শতবছরের রাজনীতি - পৃষ্ঠা নং-৩৫

শ্যামেন ভট্রাচার্য

কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রবাদ পুরুষ শ্যামেন্দ্রনাথ ভট্রাচার্য ১৯০৭ সালে কোড়কদির ভট্রাচার্য পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা সীতানাথ ছিলেন ফরিদপুর কোর্টের জুরি এবং হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন মানবতাবাদী এবং প্রতিবাদ মুখর। শৈশব কোনো শুদ্র বন্ধুর বাড়ি অন্ন বা কিছু খেয়েছিলেন বলে সমাজ তাকে উপনয়ন প্রায়শ্চিত্ত দেয়। মেধাবী ও জেদী শ্যামেনন্দ্রনাথ উপনয়ন প্রত্যাখান করলে শাস্তিস্বরুপ পরিবারের অন্য সকলের সাথে বসে খাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়। তিনি উঠোনে বসে খেতেন এবং নিজ হাতে থালাবাসন ধুয়ে অন্যস্থানে রাখতেন। তিনি তখন সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। জাতপাত তার কাছে পীড়াদায়ক মনে হয়। এসময়েই তিনি বলতেন মানুষ - জন্ম নিয়ে ভাগ হয় না। কর্মফল মানুষকে ভাগ করে। প্রকৃতির কোলে মানুষ সমভোগী এমন সত্য উচ্চারণে তিনি বাল্য বয়সেই প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন। আর সামাজিক শোষণ, বঞ্চনা, অন্যায়, অবিচারের বিরুদ্ধে সারাজীবন লড়াই করেছেন। সামন্ত সমাজে উৎপাদিত ফসলে প্রজা আর রাজার অংশিদারিত্বের দ্বন্দ্ব ছিল। সে দ্বন্দ্ব উসকে দেয় পরগাছা জমিদার শ্রেণি তাদের ভাগবন্টনের কূটকৌশল দ্বারা। এরই বিরুদ্ধে সংঘটিত হয়েছিল এ অঞ্চলের কোড়কদি গ্রামের কয়েকজন জমিদার এবং সামন্ত পরিবারের সন্তান। তারা হলেন শ্যামেন্দ্রনাথ ভট্রচার্য, অবনী লাহিড়ী, অনিল লাহিড়ী। শিক্ষিত সচেতন যুবকেরা কৃষকদের পাশে অবস্থান নেয় এবং ফসলের ভাগ বন্টনের দাবিতে কৃষকদের সচেতন ও সংঘবদ্ধ করে তোলেন। জানা যায়, তারা নিজেদের ধানের গোলা কেটে কৃষকদের মধ্যে ধান বিলি করেন। শ্যামেন্দ্রনাথ কোড়কদি স্কুল থেকে এন্ট্রাস এবং রাজেন্দ্র কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। বিগত শতকের বিশের দশকের শেষে বিপ্লবী অনুশীলন সমিতির সক্রিয় সদস্য হন। এ সময় বাজবাড়ির আশু ভরদ্বাজ, সমর সিংহ, শ্যামেন ভট্রাচার্য, চারু প্রভা সেন, অনিল লাহিড়ী, অবনী লাহিড়ীর নেতৃত্বে অনুশীলন সমিতি শক্তিশালী সংগঠনে রুপ নেয়। এ আন্দোলন বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন তীব্ররুপ ধারণ করে। শ্যামেন্দ্রনাথ গ্রেপ্তার হন। জেলে বসে পরীক্ষা দিয়ে ইংরেজি ও অর্থনীতিতে রেকর্ড নম্বর পেয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর আবার তাকে জেলে যেতে হয়। শ্যামেন্দ্রনাথ তিরিশের দশকের কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। এ সময় সমর সিংহ, আশু ভরদ্বাজ, মনমোহন ভাদুড়ী, অনিল লাহিড়ী, সত্য মিত্র প্রমুখের নেতৃত্বে ফরিদপুর কমিউনিস্ট পার্টির দৃঢ় ভিত রচনা করা হয়। এ সময়ে তার উদ্যোগে ফরিদপুর কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হলে তিনি সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন এ পদে থেকে জুলুম নির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন।

