শতবছরের রাজনীতি - পৃষ্ঠা নং-৫

পরে ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসি হয় (১৯০৮)। ক্ষুদিরামের ফাঁসিতে সারা ভারতবর্ষের শোকের ছায়া নেমে আসে। তাঁর উদ্দেশ্যে রচিত ‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি’ গানটি আজও মর্মবেদনায় ব্যথিত করে। রাজবাড়ি স্বদেশী আন্দোলনের ঘাঁটি বলে পরিচিত ছিল। রেলপথের সহজ যোগাযোগের কারণে স্বদেশীদের গুপ্ত সংগঠন বিস্তার লাভ করে। বেলগাছি, রামদিয়া, বালিয়াকান্দি, সমাধিনগর, রাজবাড়ি, গোয়ালন্দ, খানখানাপুর অনুশীলন ও যুগান্তর কর্র্মীরা মজবুত সংগঠন গড়ে তোলে। কংগ্রেস কর্মীদের নিরব সমর্থন থাকায় গুপ্ত সংগঠনগুলোর কাজ করার সুবিধা হয়। রাজবাড়ির প্রফুল্ল কর্মকার, শ্যামেন ভট্রাচার্য, অবণী লাহিড়ী, অনিল লাহিড়ী, সমর সিংহ, আশু ভরদ্বাজ দ্বারা অনুশীলন সমিতি পরিচালিত হয়। অনুশীলন যুগান্তর যে বিপ্লব ও আন্দোলন গড়ে তোলে তা সুদূর প্রসারী প্রভাব বিস্তার করে। কংগ্রেস, মুসলিমলীগ নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির সাথে সাথে বিপ্লবীদের কর্মকাণ্ড চলতে থাকে।

১৯০৭ সালে স্বদেশী আন্দোলনকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য ফরিদপুরে অম্বিকাচরণ মজুমদারকে সভাপতি ও আব্দুর রহমানকে সম্পাদক করে ফরিদপুর জেলা সমিতি গঠিত হয়। স্বদেশী আন্দোলন পূর্ববঙ্গে বিশেষ করে বরিশাল ও ফরিদপুরে ব্যাপকভাবে প্রসার লাভ করে। ফরিদপুর জেলাতেই অনুন্য একহাজার সভা অনুষ্ঠিত হয় (ফরিদপুরের ইতিহাস, আনম আবদুস সোবহান, পৃষ্ঠা-২৭০)। স্বদেশী আন্দোলনের সময় পাংশার রওশন আলী চৌধুরীর সম্পাদনায় ঐতিহ্যবাহী ‘কোহিনুর’ পত্রিকা এবং ফরিদপুর ‘হিতৈষিণী’ পত্রিকা বিশেষ ভূমিকা পালন করে। আন্দোলনের নানা গল্পকথা এখনো রাজবাড়ির প্রবীনদের মুখে শোনা যায়। বিশেষ করে ক্ষুদিরামের ফাঁসি নিয়ে রচিত গান জেলার জনমানুষের নিকট এখনো খুব প্রিয়।

স্বদেশী আন্দোলনে পাংশার রওশন আলী চৌধুরী এক কিংবদন্তি নাম। তিনি কেবল কংগ্রেসের রাজনীতির প্রতি সারাজীবন অনুগতই থাকেননি, সাথে সাথে স্বদেশেী আন্দোলনে অত্র অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দেন। পাংশায় ‘স্বদেশ বান্ধব’ সমিতি গঠন (১৯০৫) করে আন্দোলনের পক্ষে এ অঞ্চলে জনমত গড়ে তোলেন। তাঁর আদর্শে অনুগত হয়ে যুব বৃদ্ধ উদ্বুদ্ধ হয়। পাংশাকে তখন ‘স্বদেশী সংঘখানা’ বলা হত। স্বদেশী আন্দোলন শুরু হয়েছিল ‘বয়কট আন্দোলন দিয়ে। বৃটিশ কাপড় ও লবণ বর্জন এবং দেশীয় বিকল্প ব্যবহারের আহবান সারা প্রদেশে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে। বিদেশী কাপড়ের দোকানের সামনে ছাত্র-যুবকদের পিকেটিং ছিল নিত্যকর্ম। তমিজ উদ্দিন খান তখন খানখানাপুর সুরাজ মোহিনীর ছাত্র। তার আত্মজীবনী থেকে-----‘আমরা বেশিরভাগ ছাত্ররা স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে এ আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলাম। স্লোগান দেয়া ছাড়াও অনেক রকম কাজ করতে হতো।

বিদেশী কাপড়ের দোকানের সামনে পিকেটিং করতাম। কাজ না হলে জোর করে লিভারপুলের লবণের পোটলা অসতর্ক ক্রেতাদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে মাটিতে ফেলে পা দিয়ে মারাতাম। আমাদের দাপট অপ্রতিরোধ্য। আইন ও শৃংখলা একেবারে অন্তর্নিহিত হলো।’ (কালের পরীক্ষা ও আমার জীবনের দিনগুলি, তমিজ উদ্দিন খান পৃষ্ঠা-২৯)।

এ সময় একদল স্বেচ্ছাসেবীর বিরুদ্ধে গুণ্ডামীর অভিযোগ আনা হয়। রাজবাড়ির একজন ম্যাজিস্ট্রেট নাসির (তমিজ উদ্দিন খানের আত্মীয়) ও তার দলের বিচার করেন। ফরিদপুরের দুইজন উকিল পূর্ণচন্দ্র মিত্র ও নলিনীকান্ত সেন তাদের পক্ষে দাঁড়ালেন। ত্রিশ টাকা জরিমানা করে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। (তখনকার দিনে ত্রিশ টাকা বর্তমানে প্রায় ৫ মন চাউলের দামের সমান)। আন্দোলন কিছুদিনের জন্য দমন থাকলেও তা চলতে থাকল। সরকারের দমননীতিও চলতে থাকল। সব স্কুলের ছাত্রদের উপর কড়া নজর রাখা হচ্ছিল। এ বছর (১৯০৬) রাজবাড়ি অঞ্চলের ছাত্রদের ম্যাট্রিক পরীক্ষার পাসের হার ছিল মাত্র শতকরা পঁচিশ ভাগ। ছাত্ররা এ বছরটাকে ‘হত্যার বছর’ বলত (প্রাগুপ্ত, পৃষ্ঠা-২৯)।

Additional information