শতবছরের রাজনীতি - পৃষ্ঠা নং-২৭

আলোকিত ব্যক্তিত্ব

তমিজ উদ্দিন খান

বৃটিশ শাসক ও শোষকের কবল থেকে মুক্তির লক্ষ্যে ভারতবাসীর প্রচেষ্টা ও আত্মত্যাগ ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ অধ্যায়ের অন্যতম এক মনীষী তমিজ উদ্দিন খান। বিশ শতকের সূচনা থেকে বৃটিশ রাজত্বের অবসানকাল (১৯৪৭) পর্যন্ত আন্দোলন, সংগ্রাম নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর পদচারণার লক্ষ্য করা যায়। এমন কি পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভবকালে নবগঠিত রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি রচনায় তাঁর অবদান স্বরণীয়। স্বদেশী, অসহযোগ, স্বরাজ, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা আন্দোলনে তাঁর দীপ্ত পদচারণা দেখা যায়। আবার নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির ধারায় কখনো প্রাদেশিক কখনো কেন্দ্রীয় শাসনের মূখ্য ভূমিকা তিনি পালন করেছেন। গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণোজ্জ্বল। তাঁর কর্মমূখর জীবনকাল এমন এক সময়ে ব্যপ্ত যখন ভারতের মুসলমানগণ নিজেদের আত্মোপলদ্ধি ও আত্মপ্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হয়ে উঠেছিল। বলা যায় স্যার সৈয়দ আহমদের পুনর্জাগরণের সফল বাস্তবায়ন  ঘটে তাঁর সৃষ্টকালের প্রান্তসীমায়। 

তমিজ উদ্দিন খান ১৮৮৯ সালের চৈত্র মাসে রাজবাড়ি জেলার রাজবাড়ি শহরের পূর্বপ্রান্ত ইতিহাস বিজড়িত খানখানাপুর গ্রামে তৎকালীন পশ্চাৎপদ এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। জানা যায় তাঁর পূর্ব পুরুষেরা এসেছিল পশ্চিম থেকে। পিতামহ শরিয়তুল্লার জমি সাতবার পদ্মার ভাঙ্গনে নিপতিত হওয়ায় পরিবারটি নিঃস্ব হয়ে পড়ে। পিতা আমির উদ্দিন খানের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। দারিদ্রের সাথে কঠোর মোকাবেলা করে পরিবারটি টিকে থাকে। তমিজ উদ্দিন খানের মাতা কুলসুম বিবি ছয় মেয়ে ও দুই ছেলের জন্ম দেন। তাদের মধ্যে অনেকেই শৈশবে মারা যায়।

শত বছর পূর্বে দরিদ্র মুসলমান কৃষকের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষার প্রসার তেমন ঘটেনি। থানা কিংবা মহকুমায় একজনও উচ্চ শিক্ষিত লোক ছিল না। দরিদ্র কৃষকের পক্ষে শিক্ষার ব্যয়ভার বহন করা সম্ভব হত না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও ছিল কম। তমিজ উদ্দিন খানের হাতেখড়ি স্বগৃহে। এরপর তিনি ঝপু খানের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানে পড়ালেখা তেমন ভালো হয়নি। তিনি খানকানাপুর মিডল ইংলিশ (ME) স্কুলে ভর্তি হন। স্কুলটি অল্পদিনের মধ্যেই হাই ইংলিশ স্কুলে পরিণত হয়। স্থানীয় জমিদার ও স্কুলের মালিক বিপিন বিহারী রায়ের স্ত্রীর নামে স্কুলটির নামকরণ হয় খানখানাপুর সুরাজ মোহিনী ইনস্টিটিউট। এ বিদ্যালয় থেকে ১৯০৬ সালে ইংরেজিতে লেটার মার্কস নিয়ে এনট্রান্স পাস করেন। এখানেই পিতা অভাব অনটনের কারণে শিক্ষার ইতি টানতে বলেন। কিন্তু ইচ্ছা এবং শিক্ষার প্রতি গভীর অনুরাগ থাকায় তিনি কোচবিহার কলেজে ভর্তি হন এবং আই এ পাস করেন। অতপর কলিকাতায় স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে ১৯১১ সালে ইতিহাস, ও দর্শন ও ইংরেজিতে অনার্সসহ বিত্র পাস করেন। এরপর তিনি পেসিডেন্সী কলেজ থেকে ইংরেজিতে এম এ ও ল-কলেজ থেকে ল পাস করেন। তিনি সাবেক ফরিদপুর জেলার প্রথম মুসলিম অনার্স গ্রাজুয়েট। ছেলের লেখাপড়ার খরচ বহন করা পিতার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ায় পিতা ছেলের বিবাহের ব্যবস্থা করেন।

Additional information