জীবনের চব্বিশ বছর কেটেছে জেলে। তার আহবানে হাজার হাজার মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমে অংশ নিত। তিনি একটি বাওড় ও বিলের মধ্যে স্বেচ্ছাশ্রমে খাল কাটার ব্যবস্থা করেন যা আজও শ্যামেনবাবুর খাল বলে পরিচিত। কোড়কদির স্কুলটি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলে তিনি নানাভাবে অর্থ সংগ্রহ করে বাঁচিয়ে রাখেন। তিনি এ বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন শিক্ষাকতা করেন। পরে বোয়ালমারী জর্জ একাডেমির প্রধান শিক্ষক ছিলেন। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি হলে উক্ত বিদ্যালয় থেকে তাকে অপসারণ করা হয়। এ সময় আইয়ুব খান এই বলে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন যে কোনো কমিউনিস্ট সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে পারবে না। ১৯৭১ সালে তিনি ভারতে যান। ১৯৭৯ সালে তাঁর জীবনাবসান হয়।

অবনী লাহিড়ী

আবহমান বাংলার জীবন জীবিকার উৎস কৃষি। কৃষির চালনাকারী কৃষক। কিন্তু কৃষক সম্প্রদায় পরদেশী শাসনকালে কর্ষিত ভূমিতে মালিক নন। মধ্যস্বত্বভোগী নানা প্রকার বন্দোবস্তের কৌশলে  মালিকানা স্বত্বে কৃষকদের ফসলের সিংহভাগ গ্রাস করেছে। এ ব্যবস্থার পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন। এ প্রেক্ষাপটেই শুরু হয় তেভাগা আন্দোলন। উৎপাদিত ফসলের ভাগবন্টন হতে তিন ভাগে। দুইভাগ পাবে কৃষক। একভাগ মালিকের। এভাবে তেভাগা আন্দোলন দাঁনা বাধে। কৃষকদের ন্যায্য দাবি আদায়ে ১৯৪৬-৪৭ এ দিনাজপুর, রংপুর, জলপাইগুড়ি, মেদিনীপুর, ২৪পরগনায় আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করে। উত্তর বাংলায় এ আন্দোলন সংগঠিত করার দায়িত্ব পালন করেন কোড়কদির অবনী লাহিড়ী। অবনী লাহিড়ীর পিতা নলিনীমোহন উচ্চপদের চাকরিজীবী ছিলেন। বাবার চাকরিসূত্রে ১৯২৬ সালে অবন্তীমোহন কাবুলে যান। তিন বছর পর কোড়কদি ফিরে আসেন। বিংশ শতাব্দীর তিরিশের দশক রাজনীতির অগ্নিঝরা সময়। এসময় তিনি রাজনীতি সচেতন হয়ে ওঠেন এবং সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৩২ সালে মহাত্মা গান্ধী ও সুভাষ বসুকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে রাজবাড়িতে এক প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয়। এর বিরুদ্ধে সরকার ১৪৪ ধারা জারী করে। ১৫ বছর বয়সী অবনী কোড়কদি থেকে ১৮ মাইল হেটে এসে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেন। এ অপরাধে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৩৩ এ ম্যাটিকুলেশন পাস করে রিপন কলেজে ভর্তি হন। এরই মধ্যে তিনি রাজনীতিতে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছেন। ১৯৩৪ সালে গ্রেপ্তার হয়ে ১৯৩৮ এ ছাড়া পান। এরপর তিনি কমিউনিস্ট রাজনীতির আদর্শে অনুপ্রাণিত হন। ১৯৩৮ এ কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। এরপর তাকে উত্তরবঙ্গে পাঠন হয়। সেখানে ১৯৪২ এ ভারত ছাড় আন্দোলন, ৪৩ এর ভয়াল দুর্ভিক্ষ এবং ৪৬ এর তেভাগা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখায় ইতিহাস স্থান করে নিয়েছেন। ১৯৯৬ সালে তেভাগা আন্দোলনের ৫০ বছর পূর্তিতে অনেকের সাথে বাংলাদেশে এসেছিলেন। তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘তিরিশ চল্লিশের বাংলা’ ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত হয়। কৃষক আন্দোলনের এ নেতা ২০০৬ সালে ইহলোক ত্যাগ করেন।

