সংঘারামের অস্তিত্ব প্রমাণ করে।

তেঘারিয়াতে প্রাপ্ত চতুর্ভুজ বিষ্ণুমূর্তি

২০০২ সালের এপ্রিল মাসে রাজবাড়ি জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের তেঘারী গ্রামে পুস্করিণী খননকালে ১০/১২ হাত মাটির নিচে একটি চর্তুজূজ বিষ্ণুমূর্তি পাওয়া যায়। মূর্তিটি বালিয়াকান্দি থানায় ২০/২৫ দিন হেফাজতে থাকার পর ঢাকা জাদুঘর সংরক্ষিত হয়। মূর্তিটি কষ্টি পাথরের তৈরী। এর মূল্য আনুমানিক ৩ কোটি  টাকা বলে জানা যায়। এই বিষ্ণু মূর্তিটি ঐতিহাসিকভাবে সেন বংশের রাজত্বের কথা স্মরণ করায়। ইতিপূর্বে আমরা চন্দ্র বংশীয় রাজাদের শাসন স্মৃতি বিষয়ে জেনেছি। তারও পূর্বে পাল শাসন স্মৃতি হিসেবে হিউয়েন চোয়াং এর বর্ণনায় পাংশায় বৌদ্ধ সংঘারামের কথা লেখা হয়েছে। এ সময় তেঘারিতে প্রাপ্ত বিষ্ণুমূর্তি প্রাপ্তি সেন বংশের রাজত্বের চিহ্ন বহন করছে। সেন বংশের রাজত্ব শুরু হয় ১০৫০ খ্রিস্টাব্দে সামন্ত সেনের দ্বারা এবং শেষ হয় ১২০৬ মতভেদে ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজীর নিকট লক্ষণ সেনের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে। লক্ষণ সেন ১১৮৫ থেকে ১২০৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। বল্লাল সেনের পূর্ব পর্যন্ত বৌদ্ধ ধর্ম মতই দেশের প্রধান ধর্ম ছিল। বল্লাল সেনও প্রথমে এ মতের পক্ষপাতি ছিলেন। পরে তিনি তান্ত্রীক হিন্দু ধর্মে দীক্ষিত হন। লক্ষণ সেন পরম ভক্ত হিন্দু ছিলেন। পিতা পুত্রের রাজত্বকালে তাদের রাজমধ্যে তন্ত্রোক্ত দেবদেবী মূর্তি নির্মিত হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এখনো বহু স্থানে এসব মূর্তি বিদ্যামান আছে। ইতিহাস পাঠে দেখা যায় পাঠান শাসনকালে স্থান বিশেষে অত্যাচার হোক বা না হোক এসব মূর্তি পুকুরে, নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। অনেক স্মৃতি বিনষ্ট  হয়েছিল। এ সকল মূর্তির মধ্যে চতুর্ভুজ বিষ্ণুমূর্তি, গণেশমূর্তি এবং নানা জাতীয় তন্ত্রোক্ত দেবীমূর্তি। চতুর্ভুজ বাসুদেব প্রকৃতি চতুর্বিংশতি প্রকার বিষ্ণুমূর্তির মধ্যে অনেক প্রকার মূর্তি যশোর-খুলনায় দেখা যায়। সেন রাজগণের পূর্বে এ অঞ্চলে মূর্তি দ্বারা গণেশ পূজা ছিল না, যদিও ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে গণেশমূর্তি পূজা আবহমানকাল থেকে চলে আসছে। বঙ্গদেশে সেনরাজাদের সময়েই গণেশ পূজার প্রচলন হয়।

Additional information