প্রাচীন ঐতিহ্য - পৃষ্ঠা নং-৫

ঐ ঘর নির্মাতা মহিম নাকি প্রত্যেকটি জিনিষেরই পরীক্ষা করিবার জন্য একখানি রেশমি সুতা টানিয়া লইয়া যাইত। যদি সুতাটি ছিড়িয়া যাইত তাহলে বোঝা যাইত জিনিশ ভালোভাবে মসৃণ হয় নাই।’ এই ঘরটি অপূর্ব শিল্প কৌশলের নিদর্শন। ঘরটি বজ্রপাতে ভস্মিভূত হলে বাংলা ১৩৪১ সালে ২০ আষাঢ় আনন্দবাজার পত্রিকা লেখে----‘ত্রিশ হাজার টাকা মূল্যের খড়ের ঘর-----অপূর্ব শিল্পবস্তু বজ্রপাতে ভস্মিভূত। নিজস্ব সংবাদদাতা-পত্র-বালিয়াকান্দি-২ জুলাই। সংবাদ পাওয়া গিয়াছে যে ভূষণা থানার অধীন বনমালদিয়া নিবাসী জমিদার ছরওয়ারজান মিয়া সাহেবের খড়ের ঘরখানি বজ্রপাতে একেবারে ভস্মিভূত হইয়াছে।’-----বৃহৎ বঙ্গ-দীনেশচন্দ্র সেন।

পাংশা থানার যশাইতে সুলতানি আমল থেকে কাগজ উৎপাদন

প্রাচীনকালে মিশরীয়রা প্যাপিরাস বৃক্ষের ছাল থেকে কাগজ উৎপাদন করত। মিশর প্রাচীন সভ্যতার কেন্দ্র, বঙ্গে সভ্যতার শুরু অনেক পরে। প্রাচীন যুগ থেকেই বাংলায় পুণ্ড্র (মহাস্থানগর), ময়নামতিতে সভ্যতার বিকাশ ঘটে কিন্তু দক্ষিণবঙ্গে এ সভ্যতার শুরু ৬ষ্ঠ শতকে কোটালীপাড়ায়। তবে সমস্ত বাংলা সুলতানি আমল থেকেই সার্বিক  সভ্যতার সংস্পর্শে আসে। পঞ্চদশ শতাব্দীতে মাহুয়ান বাংলাদেশ ভ্রমণ করেন। তার বর্ণনা থেকে পাওয়া যায় এ দেশে লোকেরা গাছের বাকল থেকে উৎকৃষ্ট মানের কাগজ উৎপাদন করত। এ কাগজ হরিণের চামড়ার মতো মসৃণ ও উজ্জল ছিল। বর্তমান রাজবাড়ি জেলার পাংশা থানার মেঘনা যশাই ইউনিয়নে উদয়পুর, পাটকিয়াবাড়ি গ্রামে এবং পাংশা থানার বিভিন্ন অংশে ছড়ানো ২০০/৩০০ পরিবার রয়েছে যাদের উপাধি কাগজী। সাধারণ্যে তার কাগজী বলে পরিচিত। এদের কয়েকটি পরিবারের সাথে আলাপ করে জানা গেছে তাদের পূর্ব পুরুষরা বংশ পরস্পরায় কাগজ উৎপাদন করত। তাদের এই পেশা বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভ পর্যন্ত চলে। দু’একটি পরিবারে সে আমলের কাগজ তৈরির যন্ত্রপাতিও রয়েছে। কাগজীদের পূর্বপুরুষ মুসলিম শাসনামলে তৎকালীন এই উন্নত পেশায় সংশ্লিষ্ট হয়ে এলাকার মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। 

কল্যাণ দিঘি

কল্যান দীঘি রাজধরপুররাজবাড়ি শহর থেকে ছয় সাত মাইল পশ্চিমে ইসলামপুর ইউনিয়নে রাজধারপুর গ্রাম। রাজধরপুর গ্রামের পাশে কল্যাণ দিঘি। বিরাট আকারের এই দিঘি বর্তমানে সমতল বিরাট বিলে পরিণত হলেও দিঘির সীমানা নির্ধারণ কষ্টকর হয় না। অনেকের মতে দিঘিটি ১৬ খাদা জমি নিয়ে (১৬ পাখিতে ১খাদ এবং পাখি=২৫ শতাংশ) এর অবস্থান ছিল। এত বড় দিঘি এ অঞ্চলে দৃষ্ট হয় না। স্থানীয় জনগণের ধারণা কল্যাণ নামক কোনো ব্যক্তি এ দিঘি খনন করেন যে কারণে নাম হয়েছে কল্যাণ দিঘি। তৎকালীন সময়ে এ অঞ্চলে বিশুদ্ধ পানির অভাব ছিল। সে কারণে স্বতপ্রণোদিত হয়ে বড় বড় পুকুর কাটার নজির এ এলাকার মানুষের আছে। অনেকে মনে করেন মানুষ তাদের প্রয়োজনে বিনোদনের সময় সকলে মিলে দিঘিটি খনন করেছে। আর মানুষের কল্যাণে তা করা হয় বলে নাম কল্যান দিঘি।

রাজা সীতারামের পুস্করিণী

এক সময় রাজবাড়ির অঞ্চল রাজা সীতারামের শাসনভুক্ত হয়। রাজা সীতারামের শাসন স্মৃতি এখনো বহন করছে বেলগাছি স্টেশনের অদূরে মুরারীখোলা ও হাড়োয়ার মধ্যস্থলে একটি হাজামজা পুষ্করিণী। এটাকে রাজা সীতারামের পুকুর বলে। রাজা সীতারামের অনেক কীর্তির মধ্যে দিঘি ও পুষ্করিণী খনন কাজ ছিল একটি। রাজা যখন প্রজা দর্শনে বের হতেন তার সাথে একদল কোরাদার থাকত। কোথা্ও জলকষ্ট দেখতে পেলে সেখানে তাৎক্ষণিক পুকুর খননের কাজে লেগে যেত। কথিত আছে সীতারাম একদিন কোরাদারসহ ঐ স্থান দিয়ে যাচ্ছিলেন। একজন বৃদ্ধা কেঁদে বলে ‘বাবা জল বিনা আমার ছাগল মারা যায়।’ সীতারাম শুনে বললেন, ‘বটে। এখনি তোমার ছাগলের জন্য ব্যবস্থা করে দিতেছি।’ সীতারামের কোরাদার দল তাৎক্ষণিক পুকুর কেটে দিলেন।

Additional information