প্রাচীন ঐতিহ্য

প্রাচীন ঐতিহ্য

চাঁদ সওদাগরের ঢিবি

বেলগাছি রেলস্টেশন থেকে ৬/৭ কিঃমিঃ দক্ষিণ দিয়ে হড়াই নদী, এখন হড়াই খাল হয়ে ক্ষীণ ধারায় পূর্ব মুখে প্রবাহিত। রাজবাড়ি-কুষ্টিয়ার মহাসড়কে হড়াই খালের উপর বেইলী ব্রিজ। ব্রিজের সন্নিকটে ভবানীপুর গ্রামের পাশে হড়াই তীরে ৩০ থেকে ৪০ গজ একটি উঁচু ঢিবি। লোকে বলে এটা চাঁদ সওদাগরের ঢিবি। চাঁদ সওদাগরকে নিয়ে অত্র এলাকায় একটি প্রবাদ শোনা যায়-----

সব নদী খান খান

হড়াই নদী সাবধান

মঙ্গলকাব্যের নায়ক চাঁদ সওদাগর প্রাচীন ইতিহাসেরও নায়ক। তৎকালীন সময় বাংলার প্রাচুর্য়ের কথা ইউয়ান চোয়াং, ইবনে বতুতা, বার্নিয়ের, টাভার্নার কর্তৃক বিবৃত হয়েছে। ইবনে বতুতা বাংলাকে বলেছেন, প্রাচুর্যের দোজখ। শস্যশ্যামল বাংলায় প্রাচুর্য ছিল কিন্ত অতিরিক্ত গরম এবং রোগব্যাধির কারণে তিনি এমন মন্তব্য করেছিলেন।

চাঁদ সওদাগর (কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে একাদশ শতাব্দীর সেন শাসনামলে , কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে চতুর্দশ শতকে সুলতানি শাসনকালে) তার সপ্তডিঙ্গা মধুকরে প্রাচুর্যের দেশের পসার ভর্তি করে শ্যাম (থাইল্যান্ড, মালয় (মালয়েশিয়া) লঙ্কা (শ্রীলঙ্কা), জাভা (ইন্দোনেশিয়া) ইত্যাদি সমুদ্রপাড়ের দেশে বাণিজ্যতে যেতেন। মহাস্থানগড় থেকে সে সব দেশে যাওয়ার পাথ ছিল করতোয়া, হড়াই, গড়াই, কুমার ইত্যাদি। সে সময় পদ্মার প্রবাহ ছিল না। গঙ্গার স্রোত এসব নদী দিয়ে সাগর মুখে ধাবমান ছিল। এ অঞ্চলের সকল নদীর মধ্যে হড়াই ছিল বেশি খরস্রোতা ও ভয়াল। এ কারণে নাকি চাঁদ সওদাগরের মা তাকে হড়াই নদীকে উদ্দেশ্য করে সাবধান করেছিল। কিন্তু বিধি বাম। সেই হড়াই নদীর স্রোতের বাঁকে চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙ্গার (বৃহৎ নৌকা) মধ্যে ৪/৫টি ডুবে যায়। দীর্ঘদিন নৌকাগুলোর সাথে পলি জমে স্তুপাকার ঢিবি আকার ধারণ করে। ঘটনার প্রবাহে গঙ্গার মুখের জলধারার পথের পরিবর্তন ঘটে। পদ্মা, ইছামতি, আড়িয়াল হয়ে ওঠে বেগবান। গঙ্গা যমুনার জলরাশি পদ্মা মেঘনা দিয়ে প্রবাহিত হয়। হড়াই, গড়াই, কুমার মাথাভাঙ্গার ধারা ক্ষীণ হয়ে ওঠে। কিন্তু ঘটনার সাক্ষী হয়ে থাকে চাঁদ সওদাগরের ঢিবি। চাঁদ সওদাগর কি বিপ্রদাস পিপলাই (১৪৯৫-৯৬) বা বিজয়গুপ্ত (১৪৮৪) রচিত মনসা মঙ্গল কাব্যের কল্পনার নায়ক? নাকি ঐতিহাসিক চরিত্র? খাঁটি বাংলা ভাষা ব্যবহারে সাহিত্য বিকাশের মধ্যে চর্যাপদ, শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন, মঙ্গলকাব্য ইত্যাদি রচনার ধারা লক্ষ্য করা যায়। এরমধ্যে মঙ্গলকাব্যসমূহের প্রেমের কাহিনীর বদলে দেব দেবীর মাহাত্ম তুলে ধরা হয়েছে।

মনসা মঙ্গলকাব্যে দেখানো হয়েছে শৈব্যধর্মে বিশ্বাসী হলেও চাঁদ সওদাগর কীভাবে সাপের দেবী মনসার পূজা করতে বাধ্য হন। চাঁদ সওদাগর ও তার পুত্র লখিন্দর, পুত্রবধু বেহুলা ও মনসা দেবীকে কেন্দ্র করে কাহিনীর বিন্যাস। অত্র অঞ্চলে কাহিনীটি ‘ভাষান যাত্রা’ বলে পরিচিত। রাজবাড়িতে বিগত শতকে বহু ভাসান যাত্রা দল গড়ে ওঠে এবং গ্রামে গ্রামে সে সব পালাগান অনুষ্ঠিত হত।

বর্তমান বগুড়া শহরের অনতিদূরে ‘মহাস্থানগড়’ প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক সমৃদ্ধ স্থান। প্রাচীন বরেন্দ্রভূমির রাজধানী পুণ্ড্রনগর বা গৌড়, মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন রাজাদের শাসনস্মৃতি বিজড়িত মহাস্থানগড়। বগুড়া শহর থেকে ১০ কিমি উত্তরে মহাস্থানগড় ঐতিহাসিক ভিত্তিভূমি। এরপূর্বে করতোয়া নদী, পশ্চিমে মহানন্দা। বৌদ্ধ বিহার, মুর্তি, বেহুলার বাসর ঘর, শীলাদেবীর ঘাট, জিয়ৎ কুণ্ডু, কালীদহ সাগর, সুলতান সাহেবের (মাহসওয়ার) মাজার, বোরহান উদ্দিন (রাঃ) এর মাজার, পদ্মাদেবীর নানা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রয়েছে। এখনো খনন কাজ চলছে। মহাস্তানগড় হতে দক্ষিণ পশ্চিমে এবং বেহুলার বাসরঘর হতে প্রায় ২ কিমি পশ্চিমে চাঁদ সওদাগরের বাড়ি চম্পক নগর। বর্তমানে চাপাইনগর বলে অবস্থিত স্থানে এর ধবংসাবশেষ বিদ্যামান রয়েছে।


চাঁদ সওদাগর ছিলেন শিবভক্ত শৈব্য। শিবের শক্তি অসীম। শিব একক শক্তির অধিকারী। সর্পদেবী মনসাকে (পদ্মাদেবী) সে পূজা দিতে নারাজ।

হে হাতে পুজেছি আমি দেব শূলপাণি

হে হাতে পূজিব আমি বেঙ খাকী কাণী

এতে মনসা দেবী বাগান্বিত হয় এবং পুজো না দেওয়ায় প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে। ধনকুবের সওদাগর ছয়পুত্রসহ বিদেশ থেকে বাণিজ্য করে বাড়ি ফিরছিলেন। সপ্তডিঙ্গা কালীদহের সাগরে এলে মনসা দেবী কালীদহে কৃত্রিম ঝড় তোলে। এতে চাঁদের সপ্তডিঙ্গা ডুবে যায় এবং ছেলেদের সলিল সমাধি ঘটে। এরপর সওদাগরের আর এক পুত্র জন্মে। নাম লকিন্দর। লখিন্দরের বিবাহ হয় বেহুলার সাথে। কিন্তু দেবীর রোষানলে দেবীর ইশারায় বাসরঘরে লখিন্দরকে কালকুট সাপে দংশন করে। এতে লখিন্দরের মৃত্যু হয়। পতিব্রতা বেহুলা লখিন্দরকে ভেলায় নিয়ে দেবপুরীতে যায় এবং দেবকুলের অনুরোধে চাঁদ সওদাগর পদ্মাদেবীকে পূজা দিতে সম্পত হলে লখিন্দর জীবন ফিরে পায়। কাহিনীতে চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙ্গা কালীদহের সাগরে নিমজ্জিত হয়, হড়াই নদীতে নয়। কাহিনী অনুসারে হড়াই নদীতে চাঁদ সওদাগরের ডিঙ্গাডুবি নিতান্তই লোককাহিনী যাতে ইতিহাসের কোনো ভিত্তি নেই। আবার কালীদহের সাগরে মনসাদেবীর অভিশাপে সপ্তডিঙ্গার নিমজ্জন এবং ছয় পুত্রের মৃত্যু মনসা মঙ্গল কাব্যের কাহিনী। যে কাহিনী দেব-দেবীর শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠায় রচিত। কোনোটাই চাঁদ সওদাগরের ঐতিহাসিক চরিত্রের রুপায়ন নয়।

