মগ, নীলবিদ্রোহ

মগ, পর্তুগীজ, ফিরিঙ্গী-জলদস্যু, নীলবিদ্রোহ

মগের মুল্লুক, বোম্বেটে, হার্মাদ, ফিরিঙ্গী এ অঞ্চলে তথা বাংলা ভাষায় বহুল ব্যবহৃত প্রবাদ ও বিদ্রুপাত্মক শব্দ। এছাড়া পেঁপে, পেয়ারা, কামরাঙ্গা, বাদমী, আমলকী, বেদানা, কমলা, বরান্দা, বোডার্স, বোতল, বালতি, গামলা, পেরেক, মাস্তুল, তুফান, কামান, পিস্তল, গীর্জা, পাদ্রী, মিস্ত্রী, এসব শব্দ পর্তুগীজ ও ফিরিঙ্গীদের থেকে এসেছে। আমরা ফিরিঙ্গী খোঁপা বাঁধার কথা বলি, মেয়েদের আচার ব্যাবহারের ক্ষেত্রে ফিরিঙ্গী বলে থাকি। কামিজ, ইস্ত্রি, বছর, কাবাট, পুস্তক, ছাপা, জোলাপ, নিলাম ইত্যাদি তাদের ভাষাই আমাদের ভাষা হয়ে গেছে। এ অঞ্চলে মগো ব্রাহ্মণ, মগো বড়ই, মগো নাপিত,  কর্মভেদ বংশধারা মগোদের থেকে এসেছে। সর্বোপরি সেবাসটিয়ান গঞ্জালেশ পর্তুগীজ জলদস্যুর নামানুসারে গোয়ালন্দ নামকরণ এবং সংগ্রাম সাহের ইতিহাস এ অঞ্চলের পর্তুগীজ মগ জলদস্যুদের স্মরণ করায়। মগ-ফিরিঙ্গী জলদস্যুদের উৎপাত, উপদ্রব, লুণ্ঠন বিষয়ে জানার আগে তাদের

পরিচিতি বিষয়ে জানা যাক। মগদের আগমন ঘটত বার্মার আরাকান থেকে। আরাকানের স্থান চট্রগ্রামের দক্ষিণে। পূর্বে তা আরাকান রাজ্য নামে পরিচিত ছিল। এর রাজধানী ছিল রামাবর্তী আরাকান মুসলমান শাসনভুক্ত থাকে। ১৭৮২ খ্রিস্টাব্দে আরাকান রাজ্য ব্রহ্মবাসীরা কেড়ে নেয়। ১৮২৬ সালে ইংরেজ অধিকৃত হয়। এখন আরাকান মায়নমারের বিভাগ এবং রাজধানী আকিয়ার। আরাকান সমুদ্রবেষ্টিত হওয়ায় তার নৌবিদ্যায় পারদর্শী ছিল। বাণিজ্য বা রণসজ্জায় আরাকানীরা উত্তরে চট্রগ্রাম আসত এবং সন্দ্বীপ তাদের প্রধান আড্ডা ছিল। তারা সাধারণত মগ বলে পরিচিত ছিল এবং তাদের ধর্ম বৌদ্ধ। একসময় তাদের ব্যবসাই ছিল দস্যুতা। পর্তুগীজরা এসেছিল সুদূর ইউরোপের পর্তুগাল থেকে। ১৫শ শতাব্দীদে ভাস্কোদাগামা তাদের এদেশে আসার পথের সন্ধান করে দেন। ধীরে ধীরে পর্তুগীজরা পশ্চিম ভারতের সমুদ্র তীরবর্তী নানা স্থানে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘাঁটি স্থাপন করে। এছাড়া তারা ঘাঁটি গেড়েছিল ইন্দোনেশিয়ার তিমুরে, চীনের ম্যাকাওতে, বঙ্গের সন্দীপে, আর ভারতের গোয়া ও বোম্বেতে। অল্পকালের মধ্যে তারা গোয়ানগরীতে দূর্গ ও রাজধানী স্থাপন করে। বঙ্গকে তখন ভারতের ভূস্বর্গ বলা হত। ষোড়শ শতকের মধ্যভাগে পশ্চিম ভারত থেকে পর্তুগীজগণ এসে আরাকান সন্দ্বীপ ও সমুদ্রতীরের নানা স্থানে বসবাস করতে থাকে। সে সময়ে ছিল মোগলদের শাসন। মোগলরা সাগরের দস্যুতা দমনে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করত। এ সময় নৌবিদ্যায় পারদর্শী ও ভীনদেশী পর্তুগীজদের মগেরা আশ্রয় দিয়েছিল। পর্তুগীজরা দুঃসাহসিক অভিযান ভালোবাসত। স্থান দখল, দস্যুতা, বাণিজ্য ছিল তাদের রক্তে মিশ্রিত। ধীরে ধীরে তারা বঙ্গে ব্যবসা, দখল, দস্যুতা নানা উদ্দেশ্যে দলে দলে এসে বঙ্গের দক্ষিণে আশ্রয় গ্রহণ করে। মাহমুদ সাহের রাজত্বকালে পর্তুগীজরা চট্রগ্রামে ও সপ্তগ্রামে বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপনের আদেশ পায়। পর্তুগীজরা নৌবাহিনীর নিরাপদ স্থানকে বন্দর বলত। এই বন্দর হতে ব্যান্ডেল এবং তা থেকে বেন্ডিট (দস্যু) শব্দের উৎপত্তি। পশ্চিম ভারতে যে সব পর্তুগীজ বাস করত তারা গুরুতর দুর্বৃত্ততার জন্য অপরাধী হত। তারা শাস্তি পাওয়ার ভয়ে বঙ্গে পলায়ন করত। বোম্বাই (বর্তমান মুম্বাই) হতে আসত বলে তাদের বলা হত বোম্বেটে। দস্যুতাই ছিল তাদের ব্যবসা। এদেশে এখনো চরিত্রহীন, ফটকাবাজ লোকদের বোম্বেটে বলে। রাজবাড়িতে এ শব্দটির ব্যাপক ব্যবহার আছে। সে সময় সন্দ্বীপ বা সোমদ্বীপ বঙ্গোপসাগরের মধ্যে একটি উর্বর দ্বীপ। উৎপন্ন শস্য ও পণ্যের জন্য নাম ছিল স্বর্ণদ্বীপ এবং তা থেকেই হয় সন্দ্বীপ। দ্বীপটির আকার তখন  ছিল ১৪ মাইল দীর্ঘ আর ১২ মাইল প্রশস্ত। সন্দ্বীপ তখন ভারতের প্রধান লবণ ব্যাবসার কেন্দ্র ছিল। প্রতিবছর দুইশতেরও বেশি জাহাজ নবণ বোঝাই করে নিয়ে যেত। ক্রমে সেখানে মগ ও পর্তুগীজদের বসতি স্থাপন হয়। তাদের পূর্বে সেখানে মুসলমানেরা বাস করত। পর্তুগীজদের অনেকে স্ত্রী নিয়ে আসত না। তারা ক্রমে এদেশে বিবাহের অনুমতি পায়। যে সব পর্তুগীজদের দুর্বৃত্তায়নের জন্যে এদেশে পালিয়ে আসত তারা এদেশে বিবাহ করত। কেউবা একাধিক বিবাহ করত আবার কেউ উপপত্নি রাখত। তারা বিলাসিতায় গা ভাসিয়ে দিত। আবার অনেকে ব্যাতিব্যস্ত হয়ে দস্যুতাতে লিপ্ত হত। এছাড়া গোয়ায় ও বোম্বে উপনিবেশবাদী পর্তুগীজদের অনেকটাই ইন্দ্রীয়সেবায় মত্ত হয়ে এদেশীয়দের স্ত্রীলোকের সংস্পর্শে বর্ণশঙ্কর জন্ম  দিত, তারা ফিরিঙ্গী নামে পরিচিত হত।

