প্রাচীন ঐতিহ্য - পৃষ্ঠা নং-৭

 

রাজবাড়ি জেলার সন্নিকট তৎকালীন নদীয়া। ফলে শ্রী চৈতন্যের অনুসারী বৈষ্ণব ভক্তদের প্রসার ঘটে। জেলার বেলগাছি, কালুখালি ও পাংশায় অনেক বৈষ্ণব ভক্ত রয়েছে। কাল প্রবাহে শ্রী চৈতন্যের বৈষ্ণব ধারা হিন্দু ধর্মে লীন হয়ে গেছে। মন্দিরে দুটি কষ্টি পাথরের কৃষ্ণ মুর্তি ছিল যা ১৯৮০ সালে চুরি হয়ে যায়। ২০০৩ সালে ঢাকা প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ মন্দিরটির বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে। মন্দিরের স্মৃতি সংরক্ষণ প্রয়োজন।

হাড়োয়ায় মদনমোহন জিউর

কালুখালি এবং বেলগাছি রেলস্টেশনের মাঝামাঝি হাড়োয়া গ্রাম। এ গ্রামে অবস্থিত জাগ্রত দেবতা মদনমোহন জিউর। সাধারণ্যে স্থানটি মদনমোহন আঙিনা বলে পরিচিত। মদনমোহন আঙিনা, বিগ্রহ ও মন্দির বিষয়ে যে ইতিহাস পাই তা হলো-----‘এতদ্ভিন্ন বেলগাছি স্টেশনের নিকট হাড়োয় গ্রামের মদনমোহন মন্দির। বেলগাছি পরগনা পূর্বে নাটোর রাজ স্টেটের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

ইহা কেহ কেহ অনুমান করেন উক্ত মন্দির এবং বিগ্রহ নাটোর রাজবংশেরই একটা কীর্তি। এই মন্দিরাধিষ্ঠিত ‘মদনমোহন’ অতিসুন্দর ত্রিভুজ মুর্তি প্রস্তর নির্মিত দেড় হাত উচ্চ। মন্দিরের ব্যয় নির্বাহের জন্য প্রচুর দেবোত্তর ভূমি প্রদত্ত হইয়াছে।’ (ফরিদপুরের ইতিহাস, আনন্দনাথ রায় পৃষ্ঠা-২৭)। তবে মন্দিরের পরিচালক শ্রী গোপাল গোস্বামী যিনি মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা বলে দাবি করেন বাণীকণ্ঠকে এবং মদনমোহন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিশেষ কাহিনী বর্ণনা করেন। এ কাহিনীটি মদনমোহন বিষয়ে অত্র অঞ্চলের মানুষের প্রচলিত বিশ্বাস। গোপাল গোস্বামীর পূর্ব পুরুষ বাণীকণ্ঠ ছিলেন ব্রাহ্মণ ঘরের সন্তান। কোনো এক শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে ভুল মন্ত্র পাঠ হচ্ছিল শ্রবণ করে পিতার নিষেধ সত্ত্বেও বাণীবণ্ঠ মন্ত্র শুদ্ধ করে দেন। বাণীকণ্ঠের পিতা তা জানতে পারলে তিনি বাণীকণ্ঠকে ত্যাজ্যপুত্র করেন। এতে মনের দুঃখে বাণীকণ্ঠ পদ্মার অথৈ জলে আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে নদীতে ঝাঁপ দেন। কিন্তু নদীর পানি তার হাঁটু সমান হয়ে পড়ে। তিনি যত গভীরতার দিকে অগ্রসর হন না কেন পানি হাঁটু সমানই থাকে। আত্মবির্সজনের প্রবল ইচ্ছা পূরণে তিনি কলস গলায় বেঁধে নেন। আত্মাহত্যায় উদ্যত হওয়ার কালে দৈব কণ্ঠ শুনতে পান বাণী তুমি ফিরে এসো। তুমি তো আমার নাম প্রচার করবে। তুমি মানুষের সেবায় নিয়োজিত হবে। এরপরই গভীর পানি থেকে উঠে আসে মদনমোহন। মদনমোহন তাকে নিকটস্থ বাঁশঝাড় থেকে স্ত্রী রাধারানীকে তুলে আনতে বলে। মদনমোহনের স্ত্রী মদনমোহন থেকে কিছুটা উঁচু ছিল। এ কারণে স্ত্রীর সাথে মদনমোহন কথা বলতে সংকোচ বোধ করলে রাধারানী স্বেচ্ছায় ক্ষুদ্র হতে হতে মদনের পায়ের সাথে মিশে যায়।এটি একটি পাথরে পরিণত হলে উক্ত পাথরে মদনমোহন ভেসে বাণীকণ্ঠের নিকট আসে। বাণীকণ্ঠ মদনমোহনকে তুলে এনে যথাস্থানে সংস্থাপন করেন। সেখানেই প্রায় পাঁচশত বছর পূর্বে গড়ে ওঠে এ আঙিনা। ইতিহাসের সূত্রের সাথে কাহিনীর সত্যতা অনেক ক্ষেত্রে যাচাই করা সম্ভব আবার ক্ষেত্রবিশেষে কাহিনীর সাথে ইতিহাসের তথ্য তত্ত্ব মেলে না। ধর্মের ক্ষেত্রে ভারতবর্ষে হিন্দু-বৌদ্ধ, হিন্দু-মুসলমান, মুসলমান-বৌদ্ধ সংঘর্ষ ও বিরুপতায় মন্দির, মসজিদ প্যাগোডা, সংঘ, মূর্তি, বিগ্রহ ধবংশের ও নির্মাণের ইতিহাস রয়েছে। খিলজি ও তার পরবর্তী শাসকরা হিন্দুদের মন্দির আক্রমণ করেছিলেন। মন্দিরের দেবদেবী মূর্তি ভেঙ্গে নিজেদের ক্ষমতার চুড়ান্ত প্রয়াস শাসকদরে উদ্দেশ্য ছিল। আবার অনেকে কট্রর ধর্মীয় মনোভাবের জন্যও একাজ করেছিলেন। এ বিষয়ে কালাপাহাড় ইতিহাসের এক অধ্যায় বলা চলে। ষোল শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগে মুসলমান সৈন্যরা কালাপাহাড়ের নেতৃত্বে জাজপুর মন্দির লুট ও ধবংস করে। তার পূর্বেও দুই শতাব্দী ধরে মন্দির ধবংস, বিগ্রহ ধবংস ভাংচুর, নদী পুকুর, জলাশয়ে নিক্ষেপের ইতিহাস রয়েছে। কালাপাহাড় কেবল জাজপুর নয়, বঙ্গে তৎকালীন ফতেহবাদ, ভূষণাতেও এ কাজ করেন। কালাপাহাড় ওরফে রাজু ছিলেন ব্রাহ্মণ সন্তান। তিনি অভিজাত মুসলিম পরিবারে বিবাহ করেন। এর ফলে তার পরিবার সমাজচ্যুত হয়। জেদের বসে তিনি হিন্দুদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেন। তিনি ছিলেন সুলেমান ও দাউদ কাররানীর সেনাপতি। ১৫৬৮ সালে তিনি পুরী আক্রমণ করে জগন্নাথের মন্দির ধবংস করেন। জানা যায় জগন্নাথের মূর্তি সাগরে নিক্ষেপ করেছিলেন। তার সৈন্যরা সাতশত দেবদেবীর মূর্তি ধবংস করেছিল। হিন্দু সমাজে তিনি কালাপাহাড় নামে পরিচিত হন।

Additional information