মগ, নীলবিদ্রোহ - পৃষ্ঠা নং-৪

এরপর ১৮১১ সালের মধ্যে তৎকালীন নদীয়া, পরিদপুর, ঢাকা, খুলনার অঞ্চলে ব্যাপক হারে নীলকুঠি স্থাপনসহ নীলচাষ ও ব্যবসা ছড়িয়ে পড়ে। বলা যায় ১৮১১ সালের পর থেকেই বর্তমান যশোর, মাগুরা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, রাজবাড়ি, ফরিদপুর ও ঢাকা অঞ্চলে ব্যাপকহারে নীলের চাষ শুরু হয়। রাজবাড়ি জেলার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নেই নীলকুঠি ছিল। এরমধ্যে কোনো কোনো ইউনিয়নে ২ থেকে ৩টি কুঠির সন্ধান পাওয়া যায়। তবে গড়াই চন্দনার পাশ্ববর্তী পাংশা ও বালিয়াকান্দি উপজেলাতেই বেশি পরিমাণ নীলের চাষ করা হত। পাংশা, যশাই, জলিলপাড়া, বাবুপাড়া, বাগদুল, মাচপাড়া, কশবামাঝাইল, কুঠিমালিয়াট, কোর্দি, মৃগী, সাওরাইল, বাকশাডাঙ্গী, মধুপুর, ঘিকমলা, গাড়াকোলা, বালিয়াকান্দি, সোনাপুর, বহরপুর, জঙ্গল, সংগ্রামপুর, বেলগাছি, পদমদি, কালুখালি, যশাই, দুর্গাপুর, দলাগিলা, কুঠিরহাট, বারবাকপুর, বসন্তপুর, রামদিয়া, সেকাড়া এসব জায়গায় ষাটের দশকেও নীলকুঠির ধবংসাবশেষ দেখা যেত।

বিদ্যালয়ের পথে যেতে নাড়ুয়া ইউনিয়নের মধুপুর গ্রামের ঝোপঝাড় আচ্ছাদিত একটি ভগ্নকুঠির দেখতে পেতাম। ঐ ভগ্ন কুঠির সম্বন্ধে এলাকার মানুষ কিছুই বলতে পারত না। এখন বুঝতে পারি সেটা ছিল ১৮২০ এর দশকে স্থাপিত নীলকুঠি। মদাপুর ইউনিয়নের একটি গ্রামের নাম সংগ্রামপুর। কথিত আছে ঐ গ্রামের সাধারণ কৃষকেরা নীলচাষের বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত হয়, যে কারণে গ্রামের নাম হয় সংগ্রামপুর। জঙ্গল ইউনিয়নে এখনো একটি ভিটে দেখা যায় লোকে যাকে ‘ঠাঠা পড়ার ভিটে’ বলে। কথিত আছে নীলচাষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দমনে ঐ পথ দিয়ে ইংরেজ গোড়া সিপাই ঘোড়ায় চড়ে আগমন করত। চাষীরা ঐ পথে কন্দক কেটে রাখে এবং মাটির ঢিবি তৈরি করে বিদ্রোহীরা লাঠিসোটা নিয়ে আড়ালে বসে থাকে। ইংরেজ সিপাই দ্রুত ঘোড়া চালিয়ে আসতে খন্দকে পড়ে যায়। সেই সুযোগে বিদ্রোহীরা লাঠি নিয়ে তাদের পিটিয়ে ঐ গর্তে পুতে রাখে। সেই থেকে স্থানটিকে লোকে বলে-----ঠাঠা পড়ার ভিটা। বর্তমানেও নীলগাছ বিভিন্ন স্থানে দেখতে পাওয়া যায়। রাজবাড়ি সরকারি কলেজের বিজ্ঞান ভবনের সামনে একটি নীলগাছ আছে। যশোর ঝিনাইদহ অঞ্চলে এখনো নীলগাছ উৎপাদন করা হয়। তবে তা লাকড়ী ও ফসলের সবুজ সার সংগ্রহের জন্য। রং উৎপাদনের জন্য নয়। সাধারণ মানুষ একে মালগাছ বলে। নীলগাছ আকাড়ে ছোট। পাতা অনেকটা ধনচে পাতার মতো তবে ধনচে পাতা থেকে পত্র বিস্তারের দৈর্ঘ্য বেশি। নীলগাছ ডালপালাসহ সর্ব্বচ্চ ১১/১২ ফুট লম্বা এবং কাণ্ড ১ থেকে দেড়ফুট মোটা হয়। সাধারণত চারাগাছ থেকে নীল উৎপাদিত হয়। আউশ ধানের ক্ষেতে আশ্বিণ-কার্তিক মাসে নীলের বীজ বপন করা হত। উঁচু জমিতে বপন করা হত মাঘ-ফাল্গুন মাসে। আর নিচু জমিতে নীলচাষ করা হত চৈত্র মাসে। নীল গাছ দেড় থেকে দুই ফুট লম্বা হলে তা কেটে কারখানায় (নীলকুঠিতে) এনে জাগ দেওয়া হত। এরপর তা কারখানার বড় কড়াইতে জ্বাল দিয়ে কিছু রাসায়নিক দ্রব্যের সংমিশ্রনে নীল তৈরি করা হত। বর্তমানে প্যাকেটে যে গুড়া নীল পাওয়া যায় তখনকার নীলগাছ থেকে প্রাপ্ত নীল তেমন ছিল না। সে নীল ছিল দলা দলা এবং সহজে পানিতে দ্রবিভূত হয়ে যেত।

