শতবছরের রাজনীতি - পৃষ্ঠা নং-১৬

 ভাষা আন্দোলন

শত বছরের রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে ভাষা আন্দোলন অধিকার আদায়ে বাঙালির শ্রেষ্ঠতম আন্দোলন। মাতৃভাষার দাবি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আন্দোলনটি এক অনন্যতার প্রতিক। এ কারণে ২১ ফেব্রুয়ারি কেবল জাতীয়ভাবে নয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অতি গুরুত্ব ও শ্রদ্ধাভরে স্মরণীয়। ভাষা আন্দোলনের ফলাফল সুদূর প্রসারী। ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। সমকালীন বাস্তবতায় পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়। রাষ্ট্র গঠনের পূর্ণাঙ্গ শর্ত মেনে পাকিস্তানের জন্ম না হলেও পূর্ব-পাকিস্তানের মুসলমানেরা এ রাষ্ট্রের মাধ্যমে তাদের আত্মবিকাশের স্বপ্ন সাধ লালন করেছিল।

কিন্তু রাষ্ট্র গঠনের স্বল্পকালের মধ্যেই মি. জিন্নাহ, লিয়াকত আলী, খাজা নাজিমউদ্দিন এবং কেন্দ্রীয় শাসকদের মনোভাবে পূর্ব-পাকিস্তানের সচেতন নাগরিক, ছাত্র, বুদ্ধিজীবীসহ রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে মোহভঙ্গের সৃষ্টি হয়। সরকারি কাজ কর্মে তারা বাংলা ভাষাকে অবহেলা এবং উর্দুর প্রতি পৃষ্ঠপোষকতা প্রদর্শন করতে থাকে। তারা মানি অর্ডার ফর্মে, ডাকটিকেট, মুদ্রা এবং সরকারি কাজকর্মে উর্দু ব্যবহার শুরু করে। ১৯৪৭ এ পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের পূর্ব থেকেই পূর্ব-পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবী মহল ভেবে আসছিলেন পাকিস্তানের রাষ্ট্র কী হবে? বা রাষ্ট্রভাষা বাংলা বা উর্দু যাই হোক তা উভয় ভাষাভাষী মানুষের উপর কি প্রভাব বিস্তার করবে? ১৯৪৭ এর জুন মাসে যখন ঘোষণা করা হয় যে, দেশ বিভাগের ফলে বঙ্গ প্রদেশও বিভক্ত হবে তখন আবুল মনসুর আহম্মেদ, কাজী মোতাহার হোসেন (রাজবাড়ি), মোঃ শহীদুল্লাহ, আবদুল হক, মাহমুদুর রহমান জাহেদী, ফররুখ আহমেদ এ প্রশ্ন তুলেছিলেন। এরপর সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্র ও শিক্ষক মিলে আবুল কাশেমের  নেতৃত্বে তমদ্দুন মজলিশ গঠন কেরন। তমুদ্দন মজলিশ বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবিতে  একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন। উক্ত পুস্তিকায় কাজী মোতাহার হোসেন ভাষার দাবিতে প্রবন্ধ পেশ করেন।

পরবর্তী বছর এ প্রশ্নে কাজী মোতাহার হোসেনের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘অধ্যাপক সমিতি’ গঠিত হয়। এভাবে ভাষার দাবি জোড়ালো হয়ে উঠতে থাকে। ভাষা নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধের সূত্রপাত্র ঘটে ১৯৪৮ সালের শুরুতে। এ বছর ফেব্রুয়ারী মাসে পাকিস্তানের গণপরিষদে কাজের ভাষা হিসেবে বাংলা ব্যবহারের প্রস্তাব দেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। সে প্রস্তাব জিন্নাহ ও প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের বিরোধীতায় নাকচ হয়ে যায়। এ সময় থেকে ভাষা আন্দোলন বিশেষ করে ছাত্রদের মধ্যে দানা বাধতে শুরু করে। সকল ছাত্র সংগঠন মিলে ১১ মার্চ ১৯৪৮ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে।  ১১ মার্চ এই পরিষদ রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন করে। তাদের উপর পুলিশি হামলা চালান হয়। ১১ মার্চের পরপরই মি. জিন্নাহ ঢাকায় আসেন এবং বিশাল জনসভায় ঘোষণা দেন উর্দুই হবে রাষ্ট্র ভাষা। এর কয়েকদিন পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে ছাত্র শিক্ষকদের সভায় ঐ একই কথা বললে অনেকে এর প্রতিবাদ করেন। এভাবে ভাষাকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক আন্দোলন শুরু হয় তার চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন বাংলাকে পূর্ব-পাকিস্তানের সরকারি কাজে ব্যবহৃত হবে বলে আশ্বাস দিলেও ১৯৫২ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকা সফরে এসে ঘোষণা করেন প্রাদেশিক ভাষা কি হবে তা ঠিক করবে প্রদেশের লোকেরা কিন্তু রাষ্ট্র ভাষা হবে উর্দু।

এর অর্থ পূর্ব-পাকিস্তানের সরকারি কাজসহ চিঠিপত্র আদান প্রদান স্থাপনা এমন কি দৈনন্দিন জীবনে উর্দুর ব্যাপক প্রচলন থাকতে হবে। মোগল, ইংরেজ শাসনকালে যেমন ফারসী ও ইংরেজি জেকে বসে তেমনি উর্দু রাষ্ট্রভাষা হলে উর্দুর ব্যাপক প্রসারে মাতৃভাষা বাংলার অস্তিত্ব বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা দানা বাধে।

Additional information