শতবছরের রাজনীতি - পৃষ্ঠা নং-১০

সুভাষ বসুর নেতৃত্বে রাজবাড়ির উত্তপ্ত রাজনীতি

নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু উপমহাদেশের রাজনীতিতে এক কিংবদন্তি নাম। সর্ব ভারতীয় কংগ্রেসের নেতাসহ স্বরাজ আন্দোলন, আজাদ হিন্দ ফোর্স সংগঠন, অন্তর্ধান আজও নানা রহস্যের জাল বিস্তার করে আছে। তিনি সর্বভারতীয় রাজনীতিতে উল্কার মতো দেখা দিয়ে, সবার চোখ ধাঁধিয়ে রাতারাতি হারিয়ে যান। অসহযোগ আন্দোলন চলাকালীন অবস্থায় সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী ও চিত্তরঞ্জন দাস স্বাধীনতাকে তরান্বিত করার জন্য কংগ্রেসের উপদল হিসাবে স্বরাজ পার্টি গঠন করেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন তখন সহকারী হিসাব পেয়েছিলেন তরুণ প্রতিভাবান এবং লড়াকু নেতা সুভাষ চন্দ্র বসুকে। সুভাষ চন্দ্র বসু আই সিএস পরীক্ষায় চতুর্থ স্থান অধিকার করেও ইংরেজদের চাকরি ছেড়ে দিয়ে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন। ১৯২৬ সালে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তাতে এই পার্টি অধিকাংশ হিন্দু আসনে জয়ী হয়। গোয়ালন্দ সে সময় পূর্ববাংলার প্রবেশ পথ এবং রেল যোগাযোগে স্বরাজ আন্দোলনের পূর্বকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হত। সুভাষ চন্দ্র বসু কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট হন এবং কংগ্রেস ও স্বরাজ ঐক্যবদ্ধ সূত্রে হিন্দু ও মুসলমানদের ঐক্যের প্রচেষ্টা করেন। স্বরাজের সূত্র ধরে রাজবাড়ি ও গোয়ালন্দে রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক ও সমাজসেবীদের সমাবেশ ঘটে। সূর্যনগরের হরিণধরার বৃন্দাবন দাস স্বরাজ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। সাহিত্যসেবী অবধুত তাঁর কালজয়ী ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ গ্রন্থখানি বৃন্দাবন দাসের নামে উৎসর্গ করেন। স্বরাজ আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট হন মনোমহন ভাদুড়ী, কুমার বাহাদুর, নারায়ণ চক্রবর্তী, জাহ্নবী কুণ্ডু প্রমুখ। স্বরাজ আন্দোলনের মিশ্রণ সন্ত্রাসী আন্দোলন হিসেবে নানা স্থানে দাবি আদায়ে আন্দোলন সংগ্রাম শুরু হয়। এত্র এলাকায় গোয়ালন্দ মৎস্যজীবী আন্দোলন সংগঠিত হয়।

জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে তাঁর সময়ে ১৯৩৭ সালে রাজবাড়ি ড্রাই-আইস ফ্যাক্টরি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এ সময়েই সূর্যনগরে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘সুভাষচন্দ্র বসু’ কটন মিল। ১৯৪০ সালে সাবেক কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট সুভাষ বসু কলিকাতা কংগ্রেস ও কলিকাতা মুসলিম লীগের মধ্যে এক চুক্তি ঘটান। চুক্তির ভিত্তিতে কলিকাতা করর্পোরেশনের নির্বাচনে জয়ী হন। এরপরেও তিনি হিন্দু ও মুসলিম লীগের ঐক্য ধরে রাখতে ব্যর্থ হন। ইতিমধ্যে তিনি কংগ্রেস ত্যাগ করে ফরোয়ার্ড ব্লক পার্টি গড়ে তোলেন। এ সময় তিনি হিন্দু মুসলিম ঐক্যের প্রচেষ্টায় সিরাজ-উদ-দৌলাকে বাঙালি জাতীয়তার প্রতীকরুপে জীবন্ত করা এবং প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে হলওয়েল মনুমেন্ট ভাঙ্গার সত্যাগ্রহ গ্রহণ করেন। এসময় তরুণ নেতা চৌধুরী মোয়াজ্জেম হোসেন লাল মিয়া (ফরিদপুর) তরুণদের উদ্বুদ্ধ করেন। প্রতিদিন শত শত সত্যাগ্রহী নেতা গ্রেফতার হতে থাকে। সুভাষ বসু গ্রেফতার হন এবং ১৯৪০ সালে আন্দোলনের মুখে মুক্ত হন। জেল থেকে বের হয়ে তিনি কারো সাথে দেখা দিতেন না। নিজের ঘরে কাউকে ঢুকতেও দিতেন না। নির্ধারিত সময়ে ঠাকুর খাবার রেখে দরজায় টোকা দিয়ে চলে আসত। ১৯৪১ সালের ২৪ জানুয়ারি দেখা গেল খাবার পরে আছে, দরজা খোলা, সুভাষ বসু নেই। সুভাষ অন্তর্ধান হলেন।

১৯৪১ এর ২৬ জানুয়ারি তিনি দেশত্যাগ করেন। উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলের মধ্য দিয়ে কাবুল হয়ে রাশিয়ায় যান। জার্মানিতে এসে জার্মান সরকারের অনুরোধে একটি অস্থায়ী ভারত সরকার গঠন করেন। এরপর ইউরোপ থেকে সাবমেরিনযোগে আটলান্টিক ও ভারত মহাসাগর পার হয়ে ১৯৪৩ এর ২ জুলাই সিঙ্গাপুরে পৌঁছান। ১৯৪৩ এর ৪ জুলাই রাসবিহারীবসু দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার ‘আজাদ হিন্দ ফৌজে’র  সর্বময় কর্তৃত্ব সুভাষ বসুর হাতে সমর্পণ করেন।

তখন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ চলছিল। যুদ্ধে জার্মানির পক্ষে জাপান আর বিপক্ষে বৃটিশ। সুভাষ বসু ইংরেজ তাড়ানোর কৌশল হিসাবে জাপানের পক্ষ সমর্থন করেন। আজাদ হিন্দ ফৌজ সরাসরি জাপান সৈন্যদের সাহায্য করেন। যৌথবাহিনী মনিপুর পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

Additional information