শতবছরের রাজনীতি - পৃষ্ঠা নং-২০

আইউব বিরোধী সকল কর্মসূচী কলেজের ছাত্রবৃন্দ বিশেষভাবে পালন করত। মকসুদ আহম্মেদ রাজা, নাজিবুর রহমান, কাজী ইকবাল ফারুক, আনোয়ার হোসেন, ফকীর আব্দুল জব্বার, জিল্লুল হাকিম, আবদুল মতিন, গণেশ নারায়ণ চৌধুরী, মোকসেদ আলী, ফকীর আব্দুর রাজ্জাক প্রমুখ ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। ইতিমধ্যে আইউব খান বুনিয়াদী গণতন্ত্রের (Basic Democracy) এক নতুন ধারণার সূচনা করেন। ১৯৬২ ও ১৯৬৫ সালে অনেক নেতা বুনিয়াদী গণতন্ত্রী হয়ে ওঠেন। এ সময় আইউব সমর্থনকারী ছাত্র সংগঠন ন্যাশনাল স্টুডেন্ট ফ্রন্ট (NSF) রাজবাড়ি কলেজে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করেন। রঞ্জু ভাই, বাহারুল ইসলাম, সুব্রত সরকার প্রমুখ ভূমিকা রাখেন। সুব্রত সরকার বর্তমানে আওয়ামী লীগের সিনিয়র সদস্য।

১৯৫৬ সালে কাগমারী সম্মেলনে মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাপ করেন এবং ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠন করেন। ন্যাপের কার্যক্রম সারাদেশে স্বপ্লসময়ে সম্প্রসারিত হয়। রাজবাড়িতে ন্যাপের নেতৃত্ব দেন অ্যাডভোকেট আবুল কাসেম মৃধা। তিনি ফরিদপুর জেলার সভাপতি থাকেন। পরবর্তীতে ন্যাপ ভেঙ্গে মোজাফ্ফর ন্যাপ গঠিত হলে সভাপতি থাকেন এমএ মোমেন (বাচ্চু মাস্টার)। উল্লেখ্য ১৯৬২ সালে ২৬ এপ্রিল পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন নামে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের জন্ম হয়। পূর্ব-পাকিস্তানে এর নামকরণ করা হয় পূর্ব-পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন। এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন মোহাম্মদ সুলতান। সংগঠনটি অসাম্প্রদায়িক, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মনোভাবে কখনো কমিউনিস্ট আবার কখনো ন্যাপের ছত্রছায়ায় কাজ করে। রাজবাড়িতে ন্যাপ গঠনের পর ১৯৬৫ সালে আমিনুর রহমান (পানু), শিবেন্দ্রনাথ কুণ্ডু আবুল ফালাহ প্রমুখ ছাত্রদের দ্বারা ছাত্র ইউনিয়ন গঠিত হয়। এদিকে কমিউনিস্ট আন্দোলনের ধারায় রাজবাড়ি শুরু থেকেই সম্পৃক্ত ছিল। ১৯৬৩ সালে রাশিয়া ও চীনের মধ্যে আদর্শিক কারণে মহাবির্তক শুরু হয়। ফলাফলে বাংলাদেশে মস্কোপন্থী ও পিকিংপন্থী এ দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। মার্কসীয় তত্ত্বে মস্কোপন্থীকে সংশোধনবাদী বলে আখ্যায়িত করা হয়।

যুদ্ধ ও শান্তির প্রশ্নে, বিপ্লবের প্রশ্নে, জাতীয় আন্দোলনের প্রশ্নে, সুখেন্দু দস্তিদার, মোহাম্মদ তোয়াহা, আব্দুল হক চীনের মতামতকেই সমর্থন করেন। অন্যদিকে মণি সিং মস্কোর মতবাদকে সমর্থন করেন। কমিউনিস্ট ভাবাপন্ন ছাত্র ইউনিয়নও দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। ১৯৬৫ সালের ১-৩ এপ্রিলে ইঞ্জিনিয়ার ইনস্টিটিউটে পূর্ব-পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ঐ সম্মেলনে পূর্ব-পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন মেনন (রাশেদ খান মেনন) গ্রুপ ও মতিয়া (মতিয়া চৌধুরী) গ্রুপে বিভক্ত হয়। রাজবাড়ি কলেজের ছাত্র ইউনিয়নের মেনন গ্রুপের নেতৃত্বে থাকেন আমিনুর রহমান (পানু), আবদুর রহমান, আল্লা নেওয়াজ খায়রু, আবুল হাসেম, আবদুল আজিজ (পিন্টু মোল্লা) প্রমুখ। মতিয়া গ্রুপের নেতৃত্ব দেন আব্দুস সাত্তার, শিবেন্দ্রনাথ কুণ্ডু প্রমুখ। পার্টি নেতৃত্বে মেনন গ্রুপে থাকেন ত্যাগী ও সংগ্রামী নেতা সমর সিং। মতিয়া গ্রুপের নেতৃত্বে থাকেন আশু ভরদ্বাজ, কমরেড মখলেসুর রহমান। ১৯৬৯ এর ৪ জানুয়ারি পূর্ব-পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ, পূর্ব-পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি চীনপন্থীদের দ্বারা পরিচালিত), পূর্বপাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন মতিয়া গ্রুপ মস্কোপন্থীদের দ্বারা পরিচালিত) এবং পূর্ব-পাকিস্তান ছাত্রলীগ (আওয়ামী লীগ কর্তৃক পরিচালিত) ঐক্যবদ্ধ হয়ে ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। এই কর্মসূচিতেই ছাত্র-জনতা এক হয়ে ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান ঘটায়। মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এ আন্দোলন শুরু হয় এবং অতিসত্তর বিশেষ করে আসাদুজ্জামান (আসাদ) শহীদ হওয়ার পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ জেলা পর্যায়ের সকল কলেজে ছড়িয়ে পড়ে। সে ছিল এক দুর্বার আন্দোলন। পুলিশের শত বাধা ছাত্রদের হার মানাতে পারে নাই।

Additional information