শতবছরের রাজনীতি - পৃষ্ঠা নং-২১

আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। রাজনীতির সাথে তেমনভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলাম না। কিন্তু ছাত্রদের বাঁধভাঙ্গা মিছিল যখন এসএম হলের পাশ দিয়ে যেত, গগণবিদারী স্লোগানে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হত তখন নিজেকে ধরে রাখতে পারতাম না। মিছিলে শামিল হতাম। আন্দোলনে প্রথম শহীদ হন আসাদ (২০ জানুয়ারি)। সে দিনটি স্মৃতিতে অম্লান। সকাল ১০টার দিকে এসএম হলের পাশ দিয়ে যাওয়া মিছিলে শরীক হলাম। মিছিলটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ পার হতেই পুলিশের বাধা। ছাত্ররা পিকেটিং শুরু করে। আমি মেডিকেল কলেজের দোতলায় উঠে আসি। এক পুলিশকে দেখলাম রক্তাক্ত অবস্থায় ছাত্ররা নিয়ে আসছে। এরপর হলে ফিরে আসলাম। আনুমানিক বেলা ১২টার দিকে হল থেকেই গুলির শব্দ শুনলাম। ১০/১৫ মিনিট পরে খবর এল আসাদ গুলিতে শহীদ হয়েছেন। প্রায় আধাঘন্টা পর জানতে পারলাম আসাদের লাশ নিয়ে ছাত্ররা এস এম হলের সামনে দিয়ে যাচ্ছে। দৌড়ে গিয়ে লাশের মিছিলে শরীক হলাম। মিছিল বলাকা সিনেমা হল হয়ে এ্যালিফ্যান্ট রোড ঘুরে শহীদ মিনারে এল। আমি এমনি উদভ্রান্তের মতো দৌড়ে মিছিলে শরীক হয়েছিলাম যে, শহীদ মিনারে এসে দেখলাম নগ্ন পা এবং পরনে লুঙ্গী ছাড়া শরীরে আর কোনো কাপড় নেই। এ স্মৃতি ভুলবার নয়। এখনো ৬৯ এর গণ-আন্দোলনের স্মৃতিগুলো স্বপ্নের মতো ভেষে ওঠে। রাজবাড়িতেও ১১ দফার ভিত্তিতে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ গড়ে ওঠে। রাজবাড়ি কলেজে ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) ছাত্র-ইউনিয়ন (মতিয়া)  সম্মিলিত ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ তুমুল আন্দোলন গড়ে তোলে। নেতৃত্ব দেন ছাত্রলীগের ফকীর আব্দুল জব্বার, গণেশ নারায়ণ, এমজি মোস্তফা, জিল্লুল হাকিম, আবদুল মতিন, কাজী মতিন, রেজাউল হক, শহীদুন্নবী আলম, আল্লা নেওয়াজ খায়রু, আব্দুস সাত্তার, সৈয়দ আশরাফ আলী (হাসু) প্রমুখ। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ঐক্যবদ্ধভাবে ১১ দফার ভিত্তিতে রাজবাড়িতে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলে। এ আন্দোলন শহর থেকে গ্রামে গঞ্জে ছড়িয়ে যায়। আপামর জনসাধারণ এ আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা করে। সংঘবদ্ধ এ আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধের ভিত রচনা করেছিল। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব-পাকিস্তানে শতকরা আটানব্বই ভাগ ভোট পেয়ে আইন পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এ নির্বাচনে কেন্দ্রীয় আইন পরিষদ রাজবাড়ি থেকে এম এন এ নির্বাচিত হন এবিএম নুরুল ইসলাম। প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচিত হন কাজী হেদায়েত হোসেন ও মোসলেম উদ্দিন মৃধা। লেখক এ নির্বাচনে কালুখালি কেন্দ্রে প্রিজাইডিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করেন। মানুষ স্বতঃ স্ফুর্তভাবে আওয়ামী লীগকে জয়যুক্ত করে। এরপর ইয়াহিয়া ভুট্রোর যোগসাজশে আওয়ামী লীগকে সরকার গঠন থেকে বঞ্চিত করে। নানা ঘটনায় শুরু হয় ‍মুক্তিযুদ্ধ। (মুক্তিযুদ্ধ পর্বটি যথাস্থানে আলোচিত)। আওয়ামী লীগের অবিসংবাদিত নেতা, বাঙালির শ্রেষ্ঠ সন্তান, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থাপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে ঐতিহাসিক সনদ ৬ দফা পেশ করেন। পূর্ব-পাকিস্তানের স্বাধীকারসহ সকল স্তরের মানুষের শোষণ ও বঞ্চানার অবসান ছিল এই ছয় দফার মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। ছয় দফার ভিত্তিতে সারাদেশে আন্দোলন শুরু হলে শেখ মুজিবকে ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দেখিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। রাজবাড়িতে ছয় দফার ভিত্তিতে তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে। নেতৃত্ব দেন আওয়ামী লীগের অন্যতম নেতা কাজী হেদায়েত হোসেন, অমল কৃষ্ণ চক্রবর্তী, অ্যাডভোকেট আবদুল ওয়াজেদ চৌধুরী, ডা. জলিলুর রহমান, ডা. এস এ মালেক, একেএম নুরুজ্জামান (মুন্নু মিয়া), মরগুব আহমেদ, আব্দুল ওয়াহাব বিশ্বাস, বাদশা চৌধুরী, রোকন চৌধুরী, মোসলেম উদ্দিন মৃধা, ডা. জয়নাল আবেদীন প্রমুখ। ছাত্রনেতাদের মধ্যে ছিলেন চিত্তরঞ্জন গুহ, আমজাদ হোসেন, আবদুল লতিফ বিশ্বাস, নাজিবর রহমান, মকসুদ আহমেদ রাজা, ফরিদ আহমেদ, কাজী ইকবাল ফারুক, ফকীর আব্দুল জব্বার, আকবর আলী মর্জি, জিল্লুল হাকিম, গণেশ নারায়ণ চৌধুরী (সন্ত), আমিনুর রহমান আবি, এমজি মোস্তফা প্রমুখ। ছয় দফার আন্দোলন ও সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা আন্দোলনই ১৯৬৯ এর গণআন্দোলনে রুপ নেয়।

Additional information