রেল ও রাজবাড়ি

 রেল ও রাজবাড়ি

অষ্টদশ শতাব্দীর পূর্বে যাতায়াত ও যোগাযোগের ব্যবস্থা ছিল স্বল্পগতিসম্পন্ন পশুতে টাকা গাড়ি, মানুষে টাকা পালকি, পাল তোলা নৌকা ইত্যাদি। বাস্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কারের পর থেকে দ্রুতগতিসম্পন্ন যানবাহনের সাহায্যে যোগাযোগ সহজ ও দ্রুত হতে থাকে। আজকের দিনে টেলিফোন, মুঠোফোন, কম্পিটার, ইন্টারনেট যোগাযোগের গতি, আলোর গতির সমানে এনে দিয়েছে। যোগাযোগের ক্ষেত্রে সারা পৃথিবী যেন মুঠোর মধ্যে। এতদ্বসত্ত্বেও কোনো দেশেই রেলের গুরুত্ব হ্রাস পায়নি। বরং স্বল্প খরচ, নিরাপদ, আরামদায়ক যাতায়াত হিসেবে জাপান, ভারত, চীন, ইউরোপ, আমেরিকা রেলের গতি বৃ্দ্ধিতে নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও ব্যবহার বৃদ্ধি করে চলছে। পর্যায়ক্রমিক পালের গতি, অশ্বের গতি, ইঞ্জিনের গতি এবং বর্তমান ব্যবহৃত আলোর গতি সভ্যতা বিকাশের ধারাবাহিক পরিমাপক।

রাজবাড়ি রেল স্টেশনএর মধ্যে অষ্টাদশ শতকে বাষ্পীয় ইঞ্জিনের ব্যবহার কেবলমাত্র ২ শতকে ৫ হাজার শতকের অর্জিত সম্পদ ও শক্তিকে পশ্চাতে ফেলে দেয়। বিকাশ না ঘটলে ঘটত না শিল্প বিপ্লব। আর শিল্প বিপ্লব না ঘটলে আজকের চাকচিক্যময় দুনিয়া  আমরা দেখতে পেতাম না। একসময় রেলই ছিল পৃথিবীর দ্রুততম বাহন। রেলের উদ্ভাবন ও ব্যবহার ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে আসছে। ১৭৬৩ সালে জেসম ওয়াট বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিস্কার করেন। এরই সূত্র ধরে ১৮০৪ সালে প্রথম রেলের ইঞ্জিন তৈরি করেন রিচার্ড ট্রিভিসিক। ম্যাথুমুড়ে দাঁতওয়ালা রেললাইনের উপর খাঁজকাটা চাকার রেল ইঞ্জিন চালিয়ে দিলেন ১৮১২ সালে। এরপর স্কটল্যন্ডের জর্জ স্টিফেনস ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দে চুড়ান্তভাবে রেলের জন্য স্টিম ইঞ্জিনের উন্নয়ন সাধন করেন এবং ১৮২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর পৃথিবীর বুকে সর্বপ্রথম রেল পরিবহন উদ্বোধন করা হয়। ১৮৩০ সালে লিভারপুর হতে ম্যানচেস্টার পর্যন্ত ৩৫ মাইল রেলপথ খোলা হলে বিশ্বে প্রথম ভাড়ার বিনিময়ে রেলগাড়ি চালু করা হয়। তার ইঞ্জিনের নাম ছিল রকেট।

ইউরোপে তখন পুনর্জাগরণ। শিল্প বিপ্লবের যুগ। অতিসত্তর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রেল যোগাযোগ শুরু হল। ১৮২৯-এ আমেরিকা, ১৮৩৪-এ আয়ারল্যান্ড, ১৮৩৫-এ জার্মানি, ১৮৩৭-এ রাশিয়া, ১৮৩৯-এ ইটাতি, ১৮৪৮-এ স্পেন, ১৮৫৬-এ সুইজারল্যান্ড, ১৮৫৩-এ ভারতবর্ষ, ১৮৫৪-এ আফ্রিকা, ১৮৭২-এ জাপান, ১৮৭৫-এ চীন রেল স্থাপিত হয়। তখন সমগ্র ইউরোপে রেনেসাঁর যুগ। রেলপথ এসে তা তরান্বিত করেছিল।

ভারত তখন বৃটিশের উপনিবেশ। শাসন ও ব্যবসার যৌক্তিকতায় বৃটিশ সরকার ভারতে রেল স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়। ভারতের তৎকালীন বড়লাট লর্ড ডালহৌসি এ উদ্দেশ্যে ইংল্যান্ডের আর এস স্টিফেনসন এন্ড কোম্পানির রেললাইন বসানোর আলোচনা করেন। ১৮৪৪ বড়লাটের দরবারে স্থীর সিদ্ধান্ত হল যে, ভারতে রেল বসবে। এ বিষয়ে কোম্পানির সাথে চুক্তি হল। যথারীতি কাজ শুরু হয় এবং ১৮৪৫ সালের ১৬ এপ্রিল বোম্বের বোরিবন্দর স্টেশন থেকে ১৪ খানা কোচে ২১ মাইল দূরবর্তী স্টেশনে যায় এবং বোরিবন্দর ফিরে আসে। সেদিন সবাই অবাক বিস্ময়ে রেলগাড়িকে দেখেছিল, দেখেছিল দ্রুতগামী বাহন রেলের চালনা। বিজ্ঞান মানুষকে এনে দিয়েছে গতি যা জীবনকে করেছে সহজ আর উন্নয়নকে করেছে দ্রুতগামী। রক্ষণশীল গোঁড়া ধার্মিকেরা বিধান করেছিল যে, রেলগাড়ি চড়া পাপ এবং চড়লে তাকে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। বিজ্ঞানের অবদান কেউ কখনো ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি এবং পারা সম্ভব নয়। কারণ উন্নয়নই সভ্যতার অগ্রগতি। আর এর মূলে রয়েছে বিজ্ঞানের মতো সব আবিস্কার ও উদ্ভাবন।