মগ, পর্তুগীজ ফিরিঙ্গীর দল ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যভাগে এমন দস্যুবৃত্তি আরম্ভ করেছিল যে, বঙ্গে তখন কোনো শাসনই ছিল না। মগ ও ফিরিঙ্গী দস্যুগণ বঙ্গের দক্ষিণদিক হতে নদীপথে দেশের মধ্যে যেখানে সেখানে প্রবেশ করে লণ্ঠন, গৃহদাহ ও জাতিনাশে লিপ্ত হত। বঙ্গের শান্ত পল্লীগুলি শ্মশানে পরিণত হওয়ার উপক্রম হল। বার্ণিয়ের ভ্রমণকাহিনী থেকে জানা যায় চৌর্য আর দস্যুতাই ছিল তাদের প্রধান ব্যবসা। তারা দ্রুতগামী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাহাজ নিয়ে নদীনালা বেয়ে শতাধিক মাইল পর্যন্ত দেশের ভিতরে প্রবেশ করত। শহর, বাজার কিংবা বিবাহের দ্রব্যাদির সংবাদ পেলে সেখানে আক্রমণ করত এবং যা পেত তা লুটে নিত। স্ত্রীগণকে ধরে নিয়ে দাস হিসেবে বিক্রি করে দিত।


বাড়ি ঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিত আর মগ ও ফিরিঙ্গী দস্যুগণ জলপথে এসে কেবল লূট করত না তারা হিন্দু মসলমান স্ত্রী - পুরুষ ধরে নিয়ে যেত। তারা বন্দিদের হাতের তালূ ছিদ্রি করে তার মধ্যে শক্ত বেত চালিয়ে দিত এবং এভাবে গেঁথে তাদের জাহাজের পাটাতনের নিচে একটার পর একটা স্তুপীকৃত করে নিয়ে যেত। লোকে যেমন মুরগীর খাবার হিসেবে চাউল ছিটিয়ে দেয় এরুপ সকাল বিকালের অসিদ্ধ চাউলের মুষ্ঠি খাবার হিসেবে ছিটিয়ে দিত। এমন খাদ্য খেয়ে যারা বেঁচে থাকত দস্যুরা তাদের দেশে নিয়ে কঠিন কাজে নিয়োজিত করত। অনেককে দাক্ষিণাত্যে নিয়ে ওলন্দাজ ইংরেজ ফরাসীদের নিকট বিক্রি করে দিত। তাদের এ অত্যাচার দক্ষিণ বঙ্গে প্রায় সকল স্থানে এবং হুগলি পর্যন্ত বিস্তৃত লাভ করে। তাদের অত্যাচারে অনেক স্থান বিরাণভুমিতে পরিণত হয়েছিল। সম্রাট শাহজাহান ১৬৩৩ খ্রিস্টাব্দ হুগলি থেকে তাদের বিতাড়িত করেন। চট্রগ্রাম থেকে ফরিদপুরসহ অত্র অঞ্চলে তারা ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। গ্রামে এসে যে মুল্লুকের ওপর পড়ত সেখানে শাসননীতি থাকত না। এমন অঞ্চলকে মানুষ মগের মুল্লুক বলত। এসব কথা এখনো এ অঞ্চলে প্রচলিত আছে। যশোর রাজা প্রতাপাদিত্য তাদের দমনের জন্য বহু সংখ্যক দুর্গ নির্মাণ করেছিল এবং অনেকাংশে তাদের মৃত্যুর পর মগ পর্তুগীজ ফিরিঙ্গীর দল আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।

ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি সেবাসটিয়ান গঞ্জালেশ কার্ভালহের নেতৃত্বে তাদের অত্যাচার শুরু হয় যা প্রায় ৫০ বছরের অধিক কাল স্থায়ী হয়। পুর্তুগীজদের নৌ বিহারের নাম ছিল আর মার্তা। তা থেকে ফিরিঙ্গী জলদস্যুদের হারমাদ বলত। কথাটি এ অঞ্চলে এখনো প্রচলিত। কবি কঙ্কন চণ্ডিতে-----‘ফিরিঙ্গীর দেশখান বহে কর্ণধার, রাত্রি দিন বহে ডিঙ্গি হারমাদের ডরে।’ জানা যায় ডোমিঙ্গ কার্ভালোহ সন্ধীপে থেকে বিতাড়িত হওয়ার কালে বিক্রমপুরের রাজা কেদার রায়ের মেয়ে রাজকন্যা অঞ্জালিকা চৌধুরীকে সাথে নিয়ে যায়। ডোমিঙ্গ কার্ভালোহ তিমুরের পূর্বাংশে একটি মহরের নাম দিয়েছিল ভারত রাজ্যের রাজধানী দিল্লীর নামে।

মগ, ফিরিঙ্গী, পর্তুগীজদের এখনো অনেক স্মৃতি বিদ্যামান। এখনো দক্ষিণবঙ্গের অনেক স্থানের নাম ফিরিঙ্গী খাল, ফিরিঙ্গীর বাজার। মগ ফিরিঙ্গীরা যে সব বাড়ি বা পরিবার হানা দিত সমাজে তাদের পতিত বলে গণ্য করা হত এবং পরিবারকে মগো ব্রাহ্মণ, মগো বৈদ্য, মগো কায়েত, মগো নাপিত বলা হত। এখনো  মাগুরা ফরিদপুরের অভ্যন্তরে ভূষণা প্রভৃতি স্থানে মগো পরিবার শ্রেণির লোকের বসবাস রয়েছে।

সেবাসটিয়ান গঞ্জালেশ, কার্ভালোহ পর্তুগীজ জলদুস্যুর দল সে সময় রাজবাড়ি অঞ্চলে ব্যাপক দস্যুতায় মেতে ওঠে। তার সে সময় পদ্মার কূল ধরে এ অঞ্চলে প্রবেশ করত। বর্তমান গোয়ালন্দ ছিল তাদের এ অঞ্চলের প্রধান আস্তানা। দস্যুদের দল রাজবাড়ি অঞ্চলের হড়াই, গড়াই, চন্দনা নদীর তীর ধরে ভিতরে প্রবেশ করে দস্যুতা চালাত। কথিত আছে পুর্তগীজ জলদস্যুদের দ্বারা বেগম মোমতাজমহলের দুইজন দাসী অপহৃত হয়। পুর্তগীজদের এ অত্যাচার দমনের জন্য ১৬৩২ খ্রিস্টাব্দে কাসিম খানের নেতৃত্বে তাদের অবরোধ করেন। যুদ্ধে পুর্তগীজরা বহু সৈন্য নিহত হয়। তারা পরাজিত হলেও পরে আরাকানী মগদের সাথে মিশে ভাটি অঞ্চলে লুটতরাজ আরম্ভ করে। সম্রাট আওরঙ্গজেব ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে মীর জুমলাকে বাংলার সুবেদার করে পাঠান। এ সময় রাজবাড়ি অঞ্চলের মগ, পর্তুগীজ দস্যুদের দমনের জন্য রাজা সংগ্রাম সাকে অত্র অঞ্চলের নাওয়াড়া প্রধান করে পাঠান হয়।

নীলচাষ ও নীলবিদ্রোহ

বৃটিশ শাসনকালে এদেশে নীলের চাষ, নীলের ব্যবসা, নীলচাষের সাথে প্রজাকুলের দুর্ভোগ এবং নীলচাষের বিরুদ্ধে সচেতন মহল এবং কৃষককুলের বিদ্রোহ ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। নীলচাষকে কেন্দ্র করে ইংরেজ সাহেব, কুঠিয়াল এবং এদেশের জমিদার, জোতদার, মহাজনদের প্রজাশোষণ, নিপীড়ন ও অন্যায় অত্যাচারের এক করুন চিত্র পাওয়া যায়। ইংরেজ শাসনকালে ১৭৯৫ থেকে ১৮৯৫ প্রায় একশত বছর এদেশে নীলের চাষ ও ব্যবসা ছিল। বর্তমান যশোর, খুলনা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, ‍কুষ্টিয়া, রাজবাড়ি, ফরিদপুর, ঢাকা, পাবনা জেলাসহ পশ্চিমবাংলার বিভিন্ন স্থানে ব্যাপকাকারে নীলের চাষ করা হত। এ অঞ্চলেই নীলচাষের বিরুদ্ধে বিদ্রেহ গড়ে ওঠে যা ‘নীলবিদ্রোহ’ বলে পরিচিত। নীলচাষের বিরুদ্ধে কলম ধরেন সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিক্ষিত সমাজ।


