শতবছরের রাজনীতি - পৃষ্ঠা নং-৮

তমিজ উদ্দিন খান এভাবেই রাজবাড়িতে গোয়ালন্দ, খানখানাপুর, পাংশা, বালিয়াকান্দি অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনের কথা লিখেছেন। গান্ধীজীর অহিংসা মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে তমিজ উদ্দিন খান কংগ্রেসে যোগদান করেন এবং এ অঞ্চলে অসহযোগ আন্দোলনের নেতৃত্ব দান করেন। মূলত অসহযোগ আন্দোলন হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে জোরালো হয়ে উঠেছিল এবং উভয় জাতিকে ইংরেজ বিতাড়নে একজাতিতে পরিণত করেছিল।

ইংরেজ বিতাড়নে তাদের শাসন ও পণ্যবর্জনসহ সকল ক্ষেত্রে অসহযোগিতা করাই অসহযোগ আন্দোলনের মূল মন্ত্র। তৎকালীন সময়ে ফরিদপুরে অসহযোগ আন্দোলনের নেতৃত্বে দেন হাজী শরীয়তুল্লাহর বংশধর। তমিজ উদ্দিন খান অসহযোগে যোগদানের সাথে সাথেই তিনি কংগ্রেসের জেলা  কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এ সময় তিনি কেবল ওকালতীয় গাউন ছাড়া বিদেশী পোশাক বর্জন করে খদ্দর পরা শুরু করেন। এ সময় খেলাফত কমিটিগুলো প্রত্যেক জেলায় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এক যোগে কাজ করতে থাকে। অসহযোগ আন্দোলন গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে পড়ে। রাজবাড়ির প্রায় প্রতি গ্রামে চরকায় সুতা কাটা শুরু হয়। বিশেস করে অসহযোগকারীদের চরকাকাটা বাধ্যতামূলক ছিল। অসহযোগ ও খিলাফতীদের ‘বন্দে মাতরম’ ‘আল্লাহু আকবর’ ‘গান্ধিজীকে জয়’, ‘আলী ভাইদের জয়’, ‘হিন্দু মুসলিমের জয়’ স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। সরকার কংগ্রেসের কার্যকলাপ বে-আইনী ঘোষণা করে। তমিজ উদ্দিন খান উপর গেপ্তারী পরওয়ানা জারি হয়। তিনি কারাবন্দি হয়ে অমানবিকভাবে এগার মাস জেল খাটেন।

প্রজা সমিতি

নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির ধারায় কংগ্রেস ও মুসলিমলীগ ক্রমান্বয়েই সাংগঠনিক শক্তি অর্জন করতে থাকে। উভয় দলের জনপ্রতিনিধি জনস্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি বৃটিশ শাসনের কবল থেকে ভারতবর্ষকে মুক্ত করার চেষ্টা করেছে। এক্ষেত্রে কংগ্রেস অসাম্প্রদায়িক ও অধিকতর স্বাধীনতাকামী। পাশাপাশি মুসলিম লীগ সংখ্যালঘিষ্ট মুসলমানদের অধিকার আদায়ে তৎপর দেখা যায়। ফলে অনেক উদার মনোভাবাপন্ন মুসলিম নেতাকে কংগ্রেসী হতে দেখা যায়। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের পাশাপাশি বাংলার বিশেষ করে পূর্ববাংলার মুসলমান ও হিন্দু প্রজাদের স্বার্থ আদায়ে প্রজা সমিতি, প্রজা পার্টি গঠিত। দেশের ডাকসাইটে রানৈতিক নেতৃবৃন্দ প্রজা পার্টির নেতৃত্ব দেন, আন্দোলন করেন, প্রাদেশিক পরিষদে প্রতিনিধিত্ব করেন, প্রাদেশিক সরকার গঠন করে প্রজাস্বত্ত্ব আইন পাশ করেন। বাংলার ব্যাঘ্র বলে পরিচিতি একে ফজলুল হক ও প্রজা পার্টি থেকে প্রাদেশিক সরকারের প্রধানমন্ত্র্রী হন।

রাজবাড়ির মৌলবী তমিজ উদ্দিন খান (খানখানাপুর), আলীমুজ্জামান চৌধুরী (রাজবাড়ি-বেলগাছি) প্রজা সমিতির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও নেতা। আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর দালিলিক গ্রন্থের লেখক রাজনীতিবিদ, প্রজাপ্রেমী, সংগঠক, আইনজীবী কিংবদন্তি নাম আবুল মনসুর আহমেদ প্রজা সমিতির স্বপ্নদ্রষ্টা। প্রজা সমিতি ও প্রজা আন্দোলন তাঁর হাতেই রোপিত হয়। তিনি ময়মনসিংহের মানুষ। সারাদেশেই তখন জমিদারদের দোর্দণ্ড প্রতাপ। জমিদারদের অত্যাচার জুলুমের বিরুদ্ধে কিশোর বয়সেই রাজনীতি সচেতন সভা ডাকেন। মুক্তাগাছার জমিদার শ্রীযুক্ত যতীন্দ্র নারায়ণ আর্চায বার্ষিক সফরে (১৯১৬) এলে কয়েকটি দাবি পেশ করেন। তার মধ্যে কাচারিতে প্রজাদের বসার স্থান নির্ধারণ। সে সময় সাধারণ প্রজাদের বসার জন্য চট ও মাতুব্বর প্রজাদের বসার জন্য লম্বা বেঞ্চির ব্যবস্থা করা হত। তিনি প্রজাদের জন্য চটের বদলে পাটির ব্যবস্থা করার অনুরোধ করেন। পরবর্তী সময়ে এ দাবি মেনে নেওয়া হয়। এভাবেই শুরু প্রজা অধিকার আদায়ের দাবি।

Additional information