মগ, নীলবিদ্রোহ - পৃষ্ঠা নং-৬

নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বেড়েছিল কিন্তু নীলকরগণ তা গ্রাহ্য করত না। ঐশ’লি এডেন লিখেছেন----‘খুন, দাঙ্গা, ডাকাতি, লুন্ঠন, মেয়ে মানুষ চুরি, অগ্নিসংযোগ --এমন কোনো অন্যায় কাজ নেই যা তারা করত না। নীলের চাষে বাধ্যকরণ এবং নীলচাষ সম্প্রসারণ এত দ্রুত বৃদ্ধি পেতে লাগল যে এক সময় মনে হত এদেশে আর ধানের চাষ হবে না। ১৮৪২ সালে বাংলাদেশের পুলিশ প্রধান জানান যে, ফরিদপুরের পশ্চিমাঞ্চলের (বর্তমান রাজবাড়ি অঞ্চল) জমিদারগণ কৃষকদের উপর নানাভাবে অত্যাচার করছে। তাদের ধন সম্পত্তি লুটতরাজ করতেও দ্বিধা করছে না।’ আব্দুল মোতালেব নামে এক ব্যক্তি ১৫০ বছর পূর্বে এক পত্রিকায় লিখেছেন---------‘আল্লা এমন করে মারিস কেন? তুই তো সবই পারিস। একদিন কেন সকল রায়তদের মেরে রায়তদের দেনা পরিশোধ করে দেনা। দোহাই আল্লা তোর কাছে এই দরখাস্ত করছি, তুই একদিনে আমাদের মেরে ফ্যাল।’ (প্রথম আলো পত্রিকা, প্রতিবেদন, মুনতাসির মামুন)। ১৮৪৮ সালে ফরিদপুরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন জেলাটুর সাহেব। তিনি উল্লেখ করেন যে, এমন একটি নীলের বাক্স ইংল্যান্ড গিয়ে পৌছায় না, যা বাংলার কৃষকদের রক্তে রঞ্জিত নয়।

নীলকর ও জমিদারদের অত্যাচার এতটাই বিভিষীকাময় ছিল যে তা ভাষায় বর্ণনাতীত। সাধারণ লোকে ইংরেজ বলতে কোম্পানিকেই বুঝত। এই কোম্পানিই হর্তাকর্তা বিধাতা। এই কোম্পানি যে কত কৌশলে সাধারণ মানুষের সর্বশান্ত করেছে তার শেষ নেই। কোম্পানির গায়ের জোরে সাধারণ প্রজাদের নিঃশেষ করাই যেন উদ্দেশ্য। ‘কুঠির চতুর্পাশ্বের গ্রামে সকল যেনতেন প্রকারে হস্তগত না করিয়া আর কুঠির পত্তন করিতেন না। ছোটখাট জমিদার তালুকদার হইলেত কথাই নাই। লাঠির চোটে, গুদামঘরের সহায়ে, দেশী লাঠিয়ালগণের সাহায্যে, বিদেশী পাঁড়ে দেবে- চোরে, সিং-সিমির রাজপুতদের ঢাল তরবারীর জোরে কত কাণ্ডই যে এদেশে করিয়াছেন তাহার সমুদয় ঘটনার বিস্তারিত বিবরণী প্রকাশ করা সহজ ব্যাপার নহে।’(মীর মশারফ রচনাসম্ভর, পৃষ্ঠা-১১৪)।

