শতবছরের রাজনীতি - পৃষ্ঠা নং-২৫

শান্তি রঞ্জন সেন, অবনী লাহিড়ী, মোখলেসুর রহমান, আনসার আলী, আব্দুস সাত্তার, আল্লা নেওয়াজ খায়রু, দুলাল মোল্লা, কমলকৃষ্ণ গুহ, শিবেন্দ্র নাথ কুণ্ডু, মতিউল ইসলাম, জ্যোতিশংকর ঝন্টু, আবুল কালাম ইতিহাসখ্যাত নাম। বাম ধারার এ নেতৃবন্দ বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনসহ শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে আজীবন সংগ্রামী ভূমিকা রেখে গেছেন। অসহযোগ আন্দোলন, রেলশ্রমিক আন্দোলন, তেভাগা আন্দোলন, গোয়ালন্দ মৎসহজীবী আন্দোলন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রারম্ভে ছাত্র আন্দোলন, আজাদ হিন্দু ফোর্স গঠন, ৫২ এর ভাষা আন্দোলন,  আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন, ৬৯ এর গণ-আন্দোলনসহ স্বাধীনতা পরবর্তীতে শ্রমিক শ্রেণির দাবি আদায়ে কমিউনিস্ট পার্টির রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে (১৯৩৯) রাজবাড়ি জেলার কমিউনিস্টবৃন্দ বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। ১৯৩৪ সালে বালিয়াকান্দির কোড়কদিতে স্টুডেন্ট ফেডারেশন গঠন করা হয়। নেতৃত্ব গ্রহণ করেন সত্য মিত্র ও আশু ভরদ্বাজ। ১৯৫২ ভাষা আন্দোলনে ফরিদপুরে ছাত্রদের উদ্যোগে ভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। রাজবাড়িতে সমর সিংহ, শ্যামেন ভট্রাচার্য ও আরো অনেকে নেতৃত্ব দেন। বেঙ্গল প্রদেশিক স্টুডেন্ট এসোসিয়েশনের নেতৃত্বে ছিলেন সমরসিংহ ও পৃপেন রায়।

স্বাধীনতার পূর্ব রাজবাড়িতে পূর্ব-পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী লেনিনবাদী) এম এল (পিকিংপন্থী) প্রতিপত্তি বিস্তার করে। ১৯৬৬ সালের জুন মাসে সুখেন্দু দস্তিদার, মোহাম্মদ তোয়াহা, নজরুল ইসলাম, আব্দুল হক, শরদিন্দু দস্তিদার, দেলওয়ার এই ছয়জনকে নিয়ে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে পিকিংপন্থীদের যাত্রা শুরু। মনি সিং এর নেতৃত্বে পরিচালিত পূর্ব-পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টিতে মস্কোপন্থী ও পিকিংপন্থীদের নেতৃত্বে থাকেন আব্দুল হক, মোহাম্মদ তোয়াহা প্রমুখ। এ সময় ইউনিয়ন পিকিংপন্থী ও মস্কোপন্থী দুই ভাগে বিভক্ত হয়। ছাত্র ইউনিয়নের পিকিংপন্থী নেতৃত্বে থাকেন রাশেদ খান মেনন এবং মস্কোপন্থীর নেতৃত্ব দেন অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী। রাজবাড়িতে পিকিংপন্থীর নেতৃত্বে দেন আল্লা নেওয়াজ খায়রু, আব্দুর রহমান, আকতার হোসেন, দুলাল মোল্লা, ঝন্টু মোল্লা, পিন্টু মোল্লা, আবুল হাশেম, আবুল ফালাহ প্রমুখ। সার্বিক নেতৃত্ব দান করেন সমর সিংহ। মস্কোপন্থী ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্ব দেন আব্দুস সাত্তার, শীবেন্দ্র নাথ কুণ্ডু, কমল গুহ প্রমুখ। আব্দুস সাত্তার সাবেক ফরিদপুর জেলার সভাপতির দায়িত্বে থাকেন। সার্বিক নেতৃত্ব দান করেন কমরেড আশু ভরদ্বাজ।

১৯৭৮ সালে ২৬-২৮ জানুয়ারি পার্টির প্লেনাম অনুষ্ঠিত হয়। এই প্লেনামে পার্টিগুলির নাম বাতিল করে বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি নাম গ্রহণ করা হয়। এ সময় পার্টি গণতান্ত্রিক বিপ্লবের কর্মসুচিকে সামনে রেখে সাম্রাজ্যবাদ মুক্ত নতুন সমাজ, অর্থনীতি, নতুন জীবন, নতুন প্রত্যয় ও নতুন মূল্যবোধের আহবান জানায়। ১৯৭৯ সালে মে দিবস উপলক্ষে পার্টির আহবান ছিল ‘সাম্রাজ্যবাদ ও সামান্তবাদ মুক্ত মুক্তিযুদ্ধ স্বার্থক হউক। জিয়া সরকারকে উৎখাত করো। উৎখাত করো মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে। গড়ে তোল সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী জনগণের গণতান্ত্রিক সরকার।’ (বাংলাদেশ কমিউনিস্ট আন্দোলনের রুপরেখা, কমরেড আমজাদ হোসেন, পৃ-১০৪)। বিপ্লবী কমিউনিস্ট  পার্টি আওয়ামী লীগকে ভারতের দালাল এবং জিয়াকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দালাল বলে আখ্যায়িত করে। এ সময় দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে থাকেন আবদুল হক। জনযুদ্ধ নামে এক প্রচারপত্র বিলি হত। রাজবাড়ি ও পাংশায় এর ব্যাপক প্রচার এবং পার্টির প্রসার ঘটে। ১৯৭৮ সালের মে মাসে তিনটি বাম রাজনৈতিক দল কয়েকটি প্রগতিশীল সংগঠন ও শ্রেণিসংগঠনের সমন্বয়ে গণফ্রন্ট গঠিত হয়। এতে শরীক হয় এম এল সিপিবি, পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল), সাম্যবাদী দল (নগেন), চাষী সমিতি, শ্রমিক ফেডারেশন, জাতীয় ছাত্রদল। গণফ্রন্ট ছিল প্রকাশ্য সংগঠন। আহবায়ক ছিলেন শরবিন্দু দস্তিদার।

Additional information