যশোরের চৌবাড়িয়ার দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীল দর্পন’ কলিকাতার হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘হিন্দুপ্যাট্রিয়ট’ এবং রাজবাড়ির মীল মশাররফ হোসেনের ‘জমিদার দর্পন’ ও আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘আমার জীবনী’ নীলচাষ বিষয়ে প্রমাণ্য গ্রন্থ। পরবর্তী পর্যায়ে এ সকল গ্রন্থ নীলচাষের বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন করে তোলে। বিশেষ করে ‘নীল দর্পন’, ‘জমিদার দর্পণ’, ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’, নীলবিদ্রোহ গড়ে ‍তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ভারতবর্ষে আর্য, গুপ্ত, পাল, সেন, পাঠান, সুলতান, মোগল স্বজাতীয় ঐতিহ্যের ধারক। কেবল ইংরেজ শাসনকাল (১৭৫৭-১৯৪৭ ভারতে ঔপনিবেশিক শাসন বলে পরিচিত। পঞ্চদশ শতকের শুরু থেকেই ইউরোপীয় বণিকেরা ব্যবসা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে নানা দেশের নানা পথ খুঁজতে থাকে। ভাস্কো-দা-গামা, কলম্বাসের নাম ইতিহাস খ্যাত। এভাবেই ষোড়শ শতকের প্রথমেই ইংরেজরা এদেশে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে আগমন করে। নানা সূত্রে ব্যবসার উদ্দেশ্যে কুঠি নির্মাণ করতে থাকে। শেষে সুযোগমত ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে কূটকৌশলে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ্দৌলাকে পরাজিত করে ভারতকে তাদের উপনিবেশে পরিণত করে। বৃটিশ সিংহাসনের আদেশে পৌনে দুইশত বছরের শাসনকালে ভারতের প্রতি শোষণ ও ব্যবসাই হয়ে ওঠে তাদের নীতি আদর্শ।

ইংরেজ শাসনের শুরুতেই তারা ভূমি রাজস্বের কর্তৃত্ব (১৭৬৫) গ্রহণ করে নব্য জমিদার শ্রেণির উদ্ভব ঘটায়। ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে জমিদারী চিরস্থায়ী হলে প্রজার ভূমির উপর স্বত্ব লোপ পায়। জমির প্রকৃত মালিক হয়ে পড়ে জমিদার, পত্তনিদার, দরপত্তনিদার, তেপত্তনিদার, ছেপত্তনিদার। পাটসহ অর্থকারী ফসল উৎপাদন তেমন শুরু হয় নাই। তুলা, রেশম, জাফরান, আখ, ধান, তৈলবীজ ও ডাল উৎপাদন ছিল প্রধান ফসল। এ সময়কালেই নীলচাষ ও নীলের ব্যবসা শুরু হয়।

নীলচাষকে তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত রা যাবে। ১৭৭৯ থেকে ১৮১০ পর্যন্ত নীলচাষের প্রারম্ভিক কাল। ১৮১০ থেকে ১৮৬০ অর্থাৎ ১৮৫৮ সালে নীলবিদ্রোহের পূর্ব পর্যন্ত নীলের চাষ ও ব্যবসার ক্রমোন্নতির কাল। ১৮০০ শতকের শেষে নীলচাষের সমাপ্তিকাল।

অষ্টাদশ শতাব্দীর শিল্প বিপ্লব ইংল্যান্ড তথা সমগ্র ইউরোপে অর্থনীতির চালচিত্র বদলে দেয়। সহসাই শিল্প কলকারখানার ব্যাপক বিকাশ ঘটতে থাকে। বিশেষ করে ইংল্যান্ডে বস্ত্রশিল্প বিকাশ লাভ করায় সুতা ও কাপড় ছাপানোর রঙের ব্যাপক চাহিদার সৃষ্টি হয়। তখন আজকের মতো এত বাহারী রাসায়নিক রং ছিল না। গাছ থেকে উৎপাদিত রং ব্যবহার হত। গাছ থেকে প্রাপ্ত রং ছিল নীল। তাই গাছটি হল নীল গাছ। আর পাটের বা ধানের পরিকল্পিত চাষের মতো নীল উৎপাদনের নাম হল নীলচাষ।

নীল এদেশে নতুন নহে। অতি প্রাচীন কাল থেকে নীলবন্ডের কথা ভারতবাসী জানত এবং তারা নীল রং প্রস্তুত কৌশলও জানত। ধ্যানস্থ আর্য ঋুষিগণ আকাশের রং থেকে পালনকর্তা বিষ্ণুর বর্ণ নির্ণয় করেছিলেন এবং পটে বা প্রতীকে সেই নীলবর্ণ প্রতিফলিত করতেন। প্লীনি প্রভৃতি প্রাচীন রোম পণ্ডিতগণ ইন্ডিকাম (Indicum) বলে এর বর্ণনা করেছেন। নীল ইংরেজি ইন্ডিগো (Indigo) যার বৈজ্ঞানিক নাম Indigofera Tinctora.

আবুল ফজলের আইন-ই-আকবরীতে দেখা যায় গুজরাটের অন্তর্গত আহমেদাবাদে এবং আগ্রার নিকটবর্তী বায়নাতে উৎকৃষ্ট নীল রং প্রস্তুত করা হত এবং তা কনস্টান্টিনোপলে রপ্তানি হত। বার্নিয়ের ভ্রমণকাহিনী থেকে জানা যায় বায়না প্রভৃতি স্থানে নীল সংগ্রহের জন্য ওলন্দাজ বণিকেরা সেখানে বাস করতেন। ভারতবর্ষে তখন কী প্রণালীতে নীল রং প্রস্তত হত তা জানা যায় না। ইংরেজ শাসনকালের প্রথম দিকে আমেরিকা থেকে নীল উৎপাদনের নব পদ্ধতি নিয়ে আগমনে ঘটে লুই বোনডের। বলা হয় এদেশে লুই বোনডই নীলচাষ, কুঠি নির্মাণ এবং নীল ব্যবসার প্রবর্তন করে। ১৭৩৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি ফ্রান্সের অন্তর্গত মার্সেল শহরে জন্মগ্রহণ করেন এবং দৈবক্রমে পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে গিয়ে নীলের ব্যবসা শুরু করেন ১৭৭৭ সালে তিনি চন্দন নগরে অবস্থান করতঃ নিকটবর্তী তালডাঙ্গা ও গোন্দলপাড়ায় দুটি নীলকুঠি স্থাপন করেন। ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি বাকিপুরের নীল ব্যবসায়ে যোগ দেন এবং স্বপ্লকালের মধ্যে যশোরের অন্তর্গত নহাটা কারবারের মালিক হন। সর্বশেষ ১ বছরে তিনি কালনা নীলকুঠি থেকে ১৪০০ মণ নীল রপ্তানি করেন। ১৮২১ সালে তার মৃত্যু হয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অনুমতি ব্যতিত কোনো বিদেশী বণিক নীল কারখানার জন্য কোনো কাজ নিতে পারতেন না। ১৭৯৫ সালে বন্ড সাহেব কোম্পানির অনুমতি নিয়ে যশোরের অন্তর্গত রুপদিয়াতে এ অঞ্চলের সর্বপ্রথম কুঠি স্থাপন করেন।


এরপর ১৮১১ সালের মধ্যে তৎকালীন নদীয়া, পরিদপুর, ঢাকা, খুলনার অঞ্চলে ব্যাপক হারে নীলকুঠি স্থাপনসহ নীলচাষ ও ব্যবসা ছড়িয়ে পড়ে। বলা যায় ১৮১১ সালের পর থেকেই বর্তমান যশোর, মাগুরা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, রাজবাড়ি, ফরিদপুর ও ঢাকা অঞ্চলে ব্যাপকহারে নীলের চাষ শুরু হয়। রাজবাড়ি জেলার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নেই নীলকুঠি ছিল। এরমধ্যে কোনো কোনো ইউনিয়নে ২ থেকে ৩টি কুঠির সন্ধান পাওয়া যায়। তবে গড়াই চন্দনার পাশ্ববর্তী পাংশা ও বালিয়াকান্দি উপজেলাতেই বেশি পরিমাণ নীলের চাষ করা হত। পাংশা, যশাই, জলিলপাড়া, বাবুপাড়া, বাগদুল, মাচপাড়া, কশবামাঝাইল, কুঠিমালিয়াট, কোর্দি, মৃগী, সাওরাইল, বাকশাডাঙ্গী, মধুপুর, ঘিকমলা, গাড়াকোলা, বালিয়াকান্দি, সোনাপুর, বহরপুর, জঙ্গল, সংগ্রামপুর, বেলগাছি, পদমদি, কালুখালি, যশাই, দুর্গাপুর, দলাগিলা, কুঠিরহাট, বারবাকপুর, বসন্তপুর, রামদিয়া, সেকাড়া এসব জায়গায় ষাটের দশকেও নীলকুঠির ধবংসাবশেষ দেখা যেত।

