শতবছরের রাজনীতি - পৃষ্ঠা নং-১৯

ভাঙ্গাগড়ার মধ্য দিয়ে না গণতন্ত্র না স্বৈরতন্ত্রের রাজনীতির ধারায় শাসনকার্য চলতে থাকে। এরমধ্যে ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র রচিত হয়। রাষ্ট্রপতি শাসিত এ শাসনতন্ত্রের ইস্কন্দার মির্জা প্রেসিডেন্ট থাকেন। অতপর ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবরে এক আচমকা ঝড়ে সব তছনছ হয়ে যায়। পাকিস্তান রাষ্ট্রের স্বপ্নলালিত জনগণের শাসননামীয় গণতন্ত্রের প্রথম মৃত্যু ঘটে। জারী হয় ফিল্ড মার্শাল আইউব খান কর্তৃক সামরিক শাসন। শাসনতন্ত্র রহিত হল। মার্শাল আইউব খান মার্শাল ‘ল জারী করেন। আইন প্রণয়নের সর্বময় ক্ষমতা তার ইচ্ছাধীন হল। জনগণের ইচ্ছার আইন ভেঙ্গে গেল। বলা হল জনগণ ভোট দিতে জানেনা। বিশেষ করে বাঙালি নাকি ডাণ্ডায় ঠাণ্ডা। মার্শাল ‘ল জারীর পর পরই গ্রেপ্তার হন মাওলানা ভাসানী, হামিদুল হক চৌধুরী, শেখ মুজিবুর রহমান, আবুল মনসুর আহমেদসহ এগারজন নেতা। নিমিষে আইউব খানের নাম গ্রামে গঞ্জে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে গেল।

আমি তখন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। গ্রামের স্কুলে পড়ি। তখন যোগাযোগ ব্যবস্থা এত উন্নত ছিল না। পত্রিকা পাঠ চলত না। সমগ্র ইউনিয়নে কয়েকটি রেডিও ছিল। সব সংবাদ প্রচার হত মুখে মুখে। সত্য মিথ্যা যাই হোক মুখে মুখে সংবাদ প্রবাহের শক্তি কিন্তু কম নয়। শিক্ষক, ছাত্র, সাধারণ মানুষের মুখে মুখে আইউব খানের নাম শোনা যেতে লাগল। খেটে খাওয়া মানুষের মুখে শুনতে পেতাম ‘আইউব আলী জিন্দাবাদ।’ তারা হঠাৎ করেই হক-ভাসানীর নাম ভুলে গেল।

ঐ বয়েসেই বুঝে ফেললাম আইউব খান দেশের রাজা, আর বোধ হয় ঐ বয়েসে বুঝেছিলাম, রাজা হতে হলে মিলিটারী হতে হয়। কিন্তু এখন বুঝি মিলিটারী হলেও রাজা হওয়া যায় বটে তবে সে রাজার নাম স্বৈর রাজা, আসল রাজা নয়। জনগণের নিয়মতান্ত্রিক রাজা নয়। আইউব খান নিয়মতান্ত্রিক রাজা না হওয়া সত্ত্বেও মার্শাল ‘ল জারী হওয়ার প্রায় চার বছরের মধ্যে পূর্ব বা পশ্চিমপাকিস্তানে আইউব বিরোধী কোন আন্দোলন হয়নি।’ ১৯৬২ সালে করাচিতে শহীদ সহরওয়ার্দী নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার হলে ঢাকার ছাত্র, জনসাধারণ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। রাস্তায় রাস্তায় মিছিল সমাবেশ হয়। বলা যায় আন্দোলনের যে ঢেউ সাগরবক্ষে উত্থিত হল সে ঢেউই ১৯৬৯ এর গণ-আন্দোলনের ঢেউয়ের সাথে একাকার হয়ে গিয়েছিল। কারণ ৬২ এর আন্দোলন, হামিদুর রহমান  শিক্ষা কমিশন আন্দোলন, ৬ দফার আন্দোলন, ১১ দফার আন্দোলনসহ সকল আন্দোলনের ঢেউ গণআন্দোলনের উত্তাল ঢেউয়ের সৃষ্টি করেছিল।

১৯৬১ সালে রাজবাড়ি কলেজ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। কলেজটি উদ্বোধন করেন তৎকালীন গভর্নর আযম খান। উদার মনোভাবের এই উর্দুভাষী শাসনকর্তা অল্প সময়েই দেশের মানুষের মন জয় করে নেন। রাজবাড়িতে যখন আসেন তখন এখানকার এক যুবক চিত্তগ্রাহী একটি ফুলমাল্য অর্পণ করায় আযম খান খুশি হয়ে তাকে ছেলে হিসেবে গ্রহণ করেন। অনেকদিন যাবৎ তাকে আযম খানের ছেলে বলা হত। আযম কান কর্তৃক তাকে লেখা পত্র আমি দেখেছি। সূচনা থেকেই রাজবাড়ি কলেজ রাজবাড়ি জেলায় রাজনীতি চর্চার কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ১৯৬২ সালের আউব বিরোধী ছাত্র-সংগ্রামে কলেজের ছাত্রবৃন্দ বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এ সময়ই চিত্তরঞ্জন গুহ, আব্দুল লতিফ বিশ্বাস, আমজাদ হোসেন, নজিবুর রহমান, ফরিদ আহমেদ প্রমুখ ছাত্রনেতা শহীদ মিনার নির্মাণ করেন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দেন ডা. ইয়াহিয়া, কাজী হেদায়েত হোসেন, অমলকৃষ্ণ, ডা. জলিলুর রহমান, বাদশা ভাই, মুন্নু মিয়া, মরগুব আহমেদ প্রমুখ।

Additional information