কমরেড আশু ভরদ্বাজ

কমরেড আশু ভরদ্বাজ রাজবাড়িতে অতিপরিচিত নাম। তিনি গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। রাজবাড়ি কমিউনিস্ট প্রভাবিত অঞ্চল বিধায় তিনি রাজবাড়িতে কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন। তিনি দীর্ঘদিন স্মৃতিশ চক্রবর্তীর (খোকন বাবু) বাড়িতে অবস্থান করেন এবং এ বাড়িতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি কমরেড কমলকৃষ্ণ গুহ, কমরেড আবুল কালাম প্রমুখের দীক্ষা গরু। স্বল্পভাষী, অকৃতদার, আশু ভরদ্বাজ ১৯২০ সালে অনুশীলন পার্টির বিপ্লবী দীক্ষা গ্রহণ করেন। ১৯৩০ সালে গ্রেফতার হয়ে জেলে ও বন্দি শিবিরে আটক থাকেন।

তিনি অগ্নিযুগের বিপ্লবী বলে সামধিক পরিচিত। কোনো বৃটিশকে চড় মারতে গিয়ে তিনি গ্রেফতার হন এবং তার ফাঁসির আদেশ রদ করে তাঁকে আন্দামানে (কালাপানি) দ্বীপান্তরিত করা হয়। তখনকার দিনে কালাপানি এক মরণদ্বীপ। কোথাও পথঘাট নেই। যা আছে তা দুর্গম এবং শ্বাপদসঙ্কুল। কালাপানির বর্ণনায় ২৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের নেতা মওলানা ফজলে হক খায়রাবাদী তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন-----‘এ স্থানের প্রাতঃকালীন বায়ুও লু’র ন্যায় গরম ও ভয়াবহ। এখানকার অমৃতও হলাহলের চাইতেও মারাত্মক। এ স্থানের খাদ্য মানুষের উপযোগী নয়। এই দ্বীপের পানি সাপের বিষের চাইতেও মারাত্মক। এই দ্বীপে আকাশ হতে যাতনার বৃষ্টি ঝরে। এই দ্বীপের মেঘমালা শুধু নির্যাতন ও দুশ্চিন্তা বর্ষণ করিয়াই ক্ষান্ত হয়।’ ফজলে হক খায়রাবাদী সিপাহী বিদ্রোহে  বন্দি হন এবং শাস্তি স্বরুপ কালাপানিতে নির্বাসিত হন। (আজাদী আন্দোলন, পৃষ্ঠা-১৩)। বৃটিশ শাসনের অবসানকালে আশু ভরদ্বাজ রাজশাহী জেলে খাপড়া ওয়ার্ডে বন্দি থাকেন। ১৯৫২ সালে খাপড়া ওয়ার্ডে গুলি চালান হলে ৭ জন বন্দির মৃত্যু হয়। আহত অবস্থায় তিনি বেঁচে যান। তিনি সর্বমোট ৩৩ বছর জেলে কাটান। আত্মত্যাগী এই রাজনীতিবিদ ২০০০ সালে রাজবাড়িতেই দেহত্যাগ করেন। কমরেড আশু ভরদ্বাজ এর দিনলিপি থেকে------------