বিদ্যালয়ের পথে যেতে নাড়ুয়া ইউনিয়নের মধুপুর গ্রামের ঝোপঝাড় আচ্ছাদিত একটি ভগ্নকুঠির দেখতে পেতাম। ঐ ভগ্ন কুঠির সম্বন্ধে এলাকার মানুষ কিছুই বলতে পারত না। এখন বুঝতে পারি সেটা ছিল ১৮২০ এর দশকে স্থাপিত নীলকুঠি। মদাপুর ইউনিয়নের একটি গ্রামের নাম সংগ্রামপুর। কথিত আছে ঐ গ্রামের সাধারণ কৃষকেরা নীলচাষের বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত হয়, যে কারণে গ্রামের নাম হয় সংগ্রামপুর। জঙ্গল ইউনিয়নে এখনো একটি ভিটে দেখা যায় লোকে যাকে ‘ঠাঠা পড়ার ভিটে’ বলে। কথিত আছে নীলচাষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দমনে ঐ পথ দিয়ে ইংরেজ গোড়া সিপাই ঘোড়ায় চড়ে আগমন করত। চাষীরা ঐ পথে কন্দক কেটে রাখে এবং মাটির ঢিবি তৈরি করে বিদ্রোহীরা লাঠিসোটা নিয়ে আড়ালে বসে থাকে। ইংরেজ সিপাই দ্রুত ঘোড়া চালিয়ে আসতে খন্দকে পড়ে যায়। সেই সুযোগে বিদ্রোহীরা লাঠি নিয়ে তাদের পিটিয়ে ঐ গর্তে পুতে রাখে। সেই থেকে স্থানটিকে লোকে বলে-----ঠাঠা পড়ার ভিটা। বর্তমানেও নীলগাছ বিভিন্ন স্থানে দেখতে পাওয়া যায়। রাজবাড়ি সরকারি কলেজের বিজ্ঞান ভবনের সামনে একটি নীলগাছ আছে। যশোর ঝিনাইদহ অঞ্চলে এখনো নীলগাছ উৎপাদন করা হয়। তবে তা লাকড়ী ও ফসলের সবুজ সার সংগ্রহের জন্য। রং উৎপাদনের জন্য নয়। সাধারণ মানুষ একে মালগাছ বলে। নীলগাছ আকাড়ে ছোট। পাতা অনেকটা ধনচে পাতার মতো তবে ধনচে পাতা থেকে পত্র বিস্তারের দৈর্ঘ্য বেশি। নীলগাছ ডালপালাসহ সর্ব্বচ্চ ১১/১২ ফুট লম্বা এবং কাণ্ড ১ থেকে দেড়ফুট মোটা হয়। সাধারণত চারাগাছ থেকে নীল উৎপাদিত হয়। আউশ ধানের ক্ষেতে আশ্বিণ-কার্তিক মাসে নীলের বীজ বপন করা হত। উঁচু জমিতে বপন করা হত মাঘ-ফাল্গুন মাসে। আর নিচু জমিতে নীলচাষ করা হত চৈত্র মাসে। নীল গাছ দেড় থেকে দুই ফুট লম্বা হলে তা কেটে কারখানায় (নীলকুঠিতে) এনে জাগ দেওয়া হত। এরপর তা কারখানার বড় কড়াইতে জ্বাল দিয়ে কিছু রাসায়নিক দ্রব্যের সংমিশ্রনে নীল তৈরি করা হত। বর্তমানে প্যাকেটে যে গুড়া নীল পাওয়া যায় তখনকার নীলগাছ থেকে প্রাপ্ত নীল তেমন ছিল না। সে নীল ছিল দলা দলা এবং সহজে পানিতে দ্রবিভূত হয়ে যেত।

প্রথমত জমিদারের অধীন অল্প অল্প জমি নিয়ে সাহেবরা স্থানীয় প্রজাদের সাহায্যে নীলের চাষ করাতেন। ১৮১৯ সালের অষ্টম আইনে Regulation Vlll of 1819) জমিদারিদিগকে পত্তনী তালুক বন্দেবস্ত দেওয়ার অধিকার দেওয়ায় এক এক পরগনার মধ্যে অসংখ্য তালুকের সৃষ্টি হয়। নবাগত জমিদারগণ নীলকরদের নিকট হতে উচ্চহারে সেলামী নিয়ে নীলচাষের জন্য বড় বড় পত্তনী দিতে লাগলেন। দেশের বিপুল সম্পত্তির অধিকারী যারা তারাও নিজ অথবা অন্যের জমির মধ্যে পৃথক ভাবে পত্তনী নিয়ে নীলের চাষ করাতেন। যশোর, নদীয়া, ফরিদপুরের নীলের খ্যাতি বিলেতে পৌঁছিলে সে দেশের বহু ধনীর পুত্র আরো ধনী হওয়ার আশায় এ দেশে আসতে লাগলেন। কেহ নিজে স্বত্ত্বাধিকারী থেকে কেহবা কয়েকজন মিলে যৌথ কোম্পানি স্থাপনপূর্বক বিস্তৃত কনসার্ন (concern) বা কারবার খুলে বসতেন। একমাত্র যশোর জেলাতেই এরুপ ১৩টি কনসার্ন গড়ে ওঠে। এক একটি কনসার্নের মধ্যে ১৫/২০টি কুঠি (নীল উৎপাদন কারখানা) থাকত। সকল কুঠির পরিচালনা ও কার্যাব্যবস্থা একই কর্তৃপক্ষের অধীনে থাকত। কনসার্নের ম্যানেজারকে বলা হত বড় সাহেব আর সহকারীকে বলা হত ছোট সাহেব। কনসার্নের মধ্যে প্রধান কুঠিকে বলা হত-----সদরকুঠি। তৎকালীন কুমারখালি, খোকশা, পাংশা, বালিয়াকান্দি, রাজবাড়ি, গোয়ালন্দকে নিয়ে নীলচাষের কয়েকটি কনসার্ন বা কারবার কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। এর মধ্যে কুমারখালি শালঘর মধুয়া ছিল বৃহৎ কনসার্ন। এ কনসার্নের অধীনে অত্র জেলার পাংশা, মাছপাড়া, যশাই, জলিলপাড়া, খোকশা, কশবামাঝাইল, বাবুপাড়া, বাগদুল, মৃগী, ঘি-কমলা, নাড়ুয়া, মধুপুর, গাড়াকোলা, শিকজান, পদমদি, কুটিরহাট, সেকাড়া, সোনাপুর, সংগ্রামপুর, বেলগাছি, বহরপুর নীলকুঠিগুলো ছিল।


এর সদরকুঠি ছিল কুমারখালির শালঘর মধুয়া কুঠি। বড় সাহেব ছিলেন টিআই ক্যানী। অন্য বৃহৎ কনসার্ন বা কারবার কেন্দ্র ছিল কুমারখালি। এ কারবার কেন্দ্রের অধীনে ছিল জঙ্গল, বালিয়াকান্দি, সমাধিনগর, সাধুখালি, কোড়কদি, জামালপুর, নলিয়া, আরকান্দি, কুঠিরহাট, কুঠিপাঁচুরিয়া, মধুখালিসহ বর্তমান ফরিদপুর জেলার কামারখালি সংলগ্ন নীলকুঠি। সদর কুঠিসমূহ কামারখালিতে ছিল।

