রেল ও রাজবাড়ি - পৃষ্ঠা নং-৬

রেল-শ্রমিক আন্দোলনে রাজবাড়ির সংশ্লিষ্টতা

ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লবোত্তরকাল শ্রমিক শোষণের যুগ। ‘হনরীর হাতুড়ী বাজছে তো বাজছে, দিনরাত বাজছে।’ হেনরীর হাতুড়ীর শব্দ সারাদিন শোনা যায়। হেনরীর অবসর নেই। তার কাজের সময়ের পরিমাণ নির্ধারিত নাই। শোষিত বঞ্চিত শ্রমিক শ্রেণি এক সময় জেগে উঠল। সংঘবদ্ধ হয়ে ১৮৮৬ সালের ১লা মে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটের রাজপথে নেমে এলো। শোষক শ্রেণির গুলিতে রঞ্জিত হল রাজপথ। নিহত শ্রমিকদের বুকের রক্ত বৃথা যায় নাই। তারা সৃষ্টি করে গেল ঐতিহাসিক মে দিবস। শ্রমিকের কাজের সময় ৮ ঘন্টা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেল। শ্রমিক শ্রেণির সেই জয়যাত্রা থেমে নেই। যুগ যুগ ধরে শ্রমিকরা সংগঠিত হচ্ছে, ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা করে নিজ নিজ ক্ষেত্রে নায্য দাবি আদায়ে সচেষ্ট হচ্ছে। ভারতবর্ষেও এর ব্যতিক্রম হয় নাই। শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে ১৯২০ সালের ১১ই মে গঠিত হয় ‘অল ইন্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস।’ তৎকালীন দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ডানপন্থী ও বামপন্থী দুই শিবিরে বিভক্ত হয়, যার নাম ছিল অল ইন্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন ও অল ইন্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে ভারত পাকিস্তান স্বাধীনতা লাভ করে তখন থেকে ভারত পাকিস্তানে ট্রেড ইউনিয়ন নতুনভাবে সংগঠিত হয়। ইস্ট পাকিস্তান ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন গঠিত হয় ১৯৪৭ সালের ২৮ মে। রাজবাড়ি রেলশহর হিসেবে রেল শ্রমিক আন্দোলন অতিগুরুত্বপূর্ণ। অবিভক্ত ভারতে গড়ে ওঠা ফেডারেশন এর সূত্র ধরে পূর্ববাংলার বামপন্থী নিয়ন্ত্রিত ইস্টবেঙ্গল রেল রোড ওয়ার্কাস ইউনিয়ন গঠিত হয়। অতঃপর ১৯৪৭ সালে এক সম্মেলনে ইস্ট পাকিস্তান রেলওয়ে এমপ্লয়ীজ লীগ EPREL নামকরণ করে ট্রেড ইউনিয়ন গঠিত হয়। ১৯৪৭ সালের ১৮ই ডিসেম্বর ৭০ হাজার শ্রমিক কর্মচারীর সুদীর্ঘ আন্দোলন একই সাথে পে-কমিশন বাস্তবায়নের দাবিতে রেল ধর্মঘট, ১৯৪৯ সালে ১২ হাজার শ্রমিক ছাঁটাই আন্দোলন, ১৯৫২ সালে ভাড়া আন্দোলন, সিআরবি ধর্মঘট এর প্রেক্ষিতে সুপ্রীমকোর্ট জাস্টিস ফজলে আকবরের নেতৃত্বে Rly Industrial Tribunal  গঠন হয়। এই ট্রাইবুনালে রাজবাড়ি থেকে প্রতিনিধিত্ব করেন  EPREL এর কার্যকরী কমিটি। সরকার পক্ষে থাকেন ব্যারিস্টার মাহবুবর রহমান ও রেলপক্ষে থাকেন অ্যাডভোকেট হামিদুল হক চৌধুরী। দীর্ঘ এক বছর পর রায় প্রকাশিত হয় যা Rly Industrial Tribunal Award  নামে পরিচিত। এই ট্রাইবুনালে রাজবাড়ি থেকে প্রতিনিধিত্ব করেন। EPREL এর কার্যকরী কমিটির সদস্য আমজাদ হোসেন জোয়ারদার। ট্রাইবুনাল থেকে ফিরে এসে আমজাদ হোসেন জোয়ারদার EPREL  রাজবাড়ি শাখার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কাজী আব্দুল হালিম (Head clerck, Power House) এর তত্ত্ববধানে ও মোঃ রোস্তম আলী খানের (তার নামে বর্তমানে রাজবাড়ি স্টেশনের রোস্তম আলী চত্বর) সক্রিয় সহায়তায় শাখাকে পুনর্গঠিত করা হয়। সময়ে সময়ে পাবনা জেলার জসিম মণ্ডল এর সহযোগিতায় শ্রমিক জনসভা করে শাখাকে আরো মজবুত করা হয়। এ সময় স্থানীয় রাজনৈতিক দলের অনুপ্রেরণা বিশেষ করে আওয়ামী লীগ, মুসলিম লীগ, দলকে মজবুত করে। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী অ্যাডভোকেট আব্দুল ওয়াজেদ চৌধুরী জয়লাভ করেন। আওয়ামী লীগ প্রার্থীর জয়লাভে ডিএমএন ইসলাম (মরহুম ইসলাম ভাই), এসএ চৌধুরী ও আমজাদ হোসেন জোয়ারদার, প্রমুখ রেল কর্মচারীর ভূমিকা স্মরণযোগ্য।

তৎকালীন পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সামরিক শাসন জারির প্রেক্ষাপটে শ্রমিক আন্দোলনে স্থবিরতা আসলেও এমপ্লয়ীজ লীগ তার নিজস্ব নীতি বলে সংগঠন উম্মুক্ত রাখে এবং রেল শ্রমিকের দাবি দাওয়ার ভিত্তিতে ১৯৫৭ সালের ১২ই জুলাই সৈয়দপুর ওয়াগণ সপ স্ট্রাইক, ১৯৫৮ সালে তিস্তামুখ ঘাট ভাতা আন্দোলন করে। ১৯৬২ সালে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে ধর্মঘট হয় যাতে চট্রগ্রাম রেল কারখানায় পুলিশের গুলিতে ১জন শ্রমিক নিহত। বিভিন্ন স্থানে রেল শ্রমিক গ্রেফতার হন। এ সময় রাজবাড়ির আমজাদ হোসেন জোয়ারদারসহ এ এইচ চৌধুরী, মোঃ রোস্তম আলী, মোঃ আকবর আলীকে পুলিশ গ্রেফতার করে ফরিদপুর জেলে পাঠায়।

মজুরী নির্ধারণের দাবিতে ১৯৬৫ সালে সর্বাত্মক ধর্মঘট হয়। এই ধর্মঘটে রেলের বিভিন্ন স্থান থেকে পুলিশ পাইকারীভাবে রেল শ্রমিকসহ অন্যান্যদের গ্রেফতার করে। রাজবাড়ি থেকে আমজাদ হোসেন জোয়ারদার, ছাত্রলীগের চিত্তরঞ্জন গুহ, মোঃ মকসুদ আহমেদ রাজাকে রাজবন্দি হিসেবে Safey Act- এ তিন মাসের ডিটেনশন দিয়ে ফরিদপুর ও ঢাকা সেন্টা্ল জেলে আটক রাখা হয়। আরো ২৮ জন কর্মীকে নির্দিষ্ট অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। স্বাধীনতা-উত্তরকালে রাজবাড়ি রেলশ্রমিক ইউনিয়নের আন্দোলন সংগ্রাম স্মরণযোগ্য।

Additional information