আমাদের বাংলাদেশ সীমানায় রেল স্থাপন পরিকল্পনা শুরু হয় ১৮৫২ সালে ১৮৫২ সালে জে, পি, কেনেডি সুন্দরবন থেকে ঢাকা পর্যন্ত রেল সম্প্রারণের প্রস্তাব করেন। অতঃপর ১৮৫৫ সালে লে. গ্রেট হেড সার্ভে রিপোটে দুটি রুটে রেল লাইন স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়। প্রস্তাবটি কলিকাতা ভায়া যশোর-ফরিদপুর এবং দ্বিতীয় প্রস্তাব কলিকাতা ভায়া-কুষ্টিয়া-গোয়ালন্দ হয়ে ঢাকা। প্রথম সস্তাবটি ১৪টি বড় বড় নদী ও অন্যান্য কারণে বাতিল হলে দ্বিতীয় প্রস্তাবটি গ্রহণ করা হয়। এ প্রস্তাবের বাস্তবায়নে ১৮৫৭ সাল থেকে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে কলিকাতা-কুষ্টিয়া পর্যন্ত ব্রডগেজ একক লাইন নির্মাণের প্রস্তাব গৃহীত হয়। ১৮৫২ সালে রানাঘাট-জগতির মধ্যে প্রথম ট্রাফিক চলাচলের জন্য লাইন খুলে দেওয়া হয়। ১৮৬২ সালে যে রেলপথ শিয়ালদা স্টেশন থেকে জগতি স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছে ছিল। এক পর্যায়ে ১৮৭০ সালে গড়াই সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ হলে ১৮৭১ সালের ১ জানুয়ারি তা গোয়ালন্দ ঘাট পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়। (ইস্পাতের পথ, শফিকুল ইসলাম, পৃষ্ঠা-৪১)।


রেল রাজবাড়ি রাজবাড়ি অংশে রেলপথ পাংশা থেকে কালুখালির বর্তমান স্টেশন থেকে দুই কিলোমিটার উত্তর দিয়ে বহর কালুখালি হয়ে ধাওয়াপাড়ার ঘাট বরাবর ছিল। উক্ত রেলপথ বর্তমান রাজবাড়ি শহরের উত্তর দিক দিয়ে পূর্ব পথে জামালপুর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এখনো কোনো কোনো স্থানে তার স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে। জামালপুরই ছিল তখন গোয়ালন্দ ঘাট যাকে গ্যাঞ্জেস বন্দর বলা হত। ‘পোড়াদহ হতে ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে গোয়ালন্দ পর্যন্ত যখন রেলপথ বিস্তৃত হয় ঐ সময় আমাদের বাড়ির বহর-কালুখালির ঠিক মধ্যদেশ দিয়া রেললাইন যায়। আমার পিতা তখন রতনদিয়া উঠিয়া আসিলেন।’ [আমার স্মৃতিকথা, ত্রৈলোক্যনাথ, পৃষ্ঠা-৩৩ (বহর কালুখালি বর্তমান কালুখালি স্টেশন থেকে ৫ কিমি উত্তরে)]।

ত্রৈলোক্যনাথ এর স্মৃতিকথা থেকে-----

আমার জন্ম বৎসর ১৮৭৫। গ্রামের নাম বহরকালুখালি। কালুখালি স্টেশন হইতে এ গ্রামের দূরত্ব ছিল প্রায় দুই মাইল। পোড়াদহ হইতে গোয়ালন্দ রেলপথে জগতি, কুষ্টিয়া, কোর্ট, ‍কুষ্টিয়া (পরে কুষ্টিয়ার পূর্বদিকে গড়াই নদীর ব্রিজ পাড়ে চরাইখোল নামক একটি স্টেশন হয়)। তাহার পর কুমারখালি, খোকসা, পাংশা, তাহার পরেই কালুখালি। পরবর্তী স্টেশন বেলগাছি, তাহার পরেই রাজবাড়ি। পরে রাজবাড়ির কিছু পশ্চিমে সূর্যনগর নামক একটি স্টেশন হয় রাজা সূর্যকুমারের স্মৃতিতে। রাজবাড়ির পরবর্তী স্টেশন পাঁচুরিয়া জংশন, ইহার পরেই গোয়ালন্দ। ইংরেজি উচ্চারণে গোয়ালান্ডো। পাঁচুরিয়া হইতে শাখা লাইন ফরিদপুরে গিয়াছে। পাংশা ও বেলগাছি ও তন্মোধ্যবর্তী কালুখালি এই তিনটি স্টেশন ১৯১০ পর্যন্ত একটি সরলরেখায় অবস্থিত ছিল। পরে পদ্মা নদীর ভাঙ্গনে কালুখালি স্টেশনকে সরাইয়া রতনদিয়ার কাছে আনা হয়। অল্পদিনের জন্য অস্থায়ী একটি লাইন করা হয় হারোয়ার উপর দিয়া। কলিকাতা হইতে চাঁগা মেলে কালুখালি সাড়ে চার ঘন্টার পথ। কুষ্টিয়ার পরেই কালুখালি, মেলট্রেনে মধ্যবর্তী কোনো স্টেশনেই থামিত না। কালুখালি জংশন হইবার পর মেল ট্রেন কুষ্টিয়া ছাড়িয়া সোজা রাজবাড়ি গিয়া থামিত।

প্রমত্ত পদ্মার ভাঙ্গনের কারণে ১৮৯০ সালে রেল পুনঃস্থাপনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ১৮৯০ সালের ১ এপ্রিল রেল পাংশা, বর্তমান কালুখালি, বেলগাছি, সূর্যনগর, রাজবাড়ি ভায়া লোকোসেডের পশ্চিম দিয়ে উত্তর মুখী দুর্গাপুর, তেনাপচা গোয়ালন্দ ঘাট পুনঃস্থাপিত হয় (ইস্পাতের পথ ‍পৃষ্ঠা-৫১।

