শতবছরের রাজনীতি - পৃষ্ঠা নং-৯

একে ফজলুল হক, মৌলবী আবুল কাশেম, খান বাহাদুর আলীমুজ্জামান চৌধুরী (রাজবাড়ি) মওলানা মোহাম্মাদ আকরাম খাঁ, মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামবাদী, মৌলবি তমিজ উদ্দিন খান (রাজবাড়ি) তাঁরা গরিব প্রজাদের জন্য কাজ করে আসছিলেন (আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর আবুল মনসুর আহম্মদ পৃষ্ঠা-১২)। এরপর খেলাফত অসহযোগ (১৯২০), পল্লী সংগঠক, বেঙ্গল প্যাক্ট (১৯২৪) স্বরাজ্য দল (দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস ১৯২৩) কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের হিন্দু মুসলিম ঐক্য প্রচেষ্টা ইত্যাদি ঘটনা প্রবাহের মধ্যে আবুল মনসুর আহমদ কংগ্রেস ত্যাগ করেন ১৯২৯ সালে নিখিলবঙ্গ প্রজা সমিতি গঠন করেন। এই সমিতির সভাপতি হন স্যার আব্দুর রহিম এবং সেক্রেটারী হন মওলানা আকরাম খান, মৌলবী তমিজ উদ্দিন খান জয়েন্ট সেক্রেটারী নির্বাচিত হন। অন্যান্যারা হলেন মৌঃ মুজিবুর রহমান, একে ফজলুল হক, কান বাহাদুর আবুল মোমিন (সিআইসি)। প্রজা সমিতির চৌদ্দ দফার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দফাগুলো ছিল বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারদের উচ্ছেদ, খাজনার নিরিখ, হ্রাস, নায়েব সেলামী রহিতকরণ, খাজনা ঋণ মওকুফ, মহাজনী আইন প্রণয়ন, সালিশীবোর্ড গঠন, হাজা-মজা-নদী সংস্কার, প্রতি থানায় হাসপাতাল স্থাপন, প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করণ, পূর্ববাংলায় স্বায়ত্ব শাসন।

১৯৩৫ সালের পর প্রজা আন্দোলন নামে তা পূর্ববাংলার সব জেলাতে ছড়িয়ে পড়ে। মূলত কৃষক প্রজা পার্টি ছিল মুসলমানদের নিয়ে অসাম্প্রদায়িক মনোভাবের পার্টি। মুসলিম সম্প্রদায়ভূক্ত দল আর প্রজা সমিতি মুসলমানদের সংগঠন হলেও হিন্দু মুসলিম সাধারণ প্রজার স্বার্থে কাজ করে। মোহাম্মদ আকরাম খাঁ বলেছিলেন ‘হিন্দুরা যেমন অসাম্প্রদায়িক কংগ্রেস নামে হিন্দু প্রতিষ্ঠান চালায় আমরাও তেমনি অসাম্প্রদায়িক প্রজা সমিতি নামে মুসলিম প্র্রতিষ্ঠান চালাইব।’ তাদের স্লোগান ছিল, ‘লাঙ্গল যার মাটি তার।’ এ সময় ফরিদপুর থেকে ‘লাঙ্গল’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হত। আর রাজবাড়ি-পাংশা থেকে খোন্দকার নাজির উদ্দিন ‘খাতক’, ‘কাঙ্গাল’ ‘গুর্খা’ নামে পত্রিকা প্রকাশ করেন এবং কৃষক প্রজা সংগঠিত করেন। কৃষক প্রজা সমিতি ক্রমে একে ফজলুল হকের নেতৃত্বে গণদাবি আদায়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠে এবং ফলশ্রুতিতে ১৯৩৭ সালের পার্লামেন্টারী নির্বাচনে কৃষক প্রজাপার্টি ও মুসলিম লীগ কোয়ালিশন সরকারের হক মন্ত্রীসভা গঠিত হয়। উক্ত মন্ত্রীসভার প্রধান হন কৃষক প্রজা পার্টির নেত একে ফজলুল হক।

হক মন্ত্রীসভায় ১৯৩৮ সালে ঋণ সালিশী বোর্ড স্থাপন, ১৯৩৯ সালে প্রজাস্বত্ত্ব আইন পাস হয়। ১৯৪০ সালে মহাজনি আইন, প্রাথমিক শিক্ষা আইন অনুসরণে স্কুল বোর্ড গঠন, মাধ্যমিক শিক্ষা আনয়ন বিল পাস হয়। ‍ঋণ সালিশী বোর্ড ও প্রজাস্বত্ত্ব আইন পাশে কৃষক প্রজা ভূমি অধিকারে লাভবান হয়। তারা সম্পত্তির মালিকানা লাভে স্বত্ত্ববান হতে শুরু করে। জমিদার, মহাজনের, ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে। রাজবাড়ির মৌঃ আহমদ আলী মৃধা প্রজা সমিতি সদস্য ও ফজলুল হকের নেতৃত্বে প্রজা সমিতির সংগঠিত করে কৃষকদের মধ্যে গণচেতনা সৃষ্টি করেন। জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের নিরক্ষর কৃষকেরা প্রজা সমিতি, হক সাহেব ও হক সাহেবের প্রজাস্বত্ত্ব আইন ও ঋণ সালিশী বোর্ড বিষয়ে জানত। তারা মনে-প্রাণে হক সাহেবকে ভালোবাসত। আহমদ আলী মৃধা হক সাহেবকে ক্যাবিনেটে প্রজাপক্ষের পাস করা আইনকে বলতেন ‘হক সাহেবের কাচো চিৎ করা আইন।’ কচ্ছপকে চিৎ করা হলে যেমন উপুড় হওয়ার চেষ্টা করেও উপুড় হতে পারে না তেমনি হক সাহেবের পাস করা আইনের ফাঁকফোঁকর দিয়ে কেউ গরীব প্রজাকে ঠকাতে পারত না। এ কথাটি এখনো রাজবাড়ির অনেক বৃদ্ধদের মুখে শোনা যায়। ‘সালিশী বোর্ড প্রজাস্বত্ত্ব আইন ও মহাজনি আইনে বাংলার কৃষক প্রজার জীবনে এক শুভ সূচনা হল। তারা কথিত আসন্ন মৃত্যুর হাত হতে বাঁচিয়া গেল। ফলে হক মন্ত্রীসভার এই দুই তিনটা বছরকে বাংলার মুসলমানদের জন্য সাধারণভাবে কৃষক প্রজাখাতকদেদর জন্য বিশেষভাবে একটা স্বর্ণযুগ বলা যেতে পারে।’ (আমার দেখা রাজবাড়ির পঞ্চাশ বছর, আবুল মনসুর আহমেদ, পৃষ্ঠা-১৩৭)

Additional information