এক মাস পরে আমাকে ফরিদপুর জেল হইতে ঢাকার কেন্দ্রীয় জেলে নেওয়া হইল। ডাণ্ডাবেড়ী খোলা হইল। কাজ দেওয়া হইল আধামণ করিয়া ডাইল ভাঙ্গার। আমি দুই-চার সের ডাইল ভাঙ্গিয়া ফেলে রাখি। আমার বিরুদ্ধে প্রতিদিন কেস হইতে লাগিল -----‘আমি ঠিকমত কাজ করি না বলিয়া।’ পরপর অনেকগুলি শাস্তি হইয়া চলিল যথা------পেনাল ডায়েট, চটকাপড়, ডান্ডাবেড়ী, শিকলবেড়ী নাইট হ্যান্ডকাপ, স্ট্যান্ডিং হ্যান্ডকাপ, সেল পানিসমেন্ট। শেষ পর্যন্ত একদিন জেল সুপারিনডেন্টকে অপমান করায় আমার ‘কালটুপী’ হইল। ইহার পর আমাকে আন্দামান পাঠাইবার ব্যবস্থা করা হইল। প্রথমে ঢাকা হইতে প্রেসিডেন্সি জেলে পরে আলিপুর জেলে নেওয়া হইল। সেখান হইতে আন্দামান। আন্দামানে এই সময় চারটা দাবি নিয়া অনশনের প্রস্তুতি চলছে। দাবিগুলি হইতেছে (১) সমস্ত রাজবন্দিকে আন্দামান হইতে দেশে ফেরত আনিতে হইবে। (২) সমস্ত রাজবন্দি ও ডেটিনিউকে মুক্তি দিতে হবে। (৩) মুক্তি না দেওয়া পর্যন্ত দ্বিতীয় শ্রেণির বন্দি হিসাবে সকলকে রাখিতে হইবে। (৪) সমস্ত রাজবন্দিকে এক জেলে রাখিতে হইবে। সারা ভারতব্যাপী চলিল এই দাবির পক্ষে------দলমত নির্বিশেষে। রবীন্দ্রনাথ, মহাত্মা গান্ধী, জহরলাল নেহেরু সকলেই দাবি সমর্থন করিয়া বিবৃতি দিল। হরেন মুন্সী ঢাকা জেলে অনশনে মারা গেল। তেত্রিশ দিন অনশনের পর সরকার দাবিগুলি মানিয়া নিল। অনশন ভঙ্গ হইল। আন্দামান হইতে ১৯৩৭ সালের ডিসেম্বরে সমস্ত রাজবন্দিকে ফেরত আনা হইল। দমদম ও আলিপুর আনিয়া রাখা হইল।

১৯৩৮ সালে ১লা জানুয়ারি সকলকে দ্বিতীয় শ্রেণি দেওয়া হইল। কয়েক মাসের মধ্যে কয়েক হাজার ডেটিনিউকে ছাড়িয়া দেওয়া হইল। রাজবন্দিদের ছাড়িবার ব্যাপারে বোর্ড করা হইল। ১৯৩৮ সালের এপ্রিলে মহাত্মা গান্ধী দুইবার দেখা করার জন্য জেলে আসিলেন। তাঁহার প্রশ্নের উত্তরে তাঁহাদের বলা হইল ‘এখন আমরা সশস্ত্র সংগ্রাম বা সন্ত্রাসবাদে বিশ্বাসী নই।’ এই সময় আমাদের অধিকাংশই কমিউনিস্ট মতবাদে বিশ্বাসী হইয়াছে। গান্ধী বলিলেন------আমাকে এক বছর সময় দাও, তোমাদের মুক্তির চেষ্টা করিব। তোমরা কোনো কিছু করিও না। আমি ১লা মে কমিউনিসট পার্টির জেলা সংগঠন ‘কমিউনিস্ট কনসলিডেশনে’ যোগদান করি। আমাদের ‍মুক্তির সুপারিশ করার জন্য যে বোর্ড গঠিত হইয়াছিল তাহার মাধ্যমে অনেকে মুক্তি পাইল। অম্বিকা চক্রবর্তীসহ কয়েক জনকে শর্ত সাপেক্ষে মুক্তি দিতে চাইল। আমার বেলায় বলা হইল-----একে আগেই একবার বিবেচনা করিয়া ফাঁসি হইতে বাঁচান হইয়াছে, আর বিবেচনা করা হবে না। ১৯৩৮ সালে দমদম যাবার আগে ঢাকা জেলের হরেন সেন আমাদের প্রতি নানা রকম দুর্ব্যবহার ও নির্যাতন করার চেষ্টা করে।

আমরা ইহার প্রতিবাদ করিয়া অনশন আরম্ভ করি। আমাদের একটি মাত্র দাবি----‘এই জেলার এখানে থাকা পর্যন্ত আমরা কোনো খাদ্য গ্রহণ করিব না।’ এগার দিন অনশনের পর আমাদের দমদম জেলে পাঠাইয়া দেয়। আমরা খাদ্য গ্রহণ করি সেখানে যাইয়া।