১৮৯০ এ দ্বিতীয় পর্যায়ে রেল স্থাপনকালে দলিল দস্তাবেজে গোয়ালন্দ নামকরণ হয়েছে। ১৮৯০ সালে রাজবাড়ি শহরের কেন্দ্রে রেলস্টেশন স্থাপনকালে স্টেশনকে কেন্দ্র করে পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণে এক থেকে দেড় কি.মি. জায়গা রেল কর্তৃপক্ষ অধিগ্রহণ করে। রাজা সূর্যকুমার ও বাণীবহ জমিদার গীরিজাশঙ্কর মজুমদার, বাবু নারায়ণ চক্রবর্তীসহ কয়েক জোতদার ছিলেন এ জমির মালিক। স্বল্প সময়ের মধ্যে রেলওয়ে অফিসার্স কোয়ার্টারসহ স্থাপিত হয় রেলওয়ে খেলার মাঠ, এসআর হল কেন্দ্র, লোকোসেড, শ্রমিক কোয়ার্টার, বিশ্রামাগার, ইত্যাদি। ১৯৪৭ এরপর স্থাপন করা হয় রেলওয়ে কলোনী। অনেকে রেলসূত্রের চাকরিতে স্থায়ী আবাসন গড়ে তোলে। অবশ্য বর্তমান রাজবাড়ি স্টেশনটির আধুনিকীকরণ করা হয় ১৯৬০ এর দশকে। রেলের সূত্র ধরে রাজবাড়ি শহর ভিত্তি লাভ করে। রেল সূত্রে কয়লার ব্যবসায় কয়েকজন ব্যবসায়ী প্রচুর লাভবান হন। তাদের মধ্যে হাজী গোলজার হোসেন অন্যতম।

১৮৯৫ সালে পাঁচুরিয়া হয়ে রেল গোয়ালন্দ ঘাট (বর্তমান গোয়ালন্দ বাজার সংলগ্ন) পর্যন্ত পুনঃস্থাপিত হয়। এরপর পাঁচুরিয়া থেকে অম্বিকাপুর (আমিরাবাদ) রেল বসে ১৮৯৯ সালে। এ সময় খানখানাপুর, বসন্তপুর রেলস্টেশন স্থাপিত হয়। রাজবাড়ি জেলার বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের বাঁশ, বেত, পাট বহনের গুরুত্ব বিবেচনা করে ১৯৩২ সালের ১ জানুয়ারি কালুখালি থেকে ভাটিয়াপাড়া পর্যন্ত রেল স্থাপিত হয়। এ সময় রামদিয়া, বহরপুর, আড়কান্দি, স্টেশন স্থাপিত হয়। কালুখালি রেলের জংশন স্টেশনে পরিণত হয়। পরবর্তীতে গোয়ালন্দ ঘাটের মুখে পলি জমে চর পড়লে ঘাট বর্তমান দৌলতদিয়ায় স্থাপন করা হলে ১৯৭৭ সালে রেলপথ দৌলতদিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত করা হয়। দৌলতদিয়া পর্যন্ত রেল স্থাপনের ক্ষেত্রে আক্কাস আলী মিয়া বিশেষ ভূমিকা রাখেন। রেলপথ নির্মাণে যে বৃটিশ সরকার বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে সে কথা বলাই বাহুল্য।


ইবি (ইস্ট বেঙ্গল) রেলওয়ে কোম্পানি এ রেলপথ নির্মাণ করে। কোম্পানি কন্ট্রাক্টর ও সাব কন্ট্রাক্টর দ্বারা রেলপথ ও অন্যান্য স্থাপনা কাজ সম্পন্ন করে। অত্র অঞ্চলে রেল স্থাপনের ঠিকাদারী কাজ সম্পন্ন করেন পাবনা জেলার সাগরদাড়ি গ্রামের গোবিন্দ দত্ত ও গুরুচরণ দত্ত। রেলের ঠিকাদারীতে তারা অনেক অর্থবিত্তের মালিক হন এবং গ্রাসাদোপম বাড়ি নির্মাণ করে। সাধারণ্যে জমিদার বলে খ্যাতি লাভ করেন।

 রেল কোম্পানি রেলপথ নির্মাণে জনসাধারণের নিকট থেকে যে ভূমি অধিগ্রহণ করে তার যুক্তিযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান করে। ঠিকাদারের অধীনস্থ কর্মচারীরা ক্ষতিপূরণের হিসেব কষে দিত। তখনকার দিনে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির ক্ষতিপূরণ হিসেব অবাক বৈকি? আম, জাম, কাঁঠাল, সুপারি, ডাব তো বটেই কলাগাছকেও ক্ষতিপূরণের আওতায় আনা হয়েছিল। এছাড়া জমি আর জমির  ফসল তো ছিলিই। একটি কলাগাছের কলা, কলাপাতা, মোচা ইত্যাদি হিসেবের মধ্যে এনে এর ক্ষতিপূরণ ধরা হয়েছিল ৫ থেকে ১০ টাকা। ১ মণ ধানের দাম ছিল তখন তিন থেকে সাড়ে তিন টাকা। সে হিসেবে কলাগাছের দাম ১০ টাকা ---অবাক তো বটেই। আম, জাম, কাঁঠাল, ডাব গাছের দাম ৫০ হতে ১০০ শত টাকা ধার্য ছিল (আমার স্মৃতিকথা, পৃষ্ঠা-১৩৮)।

