শতবছরের রাজনীতি - পৃষ্ঠা নং৭

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে (১৯১৪-১৯১৮) পরাজিত তুরস্কের প্রতি মিত্রপক্ষের (বিশেষ কর বৃটিশদের) মুসলমান দেশ মাত্রই বিরক্তির সৃষ্টি করেছিল। বিষয়টি ভারতবর্ষের মুসলমানদের মনেও গভীর রেখাপাত করে। আলী ভ্রাতৃদ্বয় মওলানা মোহাম্মদ আলী ও মওলানা শওকত আলী আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে বৃটিশ সরকারের ন্যাক্কারজনক ভূমিকার নিন্দা করেন এবং শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তোলেন। এ আন্দোলন খিলাফত আন্দোলন নামে খ্যাত। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে ১৭ অক্টোবর খেলাফত দিবস পালিত হয়। একে ফজলুল হক এবং মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে বাংলায় খেলাফত আন্দোলন গড়ে ওঠে। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ নভেম্বর ফজলুল হকের সভাপতিত্বে খিলাফত বৈঠকের প্রথম অধিবেশন দিল্লীতে অনুষ্ঠিত হয়। (বাংলাদেশ ইতিহাস পরিক্রম, একেএম রইস উদ্দিন খান, পৃষ্ঠা-৬১৫)। ১৯২০ সালে আইমান মঞ্জিলে খেলাফত কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়।

খেলাফত আন্দোলনের পাশাপাশি শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। কলিকাতায় কংগ্রেসের বিশেষ অধিবেশনে (৪ সেপ্টেম্বর ১৯২০) মহাত্মা গান্ধী ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের প্রস্তাব করে। সর্বস্মতিক্রমে প্রস্তাব গৃহীত হয়। খেলাফত ও অসহযোগের যুগপৎ আন্দোলন দুর্বার গতিলাভ করে এবং ইংরেজ শাসকের ভিত কাঁপিয়ে তোলে।

খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে হিন্দু ও মুসলমানগণ এ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যোগদান করে। উকিল ব্যারিস্টারগণ আদালত ত্যাগ করেন, ছাত্র-ছাত্রীগণ স্কুল কলেজ পরিত্যাগ করে। শ্রমিকরা কারখানা ত্যাগ করে। সর্বত্র স্বদেশী পণ্য ব্যাবহারের হিড়িক পড়ে। দেশের সর্বত্র ধর্মঘট এবং বিলেতি কাপড় ও অপরাপর সামগ্রি বর্জনের দরুন উম্মাদনার সৃষ্টি হয়। চরকায় সুতা কেটে খদ্দর পরা শুরু হয়। মানুষ কার্পাশ বুনে তুলাচাষ আরম্ভ কার্পাশ বুনে তুলাচাষ আরম্ভ করে। এলাকাভিত্তিক পল্লী সংগঠন গড়ে ওঠে। রাজবাড়িতে খেলাফত ও অসহযেগ আন্দোলনে যোগ দেন মৌঃ তমিজ উদ্দিন খান, চারুপ্রভা সেন, সোনাপুরের নরেশ ঘোষ, পাংশার এয়াকুব আলী চৌধুরী, রওশন আলী চৌধুরী, পাটকিয়া বাড়ির ইসমাইল হোসেন বিশ্বাস, অ্যাডভোকেট আবদুল মাজেদ, সমর সিংহ, খানখানাপুরের বিজন ভট্রাচার্য, মাজবাড়ির আহম্দ আলী। সুসাহিত্যিক এয়াকুব আলী চৌধুরী আর এস কে ইনস্টিটিউশনের শিক্ষকতা পরিত্যাগ করে খেলাফত আন্দোলনে যোগদান করেন। তিনি কংগ্রেসের কর্মী ছিলেন। আন্দোলন করার জ্য তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। খানখানাপুরের প্রখ্যাত নাট্যকার, অভিনেতা, কথাসাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবীর স্মামী বিজন ভট্রাচার্য আন্দোলনরত অবস্থায় রাজবাড়ি থেকে গ্রেপ্তার হন। (চরিতাভিধান, বাংলা একাডেমী, পৃষ্ঠা-২৪৬)।

মাজবাড়ির (সোনাপুর) আহম্মদ আলী একটি পল্লী সংগঠন গড়ে তোলেন এবং অসহযোগ আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। এমনিতেই রাজবাড়ির বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁতী সম্প্রদায়ের বসবাস ছিল। অসহযোগ আন্দোলনের সময় এসব তাঁতশিল্পীরা দেশীয় কার্পাসের সুতায় কাপড় উৎপাদন করে আন্দোলনকারীদের সাহায্য করত। রাজবাড়িতে অসহযোগ আন্দোলনকালে কার্পাশ বপন শুরু হয় তা দীর্ঘদিন চলে। অসহযোগ আন্দোলন বিষয়ে তমিজ উদ্দিন খান এর আত্মজীবনী এ কথাই প্রমাণ করে যে, অসহযোগ আন্দোলন, সাঈদ আহমদ দেহলভীর ওহাবী আন্দোলন, সবই ভারত থেকে বৃটিশ শাসনের সমাপ্তি ঘটানোর সংগ্রামে সাহায্য করেছে। গান্ধী বলেছেন মুসলমান হচ্ছে গুণ্ডা আর হিন্দু কাপুরুষ। অসহযোগের তাৎক্ষণিক কাল ছিল নৈরাশ্যজনক। বিপুল বিশৃংখলা সৃষ্টি হওয়ায় সরকার নিষ্ঠুর দমন নীতি গ্রহণ করে। আন্দোলন চলতে লাগল গোপনে। গোয়ালন্দে এ্যালেন সাহেবকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হল। মিঃ ও মিসেস আশু বসু ও শামসুল আলম খুন হলেন।’ (কালের পরীক্ষা ও আমার জীবনের দিনগুলি)।

Additional information