মগ, নীলবিদ্রোহ - পৃষ্ঠা নং-৫

এর সদরকুঠি ছিল কুমারখালির শালঘর মধুয়া কুঠি। বড় সাহেব ছিলেন টিআই ক্যানী। অন্য বৃহৎ কনসার্ন বা কারবার কেন্দ্র ছিল কুমারখালি। এ কারবার কেন্দ্রের অধীনে ছিল জঙ্গল, বালিয়াকান্দি, সমাধিনগর, সাধুখালি, কোড়কদি, জামালপুর, নলিয়া, আরকান্দি, কুঠিরহাট, কুঠিপাঁচুরিয়া, মধুখালিসহ বর্তমান ফরিদপুর জেলার কামারখালি সংলগ্ন নীলকুঠি। সদর কুঠিসমূহ কামারখালিতে ছিল।

মীর মশাররফ হোসেনের ‘আমার জীবনী’ আত্মকথা থেকে অত্র অঞ্চলের নীলচাষ, নীলের ব্যবসা এবং নীলকরদের অন্যায় অত্যাচার বিষয়ে আলোকপাত করা যায়-----‘পূর্বে চন্দনা নদী দক্ষিণে বহুদূর খোলা মাঠ। পশ্চিমে পদমদি গ্রাম। নবাবের নীলকুঠি। ইতিপূর্বে কোনো সময় নীল কার্যের জন্য দেশী সাদামুখ সাহেব সপরিবারে নীলকুঠি প্রধান কার্যকারক রুপে নিযুক্ত হইয়াছেন।’ (মশাররফ রচনাসম্ভার, পৃষ্ঠা--২৩৯) নবাবের নীলকুঠি বলতে পদমদীর নবাব মীর মোহাম্মদ আলীর কথা বলেছেন। এ প্রসঙ্গে ২১১ পৃষ্ঠায় লেখা----‘কারবারে খুব টাকা পাইতে লাগিলেন। নীলকার্যের ভার, সমুদয় জমিদারীর ভার তোমার বাপের হাতে দিয়া তিনি কলিকাতায় গেলেন। এখানে তোমার বাপ নীলকার্যে এতই আয় করিলেন যে, একবার ১২৫ মণ নীলের ওপর কলিকাতায় পাঠাইলেন। মীর খয়রাতি (নবাব মোহাম্মদ আলীর ডাক নাম) নিজে যে কয় বছর নীলকার্য দেখিয়াছিলেন তাহাতে বৎসরে বিশ মণ, পচিশ মণ নীলের উপর হয় নাই। একবার মাত্র ৫০ মণ মাল হইয়াছিল। তোমার বাপ মেহনত করিয়া বছরে বছরে ৮০/৯০ মণ নীল কলিকাতায় পাঠাইতেন। মৃগীর কুঠির নীলসাহেবদের নীলের সমান দরে বিক্রি হইত। শুনিয়াছি নীল বিক্রি করিয়া মীর খয়রাতী কোনো বৎসর বিশ হাজার, কোনো বৎসর পঁচিশ হাজার-----একবার পাইয়াছিল পঞ্চাশ হাজার টাকা।’ এ তথ্য থেকে জানা যায় তখন নীলচাষ কতটা লাভজনক ছিল। আরো অনুমান করা যায় নীলচাষ প্রারম্ভে কনসার্নভিত্তিক থাকলেও পরে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জোত ও তালুকে পরিণত হয় এবং নীল ব্যবসার মালিক হয়ে ওঠেন ইংরেজ সাহেব এবং স্থানীয় বড় বড় জমিদার। মীরের আত্মজীবনী বইয়ের ১১৪ পৃষ্ঠায়----‘শালঘর মধুয়ার কুঠি টমাস কেনীর সদর কুঠি। ঐ কুঠির অন্তর্গত আরো কয়েকটি কুঠি ছিল। প্রত্যেক কুঠিতেই ইংরেজ কুঠিয়াল নিযুক্ত। মীরপুর নামে এক কুঠি ছিল। ঐ কুঠিতে এক ইংরেজ কুঠিয়াল কেনীর পক্ষে কার্য করিতেন। বোধ হয় ঐ কুঠিতে তার কিছু অংশ ছিল। কুঠি প্রধানই হোক আর ক্ষুদ্রই হোক প্রত্যেক কুঠির নিকটে ঐ নীলকরদের জমিদারী ছিল।’