বৃটিশরা বেনিয়া ছিল ঠিকই কিন্তু ন্যায় বোধ কম ছিল না। অনেকের ক্ষতিপুরণের টাকায় আর্থিক অবস্থার চাকা ঘুরে গেল। এ সময় গড়াই ব্রিজ করতে কয়েক লক্ষ টাকা খরচ হয় এবং অনেক মানুষ মারা যায়। সাগরকান্দির বাবুরা এই ব্রিজের ঠিকাদারীর আয়ে বিপুল অর্থের মালিক হন এবং তারা জমিদারী ক্রয় করেন। রেলস্থাপনের পর থেকে কত ঘটনাই না ঘটে গেছে রেলকে কেন্দ্র করে। আশা নিরাশার কেচ্ছা কাহিনীসহ শিল্প, সাহিত্য, অর্থনীতি, রাজনীতি, আন্দোলন, সংগ্রাম, দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা, মামলা মোকদ্দমা, সফলতা ও বিফলতার ইতিহাস বহন করে চলেছে রাজবাড়ির রেললাইন, রেলগাড়ি, রেলকর্মচারী, সাধারণ রেলযাত্রী ও ছাত্র জনতা।

উনিশ শতকের গোড়ার কথা। এক ইংরেজ সাহেব আসলেন রেলের বড় কর্তা হয়ে। থাকেন রেলের বাংলোতে (বর্তমান জাতীয় গ্রন্থাগারের উত্তরে এইএন সাহেবের বাসা)। সাহেব বলে কথা? আসলে সহজ মানুষ। রাজবাড়ির গ্রামীণ পরিবেশ তার ভালো লাগে। সকাল সন্ধ্যায় ঘুরে বেড়ান একাকি। বাংলোতে থাকেন একা। পরিচয় হয় কত রকম মানুষের সাথে। রাজবাড়ি শহরের পশ্চিমে শহরতলীতে ২০/২৫ ঘর বাগদীদের বাস। এখনো তা বাগদীপাড়া বলে পরিচিত। পরিচয় ঘটে এক বাগদী মেয়ের সাথে। পরিচয় ধরে প্রেম পরে পরিণয়। বাগদির মেয়ে বিয়ে করে তুলে আনলেন বাংলোতে। কয়েক বছরের সংসার। একদিন মেয়েটি কলেরা আক্রান্ত হয়ে মারা গেল। সাহেবের সেকি কান্না। স্ত্রীর স্মৃতি রক্ষার্থে সমাধিস্থ করা হল। জাতীয় গ্রন্থাগারের পশ্চিমে রাস্তার মোড়ে বাঁধানো সমাধিটি সে প্রেমের স্মৃতি বহন করে চলেছে।

রাজবাড়িতে রেল আসার পূর্বে ১৮৬১ সাল থেকে শুরু হয় গড়াই ব্রিজ নির্মাণ। মীর মশাররফ হোসেন চন্দ আরোপ করেন ‘গৌড়ী সেতু’ নামক কবিতা পুস্তিকায়। আত্মজীবনীতে তিনি গড়াই ব্রিজ নির্মাণের একটি বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেন। আমার জীবনীগ্রন্থে তিনি লিখেছেন------

লাহিনীপাড়ার উত্তরাংশ হইয়া পূর্বদেশগামী রেললাইন গৌড়ী নদী পাড় হইয়া গোয়ালন্দ পর্যন্ত গিয়াছে। ইংরেজি ১৮৭১ সালে সেতুবন্ধন শেষ হইয়া গাড়ি চলা আরম্ভ হইয়াছে। ভারতে চিরবিখ্যাত মহামতি লউসেও বড়লাট বাহদুর গৌরী সেতু খুলিয়াছেন। গৌরী সেতুবন্ধন সময়ে অনেক মান্যমান হিন্দু মুসলমান কেরানী, ড্রাফটসম্যান, ক্যাশিয়ার বড় বাবু সাজিয়া রেলওয়ে কোম্পানিরর অধীনে কার্য করিতেন। খাশ ইউরোপীয়ান অতি কম হইলে ২০/২৫ জন, দেশী ফিরিঙ্গী প্রায় ঐ পরিমাণ, নিগ্রো হাবসী ১০/১২ জন, কেরানীদল ৭০/৮০ জনের কম ছিল না। হাতী, ঘোড়া, বোট নৌকা, লঞ্চ, স্টিমার বিস্তর ছিল। চট্রগ্রাম, শ্রীহট্র প্রভৃতি স্থানের এবং দেশীয় কুলী, হিন্দুস্থানী কর্মকার, সূত্রধর কুলী মজুরের সংখ্যার হিসেবে কঠিন। স্বর্গীয় দুর্গাচরণ গুপ্ত যাহার গুপ্ত প্রেস, গুপ্ত পঞ্জিকা বঙ্গদেশ বিখ্যাত তিনিও গৌরী সেতুবন্ধন উপলক্ষ্যে রেলওয়ে কোম্পানির বেতনভোগী হেডবাবু হইয়া কার্য করিতেন। (মশাররফ রচনা সম্ভার, (পৃষ্ঠা-৭৩)। রেলস্থাপনের কালে অনেক কোম্পানির নিকট থেকে পেয়েছে জমির ক্ষতিপূরণ মূল্য আবার অনেকের ফসলের জমি জিরেত চলে গেছে কোম্পানির হাতে।


অনেকে রেলের চাকরি নিয়ে বাবু হয়েছে আবার অনেকে কয়েক পুরুষের ভিটে মাটি ছেড়ে সরে গেছে বিদেশ বিভুঁইয়ে। কত উৎসুক প্রথম ইঞ্জিন চাকাওয়ালা গাড়ি দেখতে এসেছে। গাড়ির শব্দ, ইঞ্জিনের হুইসেল শুনে চমকিত হয়েছে। কত মানুষ রেলের চাকায় পিষ্ট হয়ে কালে অকালে হারিয়ে গিয়েছে। রেলকে নিয়ে রচিত হল কবিতা ছড়া--------

‘রেলগাড়ি ঝমাঝম

পা পিছলে আলুর দম’