ইতিহাস চর্চায় দেখা যায় ম্যধযুগে পুণ্ড্রনগর বা বর্তমান মহাস্থানগড় প্রাচীন বরেন্দভূমির রাজধানী হিসেবে সমৃদ্ধ নগরীতে পরিণত হয়। চাঁদ সওদাগর, ধনপতি ইত্যাদি সওদাগর বণিকের নামও ইতিহাসে পাওয়া যায়। চম্পক নগর বা বর্তমানে চাঁপাই নগরের চাঁদ সওদাগর ছিলেন ধনকুবের বণিক যিনি সাগর পাড়ি দিয়ে বাণিজ্যেতে যেতেন। করতোয়া বেয়ে হড়াই, গড়াইয়ের পথ ধরে তিনি দক্ষিণের পথে যাতায়াত করতেন। চাঁদ সওদাগর বাণিজ্যপ্রেমী, ধনাঢ্য, বহুল আলোচিত ঐতিহাসিক বণিক। বিপ্রদাস পিপলাই বা বিজয় গুপ্ত এর দুশো বছর পর যখন মনসা মঙ্গল কাব্য রচনা করেন তখন ঐতিহাসিক চাঁদ সওদাগরকে নায়ক চরিত্রে দেখি আর মনসা দেবীর পূজার কাহিনীকে দেখতে হয় লোককথা হিসেবে। ‘বেহুলার বাসরঘর’--সর্প অধ্যুষিত বাংলার ধনাঢ্য বণিক চাঁদ সওদাগরের সন্তান লখিন্দর ও স্ত্রী বেহুলার বাসরঘর। কালীদহের সাগর এখনো সামান্য আয়তনের জলাধার হিসেবে বিদ্যামান। ফলে ইতিহাস আর সাহিত্যের রুপকল্পনায় চাঁদ সওদাগর সার্বিক অর্থেই ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে। ফলে খরস্রোতা হড়াই নদীতে চাঁদের বাণিজ্যের নৌকা ডুবে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক।

শ্রী ত্রৈলোক্যনাথ রাজবাড়ি জেলার অনেক ঘটনার প্রায় দেড়শত বছরের সাক্ষী। তিনি তাঁর লেখা আমার স্মৃতিকথা গ্রন্থের ১১৭ পৃষ্ঠায় চাঁদ সওদাগরের ঢিবি বিষয়ে লিখেছেন।

চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙ্গি

গোয়ালন্দ মহকুমার অন্তর্গত ইস্ট বেঙ্গল রেলপথে বেলগাছি স্টেশনের পশ্চিম দিক দিয়ে হড়াই নামে একটি নদী প্রবাহিত। উহা পদ্মানদীর শাখা নদী। পুরাকালে এটি নদী ছিল। বর্তমানে উহা শাখা নদীতে পরিণত হইয়াছে। তখনকার দিনে হড়াই নদীর দারুণ বেগবান ছিল। ঐ নদীতে চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙ্গা নিমজ্জিত হয়। এরুপ প্রবাদ লোখমুখে শ্রুত হয়। একটি ঢিবি এখনো বর্তমান আছে। কেহ জিজ্ঞাসা করিলে বর্তমান বসবাসকারী লোকেরা বলে ঐ স্থানে চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙ্গি নিমজ্জিত হইয়াছিল।


পাংশায় বৌদ্ধ সংঘারাম সপ্তম শাসনস্মৃতি

খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৫০০ অব্দ থেকে ৮ম শতকের পালদের শাসনকাল পর্যন্ত ভারতবর্ষ, চীন, মায়ানমার, সিংহল, তিব্বত, আফগানিস্তানসহ এশিয়ার পূর্বাঞ্চলে বৌদ্ধধর্মের ব্যাপক প্রসার ঘটে। সুদীর্ঘকাল ধর্ম শিক্ষা বিস্তার ও জ্ঞান অনুশীলনে বৌদ্ধদের অন্যতম মহাযান সম্প্রদায়ের দ্বারা সম্রাট অশোক (২৭৩ খ্রি.) ও কনিঙ্কের শাসনকালে বহু স্থানে স্তুপ, বিহার, চৈত্য, স্তম্ভ ও সংঘ গড়ে ওঠে। এ বিষয়ে উল্লেখ করা যায় যে, হর্ষবর্ধনের রাজত্বকালে ইউয়ান চোয়াং এদেশে আসেন। তিনি ৬২৯ হইতে ৬৪৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারতবর্ষে বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করেন। তার বিবরণীতে ভারতবর্ষ সম্বন্ধে অনেক তথ্য জানা যায়। ইউয়ান চোয়াং সমতট সম্বন্ধে লিখেছেন, এই স্থানে ভূমি উর্বরা, লোকসকল ক্ষুদ্রাকৃতি, কৃষ্ণকায় এবং তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন। তিনি এদেশে বহু পণ্ডিতের সমাবেশের উল্লেখ করেছেন । তিনি লিখেছেন এদেশে ৩০টিরও বেশি বৌদ্ধ সংঘরাম রয়েছে। এই ৩০টি বৌদ্ধ সংঘারাম কোথায় ছিল? এ বিষয়ে সতীশ চন্দ্র মিত্রের যশোহর-খুলনার ইতিহাসের ১৩৩ পৃষ্ঠা থেকে উদ্ধৃত হল-----চৈনিক পরিব্রাজকের উল্লেখিত ৩০টি সংঘারাম কোথায় ছিল তা নির্ণয় করা কঠিন। এ বিষয় নিয়ে কেহ এ পর্যন্ত মস্তক বিড়ম্বিত করিতে উদ্যোগী হন নাই। পুরাতত্ত্ববিদ পরেশনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় পূর্ববঙ্গের অধিকাংশ সমতটের অন্তর্ভুক্ত করিয়া লইয়া অনুমান করিয়াছেন যে, রায়পুড়া, মহেশপুর, মাঠবাড়ি, রামপাল, সুবর্ণগ্রাম, জম্বুসর, মেদিনীসার, জয়পুর, পাংশা রাজাসন, যোগীডিহি, সুমাইহা, শ্রীনগর কুমার হট্র, শৈলকুপা, তেলিগ্রাম, প্রভৃতি স্থানে বৌদ্ধ সংঘারাম ছিল।’ প্রাচীনকালে অঞ্চলটি পাল শাসনভুক্ত হয়। পালদের শাসনকালে বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার ঘটে। উল্লিখিত উদ্ধৃতিতে পাংশার নাম থাকায় পাংশায় বৌদ্ধ সংঘারামের অস্তিত্ব প্রমাণ করে।

তেঘারিয়াতে প্রাপ্ত চতুর্ভুজ বিষ্ণুমূর্তি

২০০২ সালের এপ্রিল মাসে রাজবাড়ি জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের তেঘারী গ্রামে পুস্করিণী খননকালে ১০/১২ হাত মাটির নিচে একটি চর্তুজূজ বিষ্ণুমূর্তি পাওয়া যায়। মূর্তিটি বালিয়াকান্দি থানায় ২০/২৫ দিন হেফাজতে থাকার পর ঢাকা জাদুঘর সংরক্ষিত হয়। মূর্তিটি কষ্টি পাথরের তৈরী। এর মূল্য আনুমানিক ৩ কোটি  টাকা বলে জানা যায়। এই বিষ্ণু মূর্তিটি ঐতিহাসিকভাবে সেন বংশের রাজত্বের কথা স্মরণ করায়। ইতিপূর্বে আমরা চন্দ্র বংশীয় রাজাদের শাসন স্মৃতি বিষয়ে জেনেছি। তারও পূর্বে পাল শাসন স্মৃতি হিসেবে হিউয়েন চোয়াং এর বর্ণনায় পাংশায় বৌদ্ধ সংঘারামের কথা লেখা হয়েছে। এ সময় তেঘারিতে প্রাপ্ত বিষ্ণুমূর্তি প্রাপ্তি সেন বংশের রাজত্বের চিহ্ন বহন করছে। সেন বংশের রাজত্ব শুরু হয় ১০৫০ খ্রিস্টাব্দে সামন্ত সেনের দ্বারা এবং শেষ হয় ১২০৬ মতভেদে ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজীর নিকট লক্ষণ সেনের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে। লক্ষণ সেন ১১৮৫ থেকে ১২০৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। বল্লাল সেনের পূর্ব পর্যন্ত বৌদ্ধ ধর্ম মতই দেশের প্রধান ধর্ম ছিল। বল্লাল সেনও প্রথমে এ মতের পক্ষপাতি ছিলেন। পরে তিনি তান্ত্রীক হিন্দু ধর্মে দীক্ষিত হন। লক্ষণ সেন পরম ভক্ত হিন্দু ছিলেন। পিতা পুত্রের রাজত্বকালে তাদের রাজমধ্যে তন্ত্রোক্ত দেবদেবী মূর্তি নির্মিত হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এখনো বহু স্থানে এসব মূর্তি বিদ্যামান আছে। ইতিহাস পাঠে দেখা যায় পাঠান শাসনকালে স্থান বিশেষে অত্যাচার হোক বা না হোক এসব মূর্তি পুকুরে, নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। অনেক স্মৃতি বিনষ্ট  হয়েছিল। এ সকল মূর্তির মধ্যে চতুর্ভুজ বিষ্ণুমূর্তি, গণেশমূর্তি এবং নানা জাতীয় তন্ত্রোক্ত দেবীমূর্তি। চতুর্ভুজ বাসুদেব প্রকৃতি চতুর্বিংশতি প্রকার বিষ্ণুমূর্তির মধ্যে অনেক প্রকার মূর্তি যশোর-খুলনায় দেখা যায়। সেন রাজগণের পূর্বে এ অঞ্চলে মূর্তি দ্বারা গণেশ পূজা ছিল না, যদিও ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে গণেশমূর্তি পূজা আবহমানকাল থেকে চলে আসছে। বঙ্গদেশে সেনরাজাদের সময়েই গণেশ পূজার প্রচলন হয়।


