মগ, নীলবিদ্রোহ - পৃষ্ঠা নং-৮

১৮৬৮ সালে ৩ সেপ্টেম্বর অমৃতবাজার পত্রিকায় দুদুমিয়ার শক্তির কিছু পরিচয় পাওয়া যায়, লেখা হয়-----‘কালে তার প্রভাব এতদূর বৃদ্ধি পায় যে কুঠিয়াল ইংরেজ ও জমিদারদের বিরুদ্ধে তিনি মনে করলে ৫০ হাজার লোক সংগ্রহ করতে পারতেন। সোনাপুরের হাসেম আলীর নেতৃত্বে শত শত চাষী সংঘবদ্ধ হয়। সোনাপুর, বহরপুর, বালিয়াকান্দি, বসন্তপুরসহ অনেক নীলকুঠিতে তাঁর নেতৃত্বে আগুন দেওয়া হয়।’ সে সময় পাংশার জমিদার ভৈরব বাবু নীলচাষের বিরুদ্ধে পাংশায় নেতৃত্ব দেন। ভৈরব বাবু ছিলেন অত্যন্ত সাহসী ও ডাকসাইটে জমিদার। নীলকরদের বিরুদ্ধে তিনি সক্রিয় গণবিদ্রোহের সূচনা করেন। তিনি পার্শ্ববর্তী কুঠি আক্রমণ করে বিপুল ধবংস সাধন করেন। এতে ক্ষুদ্ধ হয়ে টিআই ক্যানী ভৈরবনাথের ট্রেজারী লুট করে। ভৈরব বাবু পাবনা আদালতে ট্রেজারী লুটের মামলা করেন। এ মামলায় তিনি ১৪ হাজার টাকা ডিক্রী লাভ করেন। এর কিছুক্ষণ পর ক্যানীর লোকজন তাকে অপহরণ করে নিহত করেন। (পাংশা উপজেলার ইতিহাস, শেখ মুহাম্মদ সবুর উদ্দিন, পৃষ্ঠা-৩, ৪)। বেলগাছি অদূরে একটি গ্রামের নাম সংগ্রামপুর। ঐ গ্রামের মানুষেরা নীলচাষের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়ায় এর নাম হয় সংগ্রামপুর। সংগ্রামপুর আজও নীলবিদ্রোহের ইতিহাস বহন করছে। জঙ্গল ইউনিয়নে ঠাঠাপড়ার ভিটার বিষয়ে বলা হয়েছে।

১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে নীলবিদ্রোহ গুরুতর আকার ধারণ করল। লর্ড ক্যানিং এ সংবাদে ব্যাতিব্যস্ত হয়ে উঠলেন। এ ব্যাপারে তিনি বাংলার বড়লাট গ্রান্ট সাহেবের পরিদর্শনের ভার দেন। ঐ বছর তিনি গড়াই, কুমার, কালীগঙ্গার নদীপথে ৭০ থেকে ৮০ মাইল স্টিমার যোগে পরিদর্শন করেন। প্রায় ১৪ ঘন্টা ব্যাপী এ ভ্রমণ চলে। নদীর উভয় কূলে হাজার হাজার কৃষক শ্রেণিবদ্ধভাবে জমায়েত হয়ে ফরিয়াদ জানায়। কথিত আছে গড়াই নদীর কূল দিয়ে যাওয়ার সময় রাজবাড়ি জেলার হাজার হাজার কৃষক দুদুমিয়া ও হাশেম আলীর নেতৃত্বে কামারখালি ঘাট থেকে সমাধিনগর, নাড়ুয়া মুখে সমবেত হয়। নদীর ধারে হাজার হাজার কৃষক হাতে দরখাস্ত নিয়ে ক্যাপ্টেনকে ঘাটে জাহাজ ভিড়াতে অনুরোধ করতে লাগল। কিন্তু ক্যাপ্টেন কোনো মতে জাহাজ ঘাটে ভিড়ান না। এতে প্রজারা প্রাণ বিসর্জন দেওয়ার উদ্দেশ্যে খরস্রোতা গড়াই নদীর পানিতে ঝাঁপ দিয়ে ভেসে যেতে লাগল। গ্রান্ট সাহেব এ দৃশ্য দেখে জাহাজ ঘাটে ভিড়াতে আদেশ দিলেন। প্রজারা জাহাজ ঘিরে ফেলল এবং গ্রান্ট সাহেবকে প্রতিজ্ঞা করাল যে তিনি প্রজাদের রক্ষা করবেন।