ঘোড়ার গাড়ি, গরুরগাড়ি, পালকী বাহনে পায়ে হাঁটা শত শত বছরের অভ্যস্ত মানুষের মধ্যে অনেকে রেলকে স্বাগত জানালো আবার অনেকে ভাবল রেল স্থাপন বৃটিশ বেনিয়াদের এ দেশের সম্পাদ লুণ্ঠনের নয়াকৌশল। তবে সভ্যতা আর সংস্কৃতি বিকাশে যখন যেখানে যে কৌশলের উদ্ভাবন হয়েছে তা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছে নানা দেশ ও নানা জাতির মধ্যে। এদেশে রেলস্থাপনও সে সাক্ষ্য বহন করছে। রেলের যে শুরু তারপর থেকে এর গুরুত্ব কেবল বেড়েই চলেছে।

১৮৭১ সালে রাজবাড়িতে রেল আসার পর থেকে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা পর্যন্ত শত বছরের ইতিহাস যদি গ্রহণ করা যায় তাহলে দেখা যাবে এ জেলার অর্থনৈতিক, সামজিক ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছে এই রেলকে কেন্দ্র করে। পাংশা, বেলগাছি, কালুখালি, রাজবাড়ি, গোয়ালন্দ, খানখানাপুর, বসন্তপুর, রামদিয়া, বালিয়াকান্দি তুলনামূলক দক্ষিণের জঙ্গল, নাড়ুয়া এবং পশ্চিমের মৃগী, সাওরাইল কশবামাঝাইল এলাকা থেকে তুলনামূলক বর্ধিষ্ণু এলাকা। এরমধ্যে রাজবাড়ি, গোয়ালন্দ, পাংশা, বেলগাছির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেক বেশি।

রেল স্থাপনের পর থেকে কালুখালি একটি জংশন, রাজবাড়ি একটি শহর, গোয়ালন্দ বাংলার দ্বারপথ (Get way of Bengal) বা বৃহৎ গঞ্জ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। তখন বাংলার রাজধানী ছিল কলিকাতা। শিক্ষা-দীক্ষা, যাতায়াত, ব্যবসা-বাণিজ্য, সাহিত্য সংস্কৃতি সবই ছিল কলিকাতা কেন্দ্রিক। এ সময় থেকেই বাবু কালচার বলে একটি শ্রেণি বিশেষের সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে যার প্রভাব এ অঞ্চলে এখনো অনেক ক্ষেত্রেই লক্ষ্য করা যায়। এখনো অফিসের হেডক্লার্ককে রাজবাড়িতে অনেক অঞ্চলে বাবু বলতে শোনা যায় আর ছেলে সন্তানদের স্বাভাবিকভাবেই ডাকা হয় বাবু বলে। বস্তুত রেলের কারণে কলিকাতার সাথে সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা শিক্ষা সংস্কৃতির বিকাশ ঘটায়। জনজীবনে রেলের গুরুত্ব এতটাই বৃদ্ধি পায় যে, ১৯৪৪ সালে রেলকে নিয়ে এক সঙ্কটের সৃষ্টি হয়। তৎকালীন গোয়ালন্দ মহকুমার কালুখালি-ভাটিয়াপাড়া রেল লাইনটি কিছু প্রশাসনিক জটিলতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে ১৯৪০ সালের ৯ ডিসেম্বর কর্তৃপক্ষ ১৮ ডিসেম্বর থেকে উ্ক্ত লাইনটি বন্ধ করার এক নোটিশ জারী করে। এটা ছিল রাজবাড়ি ও ফরিদপুরের জন-মানুষের জন্য এক দুঃসংবাদ। এ সময় রাজবাড়ি ও ফরিদপুরের জনসাধারণ ভারতের ভাইসরয় ও বাংলার গভর্নর এর নিকট উক্ত লাইন চালু রাখার জন্য আকুল আবেদন জানান। এ আবেদন জনজীবনে শাখা লাইনটির সার্থক ও সামাজিক গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং লাইনটি বন্ধ না-করার দাবি রাখেন। তারা দাবিতে উল্লেখ করেন-----‘কালুখালি-ভাটিয়াপাড়া রেলপথ ৫২ মাইল দীর্ঘ। এলাকাবাসীও প্রায় ১০০ শত বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে এই রেলপথের দ্বারা উপকৃত হয়েছে। এখানে অন্যকোন যানবাহন নেই। লাইনটি এলাকার অধিবাসীদের নিকট ‘Life cord'  নামে চিহ্নিত। শাখা লাইনটি ঐতিহাসিক, বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক গুরুত্ব বহন করে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করা ছাড়াও এই রেলওয়ের মাধ্যমে জনগণের একটি বিরাট অংশ তাদের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের জন্য কাজের সূত্রে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করে। কর্মক্ষেত্র প্রসারের মাধ্যমে সামাজিক ক্ষেত্রে মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। নতুন নতুন শ্রেণির উদ্ভব হয়েছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ব্যবসায়ী, আইন ব্যবসার সাথে যুক্ত পেশাজীবী, চিকিৎসা সংক্রান্ত কাজে নিয়োজিত চিকিৎসক, শিক্ষাব্রতী, বিদ্যোৎসমাজ, সরকারি কর্মচারী, কারিগর, কৃষক, দিন মজুর ছাত্র ইত্যাদি শ্রেণি। এই লাইনটি বন্ধ হয়ে গেলে উক্ত সকল শ্রেণির মানুষ বিশেষ করে চাকরিজীবীদের মধ্যে অসুবিধার সৃষ্টি হবে এবং রেলওয়ের অনুপস্থিতির কারণে জনগণের আয়ের উপরও প্রভাব পড়বে। রেলওয়ে আগমনের ফলে এ এলাকার অধিবাসীগণ উৎসাহিত হয়ে তাদের ক্ষমতা ও উপাদান এই অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য নিবেদন করে। যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় এ অঞ্চলের অধিবাসীগণ অনেক বেশি পরিমাণে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনের তাগিদে কলিকাতার উপর অনেক নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।’ (পূববাংলার রেলওয়ের ইতিহাস, দীনাক সোহানী, পৃষ্ঠা-২০৪,৫)।