শঙ্খ চক্র গদাপদ্মের স্থাপনা ভেদে এই বিষ্ণুমূর্তি বিভিন্ন নামে অভিহিত। ইহার অধিকাংশ মূর্তিই পাষাণ মূর্তি। রাজবাড়িতে প্রাপ্ত বিষ্ণুমূর্তিটি লক্ষণ সেনের রাজত্বের স্মৃতিচিহ্ন বলে মনে হয়। বল্লাল সেনের সমগ্র রাজ্য পাঁচটি প্রধান ভুক্তি বা প্রদেশে বিভক্ত ছিল যথা----বঙ্গ, মিথিলা, বরেন্দ্র, রাঢ় ও বাগড়ী। এই ভুক্তিগুলি পুনরায় মণ্ডল বা মণ্ডলিকায় বিভক্ত ছিল।

মণ্ডল অতি প্রাচীন হিন্দু শব্দ। ভাগবতাদি পুরাণেও মণ্ডলের কথা আছে। মুসলিম যুগ হতে মহল বা জেলা শব্দ একই অর্থে ব্যবহার হয়ে আসছে। প্রত্যেক জেলায় জেলায় যেমন একসময় সাবডিভিশন বা মহকুমা ছিল সেন রাজত্বেও তেমনি মণ্ডলসমূহ কতগুলি বিষয় বা শাসনে বিভক্ত ছিল। এখন সম্পত্তির মালিককে ‘বিষয়ী’ বলা হয়। চন্দ্রবংশীয় শাসনকালে এ অঞ্চল কুমার তালক মণ্ডল বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। বল্লার সেনের সময়ে বঙ্গের রাজধানী ছিল বিক্রমপুরের অন্তর্গত রামপালে। যোগেন্দ্রনাথ গুপ্তের লেখা বিক্রমপুরের ইতিহাসের প্লেট-৯ এ রামপালের প্রাপ্ত বিষ্ণুমূর্তিটির যে চিত্র আছে তা তেঘরিয়াতে প্রাপ্ত বিষ্ণুমূর্তির অবিকল। এ থেকে ধারণা করা যায়, রাজবাড়ি তখন বঙ্গভুক্তির অন্তর্গত এবং রাজধানী ছিল বিক্রমপুরের রামপালে।

আড়কান্দি জাহাজ নির্মাণ কেন্দ্র

পর্যটক টাভার্নিয়ারের বর্ণনা এবং যুক্তি কল্পতরু নামক একখানী সংস্কৃতি গ্রন্থ থেকে জানা যায়, চতুর্দশ পঞ্চদশ শতকে বাংলায় বৃহৎ বৃহৎ জাহাজাকার নৌকা তৈরি হত। ইবনে বতুতার রেহেলা গ্রন্থে বঙ্গে জাহাজ শিল্পের ব্যাপক উন্নতির কথা বলা হয়েছে। বার্থেমা বিভিন্ন প্রকার নৌযান ও জাহাজের কথা বলেছেন। History of Indian Shipping গ্রন্থে রাধাকুমুদ মুখার্জি লিখেছেন-----‘ধনপতি নামক গৌড় শহরের এক হিন্দু বণিক ও তার পুত্র জাহাজে করে সমুদ্রযাত্রা করত।’ মনসা মঙ্গল কাব্যে বঙ্গে জাহাজ নির্মাণ সম্বন্ধে লিখিত আছে যে-----‘চাদ সওদাগর কুশাই নামক একজন কারিগরকে চৌদ্দখানা জাহাজ নির্মাণের আদেশ দেন।’ চাঁদ সওদাগর পুণ্ড্রের (পুণ্ড্রনগরের) সওদাগর ছিলেন। রাজবাড়ি তৎকালীন গঙ্গার মুখে হড়াই, চন্দনা, গড়াই বেগবতী নদীসমূহের কেন্দ্রস্থল বিধায় এ অঞ্চলে নৌ যোগাযোগের কারণে নৌ-শিল্প গড়ে ওঠা স্বাভাকি। ‍উল্লেখ্য রাজবাড়ি নাওয়াড়া মহল বলে পরিচিত। নাওয়াড়া মহলের কর্তা বাণীবহের নাওয়াড়া চৌধুরীদের নৌকা নির্মাণের কেন্দ্র ছিল আড়কান্দি। আড়কান্দি তখন বেগবান নদী চন্দনার পার্শ্ববর্তী বাণিজ্য কেন্দ্র (বঙ্গে রেল ভ্রমণ-১০৯)। বর্তমানে আড়কান্দির পাশে তুলশীবরাট গ্রামে নৌকা বানানোর মিস্ত্রীরা রাজবাড়ি জেলায় বিখ্যাত। নদ-নদী, খাল-বিল, জলা ভরাট হওয়ার কারণে এ অঞ্চলের নৌ-শিল্প নেই বললেই চলে।

মধুখালি ছরওয়ারজান মিয়ার ছনের চৌরি ঘর

এতদ্বঞ্চলে নানা ঐতিহ্যের মধ্যে মধুখালিতে ছরওয়ারজান মিয়ার ছনের চৌরিঘর স্মরণীয়। ইতিহাসখ্যাত গবেষক দীনেশ চন্দ্র সেন তাঁর বৃহৎ গ্রন্থে ৫৫৭ থেকে ৫৫৯ পৃষ্ঠা পর্যন্ত ঘরটির নিপুণ বর্ণনাসহ চিত্র তুলে ধরেছেন। ঘরটি এ অঞ্চলের লোকজ স্থাপত্যের দলিল। ঘরের দৈর্ঘ ৩৪’ ফুট এবং প্রস্থ ৩০’ ফুট এবং উচ্চতা ২০’ ফুট। তৎকালীন সময়ে ঘরটি তৈরিতে খরচ হয়েছিল ১২ হাজার টাকা। প্রায় পৌনে দু’শ বছর পূর্বে ছন, বাঁশ, বেত দিয়ে তৈরি ফুল, পাখি ইত্যাদির কারুকার্যময় ঘরখানির নির্মাণ বাবদ ১২ হাজার টাকা খরচের কথা ভারতে অবাক লাগে। কথিত আছে ছরওয়ারজান মিয়া বড় লোকের বাড়িতে বিবাহ করেন। স্মামীর বাড়িতে স্ত্রী খড়ো ঘরে বাস করে ভ্রুকুটি করে। স্ত্রীর কথায় ছরওয়ারজান মনে আঘাত পান। এরপর যে ঘর তিনি তৈরি করেন সে প্রসঙ্গে দীনেশ সেনের উক্তি-----‘মিয়া মনে দাগা পাইয়া তাহার জন্য এমন একখানি খড়ো ঘর তৈরি করাইলেন যাহা এখনো বহুদূর হইতে লোকে দেখিতে আসে। অথচ ছরওয়ারজান মিয়ার শ্বশুরের প্রাসাদোপম গৃহের শেষ ইষ্টকখানা এখন বিলুপ্ত হইয়াছে। খড়ো ঘরের মহিমায় লোকে এখনো মুগ্ধ হয়। এই ঘরে একটি মাত্র আলো জ্বালাইলে সমস্ত ঘরখানি ‘মিনাপাত’ এবং অভ্রে প্রতিবিম্বিত হইয়া আলোকিত হইত।


ঐ ঘর নির্মাতা মহিম নাকি প্রত্যেকটি জিনিষেরই পরীক্ষা করিবার জন্য একখানি রেশমি সুতা টানিয়া লইয়া যাইত। যদি সুতাটি ছিড়িয়া যাইত তাহলে বোঝা যাইত জিনিশ ভালোভাবে মসৃণ হয় নাই।’ এই ঘরটি অপূর্ব শিল্প কৌশলের নিদর্শন। ঘরটি বজ্রপাতে ভস্মিভূত হলে বাংলা ১৩৪১ সালে ২০ আষাঢ় আনন্দবাজার পত্রিকা লেখে----‘ত্রিশ হাজার টাকা মূল্যের খড়ের ঘর-----অপূর্ব শিল্পবস্তু বজ্রপাতে ভস্মিভূত। নিজস্ব সংবাদদাতা-পত্র-বালিয়াকান্দি-২ জুলাই। সংবাদ পাওয়া গিয়াছে যে ভূষণা থানার অধীন বনমালদিয়া নিবাসী জমিদার ছরওয়ারজান মিয়া সাহেবের খড়ের ঘরখানি বজ্রপাতে একেবারে ভস্মিভূত হইয়াছে।’-----বৃহৎ বঙ্গ-দীনেশচন্দ্র সেন।

