শতবছরের রাজনীতি - পৃষ্ঠা নং-৩০

পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হলে কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ গণপরিষদের সভাপতি ও তমিজ উদ্দিন খান সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। দেশের শাসনতন্ত্র প্রণয়নের ব্যাপারে মি. জিন্নাহর সাথে তাঁর অবিরাম আলাপ চলতে থাকে। ১৯৪৮ এ জিন্নাহর মৃত্যু হলে নাজিমুদ্দিন গভর্নর জেনারেল হন এবং পূর্ববাংলায় নরুল আমিন প্রধানমন্ত্রী হন। তমিজ উদ্দিন খান পার্লামেন্টারী পার্টি কর্তৃক আইন সভার সভাপতি মনোনীত হন।

এসময় সারাদেশে পাঞ্জাবের প্রাধান্য বিরাজ করতে থাকে। শাসনতন্ত্রের মূলনীতিতে ইসলামের ভূমিকা, কেন্দ্রের অধিক ক্ষমতায়ন, রাষ্ট্র ভাষা ইত্যাদি বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। লিয়াকত আলী খানের মৃত্যুর পর খাজা নাজিমুদ্দিন, তমিজ উদ্দিন খান শাসনতন্ত্র রচনায় বারংবার তাগিদ দিতে থাকেন। এরই মধ্যে ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রয়ারি ভাষা আন্দোলনকে নিয়ে পুলিশ গুলি চালালে অনেকে শহীদ ও আহত হন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তমিজ উদ্দিন খান প্রধানমন্ত্রীকে সত্তর সিদ্ধান্ত গ্রহণে চাপ দিতে থাকেন। এরই মধ্যে অনেকে মুসলিমলীগ থেকে বেরিয়ে এসে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করেন। শাসনতন্ত্র রচিত না হওয়ায় গণতন্ত্র বিকাশের পথ রুদ্ধ হতে থাকে। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়ী হয়। মুসলীমলীগের শোচনীয় পরাজয় ঘটে। কিন্তু ভারত শাসন আইনের ৮২ ক ধারা অনুযায়ী গোলাম মোহাম্মদ গণপরিষদ ভেঙ্গে দিয়ে নতুন মন্ত্রীসভা গঠনের প্রস্তাব করেন। তমিজ উদ্দিন খানকে নতুন মন্ত্রী সভায় যোগদান করতে বলা হয়। তিনি কেবল মন্ত্রীত্ব প্রত্যাখানই করলেন না, ১৯৫৪ সালের গণপরিষদ ভেঙ্গে দেওয়ার সিদ্ধন্তকে চ্যালেঞ্জ করেন। এ সময় তিনি গণপরিষদের সভাপতি ইস্কন্দার মীর্জা, গণপরিষদের সেক্রেটারী এবি আহমেদ গুরমানী বাসায় চড়াও হয়ে মন্ত্রীসভায় যোগ দিতে বলেন নচেৎ বিপদ হতে পারে বলে জানায়। তমিজউদ্দিন খান জানান তোমরা কর্তব্য কর আমার কর্তব্য আমার উপর ছেড়ে দাও। ৭ নভেম্বর ১৯৫৪ একটি স্বরণীয় ঘটনার দিন। ঐ দিন তমিজ উদ্দিন খান গণপরিষদের সভাপতি হিসেবে সিন্ধু প্রধান আদালতে রিট পিটিশন দায়ের করেন। সব হুমকি উপেক্ষা করে তিনি আদালতে উপস্থিত হন। ‘বাথ আইল্যান্ড’ সরকারি বাসভবনের কড়া নজর রাখা হয়েছিল। তিনি গোপনে মোটর রিক্সা করে কোর্টে পৌছালেন। কেউ তাকে ধরে ফেলে ভেবে ৭ নভেম্বর কোট লাইব্রেরিতে কাটান।

ঐ মামলা সমগ্র দেশে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে। দেশবাসী শান্ত এ মানুষটির সাহস দেখে অভিভূত হয়। জায়নাজাজ হাতে সাধারণ দরিদ্র মানুষের অনবরত  প্রার্থনার দৃশ্য ছিল লক্ষ্য করার মত। এই সব দরিদ্র মানুষ বুঝত না গণতন্ত্র কী? কিন্তু তারা হৃদয় দিয়ে তমিজ উদ্দিন খানের পক্ষ নিয়ে অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে সংগ্রামে সমর্থন দিয়েছেন। এ মামলায় তমিজ উদ্দিন খানের জয় হয়। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করায় ১৯৫৬ সালের সংবিধান রহিত হয়ে যায়। ১৯৬২’র মধ্যে শাসনতন্ত্র প্রণয়নের ঘোষণা করা হয়। ১৯৬২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মিস ফাতেমা জিন্নাহ (কায়েদে আজমের ছোট বোন) পূর্ব-পাকিস্তানে ব্যাপক সমর্থন পান। কিন্তু আইয়ুব খান প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তমিজ উদ্দিন খানের অনিচ্ছা সত্ত্বেও পারিবারিক চাপে কেন্দ্রীয় আইনসভার নির্বাচনে ফরিদপুর-ঢাকা আসন থেকে অংশগ্রহণ করেন এবং সহজেই জয়লাভ করেন। তিনি কেন্দ্রীয় আইন সভার ‘স্পীকার’ নিযুক্ত হন। আইয়ুব খান দেশের বাইরে গেলে দু’বার তাকে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হয়। ১৯৬৩ সালের ১৯ আগস্ট রাজনীতির কিংবদন্তির এ নায়ক ইহলোক ত্যাগ করেন। বেতারে তাঁর মৃত্যু সংবাদ বারবার ঘোষণা করা হয়। তাঁর মৃত্যুতে সারাদেশে শোকের ছায়া নেমে আসে। সব অফিস আদালত, স্কুল, কলেজ বন্ধ ঘোষণা করা হয়। প্রায় পঞ্চাশ হাজার লোক জানাজায় শরীক হয়। বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় তাঁর মৃত্যুতে সংবাদ পরিবেশিত হয়।

Additional information