রেল স্থাপনের পর গোয়ালন্দই একমাত্র সংযোগ কেন্দ্র যেখান থেকে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, সিলেট, আসাম, চট্রগ্রাম থেকে স্টিমারযোগে এসে রেলগাড়িতে কলিকাতা যাতায়াতের সুযোগ ঘটে। গোয়ালন্দের গুরুত্ব উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে। গোয়ালন্দকে তখন বাংলার প্রবেশ পথ (Get way of Bengal) বলা হত। গোয়ালন্দের নাম ছড়িয়ে পড়ে ঢাকা, কলিকাতা, দিল্লী, এমন কি সুদূর বিলেত পর্যন্ত। পদ্মা ও যমুনার সংযোগস্থল বলে গোয়ালন্দ ভূগোলবিদ, ঐতিহাসিক, মানচিত্রবিদদের নিকট পরিচিত ছিল। তদুপরি রেল স্থাপনের পর এর গুরুত্ব অধিক বৃদ্ধি পায়। ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত রেল চলাচল শুরু হয় ১৮৮৫ সালের ৪ জানুয়ারি। এই সময়েই ইন্ডিয়ান জেনারেটর নেভিগেশন এবং রেলওয়ে কোম্পানির স্টিমার গোয়ালন্দ থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত রেলের যাত্রী ও মালামাল পারাপার শুরু করে। এরপর ১ জুলাই ১৮৯৫ তারিখে চাঁদপুর ঘাট স্টেশন উদ্বোধন হওয়ার পর চাঁদপুর ঘাট পর্যন্ত রেলওয়ে যাত্রী ও মালামাল পাড়াপাড় শুরু হয়। চট্রগ্রাম, কুমিল্লা, ঢাকা, সিলেট, আসামের যাত্রী গোয়ালন্দ ঘাট দিয়ে কলিকাতায় যাতায়াত শুরু করে। কলিকাতা থেকে ঢাকা মেইল, ওয়ান আপ-টু ডাউন, ওয়ান আপ-টু-আপ প্রভৃতি নামের দ্রুতগামী ট্রেন যাতায়াত করত। অষ্ট্রিচ, ইমু, কাওয়াই প্রভৃতি নামের স্টিমার ট্রেনের যাত্রী ও মালামাল বহন করত। গোয়ালন্দ-ঢাকা, ঢাকা-গোয়ালন্দ, গোয়ালন্দ- নারায়ণগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ-গোয়ালন্দ ডিব্রুগড় স্টিমারছাড়াও অন্যপথে স্টিমার গোয়ালন্দ থেকে ফরিদপুর, বরিশাল এবং খুলনা পথে কলিকাতায় যাতায়াত করত। তখন পদ্মা নদী এবং অন্যান্য নদীর অবস্থা বর্তমানের মতো অগভীর ও স্রোতহীন ছিল না। পদ্মা, গড়াই এমন কি চন্দনা নদীতে স্টিমার চলাচল করত। ‘রেলের কারণে রাজধানী কলিকাতার সাথে সংযোগ স্থাপিত হওয়ায় গোয়ালন্দ হয়ে ওঠে পূর্ব-বাংলার বৃহত্তম বন্দর। স্টিমার, রেলগাড়ি, অফিস, মালামাল, ব্যবসায়ী, যাত্রী, কুলী-মজুরের ভীড়ে গোয়ালন্দ এক ব্যস্ত বন্দর নগরীতে পরিণত হয়। আসামের চা বাগানে কুলি প্রেরণের জন্য স্টেশনে ডিপো নির্মাণ করা হয়। এ ডিপো কুলিদের বহির্গমন ও অভিবাসনে ব্যাবহৃত হত। (পূর্ব-বাংলার রেলপথের ইতিহাস-দিনাক সোহানী-পৃ-৪৭)। গোয়ালন্দের ইলিশ, পাঙ্গাস, তরমুজ, চিনি, মশলা ভারত বিখ্যাত ছিল। কলিকাতা ও দিল্লীতে গোয়ালন্দের ইলিশ ও তরমুজের হাট বসত। গোয়ালন্দে আগমন ঘটেছে দেশের নামী দামী সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদদের। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ট্রেনযোগে গোয়ালন্দ হয়ে ঢাকা গিয়েছেন কয়েকবার। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস ‘পদ্মানদীর মাঝি’র পেক্ষাপট এ গোয়ালন্দ।

মরুতীর্থ হিংলাজের লেখক অবধুত আস্তানা গেড়েছিলেন এই গোয়ালন্দ। উপন্যাসটি তিনি তৎকালীন স্বরাজ আন্দোলনের নেতা সূর্যনগরের হরিণধারার বাবু বৃন্দাবন দাসের নামে উৎসর্গ করেন। এখানে আস্তানা গড়ে তোলেন সাধু, সন্ন্যাসী, তান্ত্রীক। ১৮৯১ সালের আদমশুমারীতে তৎকালীন ফরিদপুর জেলার লোকসংখ্যা ছিল ৯৬,৩৩৩ জন। তাদের একাংশের জীবন ও জীবীকা ছিল গোয়ালন্দকে কেন্দ্র করে । এ সময় ঢাকা থেকে আগত ৩ হাজার, যশোহর থেকে আগত ১ হাজার নদীয়া থেকে আগত ১ হাজার ঘাটকুলি নিয়োজিত ছিল। ট্রেনের ঝমাঝম আর হুইসেলের আওয়াজ, জাহাজের কাপ্তানের বাঁশি, শত শত দেশ বিদেশের যাত্রী, কয়েক হাজার ঘাটকুলী, বিশেষ কায়দায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ, রুপালি ইলিশ সব মিলিয়ে গোয়ালন্দ যেন এক রুপনগরী। পদ্মা ত্রয়োদশ চতুর্দশে ছিল ক্ষীণতোয়া। পঞ্চদশ ষোড়শ শতকে এসে পদ্মা বেগবান হয়।