পাংশা থানার যশাইতে সুলতানি আমল থেকে কাগজ উৎপাদন

প্রাচীনকালে মিশরীয়রা প্যাপিরাস বৃক্ষের ছাল থেকে কাগজ উৎপাদন করত। মিশর প্রাচীন সভ্যতার কেন্দ্র, বঙ্গে সভ্যতার শুরু অনেক পরে। প্রাচীন যুগ থেকেই বাংলায় পুণ্ড্র (মহাস্থানগর), ময়নামতিতে সভ্যতার বিকাশ ঘটে কিন্তু দক্ষিণবঙ্গে এ সভ্যতার শুরু ৬ষ্ঠ শতকে কোটালীপাড়ায়। তবে সমস্ত বাংলা সুলতানি আমল থেকেই সার্বিক  সভ্যতার সংস্পর্শে আসে। পঞ্চদশ শতাব্দীতে মাহুয়ান বাংলাদেশ ভ্রমণ করেন। তার বর্ণনা থেকে পাওয়া যায় এ দেশে লোকেরা গাছের বাকল থেকে উৎকৃষ্ট মানের কাগজ উৎপাদন করত। এ কাগজ হরিণের চামড়ার মতো মসৃণ ও উজ্জল ছিল। বর্তমান রাজবাড়ি জেলার পাংশা থানার মেঘনা যশাই ইউনিয়নে উদয়পুর, পাটকিয়াবাড়ি গ্রামে এবং পাংশা থানার বিভিন্ন অংশে ছড়ানো ২০০/৩০০ পরিবার রয়েছে যাদের উপাধি কাগজী। সাধারণ্যে তার কাগজী বলে পরিচিত। এদের কয়েকটি পরিবারের সাথে আলাপ করে জানা গেছে তাদের পূর্ব পুরুষরা বংশ পরস্পরায় কাগজ উৎপাদন করত। তাদের এই পেশা বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভ পর্যন্ত চলে। দু’একটি পরিবারে সে আমলের কাগজ তৈরির যন্ত্রপাতিও রয়েছে। কাগজীদের পূর্বপুরুষ মুসলিম শাসনামলে তৎকালীন এই উন্নত পেশায় সংশ্লিষ্ট হয়ে এলাকার মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। 

কল্যাণ দিঘি

কল্যান দীঘি রাজধরপুররাজবাড়ি শহর থেকে ছয় সাত মাইল পশ্চিমে ইসলামপুর ইউনিয়নে রাজধারপুর গ্রাম। রাজধরপুর গ্রামের পাশে কল্যাণ দিঘি। বিরাট আকারের এই দিঘি বর্তমানে সমতল বিরাট বিলে পরিণত হলেও দিঘির সীমানা নির্ধারণ কষ্টকর হয় না। অনেকের মতে দিঘিটি ১৬ খাদা জমি নিয়ে (১৬ পাখিতে ১খাদ এবং পাখি=২৫ শতাংশ) এর অবস্থান ছিল। এত বড় দিঘি এ অঞ্চলে দৃষ্ট হয় না। স্থানীয় জনগণের ধারণা কল্যাণ নামক কোনো ব্যক্তি এ দিঘি খনন করেন যে কারণে নাম হয়েছে কল্যাণ দিঘি। তৎকালীন সময়ে এ অঞ্চলে বিশুদ্ধ পানির অভাব ছিল। সে কারণে স্বতপ্রণোদিত হয়ে বড় বড় পুকুর কাটার নজির এ এলাকার মানুষের আছে। অনেকে মনে করেন মানুষ তাদের প্রয়োজনে বিনোদনের সময় সকলে মিলে দিঘিটি খনন করেছে। আর মানুষের কল্যাণে তা করা হয় বলে নাম কল্যান দিঘি।

রাজা সীতারামের পুস্করিণী

এক সময় রাজবাড়ির অঞ্চল রাজা সীতারামের শাসনভুক্ত হয়। রাজা সীতারামের শাসন স্মৃতি এখনো বহন করছে বেলগাছি স্টেশনের অদূরে মুরারীখোলা ও হাড়োয়ার মধ্যস্থলে একটি হাজামজা পুষ্করিণী। এটাকে রাজা সীতারামের পুকুর বলে। রাজা সীতারামের অনেক কীর্তির মধ্যে দিঘি ও পুষ্করিণী খনন কাজ ছিল একটি। রাজা যখন প্রজা দর্শনে বের হতেন তার সাথে একদল কোরাদার থাকত। কোথা্ও জলকষ্ট দেখতে পেলে সেখানে তাৎক্ষণিক পুকুর খননের কাজে লেগে যেত। কথিত আছে সীতারাম একদিন কোরাদারসহ ঐ স্থান দিয়ে যাচ্ছিলেন। একজন বৃদ্ধা কেঁদে বলে ‘বাবা জল বিনা আমার ছাগল মারা যায়।’ সীতারাম শুনে বললেন, ‘বটে। এখনি তোমার ছাগলের জন্য ব্যবস্থা করে দিতেছি।’ সীতারামের কোরাদার দল তাৎক্ষণিক পুকুর কেটে দিলেন।


বাণীবহে পুরাতন মন্দির

রাজবাড়ি রেলস্টেশন থেকে ৫ মাইল দক্ষিণে বাণীবহ ঐতিহ্যবাহী গ্রাম। এ গ্রামের সাথে জেলার প্রাচীন ইতিহাস জড়িত। রাজা সংগ্রাম শাহের বংশধরেরা নাওয়াড়া চৌধুরী বলে পরিচতি। সম্রাট শাজাহানের রাজত্বকালে চৌধুরীদের পূর্ব পুরুষ যুদ্ধের জন্য নৌকা (স্থানীয় ভাষায় নাও) সরবরাহ করতেন। নাওয়াড়া চৌধরীরা আগ্রা থেকে মিস্ত্রি এনে বাণীবহে একটি সুদৃশ্য মন্দির নির্মাণ করেন। মন্দিরটি সম্রাট শাহজাহানের সময় নির্মিত হয়। ৩০০ বছরেও এর কারুকাজ অটুট ছিল। মন্দিরটি ছিল উন্নত শিল্প মানের মন্দিরটি ১৯৬০ এর দশকে ভগ্ন অবস্থায় ছিল। এখন ভগ্নাবশেষটুকুও নাই। কালের স্রোতে ইতিহাসের উপাদান হারিয়ে যায়।

বেলগাছিতে শ্রীচৈতন্য দেবের মন্দির

আনন্দনাথ রায় সাহিত্য শেখর রচিত ফরিদপুরের ইতিহাস গ্রন্থের পৃষ্টা নং২৭ ‘বেলগাছিতে প্রতিষ্ঠিত চৈতন্য দেবের মন্দির অতি প্রাচীন। কেহ কেহ বলেন ইহা শ্রী চৈতন্যদেবের সমসাময়িক । মহাপ্রভুর মূর্তি নিম্বকাষ্ঠের নির্মিত। মন্দিরের গায়ে নানাবিধ প্রতিমূর্তি আছে।’ মন্দিরটি এখনো বিদ্যামান আছে। শ্রী চৈতন্য নিমাই, গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু বলে পরিচিত। প্রতিবছর এখানে মাঘী পূর্ণিমায় গৌরাঙ্গ মহা প্রভুর উদ্দেশ্যে অর্ঘ নিবেদিত হয় এবং মেলা বসে।

শ্রী চৈতন্য বৈষ্ণব ধর্মের প্রবক্তা বলে পরিচিত। তবে হিন্দু ধর্মে বৈষ্ণব তত্ত্ব প্রাচীনকাল থেকেই এর পরিচিতি ছিল। তত্ত্বটি ভক্তিবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত। রাধা কৃষ্ণের প্রেমেই সে ভক্তিবাদের মূল ভিত্তি। রাধাকৃষ্ণ প্রেম বিভোর শাশ্বত সত্যের প্রতি ভাগবৎ প্রেম শ্রী চৈতন্যের মতো ও পথ। তুলনামূলক আবেগ অতিমাত্রিক ঘনীভূত হয় ভক্তের প্রাণে। শ্রী চৈতন্যের এ ভাবটি বৈষ্ণব ধর্মকে নবসংস্কারে রুপদান করে। এ কারণেই গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু আরাধ্য ও অনুসরণীয়।