মীর মশাররফ হোসেনের ‘আমার জীবনী’ আত্মকথা থেকে অত্র অঞ্চলের নীলচাষ, নীলের ব্যবসা এবং নীলকরদের অন্যায় অত্যাচার বিষয়ে আলোকপাত করা যায়-----‘পূর্বে চন্দনা নদী দক্ষিণে বহুদূর খোলা মাঠ। পশ্চিমে পদমদি গ্রাম। নবাবের নীলকুঠি। ইতিপূর্বে কোনো সময় নীল কার্যের জন্য দেশী সাদামুখ সাহেব সপরিবারে নীলকুঠি প্রধান কার্যকারক রুপে নিযুক্ত হইয়াছেন।’ (মশাররফ রচনাসম্ভার, পৃষ্ঠা--২৩৯) নবাবের নীলকুঠি বলতে পদমদীর নবাব মীর মোহাম্মদ আলীর কথা বলেছেন। এ প্রসঙ্গে ২১১ পৃষ্ঠায় লেখা----‘কারবারে খুব টাকা পাইতে লাগিলেন। নীলকার্যের ভার, সমুদয় জমিদারীর ভার তোমার বাপের হাতে দিয়া তিনি কলিকাতায় গেলেন। এখানে তোমার বাপ নীলকার্যে এতই আয় করিলেন যে, একবার ১২৫ মণ নীলের ওপর কলিকাতায় পাঠাইলেন। মীর খয়রাতি (নবাব মোহাম্মদ আলীর ডাক নাম) নিজে যে কয় বছর নীলকার্য দেখিয়াছিলেন তাহাতে বৎসরে বিশ মণ, পচিশ মণ নীলের উপর হয় নাই। একবার মাত্র ৫০ মণ মাল হইয়াছিল। তোমার বাপ মেহনত করিয়া বছরে বছরে ৮০/৯০ মণ নীল কলিকাতায় পাঠাইতেন। মৃগীর কুঠির নীলসাহেবদের নীলের সমান দরে বিক্রি হইত। শুনিয়াছি নীল বিক্রি করিয়া মীর খয়রাতী কোনো বৎসর বিশ হাজার, কোনো বৎসর পঁচিশ হাজার-----একবার পাইয়াছিল পঞ্চাশ হাজার টাকা।’ এ তথ্য থেকে জানা যায় তখন নীলচাষ কতটা লাভজনক ছিল। আরো অনুমান করা যায় নীলচাষ প্রারম্ভে কনসার্নভিত্তিক থাকলেও পরে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জোত ও তালুকে পরিণত হয় এবং নীল ব্যবসার মালিক হয়ে ওঠেন ইংরেজ সাহেব এবং স্থানীয় বড় বড় জমিদার। মীরের আত্মজীবনী বইয়ের ১১৪ পৃষ্ঠায়----‘শালঘর মধুয়ার কুঠি টমাস কেনীর সদর কুঠি। ঐ কুঠির অন্তর্গত আরো কয়েকটি কুঠি ছিল। প্রত্যেক কুঠিতেই ইংরেজ কুঠিয়াল নিযুক্ত। মীরপুর নামে এক কুঠি ছিল। ঐ কুঠিতে এক ইংরেজ কুঠিয়াল কেনীর পক্ষে কার্য করিতেন। বোধ হয় ঐ কুঠিতে তার কিছু অংশ ছিল। কুঠি প্রধানই হোক আর ক্ষুদ্রই হোক প্রত্যেক কুঠির নিকটে ঐ নীলকরদের জমিদারী ছিল।’

নীলচাষের পদ্ধতি ছিল দুটি যথা------লিজ ও রাইয়তী। কোনো ব্যক্তি বা কোম্পানি নিজ জমিতে নিজের তত্ত্বাবধানে মজুর দ্বারা যে চাষ তা ছিল নিজ আবাদী। আর অগ্রীম টাকা বা দাদন দিয়ে প্রজাদের দ্বারা তাদের নিজ জমিতে কোম্পানি নীলের চাষ করিয়ে নিত। তাকে বল হত রাইয়তী বা দাদন পদ্ধতি। রাইয়তী বা দাদন পদ্ধতি ছিল দুই প্রকার যথা----এলাকা ও বে-এলাকা। রাইতরা দাদন নিয়ে নীল বুনতে চুক্তি করতেন। নিজের জমিতে চাষ করলে তাকে এলাকা এবং অন্যের জমিতে চাষ করলে বে-এলাকা বলত। নীলগাছ কেটে কুঠির এক অংশে জমা করা হত। তাকে বলা হত নীলখোলা। প্রতিবিঘায় নীলচাষের জন্য খরচ ছিল----চাষ-১ টাকা খাজনা -১০ আনা, বীজ-৪ আনা, নিড়ান-৮ আনা, গাছকাটা-৪ আনা, দাদনের একবার নামার জন্য স্ট্যাম্প-২ আনা, মোট খরচ=৩ টাকা।

সাধারণ বিঘা প্রতি ৮ থেকে ১২ বান্ডিল নীলগাছ জন্মত। প্রতি ৪ বান্ডিল ১ টাকা ধরে গড়ে ৮ বান্ডিলে নী থেকে আয় ২ টাকা। প্রতি বিঘায় ১মণ বীজ জন্মাত যার দাম ৪ টাকা। মোট ৬ টাকা। খরচ ৩ টাকা বাদ দিলে লাভ ৩ টাকা এবং দাদনের খরচ ২ টাকা বাদ দিলে কৃষকের প্রতি বিঘায় ১ টাকা। আর নীল ১২ বান্ডিল হলে আয় দাঁড়াতো ২ টাকা (Indigo Company Report, page-23)। তবে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে নীল ভালো না জন্মিলে দাদনের টাকা পরিশোধ হত না। উল্লেখ্য গ্যাস্ট্রোল সাহেব নীলের আয় প্রজার পক্ষে মাত্র চার আনা ধরেছেন।

প্রথমত নীলচাষ লাভজনক ভেবে কৃষকেরা নীল উৎপাদনে আগ্রহী হয়ে ওঠে। উঁচু জমিতে বটেই নিচু ধানের জমিতেও তার নীলচাষ শুরু করে। ফলে কৃষকের ধান উৎপাদন কমে যায়। এতে খাদ্যাভাব দেখা দেয়। নীলচাষে তাদের নামমাত্র লাভ থাকত। এরপরেও মাপনের সময় ৬ বান্ডিলকে ৪ বান্ডিল বা ৪ বান্ডিলকে ২ বান্ডিল করা হত। এছাড়াও তারা দিনের পর দিন দাদনের ঋণে আটকা পড়ে সর্বশান্ত হতে থাকে। নীলকরগণ জাল চুক্তিপত্র করে বছরের পর বছর তাদের দাদনের মধ্যে রেখে দিত। নীলকরদের দালালগণ জমি মাপার সময় কৃষকদের ফাঁকি দিত। দেড় বিঘা জমি মেপে একবিঘা করত। ১৮৫৪ সালে যশোর জেলা ম্যাজিস্টেট ডানভার লিখেছেন----‘নীলকরগণ উৎকৃষ্ট জমিতে নীলচাষ করাতো কিন্তু তাদের প্রকৃত মজুরী অপেক্ষা কম মজুরী দিত। তারা ১৭৯৫ সালে নীলের যে মূল্য নির্ধারণ করেছিল অর্ধ শতাব্দী পরেও কৃষকদের সেই মূল্যে নীলচাষ করাতে বাধ্য করত।


নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বেড়েছিল কিন্তু নীলকরগণ তা গ্রাহ্য করত না। ঐশ’লি এডেন লিখেছেন----‘খুন, দাঙ্গা, ডাকাতি, লুন্ঠন, মেয়ে মানুষ চুরি, অগ্নিসংযোগ --এমন কোনো অন্যায় কাজ নেই যা তারা করত না। নীলের চাষে বাধ্যকরণ এবং নীলচাষ সম্প্রসারণ এত দ্রুত বৃদ্ধি পেতে লাগল যে এক সময় মনে হত এদেশে আর ধানের চাষ হবে না। ১৮৪২ সালে বাংলাদেশের পুলিশ প্রধান জানান যে, ফরিদপুরের পশ্চিমাঞ্চলের (বর্তমান রাজবাড়ি অঞ্চল) জমিদারগণ কৃষকদের উপর নানাভাবে অত্যাচার করছে। তাদের ধন সম্পত্তি লুটতরাজ করতেও দ্বিধা করছে না।’ আব্দুল মোতালেব নামে এক ব্যক্তি ১৫০ বছর পূর্বে এক পত্রিকায় লিখেছেন---------‘আল্লা এমন করে মারিস কেন? তুই তো সবই পারিস। একদিন কেন সকল রায়তদের মেরে রায়তদের দেনা পরিশোধ করে দেনা। দোহাই আল্লা তোর কাছে এই দরখাস্ত করছি, তুই একদিনে আমাদের মেরে ফ্যাল।’ (প্রথম আলো পত্রিকা, প্রতিবেদন, মুনতাসির মামুন)। ১৮৪৮ সালে ফরিদপুরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন জেলাটুর সাহেব। তিনি উল্লেখ করেন যে, এমন একটি নীলের বাক্স ইংল্যান্ড গিয়ে পৌছায় না, যা বাংলার কৃষকদের রক্তে রঞ্জিত নয়।

