শতবছরের রাজনীতি - পৃষ্ঠা নং-৪

১৯০৫ সালে ১৬ অক্টোবর আসাম, ঢাকা, রাজশাহী, চট্রগ্রাম নিয়ে লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করেন। এতে পূর্ববাংলা ও আসাম নামে প্রদেশের উদ্ভব ঘটে। ঢাকা রাজধানী ও চট্রগ্রাম বিকল্প রাজধানী নির্বাচিত হয়। বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাবনাকালে হিন্দু নেতাদের মনে প্রবল উত্তেজনার সৃষ্টি করে। তারা পত্রিকায়, বক্তৃতা মঞ্চে একে বাঙালি বিরোধী, জাতীয়তা বিরোধী, বঙ্গমাতার অঙ্গছেদ এরুপ নানা বিশেষণে আখ্যায়িত করে। সঞ্জীবনী পত্রিকা স্বদ্বেশীয় নিবন্ধে ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে সামগ্রিক বয়কট যুদ্ধ ঘোষণা করে। তারা ভেবেছিল নতুন প্রদেশে মুসলমানেরা হবে সংখ্যাগরিষ্ঠ আর বাঙালি হিন্দুরা হবে সংখ্যালঘু। তারা স্বদেশেই হবে পরবাসী। এছাড়া ঢাকায় রাজধানী হলে কলিকাতার গুরুত্ব হ্রাস পাবে। ১৯০৫ খৃস্টাব্দে ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হবার দিন স্থিরকৃত হল। সেদিন কংগ্রেস শোক দিবস হিসেবে পালন করে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেদিন রাখীবন্ধন উৎসবের প্রচলন করেন। বাংলার মানুষ যে ভাই ভাই তার প্রতিক হিসেবে হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান নির্বিশেষে একে অপরের হাতে রাখি বেঁধে দেন। আন্দোলন প্রতিবাদ সত্ত্বেও বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হল। কিন্তু বয়কট, স্বদেশীর শপথ, সংযুক্ত বাংলা, বন্ধে মাতরম ধবনি নিয়ে স্বদেশী আন্দোলন শুরু হয়।

১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মহালয়ার দিনে কলিকাতা কালিঘাটের কালিমন্দির প্রাঙ্গণে বহুসংখ্যক মানুষ সমবেত হয় এবং লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গকে স্বৈরাচারী, অপ্রয়োজনীয় কুকীর্তি বলে নিন্দা করে এবং বয়কট আন্দোলনের শপথ নে। এ আন্দোলনের শুরুতেই সাহেবদের খানা তৈরী করতে উড়িষ্যার পাচকরা অস্বীকার করল, মুচিরা সাহেবদের জুতা মেরামত করল না, ধোপারা কাপড় পরিস্কার করতে রাজি হয় না।

এভাবে ধনী, দরিদ্র, উঁচু, নিচু, শহর নগর গ্রামবাসী সকলেই বয়কট আন্দোলনে যোগদান করলে সে আন্দোলন এক শক্তিশালী বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়। স্বদেশী আন্দোলনে ছাত্রসমাজ অংশগ্রহণ করে। বিলেতি বস্তু সংগ্রহ করে সেগুলিকে অগ্নিসংযোগ করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রজনীকান্ত সেন, দ্বীজেন্দ্র লাল রায়, রঙ্গলাল বন্দ্যোপধ্যায় প্রভৃতি রচিত স্বদেশী গান বাংলার আকাশ বাতাস মুখরিত করে তোলে। মুকুন্দ দাসের স্বদেশী গানের পালা, বাংলার শহর ও গ্রামে গ্রামে স্বদেশীকতার বন্যা এনেছিল। ‘ছেড়ে দাও রেশমী চুড়ি বঙ্গনারী, কভু হাতে আর পরো না’ ‘মায়ের দেয়া মোটা কাপড় তুলে নেরে ভাই’ প্রভৃতি গান গ্রামে, গঞ্জে শহরে বন্দরে সকলের মুখে মুখে গীত হয়ে এক অভূতপূর্ব জাগরণের সৃষ্টি করেছিল।

সরকারি দমননীতি, সাম্প্রদায়িক বিভেদ, সাংগঠনিক দুর্বলতা ইত্যাদি কারণে আন্দোলনের উদ্দেশ্য সফল হয় না। বৃটিশ সরকার বঙ্গবিভাগ সিদ্ধান্তে অটল থাকে। এদিকে জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে স্বরাজের ধ্বনি উত্থিত হয়। এসময় আন্দোলনকারীরা চরমপন্থা অবলম্বনে প্ররোচিত হয়ে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন গড়ে তোলে। সারাদেশে বিপ্লবীরা বিপ্লবের মন্ত্র ছড়াতে থাকে। বাংলা, পাঞ্জাব, মহারাষ্ট্রের বহু গুপ্ত সমিতি গড়ে ওঠে। এর মধ্যে কলকতায় যুগন্তর এবং ঢাকায় অনুশীলন সমিতি উল্লেখযোগ্য। সারাদেশে অনুশীলন সমিতির শাখা গড়ে ওঠে। তারা প্রকাশ্যে দেহচর্চায় লাঠি খেলা, কুস্তি, কুচকাওয়াজ, ছোরাখেলা অনুশীলন করত। আর বিপ্লবী সংগঠন কার্যকলাপ গোপনে চলত। বিপ্লবীরা সে সময় অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড চালাতে থাকে। তারা পূর্ববঙ্গ ও আসামের গভর্ণর ফুলার সাহেবকে হত্যা করতে ব্যর্থ হয়। কলিকাতার প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব স্বদেশীয় বিপ্লবীদের লঘু অপরাধে গুরুদণ্ড দিতে থাকে। বিপ্লবীরা কিংসফোর্ডকে হত্যার পরিকল্পনা করে। নিক্ষেপ করলে ব্যারিস্টার কেনেডি ও তার মেয়ে নিহত হন। পালিয়ে যাবার সময় মোকামা স্টেশনে ধরা পড়লে প্রফুল্ল চাকি নিজের রিভলবরের গুলিতে আত্মহত্যা করেন এবং ক্ষুদিরাম বসু গ্রেফতার হন।

Additional information