১৯৩৮ সালে এপ্রিলে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু কংগ্রেসের সভাপতি হওয়ার পরে দমদম জেলে যাইয়া সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। ইহার পরে আরো ৪/৫ বার সাক্ষাৎ করেন বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে। ১৯৩৯ সালে গান্ধীজীর কথার এক বৎসর পূর্ণ হইলে, আমরা তাহাকে চিঠি দেই। মহাদেব দেশাই (গান্ধীজীর পার্সোনাল সেক্রেটারী) গান্ধীজীর উত্তরসহ চিঠি নিয়া দেখা করেন। আমরা ইহাতে সন্তষ্ট হইতে না পারিয়া ১৯৩৯ সালের জুন হইতে মুক্তির দাবিতে আমরণ অনশন ধর্মঘট শুরু করি। কয়েকদিন পরে গান্ধীজীর সেক্রেটারী পিয়ারীলালসহ ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ (পরবর্তীতে স্বাধীন ভারতের ১ম প্রেসিডেন্ট) আমাদের সাথে দেখা করেন। অনশন বন্ধ করিতে বলেন। ডা. বিধান রায়, শরৎ বোস, সুভাস বোস, লাহিড়ী, মোজাফফর আহম্মদ (কাকা বাবু), রবি সেনসহ বহু নেতা অনশন ভঙ্গ করার কথা বলেন। আমাদের রাজি করাইতে পারে না। এই দিকে কমিউনিস্ট পার্টি ও বাম দলগুলির নেতৃত্বে প্রবল আন্দোলন শুরু হইয়াছে। এই সময় কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ হইতে গোপনে খবর পাঠায় ‘তোমরা আন্দোলনের নেতাদের উপর দায়িত্ব দিয়া অনশন ত্যাগ কর।’ সেরুপে ব্যবস্থা করা হইল। নেতারা আসিনেন, নেতাজী ফরওয়ার্ড ব্লক গঠন করিয়াছেন, তিনি বলিলেন------‘আপনারা অনশন ত্যাগ করিয়া আপনাদের দাবি আমাদের উপর ছাড়িয়া দেন। আগমী দুই মাসের মধ্যে ভারতব্যাপী আমরা এক বিরাট আন্দোলন গড়িয়া তুলিব মুক্তির দাবিকে কেন্দ্র করিয়া।’ তাহাদের কথায় আমরা বলিলাম ‘যদি আলিপুরের বন্ধুরা রাজী হয় তাহা হইলে আমরা অনশন ত্যাগ করিব।’ নেতারা রাত নয়টার সময় আলিপুর রওয়ানা হইলেন। সেখানে তাহাদের সাথে কথা বলিয়া অনশন ত্যাগ করাইলেন। রাত এগারটায় দমদমে ফিরিয়া আসিলেন এবং অনশন ত্যাগ করাইলেন। চৌত্রিশ দিন পরে রাত বারটায় আমরা ঘোলের সরবৎ দিয়া অনশন ভঙ্গ করিলাম। নেতারা রাত বারটার পর জেল হইতে বিদায় লইলেন ----- আমি মুক্তির পরেই কমিউনিস্ট পার্টির পূর্ণ সদস্যপদ পাইয়াছিলাম। আমি ফরিদপুর জেলার পার্টির সাথে যোগাযোগ করিয়া রাজবাড়ি চলিয়া আসিলাম। রাজবাড়ির প্রফুল্ল কর্মকারের বাড়িতে আমি থাকি-খাই, আর পার্টির কাজ হিসেবে দায়িত্ব থাকে পার্টি বইপত্র, পত্রিকা প্রচার, বিক্রি করা এবং  ইবি রেল রোড ওয়ার্কাস ইউনিয়নে বসিয়া যোগাযোগ রক্ষা করা, শ্রমিকদের মধ্যে যাইয়া পরিচিত হওয়া, পদ্মা মৎস্যজীবী সমিতির কাজ করা।

