রেল ও রাজবাড়ি - পৃষ্ঠা নং-৩

ইবি (ইস্ট বেঙ্গল) রেলওয়ে কোম্পানি এ রেলপথ নির্মাণ করে। কোম্পানি কন্ট্রাক্টর ও সাব কন্ট্রাক্টর দ্বারা রেলপথ ও অন্যান্য স্থাপনা কাজ সম্পন্ন করে। অত্র অঞ্চলে রেল স্থাপনের ঠিকাদারী কাজ সম্পন্ন করেন পাবনা জেলার সাগরদাড়ি গ্রামের গোবিন্দ দত্ত ও গুরুচরণ দত্ত। রেলের ঠিকাদারীতে তারা অনেক অর্থবিত্তের মালিক হন এবং গ্রাসাদোপম বাড়ি নির্মাণ করে। সাধারণ্যে জমিদার বলে খ্যাতি লাভ করেন।

 রেল কোম্পানি রেলপথ নির্মাণে জনসাধারণের নিকট থেকে যে ভূমি অধিগ্রহণ করে তার যুক্তিযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান করে। ঠিকাদারের অধীনস্থ কর্মচারীরা ক্ষতিপূরণের হিসেব কষে দিত। তখনকার দিনে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির ক্ষতিপূরণ হিসেব অবাক বৈকি? আম, জাম, কাঁঠাল, সুপারি, ডাব তো বটেই কলাগাছকেও ক্ষতিপূরণের আওতায় আনা হয়েছিল। এছাড়া জমি আর জমির  ফসল তো ছিলিই। একটি কলাগাছের কলা, কলাপাতা, মোচা ইত্যাদি হিসেবের মধ্যে এনে এর ক্ষতিপূরণ ধরা হয়েছিল ৫ থেকে ১০ টাকা। ১ মণ ধানের দাম ছিল তখন তিন থেকে সাড়ে তিন টাকা। সে হিসেবে কলাগাছের দাম ১০ টাকা ---অবাক তো বটেই। আম, জাম, কাঁঠাল, ডাব গাছের দাম ৫০ হতে ১০০ শত টাকা ধার্য ছিল (আমার স্মৃতিকথা, পৃষ্ঠা-১৩৮)।

বৃটিশরা বেনিয়া ছিল ঠিকই কিন্তু ন্যায় বোধ কম ছিল না। অনেকের ক্ষতিপুরণের টাকায় আর্থিক অবস্থার চাকা ঘুরে গেল। এ সময় গড়াই ব্রিজ করতে কয়েক লক্ষ টাকা খরচ হয় এবং অনেক মানুষ মারা যায়। সাগরকান্দির বাবুরা এই ব্রিজের ঠিকাদারীর আয়ে বিপুল অর্থের মালিক হন এবং তারা জমিদারী ক্রয় করেন। রেলস্থাপনের পর থেকে কত ঘটনাই না ঘটে গেছে রেলকে কেন্দ্র করে। আশা নিরাশার কেচ্ছা কাহিনীসহ শিল্প, সাহিত্য, অর্থনীতি, রাজনীতি, আন্দোলন, সংগ্রাম, দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা, মামলা মোকদ্দমা, সফলতা ও বিফলতার ইতিহাস বহন করে চলেছে রাজবাড়ির রেললাইন, রেলগাড়ি, রেলকর্মচারী, সাধারণ রেলযাত্রী ও ছাত্র জনতা।

উনিশ শতকের গোড়ার কথা। এক ইংরেজ সাহেব আসলেন রেলের বড় কর্তা হয়ে। থাকেন রেলের বাংলোতে (বর্তমান জাতীয় গ্রন্থাগারের উত্তরে এইএন সাহেবের বাসা)। সাহেব বলে কথা? আসলে সহজ মানুষ। রাজবাড়ির গ্রামীণ পরিবেশ তার ভালো লাগে। সকাল সন্ধ্যায় ঘুরে বেড়ান একাকি। বাংলোতে থাকেন একা। পরিচয় হয় কত রকম মানুষের সাথে। রাজবাড়ি শহরের পশ্চিমে শহরতলীতে ২০/২৫ ঘর বাগদীদের বাস। এখনো তা বাগদীপাড়া বলে পরিচিত। পরিচয় ঘটে এক বাগদী মেয়ের সাথে। পরিচয় ধরে প্রেম পরে পরিণয়। বাগদির মেয়ে বিয়ে করে তুলে আনলেন বাংলোতে। কয়েক বছরের সংসার। একদিন মেয়েটি কলেরা আক্রান্ত হয়ে মারা গেল। সাহেবের সেকি কান্না। স্ত্রীর স্মৃতি রক্ষার্থে সমাধিস্থ করা হল। জাতীয় গ্রন্থাগারের পশ্চিমে রাস্তার মোড়ে বাঁধানো সমাধিটি সে প্রেমের স্মৃতি বহন করে চলেছে।

রাজবাড়িতে রেল আসার পূর্বে ১৮৬১ সাল থেকে শুরু হয় গড়াই ব্রিজ নির্মাণ। মীর মশাররফ হোসেন চন্দ আরোপ করেন ‘গৌড়ী সেতু’ নামক কবিতা পুস্তিকায়। আত্মজীবনীতে তিনি গড়াই ব্রিজ নির্মাণের একটি বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেন। আমার জীবনীগ্রন্থে তিনি লিখেছেন------

লাহিনীপাড়ার উত্তরাংশ হইয়া পূর্বদেশগামী রেললাইন গৌড়ী নদী পাড় হইয়া গোয়ালন্দ পর্যন্ত গিয়াছে। ইংরেজি ১৮৭১ সালে সেতুবন্ধন শেষ হইয়া গাড়ি চলা আরম্ভ হইয়াছে। ভারতে চিরবিখ্যাত মহামতি লউসেও বড়লাট বাহদুর গৌরী সেতু খুলিয়াছেন। গৌরী সেতুবন্ধন সময়ে অনেক মান্যমান হিন্দু মুসলমান কেরানী, ড্রাফটসম্যান, ক্যাশিয়ার বড় বাবু সাজিয়া রেলওয়ে কোম্পানিরর অধীনে কার্য করিতেন। খাশ ইউরোপীয়ান অতি কম হইলে ২০/২৫ জন, দেশী ফিরিঙ্গী প্রায় ঐ পরিমাণ, নিগ্রো হাবসী ১০/১২ জন, কেরানীদল ৭০/৮০ জনের কম ছিল না। হাতী, ঘোড়া, বোট নৌকা, লঞ্চ, স্টিমার বিস্তর ছিল। চট্রগ্রাম, শ্রীহট্র প্রভৃতি স্থানের এবং দেশীয় কুলী, হিন্দুস্থানী কর্মকার, সূত্রধর কুলী মজুরের সংখ্যার হিসেবে কঠিন। স্বর্গীয় দুর্গাচরণ গুপ্ত যাহার গুপ্ত প্রেস, গুপ্ত পঞ্জিকা বঙ্গদেশ বিখ্যাত তিনিও গৌরী সেতুবন্ধন উপলক্ষ্যে রেলওয়ে কোম্পানির বেতনভোগী হেডবাবু হইয়া কার্য করিতেন। (মশাররফ রচনা সম্ভার, (পৃষ্ঠা-৭৩)। রেলস্থাপনের কালে অনেক কোম্পানির নিকট থেকে পেয়েছে জমির ক্ষতিপূরণ মূল্য আবার অনেকের ফসলের জমি জিরেত চলে গেছে কোম্পানির হাতে।

Additional information