শতবছরের রাজনীতি - পৃষ্ঠা নং-৩

ফরায়েজী আন্দোলন

ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলা বিশেষ করে ফরিদপুর জেলার জনগণ ফারায়েজী আন্দোলনের দ্বারা প্রভাবিত হয়। ফারায়েজী আন্দোলনের নেতা ছিলেন হাজী শরীয়তুল্লা (১৭৮১-১৮৪০) এবং তার ছেলে পীর মোহসিন উদ্দিন দুদু মিয়া (১৮১৯-১৮৬২)। হাজী শরিয়তুল্লা মাদারীপুর জেলার শিবচর থানার বাহাদুরপুরের শ্যামাইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ওহাবী আন্দোলনের দীক্ষিত হয়ে বঙ্গে জামাত সৃষ্টি করে ওহাবী আন্দোলন শুরু করেন। এই আন্দোলনই বঙ্গে ফরায়েজী আন্দোলন নামে পরিচিত। ফরায়েজী আরবী শব্দ অর্থ অবশ্য পালনীয়। ইসলাম ধর্ম অনুসারে কোরান ও হাদিসের নির্দেশাবলী সমাজে প্রতিষ্ঠা করা মুসলমানদের আবশ্যিক কর্তব্য।

তিনি ইসলাম বিরোধী রীতিনীতি পরিত্যাগ করে মুসলমানদের প্রকৃত মুসলমান হতে উপদেশ দেন। হাজী শরিয়তুল্লা প্রথমে তৎকালীন মুসলমান সমাজকে বেদাত থেকে মুক্ত করার জন্য সামাজিক সংস্কার আন্দোলন শুরু করেন। প্রতিবেশী হিন্দুদের দেখাদেখি মুসলমানেরা সেদিন পীর পূজা, মনসা পূজা, কবর পূজা, শীতলা পূজা ইত্যাদি সংস্কারে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। এ সব শরিয়ত বিরোধী কাজ থেকে মুসলমান সমাজকে ইসলামী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করার জন্য হাজী শরিয়তুল্লাহ ধর্মীয় আন্দোলন শুরু করেন। এই আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি বিপুলসংখ্যক মুসলমানকে তার নেতৃত্বে সংগঠিত করতে সমর্থ হন। পরবর্তী পর্যায়ে তিনি তার নেতৃত্বে গঠিত ফরায়েজী জামাতকে ইংরেজ শক্তির বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলেছিলেন।

তিনি শুধু ধর্মীয় সমাজ সংস্কারের ভূমিকায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেননি তিনি ইংরেজ অধিকৃত এ উপমহাদেশকে ‘দারুল হরব’ বলে ঘোষণা দেন। তিনি বিধর্মী অধিকৃত দেশে মুসলমানদের ঈদের জামাত জায়েজ নয় বলে ফতোয়া দেন। তৎকালীন দারুল হরব বক্তব্য জনসাধারণের মধ্যে ইংরেজ বিরোধী জেহাদী মনোভাবের সৃষ্টি হয়েছিল। প্রথমত এ আন্দোলন ফরিদপুর জেলায় সীমাবদ্ধ ছিল পরে তা বাকেরগঞ্জ ও ঢাকা অঞ্চলে ছড়িয়ে যায়। হাজী শরিয়তুল্লার পুত্র মোহসিন উদ্দিন (দুদুমিয়া) ফরায়েজী আন্দোলনেক রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিণত করেন। তিনি পিতার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশকে দারুল হরব বলে ঘোষণা করেন এবং ইংরেজ শক্তি উৎখাতের উদ্দেশ্যে জেহাদ ঘোষণা করেন। ১৮৪০ সালের দিকে পীর দুদুমিয়ার নেতৃত্বে ফরায়েজী আন্দোলন প্রচণ্ড রুপ লাভ করে। গ্রামাঞ্চলে পীর দুদুমিয়ার নেতৃত্বে একজন প্রচারকের পিছনে প্রায় ৮০ হাজার লোক থাকত। পরবর্তীতে দুদুমিয়া ইংরেজ শক্তি সমর্থক নীলকর সাহেব ও জমিদার শ্রেণির সাথে কয়েকটি সংঘর্ষে লিপ্ত হন। তিনি নীলচাষের বিরুদ্ধে জনসাধারণকে ক্ষেপিয়ে তোলেন এবং নীলবিদ্রোহের সহায়তা দেন। রাজবাড়ি অঞ্চলে ফরায়েজী আন্দোলনের প্রত্যক্ষ প্রভাব পরে। জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে কবর পূজা, মনসা পূজা, শীতলা পূজার প্রভাবে ইসলামের মূল শরিয়ত থেকে মুসলমানগণ দূরে সরে যায়। সোনাপুর, বালিয়াকান্দি অঞ্চলে ফরায়েজী আন্দোলনের প্রভাব পড়ে বেশি। পীর দুদুমিয়ার নেতৃত্বে এ অঞ্চলে নীলবিদ্রোহের প্রসার ঘটে। তোফাজ্জেল হোসেন জজ সাহেব ফরায়েজী আন্দোলনের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।

স্বদেশী-অনুশীলন-যুগান্তর

স্বদেশী আন্দোলন শুরু হয়েছিল বঙ্গভঙ্গকে (১৯০৫) কেন্দ্র করে। বঙ্গভঙ্গ ভারত মাতার ব্যবচ্ছেদ, এ অনুভূতি তীব্র ক্ষোপের সঞ্চার করে। প্রথমে এ আন্দোলন নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত হলেও পরে তা বয়কট ও সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনে রুপ নেয়।

Additional information