রেল ও রাজবাড়ি - পৃষ্ঠা নং-৫

রেল স্থাপনের পর গোয়ালন্দই একমাত্র সংযোগ কেন্দ্র যেখান থেকে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, সিলেট, আসাম, চট্রগ্রাম থেকে স্টিমারযোগে এসে রেলগাড়িতে কলিকাতা যাতায়াতের সুযোগ ঘটে। গোয়ালন্দের গুরুত্ব উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে। গোয়ালন্দকে তখন বাংলার প্রবেশ পথ (Get way of Bengal) বলা হত। গোয়ালন্দের নাম ছড়িয়ে পড়ে ঢাকা, কলিকাতা, দিল্লী, এমন কি সুদূর বিলেত পর্যন্ত। পদ্মা ও যমুনার সংযোগস্থল বলে গোয়ালন্দ ভূগোলবিদ, ঐতিহাসিক, মানচিত্রবিদদের নিকট পরিচিত ছিল। তদুপরি রেল স্থাপনের পর এর গুরুত্ব অধিক বৃদ্ধি পায়। ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত রেল চলাচল শুরু হয় ১৮৮৫ সালের ৪ জানুয়ারি। এই সময়েই ইন্ডিয়ান জেনারেটর নেভিগেশন এবং রেলওয়ে কোম্পানির স্টিমার গোয়ালন্দ থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত রেলের যাত্রী ও মালামাল পারাপার শুরু করে। এরপর ১ জুলাই ১৮৯৫ তারিখে চাঁদপুর ঘাট স্টেশন উদ্বোধন হওয়ার পর চাঁদপুর ঘাট পর্যন্ত রেলওয়ে যাত্রী ও মালামাল পাড়াপাড় শুরু হয়। চট্রগ্রাম, কুমিল্লা, ঢাকা, সিলেট, আসামের যাত্রী গোয়ালন্দ ঘাট দিয়ে কলিকাতায় যাতায়াত শুরু করে। কলিকাতা থেকে ঢাকা মেইল, ওয়ান আপ-টু ডাউন, ওয়ান আপ-টু-আপ প্রভৃতি নামের দ্রুতগামী ট্রেন যাতায়াত করত। অষ্ট্রিচ, ইমু, কাওয়াই প্রভৃতি নামের স্টিমার ট্রেনের যাত্রী ও মালামাল বহন করত। গোয়ালন্দ-ঢাকা, ঢাকা-গোয়ালন্দ, গোয়ালন্দ- নারায়ণগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ-গোয়ালন্দ ডিব্রুগড় স্টিমারছাড়াও অন্যপথে স্টিমার গোয়ালন্দ থেকে ফরিদপুর, বরিশাল এবং খুলনা পথে কলিকাতায় যাতায়াত করত। তখন পদ্মা নদী এবং অন্যান্য নদীর অবস্থা বর্তমানের মতো অগভীর ও স্রোতহীন ছিল না। পদ্মা, গড়াই এমন কি চন্দনা নদীতে স্টিমার চলাচল করত। ‘রেলের কারণে রাজধানী কলিকাতার সাথে সংযোগ স্থাপিত হওয়ায় গোয়ালন্দ হয়ে ওঠে পূর্ব-বাংলার বৃহত্তম বন্দর। স্টিমার, রেলগাড়ি, অফিস, মালামাল, ব্যবসায়ী, যাত্রী, কুলী-মজুরের ভীড়ে গোয়ালন্দ এক ব্যস্ত বন্দর নগরীতে পরিণত হয়। আসামের চা বাগানে কুলি প্রেরণের জন্য স্টেশনে ডিপো নির্মাণ করা হয়। এ ডিপো কুলিদের বহির্গমন ও অভিবাসনে ব্যাবহৃত হত। (পূর্ব-বাংলার রেলপথের ইতিহাস-দিনাক সোহানী-পৃ-৪৭)। গোয়ালন্দের ইলিশ, পাঙ্গাস, তরমুজ, চিনি, মশলা ভারত বিখ্যাত ছিল। কলিকাতা ও দিল্লীতে গোয়ালন্দের ইলিশ ও তরমুজের হাট বসত। গোয়ালন্দে আগমন ঘটেছে দেশের নামী দামী সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদদের। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ট্রেনযোগে গোয়ালন্দ হয়ে ঢাকা গিয়েছেন কয়েকবার। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস ‘পদ্মানদীর মাঝি’র পেক্ষাপট এ গোয়ালন্দ।