শ্রী চৈতন্যদেব ১৪৮৬ সালে ১৮ ফেব্রয়ারি নবদ্বীপে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর আদি নিবাস সিলেট। পিতৃ প্রদত্ত নাম বিশ্বম্ভর। সন্ন্যাস গ্রহণের পর শ্রী চৈতন্য নামে পরিচিত হন। তাঁর পিতার নাম জগন্নাথ মিত্র। মাতার নাম শচী দেবী। গঙ্গাদাস পণ্ডিতের টোলে তিনি ব্যাকরণ, কাব্য, দর্শন ও অলঙ্কার শাস্ত্র অধ্যায়ন করেন। শিক্ষা সমাপনের পর নিজ বাড়িতে টোল খুলে অধ্যাপনা শুরু করেন। লক্ষী দেবীর সঙ্গে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। পিতার মৃত্যুর (১৫০২) পর তিনি আর্থিক সঙ্কটে পড়েন এবং পিতৃবংশের সম্পত্তির খোঁজে সিলেট গমন করেন। তিনি সিলেট থাকাকালীন সর্প দংশনে স্ত্রী লক্ষীদেবীর মৃত্যু হয়। এর পর মাতার অনুরোধে দ্বিতীয়বার বিষ্ণুপ্রিয়াকে বিবাহ করেন। তাঁর বিদ্যার কথা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তেইশ বছর বয়সে পিতৃপিণ্ডের জন্য গয়ায় গমন করেন এবং সেখানে বৈষ্ণব ভক্ত ঈম্বরপুরীর নিকট গোপাল মন্ত্রে দীক্ষাগ্রহণ করেন। দীক্ষাগ্রহণের পর তাঁর মনে প্রবল ভক্তির ভাবাবেগের উদয় হয়। অধ্যাপনা ছেড়ে দিয়ে নিজে নাম সংকীর্তন করতে ও অপরকে করাতে লাগলেন। এরপর নবদ্বীপের ঘরে ঘরে ------‘হরে কৃষ্ণ, হরে কৃষ্ণ,কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে, হরে রাম হরে হরে, রাম রাম হরে হরে’-----সংকীর্তন শুরু হয়। কৃষ্ণ প্রেমের বন্যায় যেন সব ভেসে যায়। সে এক অপার দৃশ্য। শান্তিপুর, নদীয়ায় বৈষ্ণব ভক্তদের ভক্তি আরাধনায় যেন ডুবু ডুবু। চারিদিকে জয় জয়কার। কেশব নামক একজন আচার্যের নিকট দীক্ষাগ্রহণ করেন। কেশব ভারতী তার নাম রাখেন শ্রী কৃষ্ণ চৈতন্য। তিনি বৈষ্ণব মতের অধিকারী হয়ে এ মতো সর্বত্র প্রচারে ব্রতী হন। তিনি অরণ্য পথে কাঁশী, প্রয়োগ, মথুরা, বৃন্দাবন ভ্রমণ করেন। এরপর তিনি নদীয়ায় আসেন। হিন্দু ধর্মে প্রাচীন কাল থেকে, বর্ণাক্রম চলে আসছিল। ধর্মে মানুষের সাথে মানুষের বিভাজনের ফলে মানসিকতা লোপ পায়। অন্যদিকে ইসলামের উদার নীতির ফলে ভারতবর্ষে পঞ্চাশ শতকে দলে দলে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। এ সময় হিন্দুধর্মের সংস্কারমূলক বৈষ্ণব ধর্ম হিন্দু ধর্মকে অনেক নিরাপদ করে। বৈষ্ণব তত্ত্বকে অবলম্বন করে অনেকে রচনা করেন বৈষ্ণব পদাবলী। চৈতন্যদেব ভক্তদের মতে তিনি কৃষ্ণের অবতার তবে তাঁর দেহকান্তি ও আচরণ বিরহিনী রাধার মতো তাই তাঁর বিগ্রহ রাধাকৃষ্ণের আদলে গঠিত।


 

রাজবাড়ি জেলার সন্নিকট তৎকালীন নদীয়া। ফলে শ্রী চৈতন্যের অনুসারী বৈষ্ণব ভক্তদের প্রসার ঘটে। জেলার বেলগাছি, কালুখালি ও পাংশায় অনেক বৈষ্ণব ভক্ত রয়েছে। কাল প্রবাহে শ্রী চৈতন্যের বৈষ্ণব ধারা হিন্দু ধর্মে লীন হয়ে গেছে। মন্দিরে দুটি কষ্টি পাথরের কৃষ্ণ মুর্তি ছিল যা ১৯৮০ সালে চুরি হয়ে যায়। ২০০৩ সালে ঢাকা প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ মন্দিরটির বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে। মন্দিরের স্মৃতি সংরক্ষণ প্রয়োজন।

হাড়োয়ায় মদনমোহন জিউর

কালুখালি এবং বেলগাছি রেলস্টেশনের মাঝামাঝি হাড়োয়া গ্রাম। এ গ্রামে অবস্থিত জাগ্রত দেবতা মদনমোহন জিউর। সাধারণ্যে স্থানটি মদনমোহন আঙিনা বলে পরিচিত। মদনমোহন আঙিনা, বিগ্রহ ও মন্দির বিষয়ে যে ইতিহাস পাই তা হলো-----‘এতদ্ভিন্ন বেলগাছি স্টেশনের নিকট হাড়োয় গ্রামের মদনমোহন মন্দির। বেলগাছি পরগনা পূর্বে নাটোর রাজ স্টেটের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

ইহা কেহ কেহ অনুমান করেন উক্ত মন্দির এবং বিগ্রহ নাটোর রাজবংশেরই একটা কীর্তি। এই মন্দিরাধিষ্ঠিত ‘মদনমোহন’ অতিসুন্দর ত্রিভুজ মুর্তি প্রস্তর নির্মিত দেড় হাত উচ্চ। মন্দিরের ব্যয় নির্বাহের জন্য প্রচুর দেবোত্তর ভূমি প্রদত্ত হইয়াছে।’ (ফরিদপুরের ইতিহাস, আনন্দনাথ রায় পৃষ্ঠা-২৭)। তবে মন্দিরের পরিচালক শ্রী গোপাল গোস্বামী যিনি মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা বলে দাবি করেন বাণীকণ্ঠকে এবং মদনমোহন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিশেষ কাহিনী বর্ণনা করেন। এ কাহিনীটি মদনমোহন বিষয়ে অত্র অঞ্চলের মানুষের প্রচলিত বিশ্বাস। গোপাল গোস্বামীর পূর্ব পুরুষ বাণীকণ্ঠ ছিলেন ব্রাহ্মণ ঘরের সন্তান। কোনো এক শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে ভুল মন্ত্র পাঠ হচ্ছিল শ্রবণ করে পিতার নিষেধ সত্ত্বেও বাণীবণ্ঠ মন্ত্র শুদ্ধ করে দেন। বাণীকণ্ঠের পিতা তা জানতে পারলে তিনি বাণীকণ্ঠকে ত্যাজ্যপুত্র করেন। এতে মনের দুঃখে বাণীকণ্ঠ পদ্মার অথৈ জলে আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে নদীতে ঝাঁপ দেন। কিন্তু নদীর পানি তার হাঁটু সমান হয়ে পড়ে। তিনি যত গভীরতার দিকে অগ্রসর হন না কেন পানি হাঁটু সমানই থাকে। আত্মবির্সজনের প্রবল ইচ্ছা পূরণে তিনি কলস গলায় বেঁধে নেন। আত্মাহত্যায় উদ্যত হওয়ার কালে দৈব কণ্ঠ শুনতে পান বাণী তুমি ফিরে এসো। তুমি তো আমার নাম প্রচার করবে। তুমি মানুষের সেবায় নিয়োজিত হবে। এরপরই গভীর পানি থেকে উঠে আসে মদনমোহন। মদনমোহন তাকে নিকটস্থ বাঁশঝাড় থেকে স্ত্রী রাধারানীকে তুলে আনতে বলে। মদনমোহনের স্ত্রী মদনমোহন থেকে কিছুটা উঁচু ছিল। এ কারণে স্ত্রীর সাথে মদনমোহন কথা বলতে সংকোচ বোধ করলে রাধারানী স্বেচ্ছায় ক্ষুদ্র হতে হতে মদনের পায়ের সাথে মিশে যায়।এটি একটি পাথরে পরিণত হলে উক্ত পাথরে মদনমোহন ভেসে বাণীকণ্ঠের নিকট আসে। বাণীকণ্ঠ মদনমোহনকে তুলে এনে যথাস্থানে সংস্থাপন করেন। সেখানেই প্রায় পাঁচশত বছর পূর্বে গড়ে ওঠে এ আঙিনা। ইতিহাসের সূত্রের সাথে কাহিনীর সত্যতা অনেক ক্ষেত্রে যাচাই করা সম্ভব আবার ক্ষেত্রবিশেষে কাহিনীর সাথে ইতিহাসের তথ্য তত্ত্ব মেলে না। ধর্মের ক্ষেত্রে ভারতবর্ষে হিন্দু-বৌদ্ধ, হিন্দু-মুসলমান, মুসলমান-বৌদ্ধ সংঘর্ষ ও বিরুপতায় মন্দির, মসজিদ প্যাগোডা, সংঘ, মূর্তি, বিগ্রহ ধবংশের ও নির্মাণের ইতিহাস রয়েছে। খিলজি ও তার পরবর্তী শাসকরা হিন্দুদের মন্দির আক্রমণ করেছিলেন। মন্দিরের দেবদেবী মূর্তি ভেঙ্গে নিজেদের ক্ষমতার চুড়ান্ত প্রয়াস শাসকদরে উদ্দেশ্য ছিল। আবার অনেকে কট্রর ধর্মীয় মনোভাবের জন্যও একাজ করেছিলেন। এ বিষয়ে কালাপাহাড় ইতিহাসের এক অধ্যায় বলা চলে। ষোল শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগে মুসলমান সৈন্যরা কালাপাহাড়ের নেতৃত্বে জাজপুর মন্দির লুট ও ধবংস করে। তার পূর্বেও দুই শতাব্দী ধরে মন্দির ধবংস, বিগ্রহ ধবংস ভাংচুর, নদী পুকুর, জলাশয়ে নিক্ষেপের ইতিহাস রয়েছে। কালাপাহাড় কেবল জাজপুর নয়, বঙ্গে তৎকালীন ফতেহবাদ, ভূষণাতেও এ কাজ করেন। কালাপাহাড় ওরফে রাজু ছিলেন ব্রাহ্মণ সন্তান। তিনি অভিজাত মুসলিম পরিবারে বিবাহ করেন। এর ফলে তার পরিবার সমাজচ্যুত হয়। জেদের বসে তিনি হিন্দুদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেন। তিনি ছিলেন সুলেমান ও দাউদ কাররানীর সেনাপতি। ১৫৬৮ সালে তিনি পুরী আক্রমণ করে জগন্নাথের মন্দির ধবংস করেন। জানা যায় জগন্নাথের মূর্তি সাগরে নিক্ষেপ করেছিলেন। তার সৈন্যরা সাতশত দেবদেবীর মূর্তি ধবংস করেছিল। হিন্দু সমাজে তিনি কালাপাহাড় নামে পরিচিত হন।


সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে ১৫৮৩ সালে ফতেহবাদ পাঠান শাসনকর্তা মাসুম খান ও কতুল খান বিদ্রোহ ঘোষণা করলে কান-ই আজম বাদশাহের পক্ষ থেকে বিদ্রোহ দমনে তৎপর হন। কালীগঙ্গার তীরে উভয়ে একমাস যুদ্ধের পর মোগল পক্ষ জয়লাভ করে। এসময় ফতেহবাদের কাজীদাদা অনেকগুলি যুদ্ধ জাহাজ ও কামান বন্দুক নিয়ে বিদ্রোহীদের সাহায্যে অগ্রগামী হন। কিন্তু কাজীদাদা যুদ্ধে নিহত হন। এদিকে মাসুম খানের আদেশে কালাপাহাড় কাজীদাদা অধীনস্থ সৈন্যের নায়ক পদে নিযুক্ত হন (ইলিয়ট কর্তৃক আকবরনাম পৃষ্ঠা-৬৭)। এ বিষয়ে আনন্দনাথ লিখেছেন ‘পূববঙ্গে বহু প্রস্তর নির্মিত দেব মুর্তি ভগ্নাবস্থায় দৃষ্ট হয়। উহাদের মধ্যে কাহারও নাসিকা কাহারও বা কর্ণ, মুণ্ডু ইত্যাদি ভগ্ন দেখা যায়। তাহা কালাপাহাড়ের কুকীর্তি বলে জানা যায়। সম্ভবত এই সময়েই ফতেহবাদের আধিপত্য লাভ করিয়া কালাপাহাড় এই কুকর্মের অবতারনা করেন’ (ফরিদপুরের ইতিহাস, আনন্দনাথ রায়, পৃষ্ঠা-৭৫)।

বঙ্গে এরুপ মূর্তি যত্রতত্র পাওয়া যেত। মোগল শাসনকালের শেষে এবং বৃটিশ শাসনকালের প্রথমে মুসলিম প্রাধান্য লোপ পায় এবং হিন্দু প্রাধন্য বাড়তে থাকে। ফলে এ সময়কালে হিন্দু মন্দির, মূর্তি, বিগ্রহ, দেবতা প্রতিষ্ঠা কাজের দ্রুত বিস্তার ঘটে। মদনমোহন দেবতা ব্রাহ্মণ্য আনুকূল্যে বাণীকণ্ঠ পদ্মায় ফেলে দেওয়া মূর্তিটির সন্ধান পান এবং হাড়োয়াতে তা সংস্থাপন করেন। পরে নাটোর রাজ ব্রাহ্মণ্য পালনে প্রচুর ভূমি দেবোত্তর হিসেবে আঙিনার নামে লিখে দেন। মন্দিরটির নিয়মকানুন কঠোর। পুরোহিতগণ বাণীকণ্ঠের বংশ পরস্পরায় নিয়োজিত হন।

পুরুষ ব্যাতিত বংশের কোনো স্ত্রীলোকের প্রবেশাধিকার নেই্ পুরোহিতগণ প্রতিবারই নদীতে স্নান করে মন্দিরে প্রবেশ করেন। চারবেলা মন্দিরে ভোগ বিতরণ হয়। ভোগের নিয়ম সোয়া পাঁচ সের চাউল। কিন্তু ভক্তবৃন্দের সহায়তায় ২/৪ মণের বেশি ভোগ বিতরণ হয় প্রতিদিন। ধর্ম পালনকারী ভক্তদের জন্য রাজবাড়িতে আঙিনাটি অপূর্ব এক মিলন ক্ষেত্র।

মদনমোহনের পরিচিতি

অতিপ্রাচীন যুগ হইতে বৃন্দাবন বিশাল অরণ্যই ছিল, সেখানে মুনিঋষিদের তপোবন ছিল। বৃন্দাবন ব্রজমণ্ডল বা পুরাতন শুরসেন রাজ্যের অন্তর্গত। মধুদৈত্যের নির্মিত মধুপুরেরই পরবর্তী নাম মথুরা্ শুরসেন বংশীয় যাদবগণ মথুরার অধিবাসী ছিলেন। সেই যাদবকুলে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব হয় এবং বৃন্দাবনে তাহার মধুর লীলা প্রকাশিত হওয়ায় উহা পুণ্যতীর্থে পরিণত হইয়াছিল। অর্জুন পৌত্র মহারাজ পরিক্ষিৎ যখন ইন্দ্রপ্রস্থের সম্রাট তখন তিনি শ্রী কৃষ্ণের প্রোপৌত্র বজ্রনাভকে ব্রজমণ্ডলের রাজাসনে প্রতিষ্ঠিত করেন। ব্রজনাভই প্রপিতামহের স্মৃতিপূজার জন্য মদনমোহন গোবিন্দ প্রভৃতি শ্রীবিগ্রহের সৃষ্টি ও মেরামত করেন।

খানখানাপুর অন্নপুণ্যের মন্দির

দক্ষিণবঙ্গের দ্বারপথ দৌলতদিয়া থেকে মাইল সাতেক দক্ষিণে এশিয়ান হাইয়ের পশ্চিমে অবস্থিত খানখানাপুরে দেবী অন্নপূণ্যার মন্দির এ জেলার প্রাচীন ঐতিহ্যের নিদর্শন। অনেক দেবদেবীর মধ্যে মান অন্নূন্য অন্নের দেবী। ‘গোলাভরা ধান, গোয়ালভরা গরু আর পুকুর ভরা মাছ’ বাংলার সুখ সমৃদ্ধির বিষয়ে এমন গাথা থাকলেও দুর্ভিক্ষ আর নিরন্ন মানুষের ইতিহাসও আছে। লক্ষীর দেবী অন্নপূণ্যা বিদ্যার দেবী স্বরস্বতী। ইহলোক জীবনের প্রয়োজনবোধ তাদের পূজা আরাধনা বঙ্গের হিন্দু ধর্মালম্বীরা করে আসছে। জানা যায় বঙ্গের অন্যতম স্বাধীনচেতা ভূঁইয়া রাজ পরম বিক্রমশালী রাজা প্রতাপাদিত্যের (১৫৯৯) সময় থেকে অন্নপূণ্যার নামে দেবোত্তর ভূমিদানের প্রচলন শুরু হয়। ভূষণার জমিদার ছত্রাজীতের পতনের পর ভূষণার কিয়দংশ বিশেষ করে বর্তমান রাজবাড়ি তার দখলে আসে।


তৎকালীন প্রসিদ্ধ খানখানাপুরে প্রতিষ্ঠিত অন্নপূণ্যার মন্দির তার সমকালীন বলে ধারণা করা যায়। পূর্বে মন্দিরটি বাজারে মধ্যে ছনের ছাউনি বিশিষ্ট ছিল। বর্তমানে স্থানান্তরিত হয়ে বাঁশহাটায় সুদৃশ্য ইমারত বিশিষ্ট মন্দির। এর প্রতিটি স্তম্ভ কারুকার্যময়। এই মন্দিরে কেবল অন্নপুণ্যার পূজা ব্যতীত অন্য কোনো দেবীর পূজা হয় না।