সত্য মিত্র

১৯৭২ সালে পূর্ব-পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল) ‘পার্টি প্লেনাম’ অনুষ্ঠিত হয়। এই প্লেনামে আবদুল হক, অজয় ভট্রাচার্য, সত্য মিত্র, শরদিন্দু দস্তিদার, ইদ্রিস লোহানী প্রমুখ পিকিংপন্থী কমিউনিস্ট, সংগঠনকে মজবুত ভিতের উপর দাঁড় করান (কমিউনিস্ট আন্দোলনের রুপরেখা, আমজাদ হোসেন, পৃষ্ঠা-৯১)। প্রখ্যাত নেতা সত্য মিত্র বালিয়াকান্দির কোড়কদিতে সম্ভ্রান্ত সান্যাল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

ষাটের দশকে এ দেশে কমিউনিস্ট আন্দোলন ব্যাপক প্রসার লাভ করে ১৯৬৩ সালে রেলধর্ম ঘটে তিনি সাজাপ্রাপ্ত হন। পিকিংপন্থী সমাজ প্রতিষ্ঠায় তিনি অনেক আন্দোলন সংগ্রামে কারাবরণ করেন। পার্টি প্লেনামের পর তিনি আব্দুল হক ও অন্যান্য ত্যাগী নেতাদের মতো আত্মগোপনে চলে যান।

প্রফুল্ল কর্মকার

রাজবাড়ির এক বিপ্লবী নাম প্রফুল্ল কর্মকার। তিনি রাধেশ্যাম জুয়েলার্সের মালিক রাধেশ্যাম কর্মকারের কনিষ্ঠ পুত্র। প্রফুল্ল কর্মকার বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে টেররিস্ট গ্রুপে যোগ দেন। পরে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির ফরিদপুর জেলার সম্পাদক হন। ৩০ এর দশকের প্রথম ভাগে তিনি কারারুদ্ধ হন।

 

 

 

মনমোহন ভাদুড়ী

বোয়ালমারীর ভাদুড়ী পরিবারে জন্ম নেওয়া মনমোহন ভাদুড়ী দীর্ঘসময় গোয়ালন্দে অবস্থান করে মৎস্যজীবীদের সংগঠিত করেন। মনমোহন ভাদুড়ী বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে সুভাষ বসুর আজাদ হিন্দু ফৌজের নেতৃত্ব দেন। তাঁর নেতৃত্বে রাজবাড়িতে আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করা হয়। বেড়াডাঙ্গা (বর্তমানে রহিমুন্নেসা মাদ্রাসা যেখানে) ছিল আজাদ হিন্দ ফৌজের আশ্রয় স্থল। অস্থানীয় অনেক মহিলা এর সদস্য ছিলেন। আজাদ হিন্দ ফৌজে অতন্দ্র প্রহরীর মতো সকাল বিকাল মহড়া দিত। তিনি অনেক সময় জাহ্নবী কুণ্ডুর বাড়িতে আশ্রয় নিতেন। ১৯৪৬ সালে কলিংপঙে বৃটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধি তিনি আজাদ হিন্দ ফৌজের ক্যাপ্টেন হিসেবে নেতৃত্ব দেন। যুদ্ধে জাপানের পরাজয়ের পর আত্মগোপনে রাশিয়া যান। নেতাজী সুভাষ বলছি ----সাড়া জাগানো গ্রন্থটির ক্যাপ্টেন ভাদুড়ী চরিত্রটি মনমোহন ভাদুড়ীর। ১৯৬৪ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

আহম্মদ আলী মৃধা

আহম্মদ আলী মৃধা বহরপুর গ্রামের এক সাধারণ মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। নিজ প্রতিভা, অধ্যাবসায় আর দৃঢ় মননশক্তির দ্বারা তিনি রাজবাড়িতে বিশিষ্ট আইনজীবী এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। রাজবাড়ি টাউন মক্তবের পূর্ব পাশে অবস্থিত নিজ বাসায় তিনি সুদীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন।

