শতবছরের রাজনীতি - পৃষ্ঠা নং-২৯

তাঁর পিতার মৃত্যু, বই ব্যবসার ক্ষতি, আর্থিক দুরবস্থা ইত্যাদি কারণে ১৯২৫ সালে কংগ্রেস ত্যাগ করেন। এ সময় তিনি ফরিদপুর পৌরসভার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। আঞ্জুমান-ই-ইসলামী সেক্রেটারী হিসেবে প্রতিষ্ঠানকে সচল করেন। আইন ব্যাবসায় ফিরে যান। ১৯২৬ সালে বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ফরিদপুর জেলা দুটি কনস্টিটিউশন। ফরিদপুর সদর ও গোয়ালন্দকে নিয়ে একটি। মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জকে নিয়ে অন্যটি। তখন স্বরাজ পার্টি ছাড়া নির্বাচন করার জন্য কোনো সুনিয়ন্ত্রিত দল ছিল না। বেশির ভাগ প্রার্থী ছিলেন স্বতন্ত্র। এ নির্বাচনে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন প্রখ্যাত জমিদার পুত্র চৌধুরী মোয়াজ্জেম হোসেন লাল মিয়া। কাজী নজরুল ইসলাম ও প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন। একে ফজলুল হক লাল মিয়াকে সমর্থন দেন। বিরাট আয়োজনের এ নির্বাচনে তমিজউদ্দিন খানের পক্ষে সাধারণ গরিব প্রজা। বিপুল ভোটে তিনি জয়ী হন। লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে থাকাকালীন খান প্রজা পার্টির সেক্রেটারী নির্বাচিত হন। ভোট কমিশন ও শিক্ষা পরামর্শ কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি স্যার আবদুর রহিম, খাজা নাজিমুদ্দিন এসব মন্ত্রীদের সাথে কাজ করেন। এ সময় তিনি পশ্চাৎপদ মুসলমানদের জন্য ভোটাধিকার ও শিক্ষানীতির ক্ষেত্রে মূল্যবান অবদান রাখতে সমর্থ হন। তিনি দরিদ্র কৃষকের জমি হস্তান্তরের অধিকার নিয়ে লড়েছিলেন। ভূমি দখল আইন প্রণয়নে তাঁর অবদান ছিল। প্রজা পার্টির পক্ষ থেকে আইনসভায় জোরালোভাবে সংগ্রাম করেছিলেন। বর্গা চাষীরা এতে আশার আলো দেখতে পায়।

বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার স্থায়িত্বকাল ছিল স্বল্পকালীন। ১৯২৯ সালে ব্যবস্থাপক সভা ভেঙ্গে দেওয়া হয়। ১৯৩০ এর নির্বাচনে তিনি গোপালগঞ্জ-মাদারীপুর থেকে কংগ্রেসের মনোনয়নে জয়ী হন। ফরিদপুর-গোয়ালন্দের সিট আলীমুজ্জামান চৌধুরী পক্ষে ছেড়ে দেন। ১৯৩৭ সালে মুসলিম লীগের প্রার্থী হিসেবে কংগ্রেস প্রার্থী হুমায়ুন কবিরকে পরাজিত করে বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৩৭-১৯৪১ পর্যন্ত বঙ্গীয় সরকারের ফজলুল হক মন্ত্রীসভার কৃষি, স্বাস্থ্য, শিল্প, বাণিজ্য ও শ্রম দপ্তরের মন্ত্রী এবং ১৯৪৩-১৯৪৫ পর্যন্ত খাজা নাজিমুদ্দিন মন্ত্রীসভার শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন। ১৯৪৫-১৯৪৬ পর্যন্ত ভারতীয় আইন সভার সদস্য। ১৯৪৬ এ চতুর্থবার বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪০ সালে লাহোরে গুরুত্বপূর্ণ সভায় পাকিস্তান প্রস্তাব আনেন একে ফজলুল হক। এ সভায় তমিজ উদ্দিন খান বাংলার প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে ঢাক-ময়মনসিংহ থেকে কেন্দ্রীয় আইনসভায় সদস্য নির্বাচিত হন। ফরিদপুরের নিজস্ব সীট লাল মিয়ার জন্য ছেড়ে দেন। স্যার হালিম গজনবী ছিলেন তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী। উল্লেখযোগ্য ভোট পেয়ে জয়ী হন।

বাংলায় তমিজ উদ্দিন খান এতটাই জনপ্রিয় ছিলেন যে, তিনি যে আসন থেকে নির্বাচন করতেন সেখান থেকেই বিজয়ী হতেন। তিনি দিল্লীর কেন্দ্রীয় আইনসভার সদস্য হিসেবে যোগ দেন। তখন কেন্দ্রে জওহর লাল নেহেরু প্রধানমন্ত্রী ও লিয়াকত আলী খান অর্থমন্ত্রী। তমিজ উদ্দিন খানকে ডেপুটি স্পীকার হওয়ার কথা ওঠে। তিনি গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তখন ভারত স্বরাজ অর্জনের পথে। কংগ্রেস তখন ভারতের স্বপ্ন দেখছিল। এ সময় মুসলিমলীগ এ্যাকশন দিবস পালন করে। ১৫ আগস্ট ১৯৪৬ কোলকাতায় এ দিবস পালন করা হয়। হিন্দুরা এর বিরোধিতা করায় দাঙ্গা বাধে। বহু মুসলমান নিহত হয়। এদিকে নোয়াখালিতে প্রচুর হিন্দু নিহত হয়। মহাত্মা গান্ধী ও সহরোওয়ার্দী নোয়াখালিতে অবস্থান করে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনেন। এই দাঙ্গায় প্রমাণ হয় হিন্দু ও মুসলমানদের রাষ্ট্র ভিন্ন হওয়া আবশ্যক। ১৯৪৭ এর ভারতের আইনে এ ধারণা লিপিবদ্ধ হয়। ১৯৪৭ এর ১৪ আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়। যুক্ত ভারতের সম্পদ ও ঋণের ভাগ-বাটোয়ারা করার উদ্দেশ্যে গঠিত পার্টিশন কাউন্সিলে তমিজউদ্দিন খান সদস্য ছিলেন।

Additional information