নীলকর ও জমিদারদের অত্যাচার এতটাই বিভিষীকাময় ছিল যে তা ভাষায় বর্ণনাতীত। সাধারণ লোকে ইংরেজ বলতে কোম্পানিকেই বুঝত। এই কোম্পানিই হর্তাকর্তা বিধাতা। এই কোম্পানি যে কত কৌশলে সাধারণ মানুষের সর্বশান্ত করেছে তার শেষ নেই। কোম্পানির গায়ের জোরে সাধারণ প্রজাদের নিঃশেষ করাই যেন উদ্দেশ্য। ‘কুঠির চতুর্পাশ্বের গ্রামে সকল যেনতেন প্রকারে হস্তগত না করিয়া আর কুঠির পত্তন করিতেন না। ছোটখাট জমিদার তালুকদার হইলেত কথাই নাই। লাঠির চোটে, গুদামঘরের সহায়ে, দেশী লাঠিয়ালগণের সাহায্যে, বিদেশী পাঁড়ে দেবে- চোরে, সিং-সিমির রাজপুতদের ঢাল তরবারীর জোরে কত কাণ্ডই যে এদেশে করিয়াছেন তাহার সমুদয় ঘটনার বিস্তারিত বিবরণী প্রকাশ করা সহজ ব্যাপার নহে।’(মীর মশারফ রচনাসম্ভর, পৃষ্ঠা-১১৪)।

দখল, নির্যাতন, নিপীড়ন, শোষণের মধ্যেই কুঠিয়ালদের অন্যায় অবৈধ কাজ সীমাবদ্ধ ছিল না। তারা প্রজাদের ঘটি-কম্বল থেকে শুরু করে কার ঘরের বউ ও যুবতী মেয়েদের ওপর নজর তুলত। এরুপ ঘরের কোনো মেয়ের উপর নয়ন পড়লেই তার আর রক্ষা থাকত না। ‘ছলে বলে কৌশলে কুঠিয়াল তাকে হস্তগত করবেই। প্রয়োজনে অপহরণ করত। টাকাওয়ালা লোক অনেক আছে। কিন্তু বল প্রকাশের মধ্যে কুঠিয়ালদের কোনো কার্যে বাধা দেওয়ার শক্তি নাই। মীরপুর (কুষ্টিয়া) কুঠির সাহেবের বিরুদ্ধে দাঁড়াইতে কোনো লোকের সাধ্য নাই। কুঠির নামেই থরহরি কম্প। সাহেব দূরের কথা-----কুঠির নায়েব, গোমস্তা, আমিন, তাগাদাকারী, খালাসী, পাইক পেয়াদার যন্ত্রণাতেই অস্থির। তাহারা চক্ষু রাঙ্গাইয়া এক ধমক দিলেই চক্ষু স্থির। ইহার পর সিং দোবে, চোবে, পাঁড়ে বাঁধা কোমরে ঢাল তরবারী লইয়া আসিলেও সে সময় পাড়া প্রতিবেশীরা দিনে দুপুরেই আপন আপন ঘর বন্ধ করিয়া জঙ্গলে মাথা দেয়।’ (ঐ পৃষ্ঠা-১১৫)

নীলবিদ্রোহ ও নীলচাষের সমাপ্তি

১৮৫৮ সালে নীলবিদ্রোহের অগ্নি দেশময় ছড়িয়ে পড়লেও নীলচাষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উঠেছিল অনেক আগ থেকেই। ১৮১০ সাল থেকেই নীলচাষের বিরুদ্ধে প্রজা  সাধারণ সংগঠিত হতে থাকে। নীলকরদের অন্যায় অত্যাচার ছাড়াও জাত যাওয়ার মানসিকতায় তার সাহেবদের ভালো চোখে দেখত না। এ সময় পাদ্রীরা ব্যাপক হারে হিন্দু, মুসলমান উভয়ের দারিদ্রের সুযোগ নিয়ে খ্রিস্টান বানাতে থাকে। কথা উঠল, ‘জমির শত্রু নীল, কাজের শূল ঢিল, আর জাতীয় শত্রু পাদ্রী হীল।’ সে সময় থেকেই প্রজাগণ নীলকরদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনতেন। কিন্তু সরকার গোলমাল মেটাবার জন্য তেমন ব্যবস্থা করতেন না। ১৮৩০ অব্দে প্রজাদের পক্ষে এক চুক্তিনামার আইন পাস (Regulation V of 1830). হয়। কিন্তু পাঁচ বছর পর বেন্টিক এ আইন তুলে নেন। এছাড়াও নীল প্রধান জেলায় তৎকালীন বাংলার প্রথম বড়লাট হ্যালিডে সহকারী নীলকর ম্যাজিস্ট্রেট নিযুক্ত করতে লাগলেন। জনগণ ভাবতে আরম্ভ করল বুঝি সরকারই নীলের অংশীদার। নীলকরেরাও এই সুযোগ বুঝে অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে দিল। প্রজার ধানের জমি, আখের জমি, খেজুরের বন কেটে এবং বিদ্রোহী প্রজার ঘর ভেঙ্গে ভিটের উপর নীল চাষ করতে বাধ্য করল। ‘ভিটের ঘুঘু চড়ান’  প্রবাদটি এখান থেকেই এসেছে। আজও রাজবাড়ির মানুষ একটুতে একটু কিছু হলেই বলে, তোর ভিটেয় ঘুঘু চড়াব। তখন রাজবাড়ির পার্শ্ববর্তী জেলা পাবনা নীলচাষের আওতা বহির্ভুত ছিল বা ফীরদপুর, যশোর, কুষ্টিয়া, খুলনার মতো ব্যাপক নীলচাষ হত না। তারা নীলকরদের অত্যাচারের আওতামুক্ত থেকে সুখে ছিল। রাজবাড়ির মানুষ বলত, যে যায় পাবনা তার নেই ভাবন।


এ প্রবাদটি আজও রাজবাড়ির মানুষের মুখের বুলি। প্রজা প্রহারের জন্য তারা এক প্রকার মুণ্ডর তৈরি করেছিল যাকে বলা হত -----শ্যামচাঁদ। ওই শ্যামচাঁদের আঘাতে প্রজারা জর্জরিত হতেন। কুঠির লোকেরা প্রচার করছিল যে, প্রজাদের শাস্তির জন্য সরকার অচিরেই ‘মুণ্ডরের আইন’ পাশ করতে যাচ্ছে। মুণ্ডরের আইন আর শ্যামচাঁদের ভয়ে প্রজারা থরহরি কম্পমান থাকতেন। কিছু কিছু বিদ্রোহী প্রজা নীল বুনতে অস্বীকার করলে ক্রোধান্বিত কুঠিয়ালরা পাখির মতো গুলি করে মারত। ধীরে ধীরে প্রজারা ক্রোধান্বিত হয়ে উঠতে লাগল। তারা প্রতিজ্ঞা করল জীবন গেলেও তারা নীলচাষ করবে না। ১৮৫৮ সালে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠলো ফরিদপুর, রাজবাড়ি, যশোর, কুষ্টিয়ায়। দেখা দিল ‘সংঘবদ্ধ বিদ্রোহ’ যা ইতিহাসে ‘নীলবিদ্রোহ’ বলে পরিচিত।

