শতবছরের রাজনীতি - পৃষ্ঠা নং-৩২

ইউসুফ হোসেন চৌধুরী

রাজবাড়ি জেলার তথা বাংলার অন্যতম রাজনীতিবিদ ছিলেন ইউসুফ হোসেন চৌধুরী। বিশ শতকের শুরু থেকে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলননের সংগ্রামসহ হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের স্বার্থ রক্ষণের রাজনীতি প্রবল হতে শুরু করে। এ লক্ষ্যে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ স্ব-স্ব অবস্থানে থেকে রাজনৈতিক সংগঠনকে মজবুত করে তুলতে সচেষ্ট হয়। নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির ধারায় ইউসুফ হোসেন চৌধুরী প্রথমে কংগ্রেসের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। কংগ্রেসে মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টি উপেক্ষিত দেখে তিনি মুসলিমলীগে যোগদান করেন।

১৯৩৫ সালে প্রজ্ঞা ও কর্মদক্ষতায় মুসলিম লীগের অন্যতম নেতা হিসেবে পরিগণিত হন। জমিদার ঘরে জন্মগ্রহণ করে প্রজাদের কাতারে শামিল হন। ইউসুফ হোসেন চৌধুরী ছিলেন আলিমুজ্জামান চৌধুরীর ভ্রাতা। সহজ সরল অনাড়ম্বর জীবনযাপনে তিনি অভ্যস্ত ছিলেন। তাঁর সুনাম সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে।

১৮৯৮ সালে তিনি বেলগাছিতে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ফয়েজ বক্স চৌধুরী ছিলেন জমিদার। পরিবারেই তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত হয়। পরবর্র্তী শিক্ষা কলিকাতায়। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯২১ সালে বিএ পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে ১৯২৫ সালে ‘ল’ ডিগ্রি অর্জন করেন। এ বছরেই তিনি ফরিদপুর বার সমিতিতে যোগদান করেন। জনসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার উদ্দেশ্যে তিনি প্রথমে ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, গোয়ালন্দ মহকুমা ইউনিয়ন বোর্ড সমিতির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তিনি ফরিদপুর জেলা বোর্ডের সদস্য এবং প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন।

১৯৩৫ সালে ভারতশাসন আইন অনুসারে (১৯৩৫ সালের শাসনতন্ত্র বলে পরিচিত) প্রাদেশিক আইন পরিষদের প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৩৭ সালে। আইন পরিষদে মোট মেম্বার সংখ্যা ছিল ২৫০ জন। এরমধ্যে মুসলমান ১২২ জন, হিন্দু ৬৪ জন তফশীলী হিন্দু ৩৫ জন, ইউরোপীয়ান ২৫ জন ও এ্যাংলো ইন্ডিয়ান ৪ জন। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে ইউসুফ হোসেন চৌধুরী মুসলিম লীগের প্রার্থী হিসেবে আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৪২ সালে তিনি নিখিল ভারত মুসলিম লীগের কাউন্সিলর মনোনীত হন। সমাজসেবার প্রতি একনিষ্ঠতায় বৃটিশ সরকার তাঁকে ১৯৪৩ সালে খান বাহাদুর উপাধিতে ভূষিত করেন। দেশ বিভাগের সময় পর্যন্ত (১৯৪৭) তিনি অবিভক্ত বাংলার প্রাদেশিক সরকারের আইনসভার সদস্য ছিলেন। পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভব হলে তিনি প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য এবং মুসলিম লীগের প্রথম চীফ হুইফ নিযুক্ত হন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য (MNA) নির্বাচিত হন। ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত তিনি জাতীয় পরিষদের সদস্য ছিলেন। তিনি শিক্ষা বিভাগের পার্লামেন্টারী সেক্রেটারী ছিলেন। জাতীয় ইতিহাস কেবলমাত্র কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা একদলীয় মানুষের প্রচেষ্টার ফসল নয়। সর্বস্তরের সকল মানুষ, গোষ্ঠী ও দলের আদর্শ ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পথ বেয়ে ইতিহাসের গতিধারা চলতেই থাকে। এ ধারায় সকল মানুষের প্রচেষ্টার মধ্যেও কিছু মানুষ সাহস, সংযম, প্রজ্ঞা দিয়ে ইতিহাসের গতিধারা নিয়ন্ত্রণ করেন। এমন মানুষ ছিলেন ইউসুফ হোসেনে চৌধুরী। রাজনৈতিক জীভনে এত সফলতার পরও পরিবারের আর্থিক সফলতা ছিল না।

Additional information