প্রাচীন ঐতিহ্য - পৃষ্ঠা নং-৬

বাণীবহে পুরাতন মন্দির

রাজবাড়ি রেলস্টেশন থেকে ৫ মাইল দক্ষিণে বাণীবহ ঐতিহ্যবাহী গ্রাম। এ গ্রামের সাথে জেলার প্রাচীন ইতিহাস জড়িত। রাজা সংগ্রাম শাহের বংশধরেরা নাওয়াড়া চৌধুরী বলে পরিচতি। সম্রাট শাজাহানের রাজত্বকালে চৌধুরীদের পূর্ব পুরুষ যুদ্ধের জন্য নৌকা (স্থানীয় ভাষায় নাও) সরবরাহ করতেন। নাওয়াড়া চৌধরীরা আগ্রা থেকে মিস্ত্রি এনে বাণীবহে একটি সুদৃশ্য মন্দির নির্মাণ করেন। মন্দিরটি সম্রাট শাহজাহানের সময় নির্মিত হয়। ৩০০ বছরেও এর কারুকাজ অটুট ছিল। মন্দিরটি ছিল উন্নত শিল্প মানের মন্দিরটি ১৯৬০ এর দশকে ভগ্ন অবস্থায় ছিল। এখন ভগ্নাবশেষটুকুও নাই। কালের স্রোতে ইতিহাসের উপাদান হারিয়ে যায়।

বেলগাছিতে শ্রীচৈতন্য দেবের মন্দির

আনন্দনাথ রায় সাহিত্য শেখর রচিত ফরিদপুরের ইতিহাস গ্রন্থের পৃষ্টা নং২৭ ‘বেলগাছিতে প্রতিষ্ঠিত চৈতন্য দেবের মন্দির অতি প্রাচীন। কেহ কেহ বলেন ইহা শ্রী চৈতন্যদেবের সমসাময়িক । মহাপ্রভুর মূর্তি নিম্বকাষ্ঠের নির্মিত। মন্দিরের গায়ে নানাবিধ প্রতিমূর্তি আছে।’ মন্দিরটি এখনো বিদ্যামান আছে। শ্রী চৈতন্য নিমাই, গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু বলে পরিচিত। প্রতিবছর এখানে মাঘী পূর্ণিমায় গৌরাঙ্গ মহা প্রভুর উদ্দেশ্যে অর্ঘ নিবেদিত হয় এবং মেলা বসে।

শ্রী চৈতন্য বৈষ্ণব ধর্মের প্রবক্তা বলে পরিচিত। তবে হিন্দু ধর্মে বৈষ্ণব তত্ত্ব প্রাচীনকাল থেকেই এর পরিচিতি ছিল। তত্ত্বটি ভক্তিবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত। রাধা কৃষ্ণের প্রেমেই সে ভক্তিবাদের মূল ভিত্তি। রাধাকৃষ্ণ প্রেম বিভোর শাশ্বত সত্যের প্রতি ভাগবৎ প্রেম শ্রী চৈতন্যের মতো ও পথ। তুলনামূলক আবেগ অতিমাত্রিক ঘনীভূত হয় ভক্তের প্রাণে। শ্রী চৈতন্যের এ ভাবটি বৈষ্ণব ধর্মকে নবসংস্কারে রুপদান করে। এ কারণেই গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু আরাধ্য ও অনুসরণীয়।

শ্রী চৈতন্যদেব ১৪৮৬ সালে ১৮ ফেব্রয়ারি নবদ্বীপে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর আদি নিবাস সিলেট। পিতৃ প্রদত্ত নাম বিশ্বম্ভর। সন্ন্যাস গ্রহণের পর শ্রী চৈতন্য নামে পরিচিত হন। তাঁর পিতার নাম জগন্নাথ মিত্র। মাতার নাম শচী দেবী। গঙ্গাদাস পণ্ডিতের টোলে তিনি ব্যাকরণ, কাব্য, দর্শন ও অলঙ্কার শাস্ত্র অধ্যায়ন করেন। শিক্ষা সমাপনের পর নিজ বাড়িতে টোল খুলে অধ্যাপনা শুরু করেন। লক্ষী দেবীর সঙ্গে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। পিতার মৃত্যুর (১৫০২) পর তিনি আর্থিক সঙ্কটে পড়েন এবং পিতৃবংশের সম্পত্তির খোঁজে সিলেট গমন করেন। তিনি সিলেট থাকাকালীন সর্প দংশনে স্ত্রী লক্ষীদেবীর মৃত্যু হয়। এর পর মাতার অনুরোধে দ্বিতীয়বার বিষ্ণুপ্রিয়াকে বিবাহ করেন। তাঁর বিদ্যার কথা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তেইশ বছর বয়সে পিতৃপিণ্ডের জন্য গয়ায় গমন করেন এবং সেখানে বৈষ্ণব ভক্ত ঈম্বরপুরীর নিকট গোপাল মন্ত্রে দীক্ষাগ্রহণ করেন। দীক্ষাগ্রহণের পর তাঁর মনে প্রবল ভক্তির ভাবাবেগের উদয় হয়। অধ্যাপনা ছেড়ে দিয়ে নিজে নাম সংকীর্তন করতে ও অপরকে করাতে লাগলেন। এরপর নবদ্বীপের ঘরে ঘরে ------‘হরে কৃষ্ণ, হরে কৃষ্ণ,কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে, হরে রাম হরে হরে, রাম রাম হরে হরে’-----সংকীর্তন শুরু হয়। কৃষ্ণ প্রেমের বন্যায় যেন সব ভেসে যায়। সে এক অপার দৃশ্য। শান্তিপুর, নদীয়ায় বৈষ্ণব ভক্তদের ভক্তি আরাধনায় যেন ডুবু ডুবু। চারিদিকে জয় জয়কার। কেশব নামক একজন আচার্যের নিকট দীক্ষাগ্রহণ করেন। কেশব ভারতী তার নাম রাখেন শ্রী কৃষ্ণ চৈতন্য। তিনি বৈষ্ণব মতের অধিকারী হয়ে এ মতো সর্বত্র প্রচারে ব্রতী হন। তিনি অরণ্য পথে কাঁশী, প্রয়োগ, মথুরা, বৃন্দাবন ভ্রমণ করেন। এরপর তিনি নদীয়ায় আসেন। হিন্দু ধর্মে প্রাচীন কাল থেকে, বর্ণাক্রম চলে আসছিল। ধর্মে মানুষের সাথে মানুষের বিভাজনের ফলে মানসিকতা লোপ পায়। অন্যদিকে ইসলামের উদার নীতির ফলে ভারতবর্ষে পঞ্চাশ শতকে দলে দলে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। এ সময় হিন্দুধর্মের সংস্কারমূলক বৈষ্ণব ধর্ম হিন্দু ধর্মকে অনেক নিরাপদ করে। বৈষ্ণব তত্ত্বকে অবলম্বন করে অনেকে রচনা করেন বৈষ্ণব পদাবলী। চৈতন্যদেব ভক্তদের মতে তিনি কৃষ্ণের অবতার তবে তাঁর দেহকান্তি ও আচরণ বিরহিনী রাধার মতো তাই তাঁর বিগ্রহ রাধাকৃষ্ণের আদলে গঠিত।

Additional information