রেল ও রাজবাড়ি - পৃষ্ঠা নং-৪

অনেকে রেলের চাকরি নিয়ে বাবু হয়েছে আবার অনেকে কয়েক পুরুষের ভিটে মাটি ছেড়ে সরে গেছে বিদেশ বিভুঁইয়ে। কত উৎসুক প্রথম ইঞ্জিন চাকাওয়ালা গাড়ি দেখতে এসেছে। গাড়ির শব্দ, ইঞ্জিনের হুইসেল শুনে চমকিত হয়েছে। কত মানুষ রেলের চাকায় পিষ্ট হয়ে কালে অকালে হারিয়ে গিয়েছে। রেলকে নিয়ে রচিত হল কবিতা ছড়া--------

‘রেলগাড়ি ঝমাঝম

পা পিছলে আলুর দম’

ঘোড়ার গাড়ি, গরুরগাড়ি, পালকী বাহনে পায়ে হাঁটা শত শত বছরের অভ্যস্ত মানুষের মধ্যে অনেকে রেলকে স্বাগত জানালো আবার অনেকে ভাবল রেল স্থাপন বৃটিশ বেনিয়াদের এ দেশের সম্পাদ লুণ্ঠনের নয়াকৌশল। তবে সভ্যতা আর সংস্কৃতি বিকাশে যখন যেখানে যে কৌশলের উদ্ভাবন হয়েছে তা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছে নানা দেশ ও নানা জাতির মধ্যে। এদেশে রেলস্থাপনও সে সাক্ষ্য বহন করছে। রেলের যে শুরু তারপর থেকে এর গুরুত্ব কেবল বেড়েই চলেছে।

১৮৭১ সালে রাজবাড়িতে রেল আসার পর থেকে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা পর্যন্ত শত বছরের ইতিহাস যদি গ্রহণ করা যায় তাহলে দেখা যাবে এ জেলার অর্থনৈতিক, সামজিক ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছে এই রেলকে কেন্দ্র করে। পাংশা, বেলগাছি, কালুখালি, রাজবাড়ি, গোয়ালন্দ, খানখানাপুর, বসন্তপুর, রামদিয়া, বালিয়াকান্দি তুলনামূলক দক্ষিণের জঙ্গল, নাড়ুয়া এবং পশ্চিমের মৃগী, সাওরাইল কশবামাঝাইল এলাকা থেকে তুলনামূলক বর্ধিষ্ণু এলাকা। এরমধ্যে রাজবাড়ি, গোয়ালন্দ, পাংশা, বেলগাছির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেক বেশি।

রেল স্থাপনের পর থেকে কালুখালি একটি জংশন, রাজবাড়ি একটি শহর, গোয়ালন্দ বাংলার দ্বারপথ (Get way of Bengal) বা বৃহৎ গঞ্জ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। তখন বাংলার রাজধানী ছিল কলিকাতা। শিক্ষা-দীক্ষা, যাতায়াত, ব্যবসা-বাণিজ্য, সাহিত্য সংস্কৃতি সবই ছিল কলিকাতা কেন্দ্রিক। এ সময় থেকেই বাবু কালচার বলে একটি শ্রেণি বিশেষের সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে যার প্রভাব এ অঞ্চলে এখনো অনেক ক্ষেত্রেই লক্ষ্য করা যায়। এখনো অফিসের হেডক্লার্ককে রাজবাড়িতে অনেক অঞ্চলে বাবু বলতে শোনা যায় আর ছেলে সন্তানদের স্বাভাবিকভাবেই ডাকা হয় বাবু বলে। বস্তুত রেলের কারণে কলিকাতার সাথে সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা শিক্ষা সংস্কৃতির বিকাশ ঘটায়। জনজীবনে রেলের গুরুত্ব এতটাই বৃদ্ধি পায় যে, ১৯৪৪ সালে রেলকে নিয়ে এক সঙ্কটের সৃষ্টি হয়। তৎকালীন গোয়ালন্দ মহকুমার কালুখালি-ভাটিয়াপাড়া রেল লাইনটি কিছু প্রশাসনিক জটিলতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে ১৯৪০ সালের ৯ ডিসেম্বর কর্তৃপক্ষ ১৮ ডিসেম্বর থেকে উ্ক্ত লাইনটি বন্ধ করার এক নোটিশ জারী করে। এটা ছিল রাজবাড়ি ও ফরিদপুরের জন-মানুষের জন্য এক দুঃসংবাদ। এ সময় রাজবাড়ি ও ফরিদপুরের জনসাধারণ ভারতের ভাইসরয় ও বাংলার গভর্নর এর নিকট উক্ত লাইন চালু রাখার জন্য আকুল আবেদন জানান। এ আবেদন জনজীবনে শাখা লাইনটির সার্থক ও সামাজিক গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং লাইনটি বন্ধ না-করার দাবি রাখেন। তারা দাবিতে উল্লেখ করেন-----‘কালুখালি-ভাটিয়াপাড়া রেলপথ ৫২ মাইল দীর্ঘ। এলাকাবাসীও প্রায় ১০০ শত বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে এই রেলপথের দ্বারা উপকৃত হয়েছে। এখানে অন্যকোন যানবাহন নেই। লাইনটি এলাকার অধিবাসীদের নিকট ‘Life cord'  নামে চিহ্নিত। শাখা লাইনটি ঐতিহাসিক, বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক গুরুত্ব বহন করে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করা ছাড়াও এই রেলওয়ের মাধ্যমে জনগণের একটি বিরাট অংশ তাদের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের জন্য কাজের সূত্রে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করে। কর্মক্ষেত্র প্রসারের মাধ্যমে সামাজিক ক্ষেত্রে মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। নতুন নতুন শ্রেণির উদ্ভব হয়েছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ব্যবসায়ী, আইন ব্যবসার সাথে যুক্ত পেশাজীবী, চিকিৎসা সংক্রান্ত কাজে নিয়োজিত চিকিৎসক, শিক্ষাব্রতী, বিদ্যোৎসমাজ, সরকারি কর্মচারী, কারিগর, কৃষক, দিন মজুর ছাত্র ইত্যাদি শ্রেণি। এই লাইনটি বন্ধ হয়ে গেলে উক্ত সকল শ্রেণির মানুষ বিশেষ করে চাকরিজীবীদের মধ্যে অসুবিধার সৃষ্টি হবে এবং রেলওয়ের অনুপস্থিতির কারণে জনগণের আয়ের উপরও প্রভাব পড়বে। রেলওয়ে আগমনের ফলে এ এলাকার অধিবাসীগণ উৎসাহিত হয়ে তাদের ক্ষমতা ও উপাদান এই অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য নিবেদন করে। যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় এ অঞ্চলের অধিবাসীগণ অনেক বেশি পরিমাণে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনের তাগিদে কলিকাতার উপর অনেক নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।’ (পূববাংলার রেলওয়ের ইতিহাস, দীনাক সোহানী, পৃষ্ঠা-২০৪,৫)।

Additional information