শতবছরের রাজনীতি - পৃষ্ঠা নং-২

জলধর সেনের নেতৃত্বে গোয়ালন্দ কংগ্রেসের কয়েকটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। কংগ্রেস নেতা অশ্বিনী কুমার গোয়ালন্দ কংগ্রেসের সভায় উপস্থিত হয়ে দেশের শাসন ও বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ দাবি করেন। এ ধারার রাজনীতির মধ্যে ভারতের হিন্দু ও মুসলমান দুটি জাতির আত্মবিকাশের স্বার্থের সাথে উপনেবেশিক শাসন থেকে মুক্ত করার স্বার্থও জড়িত থাকে। পাশাপাশি ১৯১৯ সালের রুশ বিপ্লবের সফলতায় মার্কস, লেনীন জনপ্রিয় হওয়ায় কমিউনিস্ট আন্দোলন দানা বাঁধে। রাজনীতির ধারায় এরা বামপন্থী বা লেফটিস্ট বলে পরিচিত। ১৯৪৭ এরপর ভাষা ও অর্থনৈতিক অধিকার আদায় সংগ্রামে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে রাজনীতি নানা ডালপালায় বিকশিত হয়। হোসেন শহীদ সহরোওয়ার্দী, একে ফজলুল হক, মৌলবী তমিজ উদ্দিন খান, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের দ্বারা তৎকালীন পাকিস্তানের রাজনীতিতে বিশেষ করে পূর্ব-পাকিস্তানে মুসলিমলীগ, আওয়ামী মুসলিম লীগ, আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, নিজামে ইসলাম, গণতান্ত্রিক পাটি, খিলাফতে রব্বানী, ইত্যাদি রাজনৈতিক দলের বিকাশ ঘটে।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৬ এর ছয় দফার আন্দোলন, ১৯৬৯ এ গণঅভ্যুত্থান এবং সর্বশেষ ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ একটি স্বাধীন দেশের জন্ম দেয়। স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামসহ বামপন্থী ধারা জাতীয় রাজনীতিতে গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটায়। শত বছরের আন্দোলন সংগ্রামের ধারায় রাজবাড়ি জেলার রাজনীতির ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সংক্ষেপ বিবরণ।

সন্ন্যাস ও ফকীর বিদ্রোহ

রাজবাড়ি থেকে ২ স্টেশন পশ্চিমে বেলগাছি। বেলগাছির অদূরে রথখোলা যেখানে আজও রথের মেলা বসে। এ রথখোলা প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী স্থান। এ স্থানের সাথে জড়িয়ে আছে প্রাচীন অনেক স্মৃতির সাথে ফকীর ও সন্ন্যাস বিদ্রোহের চিহ্ন। ভবানী পাঠক বরেন্দ্র নিবাসী (রঙ্গপুর) জনৈক ব্রাহ্মণ সন্তান, যিনি ইংরেজদের নিকট দস্যুসর্দার বলে পরিচিত। মূলত তিনি সন্ন্যাস বিদ্রোহের নেতা। বাল্যকালে রীতিমত স্বাস্থ্যচর্চা করে তিনি জন্মভূমির দুঃখে কাতর হতেন। ইংরেজ শাসনের প্রারম্ভে ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরানী রংপুর অঞ্চলে প্রভুত্ব স্থাপন করে ইংরেজ শাসনের ভিত কাঁপিয়ে তোলেন। ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে তা বিপ্লবের রুপ ধারণ করে। ইতিহাসে তা সন্ন্যাস বিদ্রোহ বলে পরিচিত। প্রায় ৫০ সহস্র অনুচর পরিবেষ্টিত পাঠক ইংরেজ হৃদয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করেন। এ সময় বড়লাট ছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংস। প্রথমে উত্তর অঞ্চলে এ বিদ্রোহ সীমাবদ্ধ থাকলেও পরে তা বাংলার পূর্বাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। রংপুর, বগুড়া, রাজবাড়ি, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর অঞ্চলে সন্ন্যাস বিদ্রোহ দেখা দেয়। সন্ন্যাসীরা গ্রাম অঞ্চল থেকে তরুণদের রিক্রুট করে দল ভারি করত এবং গ্রাম থেকে ধনীদের সম্পদ লুণ্ঠন করে দলের শক্তি বৃদ্ধি করত। ১৭৭২ সালে ক্যান্টেন টমাসের নেতৃত্বে ইংরেজ সৈন্য বঙ্গপুর সন্ন্যাসীদের পথরোধ করলেও সংঘর্ষে ক্যাপ্টেন টমাস নিহত হন। অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলে শাহাজাদা সুবেদার বাকের জঙ্গের নেতৃত্বে ফকীর বিদ্রোহ দেখা দেয়। ইংরেজরা যাকে ফকীর মজনু শাহ বলত। ভবানী পাঠক, দেবী চৌধুরানী,  ফকীর মজনু শাহ রাজা দয়াশীল, মুছা শাহ প্রমুখের নেতৃত্বে সন্ন্যাসী ও ফকীর বিদ্রোহ প্রবল আকার ধারণ কের। রাজবাড়ি জেলার বেলগাছির রথখোলায় এ অঞ্চলে তারা প্রধান আখড়া গড়ে তোলে। এ আখড়াকে কেন্দ্র করে তারা গোয়ালন্দ, বালিয়াকান্দি, সমাধিনগর, সোনাপুর অঞ্চলে বিদ্রোহ বিস্তার করতে সমর্থ হয়। অনেকে এ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে এবং বিভিন্ন স্থানে আশ্রম মঠও প্রস্তুত করে। এ সমস্ত মঠের স্মৃতি কথা লোকমুখে জানা যায়। বেলগাছির রথখোলায় ফকীর--সন্ন্যাসীদের আশ্রমস্থল হিসেবে একটি জীর্ণ ঘরকে এখনো চিহ্নিত করা হয়।

Additional information