শতবছরের রাজনীতি - পৃষ্ঠা নং-১১

রাজবাড়ি পূর্ব থেকেই অনুশীলন, কমিউনিস্ট, স্বরাজ বিপ্লবীদের ঘাঁটি ছিল। বিপ্লবী দলের প্রবীন ও তরুণ নেতা আজাদ হিন্দু ফৌজের শক্তিশালী বাহিনী গড়ে তোলে। এ বাহিনীর বিশেষত্ব ছিল বহু স্থানীয় ও বহিরাগত মহিলা এতে যোগ দেয়। বর্তমান রাজবাড়িতে রহিমুন্নেসা কিন্ডার গার্টেন স্থানটি ছিল জঙ্গলাকীর্ণ। এই স্থানে দেবেন সিং ও কালু মজুমদারের নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ ফৌজের ঘাঁটি গড়ে তোলা হয়। সুভাষ বোসের প্রতিকৃতির ব্যাস ও সাদা শাড়ি পরে সুঠামদেহী বিপ্লবী মহিলারা লাঠি মহড়া দিত এবং স্লোগান তুলত-----‘আসামের গুণ্ডামী চলবে না-চলবে না।’ বর্তমান রাজবাড়ি প্রেসের সামনে কালু মজুমদারের জয়কালী মন্দির ক্যাবিন ছিল। বাতেন মার্কেটের স্থানে লোহার গরাদ দেওয়া আটকানো (যা ষাটের দশকে দেখা যেত) স্থানটি ছিল আজাদ হিন্দ ফৌজের নিভৃত নিবাস। কলেজ পাড়ায় দাসের ডাঙ্গী বলে পরিচিত স্থানে ছিল সুভাষ বসু খদ্দর ফ্যাক্টরি  (তথ্য-প্রবীন ব্যবসায়ী জগলু ভাই)। রাজবাড়ি বর্তমান আজাদী ময়দানের নাম এ সময় থেকে শুরু হয়। আজাদ হিন্দু ফৌজের প্রকৃত নেতৃত্ব দেন মনমোহন ভাদুড়ী। তিনিই অত্র অঞ্চলে আজাদ হিন্দু ফৌজের সংগঠিত করেন। কলিংপঙে তিনি আজাদ হিন্দু ফৌজের ক্যাপটেন হিসাবে নেতৃত্ব দেন। তিনি মাদারীপুরের মানুষ হলেও গোয়ালন্দ ও রাজবাড়ি বসবাস করে নেতৃত্ব দান করেন। সুভাষ বসুর গ্রন্থের ক্যাপ্টেন ভাদুড়ী চরিত্রটি মনমোহন ভাদুড়ীর।

সুভাষ চন্দ্রের নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ ফৌজের ১৯৪৪ এর ১৮ মার্চ বৃটিশবাহিনীকে পরাজিত করে ইস্ফল ও কোহিসার দুটি বৃটিশ ঘাঁটি দখল করে। এসময় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষ প্রায়। ঘোষণা করা হয় ফরমোজার তাইহুকু বিমান ঘাঁটিতে বিমান দুর্ঘটনায় সুভাষ বসুর মৃত্যু হয়েছে। তাঁর মৃত্যুর রহস্য  এখনো প্রশ্নবোধক। অনেকে মনে করেন সেদিন কোনো বিমান বিমান দুর্ঘঘটনা ঘটেনি এবং তিনি মারা যাননি। এ রহস্য নিয়ে এখনো নানা সংবাদ শোনা যায়।

পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভব

বৃটিশ শাসনকালে ভারতে বাঙালি, বিহারী, অসমিয়া, উড়িয়া, তামিল, পশতু, নিন্দি, সিন্ধি, কাশমিরী প্রভৃতি জাতগোষ্ঠীর মধ্যে সাত কোটি মুসলিম। জাতিসত্ত্বায় সংখ্যা লঘিষ্ঠ মুসলমান পৃথক রাষ্ট্রভূমির স্বপ্ন বাস্তবায়নে সচেষ্ট হয়ে উঠে। হিন্দু-মুসলিম দ্বিজাতি তত্ত্ব ও নানা মতভেদে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার পথ সরল ও মসৃণ ছিল না। নানা সংঘাত, কুটকৌশল, রাজনৈতিক চিন্তা চেতনা, আপোস-মীমাংসায় তা কার্যকর হয়। পাকিস্তান আন্দোলন পূর্ব থেকে শুরু হলেও এর দানা বাঁধে ১৯৪০ এর লাহোর প্রস্তাবের মধ্যে দিয়ে। ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে একে ফজলুল হক কর্তৃক পাকিস্তান প্রস্তাব উত্থাপন ও এর সমর্থনে মর্মস্পর্শী বক্তৃতা করায় বাংলার মুসলমানদের মধ্যেও পাকিস্তান দাবি ও মুসলিম শক্তি বেড়ে যায়। লাহোর অধিবেশনে পাকিস্তান প্রস্তাব গৃহীত হওয়ায় মুসলমানদের রাজনৈতিক চিন্তাধারার পরিবর্তন ঘটে।

‘এটাই মুসলীম লীগের সর্বপ্রথম রাজনৈতিক পজেটিভ পদক্ষেপ। লাহোর প্রস্তাবই মুসলিম ভারতের রাজনৈতিক আদর্শতে গোটা ভারতের রাজনৈতিক দাবির সহিত সম্ভাব্যপূর্ণ করে তোলে। মুসলিম লীগ আর ভারতের স্বাধীনতা বিরোধী থাকে না। হয়ে ওঠে স্বাধীনতার দাবিদার।’ (আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, আবুল মনসুর, পৃষ্ঠা-২৪৯)।

পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার পূর্বে বঙ্গের মুসলমানেরা নানা ক্ষেত্রে বঞ্চিত ছিল। মুসলিম লীগ ভারতের স্বাধীনতা থেকেও বেশি গুরুত্ব দিয়েছে মুসলমানদের নানা অধিকার আদায়ে।

Additional information