শতবছরের রাজনীতি - পৃষ্ঠা নং-১৪

পাকিস্তান হাসিসের আগে এদের দরকার ছিল ভোটের। পাকিস্তান হাসিলের পর এদের দরকার পাটের।’ (রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, পৃষ্ঠা-২২৯)। ভারতীয় হিন্দু মুসলমানদের ছিল সুমহান । ঐতিহ্য ও আদর্শ। সুপ্রাচীন সভ্য আর্যজাতি বংশ পরস্পরায় দোর্দণ্ড প্রতাপে রাজত্ব করেছে। ধর্ম, শিল্প, সাহিত্যে মননশীলতার উৎকর্ষ সাধনে এ জাতি রেখেছে অনবদ্য অবদান। অন্যদিকে মুসলমান জাতি পশ্চম এশিয়াসহ ভারথে প্রায় ৮০০ বছর ধরে বিজ্ঞান, স্থাপত্য,  শিল্প, সাহিত্য, চেতনা বিকাশে হিন্দুদের চেয়ে কম অবদান রাখেনি। ফলে ভারতবর্ষকে উভয় জাতিস্বত্ত্বার ভিত্তিতে ভিন্ন দুটি রাষ্ট্রের উদ্ভব আধুনিক চেতনার পরিপন্থী নয়। পণ্ডিত নেহেরু মহাত্মা গান্ধী, মিঃ জিন্নাহ, ফজলুল হক, সোহরাওয়ার্দীর মতো ‍উদারপন্থী নেতৃবৃন্দ তা বুঝেছিলেন। কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর দৃশ্যপট বদলে যায়। মি. জিন্নাহ  যে উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কথা শুনিয়ে আসছিলেন বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা গেল না। পাকিস্তান রাষ্ট্রের রাজধানী হল করাচী। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ৯ মাস পর জিন্নাহর ঢাকা আসা, ভাষার প্রশ্ন, নেতাদের কোটারী স্বার্থ উদ্দেশ্যে মুসলিম লীগে পকেটস্থ করা, পূর্বপাকিস্তানি মুসলিমলীগের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি, জিন্নাহর চরম একদলীয় মনোভাব পূর্ব-পাকিস্তানিদের মনে সন্দেহের দানা বাঁধতে শুরু করে। মূলত মুসলমানরা যে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিল আল্লামা ইকবালের সে স্বপ্নের পাকিস্তানের মধ্যে পূর্ববাংলা ছিল না। পাকিস্তান যখন হয়েই গেল আর পূর্ববাংলা ‘ফাউ’ হিসেবে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হল তখন ‘ফাউ’ এর প্রতি টান না থাকাই স্বাভাবিক। জিন্নাহ, লিয়াকত আলী তারা আগে চেয়েছিল। পাকিস্তানের জন্য মুসলমানদের ভোট আর পাকিস্তান হওয়ার পরে চায় পাট। উভয় ক্ষেত্রেই স্বার্থ জড়িত। এরমধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল বাঙালির প্রকৃত পরিচয় বাংলা ভাষার প্রতি কেন্দ্রীয় শাসকদের চরম অবজ্ঞা এবং কৌশলে বাঙালির উপর উর্দু চাপিয়ে দেয়া। তারা মানি ওর্ডার ফরমে, ডাকটিকেটে, মুদ্রায় সরকারি কাজকর্মে ইংরেজির সাথে উর্দু ব্যবহার করতে শুরু করে। এ ছাড়া আরবী হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাব, বাংলা লেখার মধ্যে আরবী, ফারসী শব্দের ব্যবহার বাঙালিদের মনে বিরুপ প্রতিক্রিয়া শুরু করে। ফলে ভাষা আন্দোলন দানা বাঁধে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে যোগ দেন রাজবাড়ির ভাষা সৈনিক অধ্যাপক আবদুল গফুর (একুশে পদক ভূষিত) মরহুম অ্যাডভোকেট আবদুল ওয়াজেদ চৌধুরী, হামিদুল হক (ভোলা মিয়া), মরহুম অধ্যক্ষ বদোরুদ্দেজা টুকু মিয়া, মুনশি তফাজ্জল হোসেন, অ্যাডভোকেট সামসুল আলম। তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের মন্ত্রী নাজিমুদ্দিন কার্যত কেন্দ্রীয় সরকারের আজ্ঞাবহ হয়ে পড়ে। কেন্দ্রীয় সরকারের নিকট থেকে কোনো অর্থনৈতিক সুবিধাও পাচ্ছিলেন না। ফলে তারা বিরোধী রাজনৈতিক দল গঠনে সচেষ্ট হন। ইতিমধ্যে ১৯৪৭ এর ১৪ আগস্টের পর কৃষক শ্রমিক আন্দোলনের নেত মওলানা ভাসানী আসাম থেকে বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তান) আসেন। একে ফজলুল হক রাজনীতিতে কিছুটা নিস্ক্রিয় ছিলেন। হোসেন শহীদ সহরওয়ার্দী থেকে যান কলকাতাতে। পূর্ব-পাকিস্তানের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন লিয়াকত আলী খানের দোসর নওয়াব খাজা নাজিমুদ্দিন, নুরুল আমিনরা। রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়। পূর্ব-পাকিস্তানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আতাউর রহমান খান, শামসুল হক, খোন্দকার মোশতাক আহমেদ, হাজী দানেশ, তাজউদ্দিন আহমেদ, অলি আহাদ প্রমুখ থকন তুরণ নেত। এদের নিয়েই মজলুম নেতা মওলানা ভাসানী শুরু করেন বিরোধীদলীয় রাজনীতি। ১৯৪৮ সালে রাজশাহী অঞ্চলের সাঁওতাল সম্প্রদায়কে সঙ্গে নিয়ে কৃষক বিদ্রোহ হলে তা দমনে পাকিস্তান সরকার এক অমানুষিক পন্থা অবলম্বন করে। ইলামিত্রসহ বহু প্রগতিশীল নেতা কর্মীর উপর চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন। ইলা মিত্রের চিকিৎসা দেন রাজবাড়ির স্বনামধন্য ডা. কেএস আলম। এই অত্যাচারের মধ্যে দিয়েই গড়ে ওঠে বিরোধী রাজনৈতিক স্রোতধারা। তরুণ নেতারা এই আন্দোলন সংগঠিত করে এবং নেতৃত্বে থাকেন মওলানা ভাসানী।

Additional information