শতবছরের রাজনীতি

শতবছরের রাজনীতি

রাষ্ট্রযন্ত্রের বিকাশের সাথে রাষ্ট্রপরিচালনায় সুসম্মত নীতিমালা রাজনীতির সংজ্ঞাভূত। প্রাচীন গ্রীসে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের বিকাশ ঘটলেও প্রকৃত রাষ্ট্র ও রাজনীতির বিষয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীগণ সপ্তদশ শতক থেকে সরব হতে শুরু করেন। হসব, লক, রশো, থেকে শুরু করে ম্যাকিয়াভেলী, লিংকন, হেরন্ড লাস্কী, গার্নার, মার্কস, রাষ্ট্রকাঠামো ও রাজনীতি বিষয়ে নানা তত্ত্ব ও মতামত ব্যক্ত করেন। রাষ্ট্র পরিচালনায় একক ব্যক্তির শাসনের বিপরীতে গণমানুষের অংশীদারিত্ব নিশ্চিতকরণে গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটে। এ সময় ইউরোপ, আমিরেকায় গণতান্ত্রিক ধারা প্রভূত বিকাশ লাভ করে এবং জনপ্রিয় হয়ে উঠে। অবশ্য ঊনিশ শতকে এসে রাষ্ট্র চেতনার ক্ষেত্রে কার্লমার্কসের আবির্ভাব নবচেতনার উন্মেষ ঘটায়। গণতন্ত্রের বিপরীতে উৎপাদন ও সমাজশাসনে রাষ্টীয় ক্ষমতার ব্যবহার সর্বাধিক গুরুত্ব পায়। ভারতবর্ষে রাজনীতির ধারা বহুবিধ হলেও এর বিকাশের

ধারণা পেতে আমাদের ইতিহাসের দিকেই দৃষ্টি ফেরাতে হবে। বলা হয় এক সময় বৃটিশ রাজ্যে সূর্য অস্তমিত হত না। প্রাচ্য আর পাশ্চত্য জুড়ে তারাই ছিল দখলদার। স্বজাতীয়দের মাতৃভূমি ছলে, বলে, কৌশলে দখল করে তারা রাজত্ব গড়ে তোলে। বৃটিশ রাজত্ব অধিনস্থ দেশকে বলা হত উপনিবেশ। অন্য দিকে বিশ শতকের শুরু থেকে মার্কসের সমাজতান্ত্রিক ধারা প্রবল হয়ে ওঠায় গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার বিপরীতে কমিউনিস্ট শাসন ব্যবস্থার প্রতি ঝোঁক প্রবল হয়। ভারতবর্ষে হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম, বৃটিশ শাসনকালে নানারুপ জাতিসত্ত্বার বিকাশ ঘটে। ফলে গণতান্ত্রিক, কমিউনিস্ট, বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন সংগ্রাম এবং হিন্দু ও মুসলিম জাতিসত্ত্বার বিকাশ ও অধিকার সুরক্ষায় রাজনীতির রঙ্গমঞ্চ নানা ধারায় বিকাশ লাভ করে। পাল, সেন, সুলতান, মোগল, শাসনকালে সম্রাট-সাম্রাজ্য, রাজা-রাজ্য, নবাব-নবাবী এমনধারায় প্রজাপালন, প্রজা শাসনে রাজ্য পরিচালিত হত। ১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধের ফলাফলে ভারত যেভাবে উপনিবেশিক শাসনের জালে আটকা পড়ে তা থেকে মুক্তিলাভ করতে লেগেছে ১৯০ বছর (১৭৫৭-১৯৪৭)। এ সময়কাল ভারতে স্বদেশীয় প্রজার স্বার্থ, অধিকার, স্বাধীকার, স্বাধীনতা অর্জনে নানা আন্দোলন, সংগ্রাম ও রক্তদানের মধ্য দিয়ে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির বিকাশ ঘটে। বৃটিশ শাসনের শুরু থেকে  সন্ন্যাস ও ফকির বিদ্রোহ, সিপাহী বিদ্রোহ, নীলবিদ্রোহ, তিতুমীরের বাঁশের কেল্লার লড়াই, পাগল বিদ্রোহ, মুজাহিদ আন্দোলন, ওহাবী আন্দোলন, ফারায়জী আন্দোলন, সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন, স্বদেশী, স্বরাজ, অনুশীলন, যুগান্তর ইতিহাসে খ্যাত। এসব আন্দোলনের ফলাফল যাই হোক আন্দোলনসমূহ রাজনীতির গতিধারা এবং ভারতবাসীকে অধিকার সচেতন করে তোলে। ঊনিশ শতকের শেষে নিয়মতান্ত্রিক অধিকার আদায়ে কংগ্রেস গঠন (১৮৮৫) এবং বিশ শতকের প্রথম দিকে মুসলিম লীগ গঠন (১৯০৬) ভারতবর্ষে রাজনীতিতে মূল ধারার সৃষ্টি করে যা বিশ শতকে গণতান্ত্রিক কাঠামোয় রুপ লাভ করে। কংগ্রেস এবং মুসলিমলীগের সৃষ্টিলগ্নে রাজবাড়ির রাজনীতিতে সচেতন মানুষের সংশ্লিষ্টতা দেখা যায়। কংগ্রেস গঠনকালে জলধর সেন গোয়ালন্দ মডেল হাইস্কুলে শিক্ষকতা করতেন। (চরিতাবিধান, বাংলা একাডেমী, পৃ-১৮৭)। ধারণা করা যায় এ বিদ্যালয়টি ছিল তৎকালীন গোয়ালন্দ ঘাট সংলগ্ন তেনাপচা দুর্গাপুর বা জামালপুরে। তিনি ঐ বিদ্যালয়ের ছাত্রও ছিলেন। জলধর সেন তাঁর স্মৃতিচারণে লিখেছেন-----‘১৮৮৬ অব্দের শেষভাগে ডিসেম্বর মাসে কলিকাতা নগরীতে জাতীয় মহা সমিতির (কংগ্রেসের) দ্বিতীয় জাতীয় অধিবেশন হয়। সেই অধিবেশনে আমি গোয়ালন্দের জনসাধারণ কর্তৃক প্রতিনিধি হয়ে যাই।’

Additional information