মরুতীর্থ হিংলাজের লেখক অবধুত আস্তানা গেড়েছিলেন এই গোয়ালন্দ। উপন্যাসটি তিনি তৎকালীন স্বরাজ আন্দোলনের নেতা সূর্যনগরের হরিণধারার বাবু বৃন্দাবন দাসের নামে উৎসর্গ করেন। এখানে আস্তানা গড়ে তোলেন সাধু, সন্ন্যাসী, তান্ত্রীক। ১৮৯১ সালের আদমশুমারীতে তৎকালীন ফরিদপুর জেলার লোকসংখ্যা ছিল ৯৬,৩৩৩ জন। তাদের একাংশের জীবন ও জীবীকা ছিল গোয়ালন্দকে কেন্দ্র করে । এ সময় ঢাকা থেকে আগত ৩ হাজার, যশোহর থেকে আগত ১ হাজার নদীয়া থেকে আগত ১ হাজার ঘাটকুলি নিয়োজিত ছিল। ট্রেনের ঝমাঝম আর হুইসেলের আওয়াজ, জাহাজের কাপ্তানের বাঁশি, শত শত দেশ বিদেশের যাত্রী, কয়েক হাজার ঘাটকুলী, বিশেষ কায়দায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ, রুপালি ইলিশ সব মিলিয়ে গোয়ালন্দ যেন এক রুপনগরী। পদ্মা ত্রয়োদশ চতুর্দশে ছিল ক্ষীণতোয়া। পঞ্চদশ ষোড়শ শতকে এসে পদ্মা বেগবান হয়।

যমুনার জল বুকে নিয়ে পদ্মা স্ফীত ও তরঙ্গায়িত হয়ে ওঠে। নিজেকে প্রশস্ত করতে কূল-পাড় ভেঙ্গে পদ্মা কীর্তিনাশায় পরিণত হয়। পদ্মার ভাঙ্গনে ঘাট বারবার বদল করতে হয়েছে। অফিস আদালত এসেছে রাজবাড়িতে। পত্তন ঘটেছে রাজবাড়ি শহরের। পদ্মার মুখে এখন আবার চর আর চর। সেকালেও পদ্মার চর পড়ত। তখন চর স্থায়ী হত না। চর ভাঙ্গন এখন তীব্র নয়। বরং পদ্মার চর গোয়ালন্দে এসে অশ্বক্ষুরাকৃতি ধারণ করেছে, যার পরিণাম নদীর মরণ। এ দেশ নদী মাতৃক দেশ। এখন আর নদীর সে প্রভাব নেই। কয়েকশত নদী মরে বিল, খাল, ডোবায় পরিণত হয়েছে। পদ্মার এমন দশায় গোয়ালন্দের সে নাম আর জৌলুস নেই। রেলের জৌলুস হারিয়ে গেছে। রাজবাড়ি-ফরিদপুর, ফরিদপুর-যশোহর মহাসড়ক ও স্থল যোগাযোগের উন্নতিতে রেল অনেকাংশে উপেক্ষিত। আশির দশকের মাঝমাঝি থেকে ভাটিয়াপাড়া লাইন বন্ধ হয়ে যায়। ফরিদপুর লাইন বন্ধ। বর্তমানে কেবল মধুমতি, নকসিকাঁথা, শাটল, পার্ববর্তীপুর লোকাল, গোয়ালন্দ ও রাজবাড়ি থেকে চলাচল করে। রেলের গৌরব ফিরে পেলে রাজবাড়ির আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন দ্রুতশীল হত।

Additional information