শতবছরের রাজনীতি - পৃষ্ঠা নং-১৮

৪। এই সভা ভাষা আন্দোলনকারী ছাত্র এবং জনসাধারণকে অবিলম্বে বিনা শর্তে মুক্তি দিবার জন্য দাবি জানাইতেছে।

৫। এই সভা নুরুল আমিন মন্ত্রীসভার পদত্যাগ দাবি করিতেছে। এভাবেই শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভাষার দাবিতে রাজবাড়ির জনগণ একাত্মাতা ঘোষণা করে এবং ভাষা আন্দোলনসহ পরবর্তী সকল আন্দোলন সংগ্রামে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন।

যুক্তফ্রন্ট (১৯৫৪) ও রাজনীতির নানা প্রসঙ্গ

মাওলানা ভাসানী, সহরোওয়ার্দী এবং তুরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহামানসহ নিবেদিত কর্মীর দ্বারা আওয়ামী লীগ খুব জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। প্রতি জেলা ও মহকুমায় আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এদিকে ফজলুল হকের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে কৃষক শ্রমিক পার্টি। জনপ্রিয় এ নেতার কারণে কৃষক শ্রমিক পার্টিও শক্তিশালী রুপ ধারণ করে। এ ছাড়া মুসলিম লীগের বিপরিতে নেজামে ইসলাম, গণতন্ত্রী, খেলাফতে রব্বানী কাজ করে আসছিল।

এ সকল দল মিলে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের বিপরীতে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে এবং ইতিহাস খ্যাত ২১ দফা রচনা করে। এই ২১ দফার মধ্যে অন্যতম দফা ছিল ২১ ফেব্রুয়ারি সরকারি ছুটি ঘোষণা, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে চিরস্থায়ী করার জন্য শহীদ মিনার নির্মাণ, প্রধানমন্ত্রীর বাসস্থান বর্ধমান হাউসকে বাংলাভাষার সেবাকেন্দ্র ইত্যাদি। নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট ২৩৭টি আসনের মধ্যে ২২৮টি আসনে জয়লাভ করে। এরমধ্যে আওয়ামী লীগ ১৪৩টি, কৃষক শ্রমিক ৪৮টি, নেজামে ইসলাম ২২টি গণতন্ত্রী ১৩টি, খেলাফত রব্বানী ২টি। মুসলিম লীগের এতবড় ভরাডুবি তারা কখনো আন্দাজ করতে পারেনি। এরপর ১০ জন মন্ত্রী নিয়ে হক মন্ত্রীসভা গঠিত হয়।

যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে রাজবাড়িতে আওয়ামী লীগ থেকে এমএলএ নির্বাচিত হন অ্যাডভোকেট আব্দুল ওয়াজেদ চৌধুরী। রাজবাড়িতে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার পর থেকে দলটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ফজলুল হক ও ভাসানী তখন অত্যন্ত জনপ্রিয় নেতা। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে হক সাহেবের নেতৃত্বে কৃষক শ্রমিক পার্টি এবং ভাসানীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ মূলত ‘হক-ভাসানী’ স্লোগানে পরিণত হয়। ‘হক-ভাসানী জিন্দাবাদ’  স্লোগানে তখন এ অঞ্চলের কৃষক শ্রমিকরা ঐক্যবদ্ধ হন। বিপরীতে মুসলিমলীগ থেকে আহম্মদ আলী মৃধা নির্বাচন করে পরাজিত হন।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিমলীগের ভরাডুবি তারা মেনে নিতে পারেননি। বলা যায় তারা ওঁত পেতে ছিল। ইতিমধ্যে আদমজীতে ভয়াবহ দাঙ্গা হয়। দাঙ্গায় শত শত মানুষ মারা যায়। এর দায়ভার হক সাহেবের উপর চাপানো হয়। ১৬ জুন ১৯৫৪ হ হক সাহেবকে দেশদ্রোহী ঘোষণা করা হয়। কেন্দ্র থেকে শক্তিশালী গভর্নর হিসেবে মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জাকে পাঠানো হয়। তিনি হুমকি দেন ফজলুল হক দেশদ্রোহী, ভাসানীকে গুলি করে হত্যা করব। ১৯৫৪’র  অক্টোবর গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ  কর্তৃক গণপরিষদ বাতিল করা হয়। মন্ত্রীসভা ভেঙ্গে দেওয়া হয়। শেখ মুজিবুর রহমান (মন্ত্রী) সহ প্রায় দুই হাজার নেতা কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। হক সাহেব নজরবন্দি হন। ভাসানী তখন বিদেশে। গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ কর্তৃক গণপরিষদ বাতিলের প্রতিবাদে তমিজ উদ্দিন খান (খানখানাপুর, রাজবাড়ি) কর্তৃক সিন্ধু হাইকোর্টে মামলা দায়ের করেন। সিন্ধু হাইকোর্ট সরকারের বিরুদ্ধে রায় প্রদান করে। এই রায়ের বিরুদ্ধে সরকার সুপ্রীম কোর্টে আপীল দায়ের করে। সু্প্রীম কোর্টের নির্দেশে ১৯৫৫ এর জুন মাসে নতুন গণপরিষদ গঠিত হয়। 

Additional information