শতবছরের রাজনীতি - পৃষ্ঠা নং-১২

১৯২০ সালে গান্ধীজীর অসহযোগ আন্দোলনে কম সংখ্যক মুসলমান তা সমর্থন করে। মুসলমানরা তখনও খেলাফত আন্দোলন নিয়ে ব্যস্ত ছিল। এই অসহযোগর মধ্যে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের উপলদ্ধি আসে অসহযোগের পথে স্বরাজ আসা সম্ভব নয়। এ জন্য তিনি কয়েকজন সর্বভারতীয় নেতার সঙ্গে মিলে কংগ্রেসের একটি উপদল হিসাবে স্বরাজ পার্টি গঠন করেন। ১৯২৩ সালে নভেম্বর মাসে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক পরিষদের যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তাতে হিন্দু আসনগুলোর অধিকাংশ এ পার্টির প্রার্থীরা জয়ী হয়। এ সময় মুসলমান সদস্যদের সমর্থন আদায় করেন চিত্তরঞ্জন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন মুসলমানদের সহযোগিতা ছাড়া কারো পক্ষেই ক্ষমতায় আসা সম্ভব নয়। সে জন্য নির্বাচনের পরের মাসে ১৯২৩ সালের ডিসেম্বরে মুসলমানদের সাথে তিনি একটি হিন্দু মুসলিম প্যাস্ট করেন। এই প্যাস্ট অনুযায়ী মুসলমানদের বড় ছাড় দেওয়া হয়। তারমধ্যে সবচেয়ে বড় ছাড় ছিল শতকরা ৫৫টি চাকরি মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত রাখা। তাছাড়া গুরু কোরবানীতে বাধা না দেওয়া, মসজিদের কাছে বাজনা না বাজান ইত্যাদি। ইতিমধ্যে ১৯২৫ সালে জুন মাসে চিত্তরঞ্জন দাস মৃত্যুবরণ করেন এ সময় নেতৃত্বের সঙ্কট দেখা দেয়। সুভাষ বসু এ সময় কারাগারে বন্দি। এ পরিবেশে জোরদার হয়ে উঠে উগ্রবাদী, সন্ত্রাসবাদী এবং ধর্মীয় রাজনীতি। এ সময় ইংরেজদের সহায়তাকারী মুসলিম জাতীয়তাবাদীরা এগিয়ে আসেন স্যার আব্দুর রহিমের নেতৃত্বে। সুনির্দিষ্ট কর্মসূচী বলতে স্যার আব্দুর রহিম ও অনুসারীদের যা ছিল তা হল মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষা করা এবং হিন্দু ভদ্রলোকদের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিপত্তি হ্রাস করা। এটা তিনি করতে চেয়েছিলেন বিশেষ করে গ্রামের সাধারণ মুসলমানদের সংগঠিত করে এবং নিম্নবর্ণের হিন্দুদের সমর্থন আদায় করে। ১৯২৬ সালের শেষ দিকে যখন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তখন মুসলিম আসনের ৩৯টির মধ্যে ৩৮টি আসনে জয়ী হন আবদুর রহিমের দলের প্রার্থীরা।

ধীরে ধীরে মুসলিম জাতীয়তাবাদ প্রবল হয়ে উঠতে থাকে। মুসলিম জাতীয়তাবাদ এত প্রবল হয়ে ওঠে যে সে জোয়ারের মুখে ফজলুল হক টিকে থাকতে পারেনি। ফজলুল হকের পর প্রধানমন্ত্রী হন নাজিমুদ্দিন কিন্তু অল্পকালের মধ্যেই দেশে গর্ভনরের শাসন চালু হয়। এরপর ১৯৪৬ সালে আবার নির্বাচনের পর মুসলিম লীগের তরফ থেকে প্রধানমন্ত্রী হন হোসেন শহীদ সহরোওর্য়াদী (স্যার আবদুর রহিমের জামাতা)। মুসলিম লীগের আমলে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যে দুটি ঘটনা ঘটে তা হলো ১৯৪৩ এর মন্বত্তর  এবং কলিকাতায় নজিরবিহীন দাঙ্গা। দ্বিতীয় যুদ্ধের সময় ১৯৪২-৪৩ জাপানিবাহিনী বার্মার পথ ধরে ভারতের ত্রিপুরা পৌঁছে যায়। উল্লেখ্য দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে হিটলারের নেতৃত্বে জার্মানীর পক্ষ অবলম্বন করে জাপান। জাপান একবারে কলিকাতার ওপর বোমা ফেলতে পারে এমন অবস্থা।

সুভাষ বসুও জাপান জার্মানীর সহায়তা নিয়ে তার ‘আজাদ হিন্দু ফৌজকে’ মনিপুর পর্যন্ত পৌঁছে দেন। এই পরিবেশে বার্মা থেকে চালের আমদানী বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া জাপানিবাহিনী বা আজাদ হিন্দু ফৌজ দেশে ঢুকলে যাতে খাদ্যশস্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সুযোগ না নিতে পারে তার জন্য সরকার প্রচুর চাল কিনে মজুদ করে এবং নৌকা আটক করে রাখে। সেবার বঙ্গদেশে ফসলও ভালো হয়নি। অন্যদিকে চালের দামের বাড়তি দেখে ব্যবসায়ীরা চাল মজুদ করে। আবার সরকারের নিকট যে চাল ছিল তা নৌকার অভাবে যথাসময়ে বন্টন করা সম্ভব হয়নি। এভাবে তৈরি হয় মানুষের তৈরি এক দুর্ভিক্ষ। দুর্ভিক্ষে বেসরকারি হিসাবে প্রায় ত্রিশ লক্ষ লোক মারা যায়। ফ্যানের আশায় এবং ভিক্ষা করতে করতে শহরে বন্দরে রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ মরে পড়ে থাকে। এরপর ১৯৪৬ সালে ক্যাবিনেট মিশন আসে। বৃটিশ সরকার ভারত বিভক্ত করতে চায়নি।

Additional information