মগ, নীলবিদ্রোহ - পৃষ্ঠা নং-২

বাড়ি ঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিত আর মগ ও ফিরিঙ্গী দস্যুগণ জলপথে এসে কেবল লূট করত না তারা হিন্দু মসলমান স্ত্রী - পুরুষ ধরে নিয়ে যেত। তারা বন্দিদের হাতের তালূ ছিদ্রি করে তার মধ্যে শক্ত বেত চালিয়ে দিত এবং এভাবে গেঁথে তাদের জাহাজের পাটাতনের নিচে একটার পর একটা স্তুপীকৃত করে নিয়ে যেত। লোকে যেমন মুরগীর খাবার হিসেবে চাউল ছিটিয়ে দেয় এরুপ সকাল বিকালের অসিদ্ধ চাউলের মুষ্ঠি খাবার হিসেবে ছিটিয়ে দিত। এমন খাদ্য খেয়ে যারা বেঁচে থাকত দস্যুরা তাদের দেশে নিয়ে কঠিন কাজে নিয়োজিত করত। অনেককে দাক্ষিণাত্যে নিয়ে ওলন্দাজ ইংরেজ ফরাসীদের নিকট বিক্রি করে দিত। তাদের এ অত্যাচার দক্ষিণ বঙ্গে প্রায় সকল স্থানে এবং হুগলি পর্যন্ত বিস্তৃত লাভ করে। তাদের অত্যাচারে অনেক স্থান বিরাণভুমিতে পরিণত হয়েছিল। সম্রাট শাহজাহান ১৬৩৩ খ্রিস্টাব্দ হুগলি থেকে তাদের বিতাড়িত করেন। চট্রগ্রাম থেকে ফরিদপুরসহ অত্র অঞ্চলে তারা ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। গ্রামে এসে যে মুল্লুকের ওপর পড়ত সেখানে শাসননীতি থাকত না। এমন অঞ্চলকে মানুষ মগের মুল্লুক বলত। এসব কথা এখনো এ অঞ্চলে প্রচলিত আছে। যশোর রাজা প্রতাপাদিত্য তাদের দমনের জন্য বহু সংখ্যক দুর্গ নির্মাণ করেছিল এবং অনেকাংশে তাদের মৃত্যুর পর মগ পর্তুগীজ ফিরিঙ্গীর দল আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।

ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি সেবাসটিয়ান গঞ্জালেশ কার্ভালহের নেতৃত্বে তাদের অত্যাচার শুরু হয় যা প্রায় ৫০ বছরের অধিক কাল স্থায়ী হয়। পুর্তুগীজদের নৌ বিহারের নাম ছিল আর মার্তা। তা থেকে ফিরিঙ্গী জলদস্যুদের হারমাদ বলত। কথাটি এ অঞ্চলে এখনো প্রচলিত। কবি কঙ্কন চণ্ডিতে-----‘ফিরিঙ্গীর দেশখান বহে কর্ণধার, রাত্রি দিন বহে ডিঙ্গি হারমাদের ডরে।’ জানা যায় ডোমিঙ্গ কার্ভালোহ সন্ধীপে থেকে বিতাড়িত হওয়ার কালে বিক্রমপুরের রাজা কেদার রায়ের মেয়ে রাজকন্যা অঞ্জালিকা চৌধুরীকে সাথে নিয়ে যায়। ডোমিঙ্গ কার্ভালোহ তিমুরের পূর্বাংশে একটি মহরের নাম দিয়েছিল ভারত রাজ্যের রাজধানী দিল্লীর নামে।

মগ, ফিরিঙ্গী, পর্তুগীজদের এখনো অনেক স্মৃতি বিদ্যামান। এখনো দক্ষিণবঙ্গের অনেক স্থানের নাম ফিরিঙ্গী খাল, ফিরিঙ্গীর বাজার। মগ ফিরিঙ্গীরা যে সব বাড়ি বা পরিবার হানা দিত সমাজে তাদের পতিত বলে গণ্য করা হত এবং পরিবারকে মগো ব্রাহ্মণ, মগো বৈদ্য, মগো কায়েত, মগো নাপিত বলা হত। এখনো  মাগুরা ফরিদপুরের অভ্যন্তরে ভূষণা প্রভৃতি স্থানে মগো পরিবার শ্রেণির লোকের বসবাস রয়েছে।

সেবাসটিয়ান গঞ্জালেশ, কার্ভালোহ পর্তুগীজ জলদুস্যুর দল সে সময় রাজবাড়ি অঞ্চলে ব্যাপক দস্যুতায় মেতে ওঠে। তার সে সময় পদ্মার কূল ধরে এ অঞ্চলে প্রবেশ করত। বর্তমান গোয়ালন্দ ছিল তাদের এ অঞ্চলের প্রধান আস্তানা। দস্যুদের দল রাজবাড়ি অঞ্চলের হড়াই, গড়াই, চন্দনা নদীর তীর ধরে ভিতরে প্রবেশ করে দস্যুতা চালাত। কথিত আছে পুর্তগীজ জলদস্যুদের দ্বারা বেগম মোমতাজমহলের দুইজন দাসী অপহৃত হয়। পুর্তগীজদের এ অত্যাচার দমনের জন্য ১৬৩২ খ্রিস্টাব্দে কাসিম খানের নেতৃত্বে তাদের অবরোধ করেন। যুদ্ধে পুর্তগীজরা বহু সৈন্য নিহত হয়। তারা পরাজিত হলেও পরে আরাকানী মগদের সাথে মিশে ভাটি অঞ্চলে লুটতরাজ আরম্ভ করে। সম্রাট আওরঙ্গজেব ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে মীর জুমলাকে বাংলার সুবেদার করে পাঠান। এ সময় রাজবাড়ি অঞ্চলের মগ, পর্তুগীজ দস্যুদের দমনের জন্য রাজা সংগ্রাম সাকে অত্র অঞ্চলের নাওয়াড়া প্রধান করে পাঠান হয়।

নীলচাষ ও নীলবিদ্রোহ

বৃটিশ শাসনকালে এদেশে নীলের চাষ, নীলের ব্যবসা, নীলচাষের সাথে প্রজাকুলের দুর্ভোগ এবং নীলচাষের বিরুদ্ধে সচেতন মহল এবং কৃষককুলের বিদ্রোহ ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। নীলচাষকে কেন্দ্র করে ইংরেজ সাহেব, কুঠিয়াল এবং এদেশের জমিদার, জোতদার, মহাজনদের প্রজাশোষণ, নিপীড়ন ও অন্যায় অত্যাচারের এক করুন চিত্র পাওয়া যায়। ইংরেজ শাসনকালে ১৭৯৫ থেকে ১৮৯৫ প্রায় একশত বছর এদেশে নীলের চাষ ও ব্যবসা ছিল। বর্তমান যশোর, খুলনা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, ‍কুষ্টিয়া, রাজবাড়ি, ফরিদপুর, ঢাকা, পাবনা জেলাসহ পশ্চিমবাংলার বিভিন্ন স্থানে ব্যাপকাকারে নীলের চাষ করা হত। এ অঞ্চলেই নীলচাষের বিরুদ্ধে বিদ্রেহ গড়ে ওঠে যা ‘নীলবিদ্রোহ’ বলে পরিচিত। নীলচাষের বিরুদ্ধে কলম ধরেন সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিক্ষিত সমাজ।

Additional information