গোয়ালন্দ বিজয়বাবুর মন্দির

বৃটিশ ভারতে গোয়ালন্দ ও গোয়ালন্দের গুরুত্ব সুবেদিত। তৎকালীন রাজধানী কলিকাতার সাথে ঢাকাসহ পূর্বাঞ্চলের একমাত্র যাত্রাপথ ছিল গোয়ালন্দ। তৎকালীন খ্যাতিমান প্রকৌশলী বিজয়বাবু গোয়ালন্দ বাজারের অনতিদূরে একখানা মন্দির নির্মাণ করেন যা বিজয়বাবুর মন্দির বলে সাধারণ্যে পরিচিত। বিজয় বাবুও ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ, মানবদরদী ও সংস্কৃতি মনা। ১৯৩৬ সালে এ মন্দির নির্মাণ করেন। নিজে প্রকৌশলী বিধায় মন্দিরের গঠন কাঠামোতে আধুনিকতার ছাপ রয়েছে। মন্দিরটি বেশ বৃহৎ আকৃতির। ছাদ থেকে শতফুট উঁচু মঠ আকৃতির আকাশ ছোঁয়া বরুজ। মঠটির চারপাশে ছোট ছোট রঙ্গিন পাথরের কারুকাজ মনোমুগ্ধকর। মঠের উচ্চ শৃঙ্গে ত্রিশূল। মন্দিরের সম্মুখে প্রশস্ত নাটমঞ্জ। নানা কারণে তখণ গোয়ালন্দ সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চার কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এই নাটমঞ্চে যাত্রা, নাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হত। কলকাতা থেকে আসতেন নামি-দামী শিল্পী। এখানে এখন পূজাপার্বণ অনুষ্ঠিত হয়। বর্তমান মন্দিরটি সংরক্ষণের অভাবে ভগ্নপ্রায়। জমি বেদখল হচ্ছে।

মুকুন্দিয়ায় দ্বারকানাথ সাহা চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রীর স্মৃতিচিহ্ন মঠ

রাজবাড়ি সদর উপজেলার পাঁচুরিয়া অন্তর্গত মুকুন্দিয়া গ্রাম। এ গ্রামের প্রভাবশালী জমিদার ছিলেন দ্বারকানাথ সাহা চৌধুরী। তিনি রাজা সূর্যকুমারের সমসাময়িক। রাজা সূর্যকুমার ও জমিদার দ্বারকানাথ সাহার প্রজা হিতৈষী ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অনেক স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে। তাঁদের আনুকূল্যে রাজবাড়ি পাবলিক লাইব্রেরি সমৃদ্ধ হয়। পল্লী চিকিৎসা ও শিক্ষা বিস্তারে দ্বারকানাথ সাহা এলাকায় স্মরণীয়। দ্বারকানাথ সাহার জন্ম ১৩৪৪ এবং মৃত্যু ১৪২২ বাংলা। পিতার মৃত্যুর পর পুত্র সরজেন্দ্র নাথ সাহা পিতার স্মৃতি রক্ষার্থে নির্মাণ করেন সুদৃশ্য মঠ। পাশেই দ্বারকানাথ সাহার স্ত্রী মঠটি বিদ্যামান রয়েছে। মঠটি জেলার পত্নতত্ত্বের নিদর্শন বহন করছে।

কোলাবাড়িয়া ডিকে সাহার মন্দির

পাঁচুরিয়া ইউনিয়নের আর একটি গ্রাম কোলাবাড়িয়া। সাধারণ লোকে বলে খোলাবাড়িয়া। খোলামেলা উম্মুক্ত পরিবেশের কোনো বাড়ির নাম থেকে হয়ত গ্রামের নাম হয়েছিল খোলাবাড়ি যা বর্তমানে আঞ্চলিক উচ্চারণে হয়ে গেছে কোলাবাড়িয়া। অনুমান করা যায় ১৮০০ শতকের জমিদার শ্রী দেবনাথ কুমার সাহা ছিলেন খোলামেলা মনের জমিদার। উদার চেতনার মানুষ হিসেবে খোলামেলা মন নিয়ে সবাই তাঁর সাথে মিলিত হতেন। ধর্ম চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি নির্মাণ করেন এই মন্দির যা আজও ডিকে সাহার মন্দির হিসেবে স্মৃতি বহন করছে। সে সাথে ধর্ম চর্চার রীতিনীতিও জানা যায়-----মন্দিরটির দিকে তাকালেই বোঝা যায় নিখুঁত কারুকারর্যের অতীত নিদর্শন। দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়লেও সৌন্দর্য ম্লান হয়নি। অপরুপ স্থাপত্যের নিদর্শন বহন করছে মন্দিরটি।


নলিয়া জোড় বাংলা মন্দির

নলিয়া জোরবাংলা মন্দিরবালিয়াকান্দি থানার নলিয়া গ্রামে একটি জোড় বাংলা মন্দিরের ধবংসাবশেষ রয়েছে। এরুপ একটি মন্দির মাদারীপুরের রাজৈর থানায় দেখতে পাওয়া যায়। এর গঠন বিচিত্র এ সব মন্দির ১৭০০ শতকে তৈরি বরে পণ্ডিতগণ মনে করেন।

 

 

মদাপুর ও মদাপুরে রাজ রাজেশ্বরের (শিব) জাগ্রত দেবতা

আনন্দনাথ রায়ের ফরিদপুরের ইতিহাস ২৭ পৃষ্ঠা----‘বেলগাছি স্টেশনের অন্তর্গত মদাপুরের বৃক্ষপুষ্করিণী সমন্বিত শিব (রাজ রাজেশ্বর) নগর পাংশা স্টেশনের অধীনে মদাপুর গ্রাম অতি প্রাচীন। এই গ্রামের দুটি বট বৃক্ষের নিচে লোকেরা বহুকাল যাবৎ পূজা দিয়া আসিতেছে। বৃক্ষের তলদেশে একটি ইষ্টক নির্মিত ক্ষুদ্র মন্দিরের ভগ্নাবাশেষ দৃষ্ট হয়।’ মদাপুরের বটবৃক্ষটি জাগ্রত দেবতা হিসেবে রাজ রাজেশ্বরের নামে নিয়মিত পূজা করা হয়। পূজা সাধারণত মঙ্গলবারে অনুষ্ঠিত হয়। প্রকাণ্ড বটবৃক্ষকে ঘিরে অনেক গল্প কাহিনী প্রচলিত আছে। অনেকে মানত করে বটবৃক্ষের নিচে সন্তানের আজন্ম লম্বিত মাথার চুল কেটে মানত পূরণ করে। দেশ দেশান্তর থেকে শত শত মানুষ প্রতিবছর চৈত্র মাসে দোল যাত্রায় আগমন করে। একই সময় মেলা বসে। বট বৃক্ষটি ঘিরেই থাকে সব আয়োজন। বৃক্ষের চারপাশ ইট দ্বারা বাঁধানো প্রায় ৪০০ বছর ধরে এই রীতি চলে আসছে বলে জানা যায়।

মহানায়ক স্বামী সমাধি প্রকাশারণ্য

স্বামী সমাধি প্রকাশারণ্য কিংবদন্তির মহানায়ক যাঁর তত্ত্ব, আদেশ, উপদেশ, কর্ম পরিধি বিদেশ বিভুঁয়েও কথিত। রাজবাড়ি জেলা নলিয়া জামালপুরের উনবিংশ শতাব্দীর আশির দশকে জন্মগ্রহণ করেন স্বামী সমাধি প্রকাশারণ্য। বাল্যকালে তার নাম ছিল নরেশচন্দ্র চট্রোপাধ্যায়। সাধারণ লোকে বলে নরেশ পাগলা। এই নরেশ পাগলাই পরে আর্যসংঘের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি।

স্বামী প্রকাশারণ্য তৎকালীন সময় প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে ইংরেজিতে এম এ পাশ করেন। ছাত্রকালীন শ্রী রামকৃষ্ণের মানসপুত্র ব্রহ্মনিন্দ মহারাজদের সাথে তার আলাপচারিতা ছিল। লেখাপড়া শেষে তিনি বালিয়াকান্দি হাই স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। পনের বছর তিনি এ পেশায় ছিলেন। ব্রহ্মচারী সাধক এতে তুষ্ট হননি। পিতা বিবাহ দেন কিন্ত তিনি ঘর সংসারে আটকে থাকেন না। কোনো সুদূরের পিয়াসা তার মধ্যে। শিক্ষক জীবনেই তার বানপ্রস্থ অবস্থা। শিক্ষকতা কাজে থাকাকালীন তার বেশভূষা দেখলেই বোঝা যেত তিনি একজন সাধক বা সাধু পুরুষ। পরনে হাঁটু পর্যন্ত লম্বিত পাজামা, গায়ে খদ্দরের হাফ জামা, পায়ে সেন্ডেল। মাথায় তেলহীন চিকন কালো চুল। দীর্ঘ ঋজু দেহ। গৌরকান্তি তেজোদ্দীপ্ত চেহারা দেখলেই বোঝা যায় তিনি অপরিগ্রহ সাধকের মূর্ত প্রতীক। ফরিদপুর জেলার শিক্ষক সম্মেলনে যোগদান করেন। সেখানে তাঁর অভিভাষণ থেকে চালু হয় বিদ্যালয়ে প্রাথমিক ধর্ম শিক্ষা। যেখানে ধর্ম সভা, কীর্তন, ভাগবত পাঠ, ধর্মালোচনা সেখানেই মাস্টার মশাই। বাল্যকাল থেকেই ব্রাহ্মণ হয়ে আচণ্ডাল শুদ্রদির সাথে মিশে গেছেন। তাদের অন্ন ভোজন করেন। বুঝেছিলেন জাতি ভেদ প্রথা সমাজে প্রভূত ক্ষতিসাধন করছে। এর বিরুদ্ধে ঘোষণা করেছিলেন বিদ্রোহ। লিখলেন, জাতিকথা পরশমণি। এসকল পুস্তকে প্রমাণ করলেন জাতিভেদ প্রথার অসারতা। সত্যের সন্ধানে দিনাজপুরের এক হাঁড়ি তার কাছে দীক্ষা প্রার্থী হলে স্বামীজি নিজেই দীক্ষাগ্রহণ করলেন দিনাজপুরে তার বাড়িতে যেয়ে। ব্রহ্মচারীর মুক্তি মনুষ্য জীবনের পরম কাম্য। এ পথে আসতে হলে প্রয়োজন ব্রহ্মকালচার বা সমাধি সাধন। দীক্ষা গ্রহণের পর তিনি ‘স্বামী সমাধি প্রকাশারণ্য’ নাম গ্রহণ করেন। প্রতিষ্ঠা করেন আর্য সংঘ। আর্য সংঘের মাধ্যমে তিনি তাঁর মত, পথ তত্ত্ব প্রকাশ করেন। তিনি বলেন জন্মান্তরবাদ কোনো মিথ্যা নয়।


