শতবছরের রাজনীতি - পৃষ্ঠা নং-৬

স্বদেশী আন্দোলনকালে মীর মশাররফ হোসেন পদমদি অবস্থানকালে ‘বিবি কুলসুম’ গ্রন্থ লিখছিলেন। তাঁর কথায়------‘স্বদেশী আন্দোলনে কুলসুম বিবি অত্যন্ত বিরক্ত ছিলেন। আন্দোলনকারীদের দুই তিনজন ব্যতিত সকলের ঘরের খবর সন্ধান করিয়া  বলিতেন যে, ইহাদের এরকম ঝকমারী কেন? ঘরে তন্দুল নাস্তি ও দিকে ধনকুবের  অদ্বিতীয় রাজশক্তিসম্পন্ন বৃটিশজাতি, বিদ্যাবুদ্ধিতে জগতশ্রেষ্ঠ, শাসন সভ্যতার জগতে সর্বজাতির আদর্শ এবং অগ্রাণী বিচার ক্ষেত্রে ধীর-স্থির। এমন নিরপেক্ষ রাজার বিরুদ্ধ বিরক্তির কারণ হইয়া কী লাভ হইবে? দিদিমনিরা সভাসমিতি করিয়া হাতের বলয় এবং অন্য অলঙ্কার পর্যন্ত খুলিয়া দিয়া দেশ উদ্ধার করিতেছেন’ (মীর মশাররফ রচনা সম্ভার পৃষ্ঠা-৪৫২)। ত্রৈলোক্যনাথ ভট্রাচার্যের লেখায় ‘১৯০৬ সালেই অসিল রাজবাড়ি ওয়ার্কাশপের কর্মীদের সঙ্গে আমাদের স্কুলের ছাত্রদের সংঘর্ষ হয়। ইহার কিছুকাল পরেই আসিল বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন। আসির অনেক ঝামেলা। ছেলেরা বিলাতি লবণ জলে ঢালিয়া দিতে লাগিল। মেয়েরা স্কুলে পিকেটিং করিয়া স্কুল পরিচালনা প্রায় অচল করিয়া দিল। নানা বিভ্রাটে প্রায় হাবুডুবু খাইতে লাগিলাম। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পরিসমাপ্তি ঘটে। সম্রাট পঞ্চম জর্জ আসিলেন ভারত পরিদর্শনে। দিল্লীতে বসিল করোনেশন দরবার। সম্রাট বঙ্গভঙ্গ নাকচ করিয়া দিলেন। ভাঙ্গা বাংলা আবার জোড়া লাগিল। আনন্দের সীমা নাই। প্রতি জেলায় ও মহকুমায় উৎসবের ধুম পড়িয়া গেল। শোভাযাত্রা, সভা, যাত্রাগান, থিয়েটার, কীর্তন, কবিগান ভাসান ইত্যাদি কিছু বাকি থাকিল না। লক্ষ লক্ষ টাকা জলের মতো খরচ হইয়া গেল।’ এ থেকে বোঝা যায় স্বদেশী আন্দোলন রাজবাড়িতে শক্তিশালী রুপ ধারণ করেছিল।

খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন

বৃটিশ ভারতে বৃটিশদের বিরুদ্ধে নানা আন্দোলন সংগ্রামের মধ্যে খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন অন্যতম। বিশ শতকের শুরু থেকে তিরিশের দশক পর্যন্ত বৃটিশদের বিরুদ্ধে নানা আন্দোলন, সংগ্রাম বৃটিশ শাসনের ভিত কাঁপিয়ে তোলে। এ সময়টি ছিল ‍বৃটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রামের অগ্নিযুগ। এ সময়ের মধ্যে অনুশীলন, স্বদেশী, খেলাফত, অসহযোগ, কমিউনিস্ট আন্দেোলন, সংগ্রাম, বিপ্লব, প্রবল আকার ধারণ করে। কংগ্রেস, মুসলিমলীগ, প্রজাসমিতি প্রভৃতি নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোও শক্তিশালী হওয়ায় সাধারণ মানুষ সচেতন হয়ে ওঠে। এ সময়ের মধ্যেই বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু ফাঁসিকাষ্ঠে আত্মদান করেন (১১-০৮-১৯০৮ খ্রি.) এবং প্রফুল্ল চাকীর আত্মহত্যা, (০১-০৫-১৯০৮) ইংরেজের শাসন থেকে মাতৃভূমিকে মুক্ত করার লক্ষ্যে খ্যাতনামা বিপ্লবী বিনয়, বাদল, দীনেশ সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনে যোগ দেন এবং শহীদ হন। ১৯৩০ সালে সূর্যসেনের নেতৃত্বে চট্রগ্রামে অস্ত্রগার লুণ্ঠন, পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ এবং আহত অবস্থায় পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দার (১৯৩২)। বৃটিশ শাসকদের হিন্দুদের পাশাপাশি মুসলমানদের আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাস কম বিস্তৃত নয়। তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা, হাজী শরিয়তুল্লাহর ফরায়েজী আন্দোলন, পীর দুদুমিয়ার নীলবিদ্রোহ, খেলাফত আন্দোলন ইতিহাস খ্যাত। এসব আন্দোলন যেমন ইংরেজ শাসকের বিরুদ্ধে সংগ্রাম তেমনি তা পশ্চাৎপদ মুসলমানদের স্বজাতীয়বোধে উদ্বুদ্ধ করেছিল। খেলাফত আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে মওলানা মুহাম্মদ আলী ও মওলানা শওকত আলী ভ্রাতৃদ্বয়ের দ্বারা। বৃটিশশাসনের শুরু থেকেই মুসলমানেরা বিদ্বেষ ও আত্মভিমানে ইংরেজদের থেকে দূরে থাকে। তৎকালীন তুর্কী সুলতানের প্রতি মুসলমানরা অনুরক্ত থাকে।

Additional information