নীলচাষের পদ্ধতি ছিল দুটি যথা------লিজ ও রাইয়তী। কোনো ব্যক্তি বা কোম্পানি নিজ জমিতে নিজের তত্ত্বাবধানে মজুর দ্বারা যে চাষ তা ছিল নিজ আবাদী। আর অগ্রীম টাকা বা দাদন দিয়ে প্রজাদের দ্বারা তাদের নিজ জমিতে কোম্পানি নীলের চাষ করিয়ে নিত। তাকে বল হত রাইয়তী বা দাদন পদ্ধতি। রাইয়তী বা দাদন পদ্ধতি ছিল দুই প্রকার যথা----এলাকা ও বে-এলাকা। রাইতরা দাদন নিয়ে নীল বুনতে চুক্তি করতেন। নিজের জমিতে চাষ করলে তাকে এলাকা এবং অন্যের জমিতে চাষ করলে বে-এলাকা বলত। নীলগাছ কেটে কুঠির এক অংশে জমা করা হত। তাকে বলা হত নীলখোলা। প্রতিবিঘায় নীলচাষের জন্য খরচ ছিল----চাষ-১ টাকা খাজনা -১০ আনা, বীজ-৪ আনা, নিড়ান-৮ আনা, গাছকাটা-৪ আনা, দাদনের একবার নামার জন্য স্ট্যাম্প-২ আনা, মোট খরচ=৩ টাকা।

সাধারণ বিঘা প্রতি ৮ থেকে ১২ বান্ডিল নীলগাছ জন্মত। প্রতি ৪ বান্ডিল ১ টাকা ধরে গড়ে ৮ বান্ডিলে নী থেকে আয় ২ টাকা। প্রতি বিঘায় ১মণ বীজ জন্মাত যার দাম ৪ টাকা। মোট ৬ টাকা। খরচ ৩ টাকা বাদ দিলে লাভ ৩ টাকা এবং দাদনের খরচ ২ টাকা বাদ দিলে কৃষকের প্রতি বিঘায় ১ টাকা। আর নীল ১২ বান্ডিল হলে আয় দাঁড়াতো ২ টাকা (Indigo Company Report, page-23)। তবে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে নীল ভালো না জন্মিলে দাদনের টাকা পরিশোধ হত না। উল্লেখ্য গ্যাস্ট্রোল সাহেব নীলের আয় প্রজার পক্ষে মাত্র চার আনা ধরেছেন।

প্রথমত নীলচাষ লাভজনক ভেবে কৃষকেরা নীল উৎপাদনে আগ্রহী হয়ে ওঠে। উঁচু জমিতে বটেই নিচু ধানের জমিতেও তার নীলচাষ শুরু করে। ফলে কৃষকের ধান উৎপাদন কমে যায়। এতে খাদ্যাভাব দেখা দেয়। নীলচাষে তাদের নামমাত্র লাভ থাকত। এরপরেও মাপনের সময় ৬ বান্ডিলকে ৪ বান্ডিল বা ৪ বান্ডিলকে ২ বান্ডিল করা হত। এছাড়াও তারা দিনের পর দিন দাদনের ঋণে আটকা পড়ে সর্বশান্ত হতে থাকে। নীলকরগণ জাল চুক্তিপত্র করে বছরের পর বছর তাদের দাদনের মধ্যে রেখে দিত। নীলকরদের দালালগণ জমি মাপার সময় কৃষকদের ফাঁকি দিত। দেড় বিঘা জমি মেপে একবিঘা করত। ১৮৫৪ সালে যশোর জেলা ম্যাজিস্টেট ডানভার লিখেছেন----‘নীলকরগণ উৎকৃষ্ট জমিতে নীলচাষ করাতো কিন্তু তাদের প্রকৃত মজুরী অপেক্ষা কম মজুরী দিত। তারা ১৭৯৫ সালে নীলের যে মূল্য নির্ধারণ করেছিল অর্ধ শতাব্দী পরেও কৃষকদের সেই মূল্যে নীলচাষ করাতে বাধ্য করত।

Additional information