উহার সদৃশ্য দার্শনিক যুক্তির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব। এর থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় সাংখ্য যোগ।  তিনি ঘোষণা করেন সমাধি জাত বিজ্ঞানই সম্যক বিজ্ঞান। তা দ্বারাই দুঃখের নিবৃত্তি হয়। গৌতম বুদ্ধ বা শ্রী রামকৃষ্ণের মতো তার মতবাদ তৎকালীন পূর্ববাংলাসহ ভারতে বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তার লাভ করে। গড়ে ওঠে সংঘ, মঠ, সমাধি, আশ্রম। এরই সূত্র ধরে তৎকালীন পশ্চাৎপদ জনপদ জঙ্গল ইউনিয়নে ১৯৩৯ সালে গুরুজীর ইচ্ছা ও দরদী মনের পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় আর্য সংঘ আশ্রম, মঠ ও মন্দির। স্থাপিত হয় হাট-বাজার পোস্ট অফিস, আর্য সংঘ বিদ্যালয়। আশ্রম প্রাঙ্গণে প্রতিষ্ঠা করলেন পার্থ সারথী মন্দির। স্থানের নাম দিলেন সমাধিনগর। এখানে দেশের বিভিন্ন বরেণ্য ব্যক্তির আগমন ঘটে। সমাধিনগর পার্থ সারথী মন্দির আশ্রম ভগ্নপ্রায়।

তৈলাঙ্গ স্বামী

যুগে যুগে মুণি ঋুষগণ পথ পরিক্রমায় সৃষ্টির মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছে সষ্ট্রার বাণী। ইহ-জাগতিক ও পর জাগতিক ধ্যানলোকে জীবনবোধে ‍উন্মেষ ঘটান। তৈলাঙ্গ স্বামী ঠাকুরজী ইতিহাসখ্যাত সাধক পুরুষ যিনি সনাতন ধর্মের বাণী প্রচার করে গেছেন। তিনি সাধারণ পরিচিতিতে ভ্রাম্যমাণ দেবমূর্তি বলে পরিচিত ছিলেন। ভারতের সাধক পুস্তকে তার নাম উল্লেখ রয়েছে। বর্তমানে যেখানে যশাই মেঘনা উক্ত স্থানটি প্রায় ৪০০ (চারশত) বছর পূর্বে নদী প্রবাহিত এলাকা ছিল। নদীটি মেঘনা বলে পরিচিত ছিল। যা থেকে মেঘনা গ্রাম নামের উৎপত্তি। ভাবুক তৈলাঙ্গ স্বামী পথ পরিক্রমায় প্রায় ৩৫০ শত বছর পূর্বে সেখানে উপস্থিত হন এবং মেঘনা মযাইতে স্থাপন করেন ছিন্ন মস্তক কালীমূর্তি। এই দেবীমূর্তি নিজ হাতে তার মস্তক ছিন্ন করছে। দেবী পার্শে স্থাপিত ডাকনী আর যোগীনিকে রক্তপান করাচ্ছেন। মূর্তিটি পিতলের তৈরি, ওজন প্রায় ২০ মণ এবং তা শিল্পসৌকর্যে অপূর্ব ছিল। এই মূর্তিটির বর্ণনা ‘চণ্ডিগ্রন্থে’ রক্তজীব পাদ অধ্যায় রয়েছে। মূর্তিটির স্বত্ত্বাধিকারী ছিলেন শান্তি কুমার বাগচী। মূর্তিটির ভগ্নাবশেষ নীলকান্ত বাগচীর নিকট সযত্নে রয়েছে। স্মামী তৈলাঙ্গ ঠাকুরের আধ্যাত্মিক প্রভাবে মেঘনা যশাই এককালে তীর্থস্থানে পরিণত।

বেলগাছি সানমঞ্চ দোলমঞ্চ

রাজবাড়ি শহর থেকে দুই স্টেশন পশ্চিমে প্রাচীন হড়াই নদীর তীরে বর্তমান পদ্মার কাছাকাছি বেলগাছি একটি ঐতিহ্যবাহী স্থান। প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী হড়াই নদীর সাথে জড়িয়ে চাঁদ সওদাগরের কাহিনী। এখনো চাঁদ সওদাগরের ঢিবি দেখার জন্য আগমন ঘটে কৌতূহলী মানুষের।

এখানেই একসময় গড়ে ওঠে ফকীর সন্ন্যাসী আন্দোলনের কেন্দ্র। আজও রথের মেলা বসে রাম জীবনের নামে। বেলগাছি অদূরে হাড়োয়া ঐতিহাসিক চিহ্ন বহন করে চলেছে কষ্টিপাথরের মদনমোহন জিউর। মদনমোহনের মূর্তিটি সম্ভবত পাল আমলের। এ থেকে প্রমাণ হয় ৮ম শতকের পুণ্ড্রের পাল শাসন এ অঞ্চলে বিস্তৃত হয়। সীতারামের পতনের পর এ অঞ্চল নাটোর রাজ রাম জীবনের করতলগত হলে বেলগাছিতে রাম জীবনের নামে গড়ে ওঠে আখড়া। রাম জীবনের নামে এখনো মেলা বসে। রাম জীবনের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে এখানে সানমঞ্চ ও দোলমঞ্চের ধবংসাবশেষ রয়েছে। ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দ ভূমি রাজসস্বের নীতি প্রণয়ন কালে এ অঞ্চলে যে ২৪টি পরগনার উদ্ভব তার মধ্যে বেলগাছি ছিল বেলগাছি পরগনা। এ পরগনার জমির পরিমাণ ছিল ১৯.৮৬২ একর (পল্লী বাংলার ইতিহাস-হান্টার)। ১৮৬৯ সালে তদানীন্তন (Government of Bengal  লোক গণনার সাধারণ ধারণার ফরিদপুর জেলার কয়েকটি গ্রামের লোক গণনার বর্ণনা করেন। দুটি সার্কেলে এই লোক গণনা করা হয়। (১) কানাইপুর (২) বেলগাছি। বেলগাছি সার্কেলে ছিল ৯টি গ্রাম আর কানাইপুর ছিল ৬টি গ্রাম। কানাইপুরে ৬টি গ্রামের লোকসংখ্যা ছিল ৯২৪ জন।


বেলগাছি ৯টি গ্রামে বাড়ি ছিল ৯৬২ এবং লোক সংখ্যা ছিল ৩,৮৯৮ জন (wwd Hunter -Statistical Account of Bengal vol. p-278). ১৮৭৫ সালে তৎকালীন গোয়ালন্দ মহকুমার থানা ছিল গোয়ালন্দ, বেলগাছি ও পাংশা। বেলগাছি থানা হিসেবে তখন বিশেষ পরিচিতি লাভ করে। এ অঞ্চলে একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে-------‘নামে খায় বেলগাছির গুড়।’ বেলগাছির গুড় যে  এককালে বিখ্যাত ছিল তার প্রমাণ আজও মেলে বেলগাছির গুড়ের বর্তমান মান থেকে। বেলগাছিতে সোনালি অতীত সংঘ নামে ঐতিহ্যবাহী একটি ক্লাব রয়েছে। এই মাধ্যমে অত্র অঞ্চলের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ জনসেবা করে থাকেন।

ফেলুমেন্টের রাস্তা

পাংশা থেকে পূর্বমুখী একটি প্রশস্ত রাস্তা ফরিদপুরমুখী ছিল। তৎকালীন সময়ে এই রাস্তা দিয়ে লোকজন চলাচল করত। কিংবদন্তি রয়েছে এই রাস্তাটি নাকি ফেলু নামে কোনো এক মেথর তৈরি করেছিল। আসলে এর কোনো ভিত্তি নেই। মূলত এটি পরবর্তীতে ফেরিফান্ড নামে পরিচিত।

Additional information