মগ, নীলবিদ্রোহ - পৃষ্ঠা নং-৩

যশোরের চৌবাড়িয়ার দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীল দর্পন’ কলিকাতার হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘হিন্দুপ্যাট্রিয়ট’ এবং রাজবাড়ির মীল মশাররফ হোসেনের ‘জমিদার দর্পন’ ও আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘আমার জীবনী’ নীলচাষ বিষয়ে প্রমাণ্য গ্রন্থ। পরবর্তী পর্যায়ে এ সকল গ্রন্থ নীলচাষের বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন করে তোলে। বিশেষ করে ‘নীল দর্পন’, ‘জমিদার দর্পণ’, ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’, নীলবিদ্রোহ গড়ে ‍তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ভারতবর্ষে আর্য, গুপ্ত, পাল, সেন, পাঠান, সুলতান, মোগল স্বজাতীয় ঐতিহ্যের ধারক। কেবল ইংরেজ শাসনকাল (১৭৫৭-১৯৪৭ ভারতে ঔপনিবেশিক শাসন বলে পরিচিত। পঞ্চদশ শতকের শুরু থেকেই ইউরোপীয় বণিকেরা ব্যবসা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে নানা দেশের নানা পথ খুঁজতে থাকে। ভাস্কো-দা-গামা, কলম্বাসের নাম ইতিহাস খ্যাত। এভাবেই ষোড়শ শতকের প্রথমেই ইংরেজরা এদেশে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে আগমন করে। নানা সূত্রে ব্যবসার উদ্দেশ্যে কুঠি নির্মাণ করতে থাকে। শেষে সুযোগমত ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে কূটকৌশলে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ্দৌলাকে পরাজিত করে ভারতকে তাদের উপনিবেশে পরিণত করে। বৃটিশ সিংহাসনের আদেশে পৌনে দুইশত বছরের শাসনকালে ভারতের প্রতি শোষণ ও ব্যবসাই হয়ে ওঠে তাদের নীতি আদর্শ।

ইংরেজ শাসনের শুরুতেই তারা ভূমি রাজস্বের কর্তৃত্ব (১৭৬৫) গ্রহণ করে নব্য জমিদার শ্রেণির উদ্ভব ঘটায়। ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে জমিদারী চিরস্থায়ী হলে প্রজার ভূমির উপর স্বত্ব লোপ পায়। জমির প্রকৃত মালিক হয়ে পড়ে জমিদার, পত্তনিদার, দরপত্তনিদার, তেপত্তনিদার, ছেপত্তনিদার। পাটসহ অর্থকারী ফসল উৎপাদন তেমন শুরু হয় নাই। তুলা, রেশম, জাফরান, আখ, ধান, তৈলবীজ ও ডাল উৎপাদন ছিল প্রধান ফসল। এ সময়কালেই নীলচাষ ও নীলের ব্যবসা শুরু হয়।

নীলচাষকে তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত রা যাবে। ১৭৭৯ থেকে ১৮১০ পর্যন্ত নীলচাষের প্রারম্ভিক কাল। ১৮১০ থেকে ১৮৬০ অর্থাৎ ১৮৫৮ সালে নীলবিদ্রোহের পূর্ব পর্যন্ত নীলের চাষ ও ব্যবসার ক্রমোন্নতির কাল। ১৮০০ শতকের শেষে নীলচাষের সমাপ্তিকাল।

অষ্টাদশ শতাব্দীর শিল্প বিপ্লব ইংল্যান্ড তথা সমগ্র ইউরোপে অর্থনীতির চালচিত্র বদলে দেয়। সহসাই শিল্প কলকারখানার ব্যাপক বিকাশ ঘটতে থাকে। বিশেষ করে ইংল্যান্ডে বস্ত্রশিল্প বিকাশ লাভ করায় সুতা ও কাপড় ছাপানোর রঙের ব্যাপক চাহিদার সৃষ্টি হয়। তখন আজকের মতো এত বাহারী রাসায়নিক রং ছিল না। গাছ থেকে উৎপাদিত রং ব্যবহার হত। গাছ থেকে প্রাপ্ত রং ছিল নীল। তাই গাছটি হল নীল গাছ। আর পাটের বা ধানের পরিকল্পিত চাষের মতো নীল উৎপাদনের নাম হল নীলচাষ।

নীল এদেশে নতুন নহে। অতি প্রাচীন কাল থেকে নীলবন্ডের কথা ভারতবাসী জানত এবং তারা নীল রং প্রস্তুত কৌশলও জানত। ধ্যানস্থ আর্য ঋুষিগণ আকাশের রং থেকে পালনকর্তা বিষ্ণুর বর্ণ নির্ণয় করেছিলেন এবং পটে বা প্রতীকে সেই নীলবর্ণ প্রতিফলিত করতেন। প্লীনি প্রভৃতি প্রাচীন রোম পণ্ডিতগণ ইন্ডিকাম (Indicum) বলে এর বর্ণনা করেছেন। নীল ইংরেজি ইন্ডিগো (Indigo) যার বৈজ্ঞানিক নাম Indigofera Tinctora.

আবুল ফজলের আইন-ই-আকবরীতে দেখা যায় গুজরাটের অন্তর্গত আহমেদাবাদে এবং আগ্রার নিকটবর্তী বায়নাতে উৎকৃষ্ট নীল রং প্রস্তুত করা হত এবং তা কনস্টান্টিনোপলে রপ্তানি হত। বার্নিয়ের ভ্রমণকাহিনী থেকে জানা যায় বায়না প্রভৃতি স্থানে নীল সংগ্রহের জন্য ওলন্দাজ বণিকেরা সেখানে বাস করতেন। ভারতবর্ষে তখন কী প্রণালীতে নীল রং প্রস্তত হত তা জানা যায় না। ইংরেজ শাসনকালের প্রথম দিকে আমেরিকা থেকে নীল উৎপাদনের নব পদ্ধতি নিয়ে আগমনে ঘটে লুই বোনডের। বলা হয় এদেশে লুই বোনডই নীলচাষ, কুঠি নির্মাণ এবং নীল ব্যবসার প্রবর্তন করে। ১৭৩৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি ফ্রান্সের অন্তর্গত মার্সেল শহরে জন্মগ্রহণ করেন এবং দৈবক্রমে পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে গিয়ে নীলের ব্যবসা শুরু করেন ১৭৭৭ সালে তিনি চন্দন নগরে অবস্থান করতঃ নিকটবর্তী তালডাঙ্গা ও গোন্দলপাড়ায় দুটি নীলকুঠি স্থাপন করেন। ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি বাকিপুরের নীল ব্যবসায়ে যোগ দেন এবং স্বপ্লকালের মধ্যে যশোরের অন্তর্গত নহাটা কারবারের মালিক হন। সর্বশেষ ১ বছরে তিনি কালনা নীলকুঠি থেকে ১৪০০ মণ নীল রপ্তানি করেন। ১৮২১ সালে তার মৃত্যু হয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অনুমতি ব্যতিত কোনো বিদেশী বণিক নীল কারখানার জন্য কোনো কাজ নিতে পারতেন না। ১৭৯৫ সালে বন্ড সাহেব কোম্পানির অনুমতি নিয়ে যশোরের অন্তর্গত রুপদিয়াতে এ অঞ্চলের সর্বপ্রথম কুঠি স্থাপন করেন।

Additional information