আহম্মদ আলী মৃধা জয়েন্ট বেঙ্গল পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি একবার পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্য ছিলেন। রাজনীতির ক্ষেত্রে তিনি মোহন মিয়া, তমিজ উদ্দিন খান, খানবাহাদুর ইউসুফ হোসেন চৌধুরীর সহযোগী ছিলেন। অত্র অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া মুসলিম সমাজের শিক্ষা দীক্ষা, কাজকর্মে উদ্বুদ্ধকরণে আহম্মদ আলী মৃধা বিশেষ ভূমিকা রেখে গেছেন। বৃটিশ ভারতে মুসলিম সম্প্রদায় নানাভাবে পিছিয়ে পড়ে। শ্রেণি বিন্যাসে তাদের অবস্থান থাকে নিম্নে। হিন্দু সম্প্রদায় এ সময় সমাজের কর্তৃত্ব করে।

মুসলিম সম্প্রদায়ের জাগরণে আহম্মদ আলী মৃধা কাজ করেন গেছেন। মুসলমান যে কেউ তার নিকট যে কোনো ব্যাপারে সাহায্য চাইতে গেলে তাকে তিনি আত্মপত্যয়ী হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে বলতেন। বিভিন্ন রকম কাজ করে উৎপাদন ও আর্থিক অবস্থার উন্নতির জন্য উপদেশ দিতেন। তার পুত্রদের মধ্যে আহমদ মোর্তজা (মর্জি) আমেরিকায় “নাসার’ সম্পাদক। কন্যা নাসিম বানু বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ছিলেন। পুত্রবধু জাহানারা বেগম বিএনপি সরকার আমলে তৎকালীন সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ছিলেন।

ডা. একেএম আসজাদ

ডা. একেএম আসজাদ এমবিবিএস করে মানব সেবার ব্রত নিয়ে এলাকায় চিকিৎসা শুরু করেন। সে সময় জেলায় আর কোনো এমবিবিএস ছিল কিনা তা জানা যায় না। ডা. আসজাদ এ সময়ের বড় ডাক্তার হয়েও অর্থের নেশায় বড় চাকরি গ্রহণ করেননি। আর্তমানবের সেবায় নিজেকে সমর্পণ করেছেন। ডাক্তার হিসেবে তাঁর ফি ছিল সামান্য। কিচিৎসার সাথে তিনি মানুষকে কর্মদ্যোগী হওয়ার উপদেশ দিতেন। পাংশার মাগুরাডাঙ্গী ঐতিহ্যবাহী কাজী পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন (১৯২২)। পিতা কাজী আব্দুল মাজেদ ছিলেন বিশিষ্ট মুসলিম লীগ নেতা। পাকিস্তান আন্দোলনে তিনি বিশেষ ভূমিকা রাখেন। কাজী আব্দুল মাজেদের লেখা ‘বিশ্বরাজনীতি ও পাকিস্তান’ গ্রন্থখানা সমকালীন রাজনীতিতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তাঁর পুত্র একেএম আসজাদ পাংশা জর্জ হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে কলিকাতায় লেখাপড় করেন। অতঃপর কলিকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন। ছাত্র থাকা অবস্থাতেই তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। মুসলিমলীগের ছাত্র সংগঠনের ছিলেন অন্যতম নেতা। পরবর্তীতে মুসলিম লীগের রাজনীতিতে যোগদান করে গোয়ালন্দ মহকুমার মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন।

পাকিস্তানবাহিনীর বর্বরোচিত আক্রমণ থেকে স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠায় ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে ডা. আসজাদের অসামান্য অবদান রয়েছে। ২৫ মার্চ কালরাতে তাঁর ভগ্নিপতি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামী কমোডর মোয়াজ্জেম হোসেন পাকিস্তানবাহিনীর হাতে নির্মমভাবে নিহত হলে তিনি স্থানীয়ভাবে রাজবাড়ি শহরে সকল রাজনৈতিক ব্যক্তিও যুবকদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সংগঠিকত করেন। পরে তিনি কুষ্টিয়ার যুদ্ধে নেতৃত্বে দেন। তিনি সারাজীবন ইসলামিক আদর্শের অনুসারী ছিলেন। কুরআন ও সুন্না’য় তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। বেশভূষায় ছিলেন একজন খাঁটি মুসলমান। স্বৈরশাসকের পতনের পর ১৯৯১ সালে সংসদ নির্বাচনে রাজবাড়ি-২ আসনে জামায়াতে ইসলাম থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

Additional information