যশোর, ফরিদপুর, কুষ্টিয়াই নীলচাষের প্রধান ক্ষেত্র বলে বিবেচিত। যশোরের চৌগাছার বিষ্ণুচরণ বিশ্বাস ও দিগম্বর বিশ্বাসের নেতৃত্বে প্রথম নীলবিদ্রোহ শুরু হয়। পরে তা সমগ্র অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ১৮৫৮ সালে শত শত নারী পুরুষ সংঘবদ্ধভাবে নীলচাষের বিরুদ্ধে ক্ষেপে ওঠে। ১৮৫৯ সালের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত এই বিদ্রোহ যশোর, ‍কুষ্টিয়া, নদীয়া, ফরিদপুর, ব্যাপককার ধারণ করে। নেতৃত্ব দেন চৌগাছার বিষ্ণুচরণ বিশ্বাস, পলু মাগুরার শিশির কুমার ঘোষ, সাধুহাটির জমিদার মথুরানাথ আচার্য, শরিয়তপুরের হাজী শরীয়তুল্লাহর ছেলে পীর দুদু মিয়া, রাজবাড়ির সোনাপুরের কৃষক হাশেম আলী, পাংশার জমিদার ভৈরব নাথ প্রমুখ। যশোরের চৌবাড়িয়ার নীলদর্পণ প্রণেতা দীনবন্ধু মিত্র, কলিকাতার হিন্দু প্যাট্রিয়ট সম্পাদক হরিশচন্দ্র মজুমদার, কুমারখালির কাঙ্গাল হরিনাথ, সুসাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেন, পাংশার রওশন আলী চৌধুরী খোন্দকার নজীর হোসেন লেখনীর মাধ্যমে বিদ্রোহীকে অগ্নিরুপ ধারণ করতে সাহায্য করেন।

১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে আশ্বিন মাসে দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়। এ নাটকে নীলকরপীড়িত বাংলাদেশের এক জীবন্ত চিত্র তুলে ধরা হয়। কয়েক মাসের মধ্যে এই পুস্তক পাদবী লং সাহেবের তত্ত্বাবধানে কবিবর মাইকেল মধুসূদন দত্তের লেখনীর সাহায্যে ইংরেজিতে অনূদিত হলে নীলকর মহলে হুলুস্থল পড়ে গেল। নীলকররা লং এর বিরুদ্ধে মামলা করলে তার একমাস জেল এবং ১ হাজার টাকা জরিমানা হল। কালীপ্রসন্ন সিংহ তৎক্ষাণাৎ  কোর্টে এক হাজার টাকা জমা দিলেন। কিন্তু কারাদণ্ড মাফ হল না। কিন্ত প্রজার চোখে মহান হয়ে উঠলেন লং সাহেব। কবিরা গ্রাম্য সুরে গান রচনা করল-----‘নীলবাঁদের সোনার বাংলা করল এবার ছারে খার, অসময়ে হারিয়া মলো, লং এর হল কারগার-----প্রজার প্রাণ বাঁচা ভার।’ মহারানী ভিক্টোরিয়া ইংল্যান্ডে রাজ্যাসনে বসার পর ভারতের শাসন বিভাগে এক নবযুগের অবতারণা হয়েছিল। প্রসিদ্ধ গ্রান্ট মহোদয় (Sir, JP Grant) বাংলার বড়লাট এবং দয়ার সাগর বলে পরিচিত। লর্ড ক্যানিং ভারতের রাজ্য প্রতিনিধি হলেন। বস্তুত তাদের সহায়তাতেই এদেশে নীলকরের দৌরাত্ব হ্রাস পেয়েছিল। ১৭৯৩ সালে বর্তমান রাজবাড়ি জেলার অধিক অংশ ঘাট গোয়ালন্দকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল তা থেকে রাজবাড়ি জেলাকে বাদ দেওয়ার অবকাশ নেই। তাই  যশোরের পলু মাগুরার শিশির কুমার এবং শরীয়তপুরের পীর দুদু মিয়া, পাংশার ভৈরব নাথ, সোনাপুরের হাসেম আলীর ভূমিকা আলোচনা প্রয়োজন।

১৮৫৮ সালে শিশির কুমারের বয়স মাত্র ১৮ বছর। এ যুবক যে জ্বালাময়ী ভাষণ দিয়ে প্যাট্রিয়ট পত্রিকার জন্য প্রবন্ধ লিখতেন তাতে ইংরেজ কর্তৃপক্ষের তাক লেগে যেত। যশোরের ম্যাজিট্র্রেট মেলোনী ও স্কীনার সাহেব তাঁকে ভয় দেখালেন কিন্ত লেখা থেকে বিরত করতে  পারলেন না। তিনি গ্রামে গ্রামে ঘুরে নীলচাষের বিরুদ্ধে প্রজাদের সংগঠিত ও সাহসী করে তুলতেন। গ্রামের সীমানায় একস্থানে একটি ঢাক থাকত, নীলকরের সাহেবরা অত্যাচার করতে এলে কেহ ঢাক বাজিয়ে দিতেন। অমনি শত শত গ্রাম্য কৃষক লাঠিসোটা নিয়ে তাদের ঘিরে ফেলত এবং তারা অক্ষত দেহে ফিরে যেতে পারত না। নীলকরের অত্যাচার থেকে রক্ষা করতেই যেন শিশির বাবু ঈম্বর কর্তৃক প্রেরিত হয়েছিল। এই মনে করে হিন্দু কৃষকগণ তাঁকে দেবতার ন্যায় ভক্তি করত। মুসলমান কৃষকগণ তাঁর নামে সিন্নি দিত। তাকে ‘সিন্নিবাবু’ বলে সকলে সম্বোধন করত। তাঁর ডাকে হাজার হাজার কৃষক সমবেত হত।

নীলবিদ্রোহের কেন্দ্র বলে পরিচিত চৌগাছা, সিন্দুরিয়া, জোড়াদহ, নয়াহাটা, চুয়াডাঙ্গা ছাড়িয়ে গড়াই নদীর উত্তর পাড়ে রাজবাড়ি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ল। মাদারীপুর, ফরিদপুরের বিভিন্ন অঞ্চলসহ রাজবাড়ির বালিয়াকান্দি, জঙ্গল, সোনাপুর, মৃগী, পাংশা, সংগ্রামপুর, কুমারখালি অঞ্চলে বিদ্রোহের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। এ অঞ্চলে নীলবিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন শরিয়তপুরের পীর দুদু মিয়া, সোনাপুরের (বালিয়াকান্দি) হাসেম আলী, পাংশার ভৈরব বাবু প্রমুখ। পীর দুদু মিয়া জমিদারের বিরুদ্ধে দুর্দশাগ্রস্থ চাষীদের ভীষণভাবে ক্ষেপিয়ে তোলেন।


১৮৬৮ সালে ৩ সেপ্টেম্বর অমৃতবাজার পত্রিকায় দুদুমিয়ার শক্তির কিছু পরিচয় পাওয়া যায়, লেখা হয়-----‘কালে তার প্রভাব এতদূর বৃদ্ধি পায় যে কুঠিয়াল ইংরেজ ও জমিদারদের বিরুদ্ধে তিনি মনে করলে ৫০ হাজার লোক সংগ্রহ করতে পারতেন। সোনাপুরের হাসেম আলীর নেতৃত্বে শত শত চাষী সংঘবদ্ধ হয়। সোনাপুর, বহরপুর, বালিয়াকান্দি, বসন্তপুরসহ অনেক নীলকুঠিতে তাঁর নেতৃত্বে আগুন দেওয়া হয়।’ সে সময় পাংশার জমিদার ভৈরব বাবু নীলচাষের বিরুদ্ধে পাংশায় নেতৃত্ব দেন। ভৈরব বাবু ছিলেন অত্যন্ত সাহসী ও ডাকসাইটে জমিদার। নীলকরদের বিরুদ্ধে তিনি সক্রিয় গণবিদ্রোহের সূচনা করেন। তিনি পার্শ্ববর্তী কুঠি আক্রমণ করে বিপুল ধবংস সাধন করেন। এতে ক্ষুদ্ধ হয়ে টিআই ক্যানী ভৈরবনাথের ট্রেজারী লুট করে। ভৈরব বাবু পাবনা আদালতে ট্রেজারী লুটের মামলা করেন। এ মামলায় তিনি ১৪ হাজার টাকা ডিক্রী লাভ করেন। এর কিছুক্ষণ পর ক্যানীর লোকজন তাকে অপহরণ করে নিহত করেন। (পাংশা উপজেলার ইতিহাস, শেখ মুহাম্মদ সবুর উদ্দিন, পৃষ্ঠা-৩, ৪)। বেলগাছি অদূরে একটি গ্রামের নাম সংগ্রামপুর। ঐ গ্রামের মানুষেরা নীলচাষের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়ায় এর নাম হয় সংগ্রামপুর। সংগ্রামপুর আজও নীলবিদ্রোহের ইতিহাস বহন করছে। জঙ্গল ইউনিয়নে ঠাঠাপড়ার ভিটার বিষয়ে বলা হয়েছে।