এরপর থেকে পাঁচজন সদস্য নিয়ে ‘ইন্ডিগো কমিশন’ গঠিত হয়। পরবর্তী ডিসেম্বর মাসে গ্রান্ট মহোদয় সুদীর্ঘ মন্তব্য করেন----বাংলার প্রজা ক্রীতদাস নহেন। প্রকৃতপক্ষে জমির স্বত্ত্বাধিকারী। তাহাদের পক্ষে এরুপ ক্ষতির বিরোধী হওয়া বিস্ময়কর। যাহা ক্ষতিজনক তাহা করাইতে গেলে অত্যাচার অবশ্যম্ভবী। এই অত্যাচারের আতিশস্যাই নীল বপনে প্রজার আপত্তির মূখ্য কারণ----(হেমেন্দ্র প্রসাদ ঘোষ লিখিত নীলদর্পণের ভূমিকা, কর মজুমদার সং-১ পৃ) কমিশন নিম্নলিখিত সুপারিশ এবং তদ্বারা ইশতেহার জারী করা হয়-(১) সরকার নীলচাষের পক্ষে বা বিপক্ষে নহেন (২) অন্য চাষের মতো নীলচাষ করা বা না করা সম্পূর্ণরুপে প্রজার ইচ্ছাধীন (৩) আইন অমান্য করে অত্যাচার বা অশান্তির কারণ হলে নীলকর বা প্রজা কেউই কঠোর শাস্তি হতে নিস্তার পাবেন না।

 কমিশনের ইশতেহার প্রকাশের পর নীলচাষ প্রজার ইচ্ছাধীন হলেও নীলের ব্যবসা ও উৎপাদন বন্ধ হল না। তবে নীলচাষ ক্রমে ক্রমে হ্রাস পেতে থাকল। অনেক স্থানের কুঠি বন্ধ হলেও রাজবাড়ি অঞ্চলের নীলের চাষ চলতেই থাকে। এ সময় টমাস কেনীর অত্যাচারও যেন বেড়ে যায়। এ অঞ্চলের প্রজারা আরো বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। এ প্রসঙ্গে মীর মশাররফ হোসেনের আমার জীবনী গ্রন্থে ১১০ পৃষ্ঠায় -----‘নীলচাষের দৌরাত্ব সহ্য করিতে না পারিয়া সর্বসাধারণ প্রজা আবার নীলবিদ্রোহী হইয়াছেন। মীর সাহেব আলী বিদ্রোহের সময় প্রজার দলে মিশিয়াছেন। প্রজাসাধারণ এত ক্ষেপে উঠলো যে কি কৌশলে টমাস কেনীর প্রাণ হরণ করবেন, মিসেস কেনীর সর্বনাশ করবেন, কী কৌশলে সালঘর মধুয়ার কুঠি ভাঙ্গিয়া কালীগঙ্গায় নিক্ষেপ করবেন।’ সতীশ চন্দ্র মিত্র লিখেছেন নীলের দ্বিতীয় বিদ্রোহ শুরু ১৮৮৯ সালে। ডম্বল সাহেবের অত্যাচারে এ বিদ্রোহ দেখা দেয়। এ বিদ্রোহ মাগুরা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া ও রাজবাড়ি সীমাবদ্ধ ছিল। এ সময় পাটের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রজারা নীলচাষে একেবারেই অসম্মতি জানায়। ফলে নীলকরেরা নীলের দাম বৃদ্ধি করে নীলচাষ করতে চায় কিন্তু তারা ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্থ হতে থাকে। এরই মধ্যে জার্মান থেকে কৃত্রিম কৌশলে উৎপাদিত নীল সস্তা দামে দেশে দেশে আমদানী হওয়ায় নীলের চাষ ও ব্যবসা ১৮৯৫ সালের মধ্যে একেবারে উঠে গেল।

Additional information