প্রাচীন ঐতিহ্য - পৃষ্ঠা নং-৪

শঙ্খ চক্র গদাপদ্মের স্থাপনা ভেদে এই বিষ্ণুমূর্তি বিভিন্ন নামে অভিহিত। ইহার অধিকাংশ মূর্তিই পাষাণ মূর্তি। রাজবাড়িতে প্রাপ্ত বিষ্ণুমূর্তিটি লক্ষণ সেনের রাজত্বের স্মৃতিচিহ্ন বলে মনে হয়। বল্লাল সেনের সমগ্র রাজ্য পাঁচটি প্রধান ভুক্তি বা প্রদেশে বিভক্ত ছিল যথা----বঙ্গ, মিথিলা, বরেন্দ্র, রাঢ় ও বাগড়ী। এই ভুক্তিগুলি পুনরায় মণ্ডল বা মণ্ডলিকায় বিভক্ত ছিল।

মণ্ডল অতি প্রাচীন হিন্দু শব্দ। ভাগবতাদি পুরাণেও মণ্ডলের কথা আছে। মুসলিম যুগ হতে মহল বা জেলা শব্দ একই অর্থে ব্যবহার হয়ে আসছে। প্রত্যেক জেলায় জেলায় যেমন একসময় সাবডিভিশন বা মহকুমা ছিল সেন রাজত্বেও তেমনি মণ্ডলসমূহ কতগুলি বিষয় বা শাসনে বিভক্ত ছিল। এখন সম্পত্তির মালিককে ‘বিষয়ী’ বলা হয়। চন্দ্রবংশীয় শাসনকালে এ অঞ্চল কুমার তালক মণ্ডল বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। বল্লার সেনের সময়ে বঙ্গের রাজধানী ছিল বিক্রমপুরের অন্তর্গত রামপালে। যোগেন্দ্রনাথ গুপ্তের লেখা বিক্রমপুরের ইতিহাসের প্লেট-৯ এ রামপালের প্রাপ্ত বিষ্ণুমূর্তিটির যে চিত্র আছে তা তেঘরিয়াতে প্রাপ্ত বিষ্ণুমূর্তির অবিকল। এ থেকে ধারণা করা যায়, রাজবাড়ি তখন বঙ্গভুক্তির অন্তর্গত এবং রাজধানী ছিল বিক্রমপুরের রামপালে।

আড়কান্দি জাহাজ নির্মাণ কেন্দ্র

পর্যটক টাভার্নিয়ারের বর্ণনা এবং যুক্তি কল্পতরু নামক একখানী সংস্কৃতি গ্রন্থ থেকে জানা যায়, চতুর্দশ পঞ্চদশ শতকে বাংলায় বৃহৎ বৃহৎ জাহাজাকার নৌকা তৈরি হত। ইবনে বতুতার রেহেলা গ্রন্থে বঙ্গে জাহাজ শিল্পের ব্যাপক উন্নতির কথা বলা হয়েছে। বার্থেমা বিভিন্ন প্রকার নৌযান ও জাহাজের কথা বলেছেন। History of Indian Shipping গ্রন্থে রাধাকুমুদ মুখার্জি লিখেছেন-----‘ধনপতি নামক গৌড় শহরের এক হিন্দু বণিক ও তার পুত্র জাহাজে করে সমুদ্রযাত্রা করত।’ মনসা মঙ্গল কাব্যে বঙ্গে জাহাজ নির্মাণ সম্বন্ধে লিখিত আছে যে-----‘চাদ সওদাগর কুশাই নামক একজন কারিগরকে চৌদ্দখানা জাহাজ নির্মাণের আদেশ দেন।’ চাঁদ সওদাগর পুণ্ড্রের (পুণ্ড্রনগরের) সওদাগর ছিলেন। রাজবাড়ি তৎকালীন গঙ্গার মুখে হড়াই, চন্দনা, গড়াই বেগবতী নদীসমূহের কেন্দ্রস্থল বিধায় এ অঞ্চলে নৌ যোগাযোগের কারণে নৌ-শিল্প গড়ে ওঠা স্বাভাকি। ‍উল্লেখ্য রাজবাড়ি নাওয়াড়া মহল বলে পরিচিত। নাওয়াড়া মহলের কর্তা বাণীবহের নাওয়াড়া চৌধুরীদের নৌকা নির্মাণের কেন্দ্র ছিল আড়কান্দি। আড়কান্দি তখন বেগবান নদী চন্দনার পার্শ্ববর্তী বাণিজ্য কেন্দ্র (বঙ্গে রেল ভ্রমণ-১০৯)। বর্তমানে আড়কান্দির পাশে তুলশীবরাট গ্রামে নৌকা বানানোর মিস্ত্রীরা রাজবাড়ি জেলায় বিখ্যাত। নদ-নদী, খাল-বিল, জলা ভরাট হওয়ার কারণে এ অঞ্চলের নৌ-শিল্প নেই বললেই চলে।

মধুখালি ছরওয়ারজান মিয়ার ছনের চৌরি ঘর

এতদ্বঞ্চলে নানা ঐতিহ্যের মধ্যে মধুখালিতে ছরওয়ারজান মিয়ার ছনের চৌরিঘর স্মরণীয়। ইতিহাসখ্যাত গবেষক দীনেশ চন্দ্র সেন তাঁর বৃহৎ গ্রন্থে ৫৫৭ থেকে ৫৫৯ পৃষ্ঠা পর্যন্ত ঘরটির নিপুণ বর্ণনাসহ চিত্র তুলে ধরেছেন। ঘরটি এ অঞ্চলের লোকজ স্থাপত্যের দলিল। ঘরের দৈর্ঘ ৩৪’ ফুট এবং প্রস্থ ৩০’ ফুট এবং উচ্চতা ২০’ ফুট। তৎকালীন সময়ে ঘরটি তৈরিতে খরচ হয়েছিল ১২ হাজার টাকা। প্রায় পৌনে দু’শ বছর পূর্বে ছন, বাঁশ, বেত দিয়ে তৈরি ফুল, পাখি ইত্যাদির কারুকার্যময় ঘরখানির নির্মাণ বাবদ ১২ হাজার টাকা খরচের কথা ভারতে অবাক লাগে। কথিত আছে ছরওয়ারজান মিয়া বড় লোকের বাড়িতে বিবাহ করেন। স্মামীর বাড়িতে স্ত্রী খড়ো ঘরে বাস করে ভ্রুকুটি করে। স্ত্রীর কথায় ছরওয়ারজান মনে আঘাত পান। এরপর যে ঘর তিনি তৈরি করেন সে প্রসঙ্গে দীনেশ সেনের উক্তি-----‘মিয়া মনে দাগা পাইয়া তাহার জন্য এমন একখানি খড়ো ঘর তৈরি করাইলেন যাহা এখনো বহুদূর হইতে লোকে দেখিতে আসে। অথচ ছরওয়ারজান মিয়ার শ্বশুরের প্রাসাদোপম গৃহের শেষ ইষ্টকখানা এখন বিলুপ্ত হইয়াছে। খড়ো ঘরের মহিমায় লোকে এখনো মুগ্ধ হয়। এই ঘরে একটি মাত্র আলো জ্বালাইলে সমস্ত ঘরখানি ‘মিনাপাত’ এবং অভ্রে প্রতিবিম্বিত হইয়া আলোকিত হইত।

Additional information