রেল ও রাজবাড়ি - ‍পৃষ্ঠা নং-২

রেল রাজবাড়ি রাজবাড়ি অংশে রেলপথ পাংশা থেকে কালুখালির বর্তমান স্টেশন থেকে দুই কিলোমিটার উত্তর দিয়ে বহর কালুখালি হয়ে ধাওয়াপাড়ার ঘাট বরাবর ছিল। উক্ত রেলপথ বর্তমান রাজবাড়ি শহরের উত্তর দিক দিয়ে পূর্ব পথে জামালপুর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এখনো কোনো কোনো স্থানে তার স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে। জামালপুরই ছিল তখন গোয়ালন্দ ঘাট যাকে গ্যাঞ্জেস বন্দর বলা হত। ‘পোড়াদহ হতে ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে গোয়ালন্দ পর্যন্ত যখন রেলপথ বিস্তৃত হয় ঐ সময় আমাদের বাড়ির বহর-কালুখালির ঠিক মধ্যদেশ দিয়া রেললাইন যায়। আমার পিতা তখন রতনদিয়া উঠিয়া আসিলেন।’ [আমার স্মৃতিকথা, ত্রৈলোক্যনাথ, পৃষ্ঠা-৩৩ (বহর কালুখালি বর্তমান কালুখালি স্টেশন থেকে ৫ কিমি উত্তরে)]।

ত্রৈলোক্যনাথ এর স্মৃতিকথা থেকে-----

আমার জন্ম বৎসর ১৮৭৫। গ্রামের নাম বহরকালুখালি। কালুখালি স্টেশন হইতে এ গ্রামের দূরত্ব ছিল প্রায় দুই মাইল। পোড়াদহ হইতে গোয়ালন্দ রেলপথে জগতি, কুষ্টিয়া, কোর্ট, ‍কুষ্টিয়া (পরে কুষ্টিয়ার পূর্বদিকে গড়াই নদীর ব্রিজ পাড়ে চরাইখোল নামক একটি স্টেশন হয়)। তাহার পর কুমারখালি, খোকসা, পাংশা, তাহার পরেই কালুখালি। পরবর্তী স্টেশন বেলগাছি, তাহার পরেই রাজবাড়ি। পরে রাজবাড়ির কিছু পশ্চিমে সূর্যনগর নামক একটি স্টেশন হয় রাজা সূর্যকুমারের স্মৃতিতে। রাজবাড়ির পরবর্তী স্টেশন পাঁচুরিয়া জংশন, ইহার পরেই গোয়ালন্দ। ইংরেজি উচ্চারণে গোয়ালান্ডো। পাঁচুরিয়া হইতে শাখা লাইন ফরিদপুরে গিয়াছে। পাংশা ও বেলগাছি ও তন্মোধ্যবর্তী কালুখালি এই তিনটি স্টেশন ১৯১০ পর্যন্ত একটি সরলরেখায় অবস্থিত ছিল। পরে পদ্মা নদীর ভাঙ্গনে কালুখালি স্টেশনকে সরাইয়া রতনদিয়ার কাছে আনা হয়। অল্পদিনের জন্য অস্থায়ী একটি লাইন করা হয় হারোয়ার উপর দিয়া। কলিকাতা হইতে চাঁগা মেলে কালুখালি সাড়ে চার ঘন্টার পথ। কুষ্টিয়ার পরেই কালুখালি, মেলট্রেনে মধ্যবর্তী কোনো স্টেশনেই থামিত না। কালুখালি জংশন হইবার পর মেল ট্রেন কুষ্টিয়া ছাড়িয়া সোজা রাজবাড়ি গিয়া থামিত।

প্রমত্ত পদ্মার ভাঙ্গনের কারণে ১৮৯০ সালে রেল পুনঃস্থাপনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ১৮৯০ সালের ১ এপ্রিল রেল পাংশা, বর্তমান কালুখালি, বেলগাছি, সূর্যনগর, রাজবাড়ি ভায়া লোকোসেডের পশ্চিম দিয়ে উত্তর মুখী দুর্গাপুর, তেনাপচা গোয়ালন্দ ঘাট পুনঃস্থাপিত হয় (ইস্পাতের পথ ‍পৃষ্ঠা-৫১।

১৮৯০ এ দ্বিতীয় পর্যায়ে রেল স্থাপনকালে দলিল দস্তাবেজে গোয়ালন্দ নামকরণ হয়েছে। ১৮৯০ সালে রাজবাড়ি শহরের কেন্দ্রে রেলস্টেশন স্থাপনকালে স্টেশনকে কেন্দ্র করে পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণে এক থেকে দেড় কি.মি. জায়গা রেল কর্তৃপক্ষ অধিগ্রহণ করে। রাজা সূর্যকুমার ও বাণীবহ জমিদার গীরিজাশঙ্কর মজুমদার, বাবু নারায়ণ চক্রবর্তীসহ কয়েক জোতদার ছিলেন এ জমির মালিক। স্বল্প সময়ের মধ্যে রেলওয়ে অফিসার্স কোয়ার্টারসহ স্থাপিত হয় রেলওয়ে খেলার মাঠ, এসআর হল কেন্দ্র, লোকোসেড, শ্রমিক কোয়ার্টার, বিশ্রামাগার, ইত্যাদি। ১৯৪৭ এরপর স্থাপন করা হয় রেলওয়ে কলোনী। অনেকে রেলসূত্রের চাকরিতে স্থায়ী আবাসন গড়ে তোলে। অবশ্য বর্তমান রাজবাড়ি স্টেশনটির আধুনিকীকরণ করা হয় ১৯৬০ এর দশকে। রেলের সূত্র ধরে রাজবাড়ি শহর ভিত্তি লাভ করে। রেল সূত্রে কয়লার ব্যবসায় কয়েকজন ব্যবসায়ী প্রচুর লাভবান হন। তাদের মধ্যে হাজী গোলজার হোসেন অন্যতম।

১৮৯৫ সালে পাঁচুরিয়া হয়ে রেল গোয়ালন্দ ঘাট (বর্তমান গোয়ালন্দ বাজার সংলগ্ন) পর্যন্ত পুনঃস্থাপিত হয়। এরপর পাঁচুরিয়া থেকে অম্বিকাপুর (আমিরাবাদ) রেল বসে ১৮৯৯ সালে। এ সময় খানখানাপুর, বসন্তপুর রেলস্টেশন স্থাপিত হয়। রাজবাড়ি জেলার বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের বাঁশ, বেত, পাট বহনের গুরুত্ব বিবেচনা করে ১৯৩২ সালের ১ জানুয়ারি কালুখালি থেকে ভাটিয়াপাড়া পর্যন্ত রেল স্থাপিত হয়। এ সময় রামদিয়া, বহরপুর, আড়কান্দি, স্টেশন স্থাপিত হয়। কালুখালি রেলের জংশন স্টেশনে পরিণত হয়। পরবর্তীতে গোয়ালন্দ ঘাটের মুখে পলি জমে চর পড়লে ঘাট বর্তমান দৌলতদিয়ায় স্থাপন করা হলে ১৯৭৭ সালে রেলপথ দৌলতদিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত করা হয়। দৌলতদিয়া পর্যন্ত রেল স্থাপনের ক্ষেত্রে আক্কাস আলী মিয়া বিশেষ ভূমিকা রাখেন। রেলপথ নির্মাণে যে বৃটিশ সরকার বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে সে কথা বলাই বাহুল্য।

Additional information