যমুনার জল বুকে নিয়ে পদ্মা স্ফীত ও তরঙ্গায়িত হয়ে ওঠে। নিজেকে প্রশস্ত করতে কূল-পাড় ভেঙ্গে পদ্মা কীর্তিনাশায় পরিণত হয়। পদ্মার ভাঙ্গনে ঘাট বারবার বদল করতে হয়েছে। অফিস আদালত এসেছে রাজবাড়িতে। পত্তন ঘটেছে রাজবাড়ি শহরের। পদ্মার মুখে এখন আবার চর আর চর। সেকালেও পদ্মার চর পড়ত। তখন চর স্থায়ী হত না। চর ভাঙ্গন এখন তীব্র নয়। বরং পদ্মার চর গোয়ালন্দে এসে অশ্বক্ষুরাকৃতি ধারণ করেছে, যার পরিণাম নদীর মরণ। এ দেশ নদী মাতৃক দেশ। এখন আর নদীর সে প্রভাব নেই। কয়েকশত নদী মরে বিল, খাল, ডোবায় পরিণত হয়েছে। পদ্মার এমন দশায় গোয়ালন্দের সে নাম আর জৌলুস নেই। রেলের জৌলুস হারিয়ে গেছে। রাজবাড়ি-ফরিদপুর, ফরিদপুর-যশোহর মহাসড়ক ও স্থল যোগাযোগের উন্নতিতে রেল অনেকাংশে উপেক্ষিত। আশির দশকের মাঝমাঝি থেকে ভাটিয়াপাড়া লাইন বন্ধ হয়ে যায়। ফরিদপুর লাইন বন্ধ। বর্তমানে কেবল মধুমতি, নকসিকাঁথা, শাটল, পার্ববর্তীপুর লোকাল, গোয়ালন্দ ও রাজবাড়ি থেকে চলাচল করে। রেলের গৌরব ফিরে পেলে রাজবাড়ির আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন দ্রুতশীল হত।


রেল-শ্রমিক আন্দোলনে রাজবাড়ির সংশ্লিষ্টতা

ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লবোত্তরকাল শ্রমিক শোষণের যুগ। ‘হনরীর হাতুড়ী বাজছে তো বাজছে, দিনরাত বাজছে।’ হেনরীর হাতুড়ীর শব্দ সারাদিন শোনা যায়। হেনরীর অবসর নেই। তার কাজের সময়ের পরিমাণ নির্ধারিত নাই। শোষিত বঞ্চিত শ্রমিক শ্রেণি এক সময় জেগে উঠল। সংঘবদ্ধ হয়ে ১৮৮৬ সালের ১লা মে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটের রাজপথে নেমে এলো। শোষক শ্রেণির গুলিতে রঞ্জিত হল রাজপথ। নিহত শ্রমিকদের বুকের রক্ত বৃথা যায় নাই। তারা সৃষ্টি করে গেল ঐতিহাসিক মে দিবস। শ্রমিকের কাজের সময় ৮ ঘন্টা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেল। শ্রমিক শ্রেণির সেই জয়যাত্রা থেমে নেই। যুগ যুগ ধরে শ্রমিকরা সংগঠিত হচ্ছে, ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা করে নিজ নিজ ক্ষেত্রে নায্য দাবি আদায়ে সচেষ্ট হচ্ছে। ভারতবর্ষেও এর ব্যতিক্রম হয় নাই। শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে ১৯২০ সালের ১১ই মে গঠিত হয় ‘অল ইন্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস।’ তৎকালীন দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ডানপন্থী ও বামপন্থী দুই শিবিরে বিভক্ত হয়, যার নাম ছিল অল ইন্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন ও অল ইন্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে ভারত পাকিস্তান স্বাধীনতা লাভ করে তখন থেকে ভারত পাকিস্তানে ট্রেড ইউনিয়ন নতুনভাবে সংগঠিত হয়। ইস্ট পাকিস্তান ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন গঠিত হয় ১৯৪৭ সালের ২৮ মে। রাজবাড়ি রেলশহর হিসেবে রেল শ্রমিক আন্দোলন অতিগুরুত্বপূর্ণ। অবিভক্ত ভারতে গড়ে ওঠা ফেডারেশন এর সূত্র ধরে পূর্ববাংলার বামপন্থী নিয়ন্ত্রিত ইস্টবেঙ্গল রেল রোড ওয়ার্কাস ইউনিয়ন গঠিত হয়। অতঃপর ১৯৪৭ সালে এক সম্মেলনে ইস্ট পাকিস্তান রেলওয়ে এমপ্লয়ীজ লীগ EPREL নামকরণ করে ট্রেড ইউনিয়ন গঠিত হয়। ১৯৪৭ সালের ১৮ই ডিসেম্বর ৭০ হাজার শ্রমিক কর্মচারীর সুদীর্ঘ আন্দোলন একই সাথে পে-কমিশন বাস্তবায়নের দাবিতে রেল ধর্মঘট, ১৯৪৯ সালে ১২ হাজার শ্রমিক ছাঁটাই আন্দোলন, ১৯৫২ সালে ভাড়া আন্দোলন, সিআরবি ধর্মঘট এর প্রেক্ষিতে সুপ্রীমকোর্ট জাস্টিস ফজলে আকবরের নেতৃত্বে Rly Industrial Tribunal  গঠন হয়। এই ট্রাইবুনালে রাজবাড়ি থেকে প্রতিনিধিত্ব করেন  EPREL এর কার্যকরী কমিটি। সরকার পক্ষে থাকেন ব্যারিস্টার মাহবুবর রহমান ও রেলপক্ষে থাকেন অ্যাডভোকেট হামিদুল হক চৌধুরী। দীর্ঘ এক বছর পর রায় প্রকাশিত হয় যা Rly Industrial Tribunal Award  নামে পরিচিত। এই ট্রাইবুনালে রাজবাড়ি থেকে প্রতিনিধিত্ব করেন। EPREL এর কার্যকরী কমিটির সদস্য আমজাদ হোসেন জোয়ারদার। ট্রাইবুনাল থেকে ফিরে এসে আমজাদ হোসেন জোয়ারদার EPREL  রাজবাড়ি শাখার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কাজী আব্দুল হালিম (Head clerck, Power House) এর তত্ত্ববধানে ও মোঃ রোস্তম আলী খানের (তার নামে বর্তমানে রাজবাড়ি স্টেশনের রোস্তম আলী চত্বর) সক্রিয় সহায়তায় শাখাকে পুনর্গঠিত করা হয়। সময়ে সময়ে পাবনা জেলার জসিম মণ্ডল এর সহযোগিতায় শ্রমিক জনসভা করে শাখাকে আরো মজবুত করা হয়। এ সময় স্থানীয় রাজনৈতিক দলের অনুপ্রেরণা বিশেষ করে আওয়ামী লীগ, মুসলিম লীগ, দলকে মজবুত করে। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী অ্যাডভোকেট আব্দুল ওয়াজেদ চৌধুরী জয়লাভ করেন। আওয়ামী লীগ প্রার্থীর জয়লাভে ডিএমএন ইসলাম (মরহুম ইসলাম ভাই), এসএ চৌধুরী ও আমজাদ হোসেন জোয়ারদার, প্রমুখ রেল কর্মচারীর ভূমিকা স্মরণযোগ্য।