দখল, নির্যাতন, নিপীড়ন, শোষণের মধ্যেই কুঠিয়ালদের অন্যায় অবৈধ কাজ সীমাবদ্ধ ছিল না। তারা প্রজাদের ঘটি-কম্বল থেকে শুরু করে কার ঘরের বউ ও যুবতী মেয়েদের ওপর নজর তুলত। এরুপ ঘরের কোনো মেয়ের উপর নয়ন পড়লেই তার আর রক্ষা থাকত না। ‘ছলে বলে কৌশলে কুঠিয়াল তাকে হস্তগত করবেই। প্রয়োজনে অপহরণ করত। টাকাওয়ালা লোক অনেক আছে। কিন্তু বল প্রকাশের মধ্যে কুঠিয়ালদের কোনো কার্যে বাধা দেওয়ার শক্তি নাই। মীরপুর (কুষ্টিয়া) কুঠির সাহেবের বিরুদ্ধে দাঁড়াইতে কোনো লোকের সাধ্য নাই। কুঠির নামেই থরহরি কম্প। সাহেব দূরের কথা-----কুঠির নায়েব, গোমস্তা, আমিন, তাগাদাকারী, খালাসী, পাইক পেয়াদার যন্ত্রণাতেই অস্থির। তাহারা চক্ষু রাঙ্গাইয়া এক ধমক দিলেই চক্ষু স্থির। ইহার পর সিং দোবে, চোবে, পাঁড়ে বাঁধা কোমরে ঢাল তরবারী লইয়া আসিলেও সে সময় পাড়া প্রতিবেশীরা দিনে দুপুরেই আপন আপন ঘর বন্ধ করিয়া জঙ্গলে মাথা দেয়।’ (ঐ পৃষ্ঠা-১১৫)

নীলবিদ্রোহ ও নীলচাষের সমাপ্তি

১৮৫৮ সালে নীলবিদ্রোহের অগ্নি দেশময় ছড়িয়ে পড়লেও নীলচাষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উঠেছিল অনেক আগ থেকেই। ১৮১০ সাল থেকেই নীলচাষের বিরুদ্ধে প্রজা  সাধারণ সংগঠিত হতে থাকে। নীলকরদের অন্যায় অত্যাচার ছাড়াও জাত যাওয়ার মানসিকতায় তার সাহেবদের ভালো চোখে দেখত না। এ সময় পাদ্রীরা ব্যাপক হারে হিন্দু, মুসলমান উভয়ের দারিদ্রের সুযোগ নিয়ে খ্রিস্টান বানাতে থাকে। কথা উঠল, ‘জমির শত্রু নীল, কাজের শূল ঢিল, আর জাতীয় শত্রু পাদ্রী হীল।’ সে সময় থেকেই প্রজাগণ নীলকরদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনতেন। কিন্তু সরকার গোলমাল মেটাবার জন্য তেমন ব্যবস্থা করতেন না। ১৮৩০ অব্দে প্রজাদের পক্ষে এক চুক্তিনামার আইন পাস (Regulation V of 1830). হয়। কিন্তু পাঁচ বছর পর বেন্টিক এ আইন তুলে নেন। এছাড়াও নীল প্রধান জেলায় তৎকালীন বাংলার প্রথম বড়লাট হ্যালিডে সহকারী নীলকর ম্যাজিস্ট্রেট নিযুক্ত করতে লাগলেন। জনগণ ভাবতে আরম্ভ করল বুঝি সরকারই নীলের অংশীদার। নীলকরেরাও এই সুযোগ বুঝে অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে দিল। প্রজার ধানের জমি, আখের জমি, খেজুরের বন কেটে এবং বিদ্রোহী প্রজার ঘর ভেঙ্গে ভিটের উপর নীল চাষ করতে বাধ্য করল। ‘ভিটের ঘুঘু চড়ান’  প্রবাদটি এখান থেকেই এসেছে। আজও রাজবাড়ির মানুষ একটুতে একটু কিছু হলেই বলে, তোর ভিটেয় ঘুঘু চড়াব। তখন রাজবাড়ির পার্শ্ববর্তী জেলা পাবনা নীলচাষের আওতা বহির্ভুত ছিল বা ফীরদপুর, যশোর, কুষ্টিয়া, খুলনার মতো ব্যাপক নীলচাষ হত না। তারা নীলকরদের অত্যাচারের আওতামুক্ত থেকে সুখে ছিল। রাজবাড়ির মানুষ বলত, যে যায় পাবনা তার নেই ভাবন।

Additional information