১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে নীলবিদ্রোহ গুরুতর আকার ধারণ করল। লর্ড ক্যানিং এ সংবাদে ব্যাতিব্যস্ত হয়ে উঠলেন। এ ব্যাপারে তিনি বাংলার বড়লাট গ্রান্ট সাহেবের পরিদর্শনের ভার দেন। ঐ বছর তিনি গড়াই, কুমার, কালীগঙ্গার নদীপথে ৭০ থেকে ৮০ মাইল স্টিমার যোগে পরিদর্শন করেন। প্রায় ১৪ ঘন্টা ব্যাপী এ ভ্রমণ চলে। নদীর উভয় কূলে হাজার হাজার কৃষক শ্রেণিবদ্ধভাবে জমায়েত হয়ে ফরিয়াদ জানায়। কথিত আছে গড়াই নদীর কূল দিয়ে যাওয়ার সময় রাজবাড়ি জেলার হাজার হাজার কৃষক দুদুমিয়া ও হাশেম আলীর নেতৃত্বে কামারখালি ঘাট থেকে সমাধিনগর, নাড়ুয়া মুখে সমবেত হয়। নদীর ধারে হাজার হাজার কৃষক হাতে দরখাস্ত নিয়ে ক্যাপ্টেনকে ঘাটে জাহাজ ভিড়াতে অনুরোধ করতে লাগল। কিন্তু ক্যাপ্টেন কোনো মতে জাহাজ ঘাটে ভিড়ান না। এতে প্রজারা প্রাণ বিসর্জন দেওয়ার উদ্দেশ্যে খরস্রোতা গড়াই নদীর পানিতে ঝাঁপ দিয়ে ভেসে যেতে লাগল। গ্রান্ট সাহেব এ দৃশ্য দেখে জাহাজ ঘাটে ভিড়াতে আদেশ দিলেন। প্রজারা জাহাজ ঘিরে ফেলল এবং গ্রান্ট সাহেবকে প্রতিজ্ঞা করাল যে তিনি প্রজাদের রক্ষা করবেন।

এরপর থেকে পাঁচজন সদস্য নিয়ে ‘ইন্ডিগো কমিশন’ গঠিত হয়। পরবর্তী ডিসেম্বর মাসে গ্রান্ট মহোদয় সুদীর্ঘ মন্তব্য করেন----বাংলার প্রজা ক্রীতদাস নহেন। প্রকৃতপক্ষে জমির স্বত্ত্বাধিকারী। তাহাদের পক্ষে এরুপ ক্ষতির বিরোধী হওয়া বিস্ময়কর। যাহা ক্ষতিজনক তাহা করাইতে গেলে অত্যাচার অবশ্যম্ভবী। এই অত্যাচারের আতিশস্যাই নীল বপনে প্রজার আপত্তির মূখ্য কারণ----(হেমেন্দ্র প্রসাদ ঘোষ লিখিত নীলদর্পণের ভূমিকা, কর মজুমদার সং-১ পৃ) কমিশন নিম্নলিখিত সুপারিশ এবং তদ্বারা ইশতেহার জারী করা হয়-(১) সরকার নীলচাষের পক্ষে বা বিপক্ষে নহেন (২) অন্য চাষের মতো নীলচাষ করা বা না করা সম্পূর্ণরুপে প্রজার ইচ্ছাধীন (৩) আইন অমান্য করে অত্যাচার বা অশান্তির কারণ হলে নীলকর বা প্রজা কেউই কঠোর শাস্তি হতে নিস্তার পাবেন না।

 কমিশনের ইশতেহার প্রকাশের পর নীলচাষ প্রজার ইচ্ছাধীন হলেও নীলের ব্যবসা ও উৎপাদন বন্ধ হল না। তবে নীলচাষ ক্রমে ক্রমে হ্রাস পেতে থাকল। অনেক স্থানের কুঠি বন্ধ হলেও রাজবাড়ি অঞ্চলের নীলের চাষ চলতেই থাকে। এ সময় টমাস কেনীর অত্যাচারও যেন বেড়ে যায়। এ অঞ্চলের প্রজারা আরো বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। এ প্রসঙ্গে মীর মশাররফ হোসেনের আমার জীবনী গ্রন্থে ১১০ পৃষ্ঠায় -----‘নীলচাষের দৌরাত্ব সহ্য করিতে না পারিয়া সর্বসাধারণ প্রজা আবার নীলবিদ্রোহী হইয়াছেন। মীর সাহেব আলী বিদ্রোহের সময় প্রজার দলে মিশিয়াছেন। প্রজাসাধারণ এত ক্ষেপে উঠলো যে কি কৌশলে টমাস কেনীর প্রাণ হরণ করবেন, মিসেস কেনীর সর্বনাশ করবেন, কী কৌশলে সালঘর মধুয়ার কুঠি ভাঙ্গিয়া কালীগঙ্গায় নিক্ষেপ করবেন।’ সতীশ চন্দ্র মিত্র লিখেছেন নীলের দ্বিতীয় বিদ্রোহ শুরু ১৮৮৯ সালে। ডম্বল সাহেবের অত্যাচারে এ বিদ্রোহ দেখা দেয়। এ বিদ্রোহ মাগুরা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া ও রাজবাড়ি সীমাবদ্ধ ছিল। এ সময় পাটের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রজারা নীলচাষে একেবারেই অসম্মতি জানায়। ফলে নীলকরেরা নীলের দাম বৃদ্ধি করে নীলচাষ করতে চায় কিন্তু তারা ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্থ হতে থাকে। এরই মধ্যে জার্মান থেকে কৃত্রিম কৌশলে উৎপাদিত নীল সস্তা দামে দেশে দেশে আমদানী হওয়ায় নীলের চাষ ও ব্যবসা ১৮৯৫ সালের মধ্যে একেবারে উঠে গেল।


ইংরেজ শাসনকালে এ দেশে নীলচাষ, নীলবিদ্রোহ, নীলকরদের অন্যায় অত্যাচার ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়। শত বছরেরও অধিক কাল পূর্বে তা শেষ হয়েছে। তারপরও এদেশের মানুষকে ইংরেজ-পাকিস্তানি ও স্বজাতীয়দের দ্বারা কত দুঃখ যন্ত্রণাই না ভোগ করতে হয়েছে। ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ অনাহারে মারা যায়, ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হন। এখনো দেশে প্রায় ৩০ ভাগ মানুষ দারিদ্রপিড়ীত। রাজনৈতিক সহিংসতা মনে শঙ্কা জাগায়। সন্ত্রাস, দুর্নীতি উন্নয়নকে ব্যবহ করছে। এতদ্বসত্ত্বেও বাংলাদেশ একবিংশ শতকের চ্যালেঞ্জ নিয়ে দ্রুত বিশ্বায়নের পথে সতর্ক সম্পর্ক স্থাপন করে চলেছে। বাড়ছে মাথাপিছু আয়, বাড়ছে প্রযু্ক্তি, বাড়ছে মানুষের জীবনযাত্রার মান। বাংলাদেশের মানুষের বিগত দুই শত বছরের ইতিহাসের প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এ জাতি শত প্রতিকুলতার মধ্য দিয়ে স্বাধীকার, স্বকীয়তা, স্বাধীনতা ও আত্মবিকাশের পথে নিরন্তর চালনা করছে। এ ধারা অব্যাহত থাক, শত বছর পরের ইতিহাস পাঠক এ সংবাদ পাঠ করবে----এ প্রত্যাশায়।

Additional information