শতবছরের রাজনীতি - পৃষ্ঠা নং-২৮

তমিজ উদ্দিন খান রাজবাড়ি শহরের নিকটবর্তী চরনায়নপুর গ্রামের বিত্তবান ও হোমিও চিকিৎসক বশির উদ্দিন সাহেবের মেয়ে রাহতুন নেসার (বিবাহের পর রাবেয়া) সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। শিশুকাল থেকেই তিনি ছিলেন আমোদপ্রিয়। মাছ ধরা, সাঁতার টামবাড়ি, লাঠিখেলা, ক্রিকেট, হাডুডু, ফুটবল, ঘুড়ি উড়ানো, যাত্রা, কবিগান সবই ছিল তাঁর প্রিয় সখ।

‘বয়কট’ ও ‘স্বদেশী’  আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরু। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের প্রতিক্রিয়ায় প্রথমে ‘বয়কট’ পরে তা ‘স্বদেশী’ আন্দোলনে রুপ নেয়। এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন ফরিদপুরের ‘অম্বিকা চরণ মজুমদার’। সহসাই আন্দোলন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। এ আন্দোলনে যোগ দিয়ে প্রথম তিনি পাঁচুরিয়া বিপিন পাল ও ডা. গফুরের বক্তৃতা মঞ্চে গৃহীত সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে কম্পিত কণ্ঠে বলেন, মুসলমানদের পক্ষ থেকে আমি এ প্রস্তাব সমর্থন করছি। `I support the resolution on be half of the Muslim community' (The test ot time my - life and days, by Tamijuddin khan, Page-29). এ সময় তিনি দশম শ্রেণির ছাত্র। বৃটিশ কাপড় ও লবণ বর্জনে তিনি ছাত্র ও জনতাকে উদ্বুদ্ধ করেন। বন্দে মাতরম ধ্বনি সহকারে বিদেশী কাপড়ের দোকানের সানে দল বেঁধে স্লোগান দেওয়া তার নৈমত্তিক কর্ম হয়ে দাঁড়ায়।

শিক্ষা সমাপ্ত করে তিনি প্রথমে কলিকাতায় ও পরে ফরিদপুর জেলা স্কুলে কিছুদিন শিক্ষকতা করেন এরপর তিনি স্বাধীন ব্যবসা ও জনসেবায় আত্মনিয়োগের উদ্দেশ্যে ফরিদপুর বার এ যোগ দেন। আইনব্যবসায় যোগদান করার পর ফরিদপুর পৌরসভার কমিশনার এবং পরে ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন। তিনি এ সময় ফরিদপুরে প্রজা সম্মেলনের ব্যবস্থা করেন। দীনেশচন্দ্র সেন সভাপতি এবংতমিজ উদ্দিন খান সেক্রেটারী ছিলেন। তিনি ফরিদপুর আঞ্জুমান-ই-ইসলামিয়ার সেক্রেটারী নির্বাচিত হন। তিনি ১৯১৫ সালে মুসলিম লীগের সদস্য পদের টিকেট ক্রয় করেন কিন্তু সক্রিয় হয়ে ওঠেননি।

পাক ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসে ১৯১৯ সালে রাউলাট আইন ছিল রাষ্ট্র বিরোধী কার্যকলাপ দমন, গ্রেপ্তার ও দমন পীড়নের কালো আইন। এর প্রতিবাদে মি. জিন্নাহ লেজিজলেটিভ কাউন্সিল থেকে পদত্যাগ করেন এবং গান্ধী সত্যাগ্রহের আহবান জানিয়ে অসহযোগের মাধ্যমে রাউলাট আইনকে বয়কট করতে বললেন। এ নিয়ে বোম্বে গোলযোগ বাধে। দুইজন কংগ্রেসী কর্মী গ্রেফতার হন। জনতা ক্ষিপ্ত হয়ে দুইজন ইউরোপীয় ব্যাংক কর্মচারীকে হত্যা করে। জেনারেল ডায়ারের উপর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ভার দেওয়া হয়। এরপর ঘটে জালিয়ান ওয়ালবাগের নৃশংসতম  হত্যাকাণ্ড।

এ নৃশংস হত্যায় ভারতবাসী প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হল। তারা স্বরাজের জন্য মরিয়া হয়ে উঠল। হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে একযোগে অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এ সময় তমিজ উদ্দিন খান মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে কংগ্রেসে যোগ দেন এবং রাজবাড়ি ফরিদপুরে অসহযোগ আন্দোলনে নেতৃত্বে দান করেন। এ সময়েই তিনি কংগ্রেসের ফরিদপুর জেলা কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। অসহযোগ ও খেলাফত যুগপৎ আন্দোলন বৃটিশ সিংহাসনের ভিত কাঁপিয়ে তুলেছিল। প্রাচীন হিন্দু ঋষিদের মতো মহাত্মা গান্ধীর রহস্যময় ব্যক্তিত্ব বৃটিশ রাজকে বিব্রত করে তোলে। এ সময় সরকারের দমন নীতি কঠোতম করা হল। তমিজ ‍উদ্দিন খানকে গ্রেফতার করা হল। জেলে তাঁকে শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়। ১৪ মাস জেলে থাকার পর ১৯২১ সালে তিনি ‍মুক্তি পান ইতিমধ্যে অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলন থিতিয়ে পড়েছে। স্বরাজ দুরাশা । দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের স্বরাজ পার্টির প্রতিও অনুরক্ত ছিলেন তিনি। স্বরাজ দুরস্থ হলেও তিনি সক্রিয় ভূমিকায় থাকেন। কিন্তু এরই মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়েছে। মুসলমানদের প্রতি হিন্দুরা মারদাঙ্গা হয়ে উঠল।

Additional information