তৎকালীন পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সামরিক শাসন জারির প্রেক্ষাপটে শ্রমিক আন্দোলনে স্থবিরতা আসলেও এমপ্লয়ীজ লীগ তার নিজস্ব নীতি বলে সংগঠন উম্মুক্ত রাখে এবং রেল শ্রমিকের দাবি দাওয়ার ভিত্তিতে ১৯৫৭ সালের ১২ই জুলাই সৈয়দপুর ওয়াগণ সপ স্ট্রাইক, ১৯৫৮ সালে তিস্তামুখ ঘাট ভাতা আন্দোলন করে। ১৯৬২ সালে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে ধর্মঘট হয় যাতে চট্রগ্রাম রেল কারখানায় পুলিশের গুলিতে ১জন শ্রমিক নিহত। বিভিন্ন স্থানে রেল শ্রমিক গ্রেফতার হন। এ সময় রাজবাড়ির আমজাদ হোসেন জোয়ারদারসহ এ এইচ চৌধুরী, মোঃ রোস্তম আলী, মোঃ আকবর আলীকে পুলিশ গ্রেফতার করে ফরিদপুর জেলে পাঠায়।

মজুরী নির্ধারণের দাবিতে ১৯৬৫ সালে সর্বাত্মক ধর্মঘট হয়। এই ধর্মঘটে রেলের বিভিন্ন স্থান থেকে পুলিশ পাইকারীভাবে রেল শ্রমিকসহ অন্যান্যদের গ্রেফতার করে। রাজবাড়ি থেকে আমজাদ হোসেন জোয়ারদার, ছাত্রলীগের চিত্তরঞ্জন গুহ, মোঃ মকসুদ আহমেদ রাজাকে রাজবন্দি হিসেবে Safey Act- এ তিন মাসের ডিটেনশন দিয়ে ফরিদপুর ও ঢাকা সেন্টা্ল জেলে আটক রাখা হয়। আরো ২৮ জন কর্মীকে নির্দিষ্ট অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। স্বাধীনতা-উত্তরকালে রাজবাড়ি রেলশ্রমিক ইউনিয়নের আন্দোলন সংগ্রাম স্মরণযোগ্য।


স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের পর অন্যান্য দলের মতো বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মতাদর্শের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দলের অঙ্গদল হিসেবে অধিভুক্ত হয়। যেমন আওয়ামী লীগের বাংলাদেশ রেলশ্রমিক লীগ, বামপন্থীদলের বাংলাদেশ রেলওয়ে শ্রমিক ইউনিয়ন। রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় থেকে শ্রমিক শ্রেণির কল্যাণ সম্ভব নয় বিধায় এর কিছু সংখ্যক সচেতন কর্মী ও কর্মকর্তা শ্রমিক আন্দোলনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার কল্পে অনেক প্রতিকূল অবস্থার ভিতর ১৯৭৪ সালে ইস্ট-পাকিস্তান রেলওয়ে এমপ্লয়ীজ লীগকে বাংলাদেশ রেলওয়ে এমপ্লয়ীজ লীগ নামকরণ করে। রাজবাড়ি শাখার দায়িত্ব নে গার্ড শওকত আলী মিয়া। তিনি আমজাদ হোসেন জোয়ারদারের তত্ত্বাবধানে শাখা পুনর্গঠন ও মজবুত করেন। শওকত আলী নবীন হলেও তার দক্ষতা, বিচক্ষণতা ও সততার দরুণ তিনি জাতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশ ফ্রিট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের সক্রিয় সদস্য হন। তিনি ১৯৯৮ সালে সরকারের পক্ষ থেকে দিল্লীতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ট্রন্সপোর্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের মহাসম্মেলনে প্রতিনিধিত্ব করেন। তিনি খুলনায় অবস্থিত জোনাল শ্রম আদালতের একজন উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত। তিনি বাংলাদেশ গার্ড কাউন্সিলের সহ-সভাপতি। রেল সংকোচনের ফলে রেল বন্ধ হওয়ার উপক্রম। ইতিমধ্যে ভাটিয়াপাড়া ও ফরিদপুর লাইন বন্ধ হয়ে গেছে। রেল সংকোচন নীতি বাতিল ও রেল সম্প্রসারণ আন্দোলনে গঠিত রেলওয়ে সংগ্রাম পরিষদ এর কার্যকরী কমিটির সদস্য হিসেবে শওকত আলী কাজ করে চলেছেন। রেলশ্রমিক আন্দোলনের সাথে রাজবাড়িতে বিশেষভাবে সংশ্লিষ্ট আছে রবিউল ইসলাম (রবিউল), আব্দুস সাত্তার, গোলাম মওলা, আজিজুর রহমান (দিলু), আব্দুল মান্নাফসহ (মোহন)অনেকে।

Additional information