প্রাচীন ঐতিহ্য - পৃষ্ঠা নং-৮

সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে ১৫৮৩ সালে ফতেহবাদ পাঠান শাসনকর্তা মাসুম খান ও কতুল খান বিদ্রোহ ঘোষণা করলে কান-ই আজম বাদশাহের পক্ষ থেকে বিদ্রোহ দমনে তৎপর হন। কালীগঙ্গার তীরে উভয়ে একমাস যুদ্ধের পর মোগল পক্ষ জয়লাভ করে। এসময় ফতেহবাদের কাজীদাদা অনেকগুলি যুদ্ধ জাহাজ ও কামান বন্দুক নিয়ে বিদ্রোহীদের সাহায্যে অগ্রগামী হন। কিন্তু কাজীদাদা যুদ্ধে নিহত হন। এদিকে মাসুম খানের আদেশে কালাপাহাড় কাজীদাদা অধীনস্থ সৈন্যের নায়ক পদে নিযুক্ত হন (ইলিয়ট কর্তৃক আকবরনাম পৃষ্ঠা-৬৭)। এ বিষয়ে আনন্দনাথ লিখেছেন ‘পূববঙ্গে বহু প্রস্তর নির্মিত দেব মুর্তি ভগ্নাবস্থায় দৃষ্ট হয়। উহাদের মধ্যে কাহারও নাসিকা কাহারও বা কর্ণ, মুণ্ডু ইত্যাদি ভগ্ন দেখা যায়। তাহা কালাপাহাড়ের কুকীর্তি বলে জানা যায়। সম্ভবত এই সময়েই ফতেহবাদের আধিপত্য লাভ করিয়া কালাপাহাড় এই কুকর্মের অবতারনা করেন’ (ফরিদপুরের ইতিহাস, আনন্দনাথ রায়, পৃষ্ঠা-৭৫)।

বঙ্গে এরুপ মূর্তি যত্রতত্র পাওয়া যেত। মোগল শাসনকালের শেষে এবং বৃটিশ শাসনকালের প্রথমে মুসলিম প্রাধান্য লোপ পায় এবং হিন্দু প্রাধন্য বাড়তে থাকে। ফলে এ সময়কালে হিন্দু মন্দির, মূর্তি, বিগ্রহ, দেবতা প্রতিষ্ঠা কাজের দ্রুত বিস্তার ঘটে। মদনমোহন দেবতা ব্রাহ্মণ্য আনুকূল্যে বাণীকণ্ঠ পদ্মায় ফেলে দেওয়া মূর্তিটির সন্ধান পান এবং হাড়োয়াতে তা সংস্থাপন করেন। পরে নাটোর রাজ ব্রাহ্মণ্য পালনে প্রচুর ভূমি দেবোত্তর হিসেবে আঙিনার নামে লিখে দেন। মন্দিরটির নিয়মকানুন কঠোর। পুরোহিতগণ বাণীকণ্ঠের বংশ পরস্পরায় নিয়োজিত হন।

পুরুষ ব্যাতিত বংশের কোনো স্ত্রীলোকের প্রবেশাধিকার নেই্ পুরোহিতগণ প্রতিবারই নদীতে স্নান করে মন্দিরে প্রবেশ করেন। চারবেলা মন্দিরে ভোগ বিতরণ হয়। ভোগের নিয়ম সোয়া পাঁচ সের চাউল। কিন্তু ভক্তবৃন্দের সহায়তায় ২/৪ মণের বেশি ভোগ বিতরণ হয় প্রতিদিন। ধর্ম পালনকারী ভক্তদের জন্য রাজবাড়িতে আঙিনাটি অপূর্ব এক মিলন ক্ষেত্র।

মদনমোহনের পরিচিতি

অতিপ্রাচীন যুগ হইতে বৃন্দাবন বিশাল অরণ্যই ছিল, সেখানে মুনিঋষিদের তপোবন ছিল। বৃন্দাবন ব্রজমণ্ডল বা পুরাতন শুরসেন রাজ্যের অন্তর্গত। মধুদৈত্যের নির্মিত মধুপুরেরই পরবর্তী নাম মথুরা্ শুরসেন বংশীয় যাদবগণ মথুরার অধিবাসী ছিলেন। সেই যাদবকুলে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব হয় এবং বৃন্দাবনে তাহার মধুর লীলা প্রকাশিত হওয়ায় উহা পুণ্যতীর্থে পরিণত হইয়াছিল। অর্জুন পৌত্র মহারাজ পরিক্ষিৎ যখন ইন্দ্রপ্রস্থের সম্রাট তখন তিনি শ্রী কৃষ্ণের প্রোপৌত্র বজ্রনাভকে ব্রজমণ্ডলের রাজাসনে প্রতিষ্ঠিত করেন। ব্রজনাভই প্রপিতামহের স্মৃতিপূজার জন্য মদনমোহন গোবিন্দ প্রভৃতি শ্রীবিগ্রহের সৃষ্টি ও মেরামত করেন।

খানখানাপুর অন্নপুণ্যের মন্দির

দক্ষিণবঙ্গের দ্বারপথ দৌলতদিয়া থেকে মাইল সাতেক দক্ষিণে এশিয়ান হাইয়ের পশ্চিমে অবস্থিত খানখানাপুরে দেবী অন্নপূণ্যার মন্দির এ জেলার প্রাচীন ঐতিহ্যের নিদর্শন। অনেক দেবদেবীর মধ্যে মান অন্নূন্য অন্নের দেবী। ‘গোলাভরা ধান, গোয়ালভরা গরু আর পুকুর ভরা মাছ’ বাংলার সুখ সমৃদ্ধির বিষয়ে এমন গাথা থাকলেও দুর্ভিক্ষ আর নিরন্ন মানুষের ইতিহাসও আছে। লক্ষীর দেবী অন্নপূণ্যা বিদ্যার দেবী স্বরস্বতী। ইহলোক জীবনের প্রয়োজনবোধ তাদের পূজা আরাধনা বঙ্গের হিন্দু ধর্মালম্বীরা করে আসছে। জানা যায় বঙ্গের অন্যতম স্বাধীনচেতা ভূঁইয়া রাজ পরম বিক্রমশালী রাজা প্রতাপাদিত্যের (১৫৯৯) সময় থেকে অন্নপূণ্যার নামে দেবোত্তর ভূমিদানের প্রচলন শুরু হয়। ভূষণার জমিদার ছত্রাজীতের পতনের পর ভূষণার কিয়দংশ বিশেষ করে বর্তমান রাজবাড়ি তার দখলে আসে।

Additional information