প্রথমত জমিদারের অধীন অল্প অল্প জমি নিয়ে সাহেবরা স্থানীয় প্রজাদের সাহায্যে নীলের চাষ করাতেন। ১৮১৯ সালের অষ্টম আইনে Regulation Vlll of 1819) জমিদারিদিগকে পত্তনী তালুক বন্দেবস্ত দেওয়ার অধিকার দেওয়ায় এক এক পরগনার মধ্যে অসংখ্য তালুকের সৃষ্টি হয়। নবাগত জমিদারগণ নীলকরদের নিকট হতে উচ্চহারে সেলামী নিয়ে নীলচাষের জন্য বড় বড় পত্তনী দিতে লাগলেন। দেশের বিপুল সম্পত্তির অধিকারী যারা তারাও নিজ অথবা অন্যের জমির মধ্যে পৃথক ভাবে পত্তনী নিয়ে নীলের চাষ করাতেন। যশোর, নদীয়া, ফরিদপুরের নীলের খ্যাতি বিলেতে পৌঁছিলে সে দেশের বহু ধনীর পুত্র আরো ধনী হওয়ার আশায় এ দেশে আসতে লাগলেন। কেহ নিজে স্বত্ত্বাধিকারী থেকে কেহবা কয়েকজন মিলে যৌথ কোম্পানি স্থাপনপূর্বক বিস্তৃত কনসার্ন (concern) বা কারবার খুলে বসতেন। একমাত্র যশোর জেলাতেই এরুপ ১৩টি কনসার্ন গড়ে ওঠে। এক একটি কনসার্নের মধ্যে ১৫/২০টি কুঠি (নীল উৎপাদন কারখানা) থাকত। সকল কুঠির পরিচালনা ও কার্যাব্যবস্থা একই কর্তৃপক্ষের অধীনে থাকত। কনসার্নের ম্যানেজারকে বলা হত বড় সাহেব আর সহকারীকে বলা হত ছোট সাহেব। কনসার্নের মধ্যে প্রধান কুঠিকে বলা হত-----সদরকুঠি। তৎকালীন কুমারখালি, খোকশা, পাংশা, বালিয়াকান্দি, রাজবাড়ি, গোয়ালন্দকে নিয়ে নীলচাষের কয়েকটি কনসার্ন বা কারবার কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। এর মধ্যে কুমারখালি শালঘর মধুয়া ছিল বৃহৎ কনসার্ন। এ কনসার্নের অধীনে অত্র জেলার পাংশা, মাছপাড়া, যশাই, জলিলপাড়া, খোকশা, কশবামাঝাইল, বাবুপাড়া, বাগদুল, মৃগী, ঘি-কমলা, নাড়ুয়া, মধুপুর, গাড়াকোলা, শিকজান, পদমদি, কুটিরহাট, সেকাড়া, সোনাপুর, সংগ্রামপুর, বেলগাছি, বহরপুর নীলকুঠিগুলো ছিল।

Additional information